https://www.prothomalony.com/
18144
bangladesh
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিক্স শীর্ষ সম্মেলনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যে কথাগুলো বললেন, তা আসলে নতুন কিছু নয়। বহুদিন ধরে বিশ্বের প্রান্তিক অর্থনীতিগুলোর মুখে মুখে ঘুরতে থাকা একটি দাবিরই আনুষ্ঠানিক প্রতিধ্বনি এটি। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ একগুচ্ছ উদীয়মান অর্থনীতির নেতাদের সামনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর ভর করে আজকের বিশ্বব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে, তা আর বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
"আজকের অর্থনৈতিক, জনতাত্ত্বিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ১৯৪৫ সালের নয়"—এই একটি বাক্যেই তিনি নিরাপত্তা পরিষদ থেকে শুরু করে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা পর্যন্ত গোটা বিশ্ব-প্রতিষ্ঠানিক স্থাপত্যের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলেন।
গুতেরেসের বক্তব্যে চারটি অগ্রাধিকার উঠে এসেছে—অর্থায়ন, প্রযুক্তি, জলবায়ু ন্যায্যতা এবং শান্তি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিপুল আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোকে "আরও বড়, আরও উন্নত, আরও সাহসী" হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গে তাঁর সতর্কবার্তা আরও তীক্ষ্ণ। এই প্রযুক্তির ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে আছে হাতেগোনা কিছু কোম্পানি আর কিছু দেশের হাতে। যা নিয়ন্ত্রণহীন থাকলে আয়, সুযোগ, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিভাজনকে আরও গভীর করবে। জলবায়ু প্রসঙ্গে তাঁর ভাষা ছিল সবচেয়ে তীব্র। দাবদাহ, হিমবাহ গলন, দাবানল, বন্যা—এসব যেন আসন্ন এক ভয়াবহ ভবিষ্যতেরই পূর্বাভাস। তার ওপর অতিরিক্ত শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। ধনী দেশগুলোর প্রতি তাঁর আহ্বান—প্রতিশ্রুত তিনশ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক সহায়তা, অভিযোজন তহবিল তিনগুণ করা এবং ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে অধিকতর অবদান রাখা। খনিজ সম্পদ লুণ্ঠনের বিরুদ্ধেও তিনি স্পষ্ট ভাষায় কথা বলেছেন।
শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে গাজা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও সুদানের প্রসঙ্গ টেনে সনদের মূলনীতি—সার্বভৌম সাম্য, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি—মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
এখন প্রশ্ন হলো, এই বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার আহ্বানে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়। বাংলাদেশ বরাবরই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বের পক্ষে সোচ্চার থেকেছে। বিশেষত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় সেনা ও পুলিশ প্রদানকারী দেশ হিসেবে এই বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিকীকরণের প্রশ্নে ঢাকার একটি নৈতিক অবস্থান রয়েছে। জলবায়ু ন্যায্যতার প্রশ্নেও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জোটের অন্যতম মুখপাত্র। অভিযোজন তহবিল তিনগুণ করার যে দাবি গুতেরেস তুলেছেন, তা কার্যত ঢাকার বহুদিনের কূটনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিধ্বনি। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশের জন্য বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর সংস্কার এবং সহজ শর্তের অর্থায়নের প্রশ্নটি নিছক কূটনৈতিক অলংকার নয়।এটি অর্থনৈতিক টিকে থাকার প্রশ্ন।
বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিক্সের সদস্য নয়। ফলে এই মঞ্চের সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ বাংলাদেশের নেই। এটি একধরনের কূটনৈতিক দ্বিধার জায়গা তৈরি করে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ও উন্নয়ন-সম্পর্ক, অন্যদিকে ভারত-চীন-রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন এই বিকল্প বলয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। এই দুইয়ের মাঝখানে ভারসাম্য রক্ষার কৌশলই বাংলাদেশের ঐতিহাসিক কূটনীতির বৈশিষ্ট্য থেকে গেছে।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রেক্ষাপটে দেখলে বহুপাক্ষিকতার এই সংকট আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা তহবিল ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার প্রশ্নে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে বারবার—এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে, গুতেরেস যে প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থার কথা বলছেন, তা নিছক তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। কক্সবাজারের ক্যাম্পে বসবাসরত লাখো মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে বলা যায়, স্বল্প মেয়াদে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হওয়ার মতো রাজনৈতিক ইচ্ছা এখনো অনুপস্থিত। তবে দীর্ঘমেয়াদে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার দিকে অভিযাত্রা থামানো কঠিন হবে। কারণ অর্থনৈতিক শক্তির ভরকেন্দ্র ক্রমেই এশিয়া ও দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে সরে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় কৌশলগত সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষত অবকাঠামো অর্থায়ন ও জলবায়ু তহবিলের ক্ষেত্রে বিকল্প উৎসের সন্ধানে।
একইসঙ্গে সতর্কতাও জরুরি। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিবলয়গুলোর মাঝে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া ঢাকার ঐতিহ্যগত ভারসাম্যনীতিকে ব্যাহত করতে পারে।
জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেসের এই ভাষণ বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য একটি বার্তাই বহন করে—বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবিতে সম্মিলিত কণ্ঠস্বর তৈরি করা ছাড়া প্রান্তিক অর্থনীতিগুলোর জন্য বিশ্বমঞ্চে দর কষাকষির শক্তি বাড়ানোর আর কোনো সহজ পথ নেই।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন