https://www.prothomalony.com/

18107

bangladesh

বাংলাদেশ

জুলাইয়ের দুই মুখ: অধিকার আন্দোলন ও সহিংসতার রাজনীতি

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪২

জুলাই কি শুধু আন্দোলন, নাকি এর পেছনে ছিল বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনা? ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। শুরুতে এটি ছিল মূলত একটি ছাত্র আন্দোলন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং একপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। প্রশ্ন হলো, জুলাই কি কেবল একটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল, নাকি আন্দোলনের কোনো পর্যায়ে এর সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও সংগঠিত কর্মকাণ্ড যুক্ত হয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ একপাক্ষিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অতিরিক্ত ও বেআইনি বলপ্রয়োগের গুরুতর অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে থানা, সরকারি স্থাপনা ও পুলিশের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এসব ঘটনার স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।

তাই জুলাইকে শুধু ‘স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন’ কিংবা বিপরীতভাবে শুধু ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করলে পুরো বাস্তবতা বোঝা সম্ভব নয়। বরং অনুসন্ধানের বিষয় হওয়া উচিত, কোন পর্যায়ে একটি ন্যায্য আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠন, সহিংসতা এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের কৌশল যুক্ত হয়েছিল।

জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে পুলিশের ওপর হামলা ও পুলিশ সদস্যদের হত্যার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২১ জুলাই থেকে ১৪ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সহিংসতায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ২১ জন ছিলেন কনস্টেবল। শুধু ৪ ও ৫ আগস্টেই যথাক্রমে ১৪ ও ২৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলায় ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

কোনো রাজনৈতিক মত, ক্ষোভ বা আন্দোলনের দাবিই পুলিশ সদস্যকে হত্যা, থানায় হামলা, অস্ত্র লুট কিংবা সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগকে বৈধতা দিতে পারে না। ৫ আগস্ট ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি অংশ উদ্ধারের তথ্যও প্রকাশিত হয়।

এসব ঘটনা কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতি নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নাগরিক জীবনের জন্যও বড় ধরনের হুমকি। এসব অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অতিরিক্ত ও নির্বিচার বলপ্রয়োগের অভিযোগও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। জাতিসংঘের অনুসন্ধানে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কারণে বহু মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি উঠে এসেছে।

আইনের শাসনের মূল কথা হলো, অপরাধের বিচার ব্যক্তি বা পক্ষ দেখে হবে না। একজন আন্দোলনকারীকে বেআইনিভাবে হত্যা করা যেমন অপরাধ, তেমনি একজন পুলিশ সদস্যকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করাও অপরাধ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহিংসতাও কোনোভাবেই বৈধ রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না।

একটির বিচার চাইতে গিয়ে অন্যটিকে আড়াল করা ন্যায়বিচার নয়। সত্যিকারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সব পক্ষের অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে, তা হলো মবের হাতে বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মাজার কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই দলবদ্ধ হামলা, ভাঙচুর বা শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না।

অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত। অপরাধের প্রমাণ মূল্যায়ন করবে আদালত। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিচার একই আইনে হতে হবে।

মবের হাতে বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকে না। আজ যে জনতা অন্যের বিরুদ্ধে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, কাল সেই একই পদ্ধতির শিকার হতে পারে তার নিজের মানুষও।

জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে পরিবর্তন করা যায়, সেটিও। একটি সরকার চলে গিয়ে আরেকটি সরকার ক্ষমতায় এলেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায় না।

দুর্নীতি, দখল, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দলীয়করণ এবং মব সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে স্বাধীন তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি।

মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত কিংবা দেশের ইতিহাস নিয়ে মানুষের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতভেদ স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে বিতর্ক হবে গবেষণা, যুক্তি ও মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে। ভাঙচুর, অপমান কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে নয়।

একটি জাতির ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়, কিন্তু ইতিহাসের স্মারক বা জাতীয় প্রতীক ধ্বংস করে মত প্রকাশ কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না।

জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি সত্যিকারের সম্মান কেবল স্মরণসভা, স্লোগান কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁদের আত্মত্যাগের মর্যাদা তখনই রক্ষা হবে, যখন বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে অন্যায়ের বিচার হবে, কিন্তু মবের হাতে নয়; অপরাধের শাস্তি হবে আদালতে, প্রতিহিংসার মাধ্যমে নয়; আর রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে জনগণের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, সহিংসতার মাধ্যমে নয়।

জুলাইয়ের প্রকৃত শিক্ষা তাই কোনো দল বা ব্যক্তির জয়-পরাজয়ের গল্প নয়। এটি একটি রাষ্ট্র কীভাবে অন্যায়, সহিংসতা ও প্রতিহিংসার চক্র থেকে বেরিয়ে আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা ও গণতন্ত্রের পথে এগোতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

দল নয়, ব্যক্তি নয়, মব নয়।
শেষ কথা হোক আইন, ন্যায়বিচার এবং মানুষের মর্যাদা।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন