https://www.prothomalony.com/

18134

north-america

উত্তর আমেরিকা

আটলান্টিকের ঢেউ, অ্যাড্রিয়াটিকের হাওয়া

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:৪৪

এত সুন্দর পৃথিবীটা, একটু নড়াচড়া, ঘুরেফিরে না দেখেই চলে যাব? সেটা কি ঠিক হবে? আমার তো এমনিতেই পায়ের তলায় খড়ম। বোহেমিয়ানের মতো কেবলই ঘুরে বেড়াতে মন চায়।

আমার ছেলেরাও বেড়াতে খুব ভালোবাসে। ভ্রমণ প্রসঙ্গ এলেই আমি তাদের জোরালো সমর্থন পাই। তারা বলে, ‘অফকোর্স মাদার, অবশ্যই বেড়াতে যাবে। তোমাদের এখন অফুরন্ত অবসর। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, সুস্থ আছো, পৃথিবী ঘুরে দেখো। শরীরের যন্ত্রপাতি বিকল হতে শুরু করলে আর এমন সুযোগ পাবে না।’

বড় ছেলে সুমিত ভাইকিং ক্রুজ কোম্পানিতে কাজ করে। অনেক দিন ধরেই সে বলছিল ক্রুজে করে ইউরোপে একটা ট্যুর করতে। তার পরিবার হিসেবে আমরা সেখানে অর্ধেক মূল্যে ভ্রমণের সুযোগ পাব। সুতরাং এমন সুযোগ মিস করা বোকামি। ছোট ছেলে অমিতও উৎসাহিত করল। কিন্তু সাগরভীতির কারণে আমি নিজেই একটু গড়িমসি করছিলাম। পানিতে দম আটকে মরতে আমার বড় ভয়। কেবলই মনে হয়, মৃত্যুকালে অন্তত চারদিক দেখে-শুনে, নিঃশ্বাস ফেলে মরতে পারলে ভালো হয়। যেহেতু সাঁতার জানি না, আমার জন্য সাগর যা, পুকুরও তাই দুটোই মৃত্যুকূপ। সুতরাং নিজেকে বোঝালাম, 'ডরো মাত। কুছ নেহি হোগা। জিন্দেগি এক সফর কা নাম হ্যায়। জব সফর খতম হোগা, তুমকো চলে জানা হোগা। যা সিমরান, যা। জি লো, জিন্দেগি কো।'

জোরেশোরে সাগরযাত্রার আয়োজন শুরু হলো। প্লেন, জাহাজ, ইতালির শহরগুলোতে ইনক্লুডেড ট্যুর, রেস্তোরাঁয় ডিনার; সব ধরনের বুকিং শেষ করে, সমস্ত ভ্রমণ পরিকল্পনার খুঁটিনাটি মাস, দিন, ক্ষণ একটা ছোট ডায়েরিতে লিখে আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো। আমরা নিউইয়র্ক থেকে রোম যাব। রোম বিমানবন্দর থেকে আমাদের পিকআপ করে ভাইকিং আমাদের নিয়ে যাবে ইতালির মোট পাঁচটি বিখ্যাত শহরে। আট দিনে আমরা পর্যায়ক্রমে নেপলস, মেসিনা, ক্রোতোনে এবং বারিতে যাব। এরপরের গন্তব্য ক্রোয়েশিয়ার উপকূলীয় শহর সিবেনিক। শেষ গন্তব্য ভেনিস। ভেনিস ভ্রমণ শেষে পরের দিন বিমানবন্দরে ড্রপ-অফ করে ভাইকিং আমাদের গুডবাই জানাবে।

ইতালি ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে করতেই আমার মাথায় এলো, ‘যেহেতু ভেনিস পর্যন্ত যাচ্ছি, তাহলে ভেনিস থেকে আমরা কেন বিলেত পাড়ি দিই না?’ ইশ! আমার কৈশোরের লালিত স্বপ্নটা কীভাবে এই আটপৌরে জীবনের যাঁতাকলে চাপা পড়ে ছিল! একটু উসকে দিতেই জ্বালামুখ থেকে স্বপ্নরা ভুসভুস করে উদ্গিরণ শুরু করল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে শফিক রেহমানের 'যায়যায়দিন' কত আগ্রহ নিয়েই না পড়তাম! মঈন-মিলার ফোনালাপের সংলাপগুলো কী তুমুলভাবেই না আমাদের আলোড়িত করেছিল! একসময় যায়যায়দিন বন্ধ হয়ে গেল। মঈন-মিলাও হারিয়ে গেল। ২০১৬ সালে সেই মঈন-মিলার কাহিনিকে উপজীব্য করেই একটি গল্প লেখা শুরু করেছিলাম। মঈন যেহেতু ঢাকা-বিলেতে আসা-যাওয়া করত, তাই গল্পের সমাপ্তি টানতে আমারও যেভাবেই হোক মিলাকে বিলেত নেওয়া প্রয়োজন ছিল। ইচ্ছে ছিল মিলার বিলেত ভ্রমণের মধ্য দিয়ে গল্পের সমাপ্তি টানব। কিন্তু নিজে সরেজমিনে বিলেত না দেখলে কীভাবে বিলেতের দৃশ্য সাজাব? তাই বিলেত যাওয়ার প্রতীক্ষায় আমার গল্পটা ওখানেই থেমে গিয়েছিল।

ছোট বোন সালমা দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনের বাসিন্দা। দুই সন্তান বিয়েশাদি করে নিজেদের মতো সংসার করছে। সাল মারাও আমাদের মতোই এম্পটি নেস্টার। ইস্ট লন্ডনের বার্কিংয়ে ওদের তিন বেডরুমের বড়সড় বাড়ি। ও উৎসাহিত হয়েই আমন্ত্রণ জানাল। সুতরাং ‘নো চিন্তা, ডু ফুর্তি’। ভেনিস টু লন্ডনের টিকিটও কাটা হয়ে গেল। বিলেতে আমরা থাকব তিন সপ্তাহ! হুররে!

ভ্রমণ-আয়োজন কমপ্লিট, কেবল যাত্রার অপেক্ষা। হঠাৎ করেই ‘স্টার প্রিন্সেস’ নামক এক জাহাজে নোরোভাইরাস প্রাদুর্ভাবের খবরটা কানে এলো। ৪ হাজার ৩০৭ জন যাত্রীর মধ্যে ১৪১ জন এবং ১ হাজার ৫৬১ জন ক্রুর মধ্যে ৫২ জন ভাইরাসে আক্রান্ত। ভাবলাম, আচ্ছা, দেখাই যাক কী হয়! সবে মার্চ মাস, আমরা যাব আগস্টে। এখনো ঢের দেরি।

খবরটা ধামাচাপা পড়তে না পড়তে জুন মাসে ‘রুবি প্রিন্সেস’ নামে আরেকটা ক্রুজে ব্যাপকভাবে ভাইরাস সংক্রমণের খবর চাউর হলো। সান ফ্রান্সিসকো থেকে আলাস্কা-কানাডা রাউন্ড ট্রিপের ক্রুজটিতে ৩ হাজার ৩২ জন যাত্রীর মধ্যে ১০২ জন এবং ১ হাজার ১৪৪ জন ক্রুর মধ্যে ২৩ জন; মোট ১২৫ জন আক্রান্ত হয়েছে। উপসর্গ ছিল বমি ও ডায়রিয়া। ২৮ জুন খবরটি সিডিসিকে রিপোর্ট করা হয়। সেই একই ভাইরাস! মনটা দমে গেল। তারপর জুলাই মাসে 'National Geographic Sea Bird' জাহাজে পেটের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবরে আমরা আসলেই নড়েচরে বসলাম।

কনসেশন রেটে টিকিট কাটার পরও ডলারের অঙ্কটা আমাদের জন্য খুব একটা কম ছিল না। প্রায় ছয় হাজার ডলারের ধাক্কা! বলা বাহুল্য, আমি একটু মুষড়েই পড়লাম। এতগুলো টাকা এবং জীবনের ঝুঁকি! ছেলেরা অভয় দিল, ‘মা ভেবো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আগস্ট আসতে এখনো দেরি আছে। তা ছাড়া পরিস্থিতি তেমন খারাপ হলে ক্রুজ কোম্পানি ট্যুর বন্ধ করে টাকা ফেরত দেবে। কিংবা ওরা ডিপোজিট ধরে রেখে পরিস্থিতি ভালো হলে নতুন করে বুকিং ইস্যু করবে।’

এদিকে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনও তাঁদের উৎকণ্ঠা প্রকাশ করতে লাগলেন। কেউ কেউ না যাওয়ার পরামর্শও দিলেন। আমার সহযাত্রীও না যাওয়ার টালবাহানা শুরু করলেন। এমনিতেই বেড়ানোর নামে তাঁর গায়ে জ্বর ওঠে, এখন তো আরও ঢোলে বাড়ি।

এদিকে জুলাইয়ের শুরুতেই ‘ভাইকিং সি’ ক্রুজ কর্তৃপক্ষ ইমেইল চালাচালি শুরু করে দিল। তারা স্বাগতম এবং শুভেচ্ছা বাণী পাঠাতে শুরু করল। যাত্রার জন্য কী কী করণীয়, কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন তা স্মরণ করিয়ে দিল। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো বিধিনিষেধ থাকলে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সাজেশন, লেবেলকৃত অরিজিনাল প্যাকেটে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, সাথে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন বহন করার নানাবিধ উপদেশ এবং রিমাইন্ডার এলো পরপর কয়েকটি ইমেইলে। পাসপোর্ট এবং প্রিন্ট করা ভিসা সাথে রাখার জরুরি পরামর্শ এলো। ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি খুচরো ইউরো রাখার পরামর্শসহ এমন কোনো টুকিটাকি বিষয় বাকি রইল না, যা ভাইকিংয়ের নজরদারি এড়াতে পারে। আমরা বিস্মিত এবং মুগ্ধ হলাম। জুলাইয়ের মাঝামাঝি আমাদের দুজনের লাগেজের জন্য লাল চামড়ার ওপর সাদা অক্ষরে ‘ভাইকিং’ লেখা সুদৃশ্য ট্যাগ এবং নিজেদের বুকে লাগানোর জন্য নেমট্যাগ এলো; আমরা রোমের বিমানবন্দরে বের হওয়া মাত্রই তারা যাতে আমাদের সহজেই শনাক্ত করতে পারে। সে এক এলাহি কাণ্ড!

দেখতে দেখতে জুলাইও শেষ হয়ে এলো। হাতে সময় খুব কম। মন থেকে সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে তড়িঘড়ি বোনের পরিবারের জন্য কিছু উপহারসামগ্রী কিনলাম। অভিজাত একটা ক্রুজে যাব, সেই মতো পোশাক-আশাক পরা প্রয়োজন। তাই নিজেদের জন্য কিছু নতুন পোশাক-আশাকও কেনা হলো। সুমিত বলল, ভাইকিং সির যাত্রীরা ধনী এবং অভিজাত শ্রেণির; যারা নির্বিঘ্নে, নিরিবিলিতে, আরামে অবকাশ যাপন করতে চান—এমন মধ্যবয়সী মানুষ এবং অবসরপ্রাপ্ত বুড়োবুড়ির সংখ্যাই বেশি। যেহেতু বাচ্চাকাচ্চা নেই, তাই ভিড়ভাট্টা, হট্টগোল নেই। ক্যাসিনো নেই, ওয়াটার স্লাইড নেই—প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রুচিশীল, শান্ত পরিবেশ।

ছেলেরা বলল, আশা করি তোমাদের জন্য যাত্রাটা আরামের এবং উপভোগ্য হবে।

ছয় মাস আগেই টিকিট কাটা। সমস্ত পরিকল্পনা কাগজের ডায়েরিতে, আইপ্যাডে টুকে রাখা। পরিকল্পনা মাফিক ফ্রিজের খাবারদাবার, বাজারসদাই প্রায় শেষ করে, ঘরদোর পরিষ্কার করে, সবকিছু গুছিয়ে আমরা এক মাসের ভ্যাকেশনের জন্য প্রস্তুত।

অমিতের ছুটি থাকায় আগের দিন সে আমাদের বাসায় চলে এলো। আমরা একসাথে ফেয়ারওয়েল ডিনার খেলাম। শেষবারের মতো চেকলিস্ট ধরে প্রয়োজনীয় সবকিছু নেওয়া হয়েছে কিনা, কোনো কিছু ভুল হলো কিনা পরীক্ষা করা হলো।

আগস্টের তিন তারিখ সকালে, প্রাতরাশ সেরে, ঈশ্বরের নাম নিয়ে আমরা জেএফকের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন