https://www.prothomalony.com/
18135
literature
শুকনো বাবলার চাঁদ
দেবাশিস চক্রবর্তী
একদম ক্লাসিক ভুতুড়ে রাস্তা, দুদিকে ঘন জঙ্গল, আলো বলতে চাঁদের জ্যোৎস্না—আর এই রাস্তার বুক চিরেই আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে সেই আশ্চর্য ডেস্টিনেশনের দিকে, যেখানে নদী, পাহাড় আর এক টুকরো শান্তি জমিয়ে রাখা হয়েছে হয়তো আমাদেরই জন্য। এই রাস্তায় গাড়ি চালাতে গেলে আপনার প্রথমেই মনে হতে পারে, হয়তো এই চাঁদের আলোতে রাস্তার মাঝখানে কোনও এক অপূর্ব সুন্দরী দাঁড়িয়ে থাকবে, আপনি গাড়িতে ব্রেক কষবেন এবং সেও হাওয়ায় বিলীন হয়ে হারিয়ে যাবে জঙ্গলে। এরপর আপনি আপনার কাঁধের সামনে হয়তো দেখবেন একটা কঙ্কালের হাত।
স্নিগ্ধা এবার বলে উঠল, "তুমি কথা বলছ না কেন?"
বললাম, "জঙ্গলের এই রাস্তায় গাড়ি চালানো একটা আর্ট। ফলে ছবি আঁকার সময় আর্টিস্টরা কথা বলে না।"
আমার এ কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল। গাড়িতে আমরা মূলত চারজন রয়েছি—আমি প্রবাল, আমার গার্লফ্রেন্ড স্নিগ্ধা এবং বন্ধু সমৃদ্ধ দত্ত ও তার স্ত্রী শ্রেয়সী। মূলত সমৃদ্ধ আর শ্রেয়সীর জন্যই এই ট্রিপটা আমরা করছি। ওদের ডিভোর্সের অ্যারেঞ্জমেন্ট চলছে। আমরা বন্ধুরা বলেছি, শেষ সুযোগ একবার সম্পর্কটাকে দিয়ে দেখ, তারপর তো সব পথই খোলা রইল। ফলে এই ট্রিপ। যদি প্রকৃতির কাছে এসে, পাহাড় আর ঝরনার কাছে এসে, অচেনা এক নদীর কাছে এসে ওরা আবার যদি নিজেদের সম্পর্কের শেকড়টাকে চিনতে পারে, ভালোবাসতে পারে—তার জন্যই আমাদের এই বেড়াতে যাওয়া।
এবার সমৃদ্ধ বলল, "পলাশডাঙ্গা জায়গাটা কিন্তু তোফা! নদী, পাহাড়, ঝরনা, সঙ্গে আছে ভূতের ভয়। ফলে ফুল জমে ক্ষীর হয়ে যাবে আমাদের এবারের ট্রিপটা।"
শ্রেয়সী এবার মনে মনে একটা গান ধরল, 'আমি যামিনী তুমি শশী হে, ভাতিছ গগন মাঝে'—মান্না দে-র সেই পুরনো গান। গুগল ম্যাপ বলছে পলাশডাঙ্গা এখনও তিন কিলোমিটার। এবার একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। দেখলাম সাদা চাদরে মোড়া এক বৃদ্ধ হাত দেখিয়ে আমাদের থামতে বলছে। গাড়িটা নিয়ে প্রথমে একটু এগিয়ে গেলাম, এরপর আবার ব্যাক করলাম। করা উচিত হল না, তবু করলাম। কিন্তু কী আশ্চর্য! একটু আগেই যে লোকটা রাস্তার বাঁদিকে দাঁড়িয়ে আমাদের গাড়ি থামানোর জন্য হাত দেখাচ্ছিল—সে এখন আমার ডানদিকে। মানে রাস্তার ডানদিকে অর্থাৎ একদম রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ড্রাইভারের সিটের কাচটা নামিয়ে বললাম, "কী হয়েছে? হাত দেখাচ্ছিলেন কেন?"
লোকটা ঠান্ডা কণ্ঠস্বরে বলল, "মৃত্যু। পলাশডাঙ্গা এবার মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হবে।"
এই বলেই লোকটা কোথায় যেন হঠাৎ করেই ভ্যানিশ হয়ে গেল! আমার পাশে সমৃদ্ধ বসে রয়েছে। পিছনের সিটে দুই মহিলা। শ্রেয়সী চিৎকার করে বলল, "চল আমরা ফিরে যাই, এরকম জায়গায় যাওয়ার কোনও মানে হয় না।"
স্নিগ্ধা বলল, "আমার খুব ভয় করছে। আমি বুঝতে পারছি না কী করব, গাড়ির স্টিয়ারিং কি ঘুরিয়ে দেবে বাড়ির দিকে?"
এই সময়ই সমৃদ্ধ বলে উঠল, "একটা মাতাল বুড়োর কথা শুনে আমি আমার উইকেন্ড নষ্ট করতে পারব না। অনেকদিন পর ছুটি পেয়েছি, তোরা কেউ না গেলেও পলাশডাঙ্গা তো আমি যাবই।"
শ্রেয়সী বলল, "প্রথমে লোকটা রাস্তার বাঁদিকে ছিল, তারপর চলে এল ডানদিকে। এরপর 'মৃত্যু' বলেই লোকটা ভ্যানিশ? ও তাহলে গেল কোথায়?"
আমি বললাম, "গ্রামের লোক এই সব রাস্তা চটপট পার হয়ে যায়। ওরা আমাদের চেয়ে দ্রুত হাঁটে। ফলে ওই লোকটা কথাটা বলেই সটকে পড়েছে। দ্রুত সটকে পড়েছে। এটা কোনও ভুতুড়ে ব্যাপার নয়।"
যাই হোক, গাড়ির স্পিড একটু স্লো করেই আমরা এগিয়ে চলেছি পলাশডাঙ্গার উদ্দেশ্যে। ঘড়িতে এখন সন্ধ্যা সাতটা পাঁচ। অথচ এই গোটা রাস্তাটাকে মনে হচ্ছে আশ্চর্য এক স্লো মোশন, নিখুঁত এক মাঝরাত। গাড়ি চালাতে চালাতেই দেখলাম, শুকিয়ে যাওয়া একটা বাবলা গাছের মাথায় ঘন বিষণ্ণ এক চাঁদের আলো। ঠিক ছোটবেলায় আমার ঠাকুমার শুকিয়ে যাওয়া মুখের মতো অদ্ভুত সেই আলো। একটা কেমন যেন মনমরা মনমরা পরিবেশ।
এবার আমাদের সামনে দেখলাম একটা পুলিশের ভ্যান দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওরা হাত দেখাল, গাড়িটা থামালাম। অনেকক্ষণ পর গাড়ির বাইরে বেরিয়ে একটু আরাম লাগল। আগে যে রাস্তাটাকে ভয়ের মনে হচ্ছিল, এবার এখানে দাঁড়িয়েই আকাশে অনেকগুলো তারাকে একসঙ্গে দেখতে পেলাম—যেটা শহরে আর দেখা যায় না। আমরা মদ খেয়ে আছি কি না ইত্যাদি পরীক্ষা করার পর এক পুলিশ অফিসার বললেন, "সাবধানে যাবেন, সামনে একটু আগেই একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। একটা গাড়ি সম্পূর্ণ পড়ে গেছে জঙ্গলের খাদে।"
এই কথাটা শোনার পর আমার মনে ভয় হতে শুরু করল। একটু আগের সেই বৃদ্ধের ঘটনাটা শ্রেয়সী অলরেডি জানিয়ে দিয়েছে পুলিশকে। ফলে অফিসার মহাদেব রাউত বললেন, "ডোন্ট ওরি, আমি একজন ড্রাইভার দিয়ে দিচ্ছি। ও আপনাদের সেফলি নিয়ে যাবে পলাশডাঙ্গা।"
এখন পুলিশের এক ছোট অফিসার ড্রাইভারের ভূমিকায়, আমি তার পাশের সিটে। সমৃদ্ধ, শ্রেয়সী ও স্নিগ্ধা পেছনের সিটে। আমাদের থেকে বয়সে দু-এক বছরের ছোট যে পুলিশ অফিসারটি গাড়ি চালাচ্ছে, তার নাম অনিমেষ রায়। ও আমাদের বলল, "এমনিতে পলাশডাঙ্গা খুব শান্ত জায়গা হলে কী হবে, এখানকার পরতে পরতে আপনারা সুপারস্টিশন খুঁজে পাবেন। এখানে রাত হলেই নানা তাণ্ডব বাড়ে। আপনারা থোরো দেবীর গল্পটা জানেন তো?"
সমৃদ্ধ বলল, "না, জানি না।"
"তাহলে শুনুন, একসময় এ অঞ্চলে দলিত বা নিম্নবর্গের দেবীর নাম ছিল থোরো। তো সে সময় উচ্চবর্ণের জমিদাররা একদিনে ২০০ দলিতকে হত্যা করে এবং ওই দেবীর মন্দির পুড়িয়ে দেয়। তারপর থেকেই লোকের বিশ্বাস যে পলাশডাঙ্গা আসলে অভিশপ্ত। এখানে রাত হলেই নাকি থোরো দেবীর উত্তপ্ত নিঃশ্বাস পড়তে থাকে, চারদিকে ঘটতে থাকে আজব আজব ঘটনা।"
এবার সমৃদ্ধ বলল, "আপনাদের এখানে তো এই বছর চার-পাঁচ আগেও একটা চূড়ান্ত এক্সপ্লয়টেশনের ঘটনা ঘটেছিল না?"
ছেলেটি বলে উঠল, "হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে এখানে এক দলিত ছেলে তার বিয়েতে ব্যান্ড পার্টি ডেকেছিল। রাস্তায় গান-বাজনা চলছিল। কিছু মানুষের এতে খুব অসুবিধা হল—দলিতের বিয়েতে আবার ব্যান্ড পার্টি! ব্যস, চারটে লাশ পড়েছিল সেই ঘটনায়।"
স্নিগ্ধা এবার বলল, "এই আধুনিক যুগে শুধু গান শুনবে বলে চারজনকে মারা যেতে হবে?"
একটা মৃদু হাসি নিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে অনিমেষ উত্তর দিল, "যে সোসাইটিতে অ্যাম্বুলেন্স বাড়িতে পৌঁছানোর আগে পিৎসা চলে আসে, সেখানে মনের অন্ধকার এত সহজে কাটবে কি?"
সমৃদ্ধ এবার জিজ্ঞেস করল, "আমরা কটার সময় ওখানে গিয়ে পৌঁছাব?"
অফিসার বলল, "সাধারণত ঘণ্টা দুয়েক লাগার কথা, তবে বর্ষা শেষ হয়ে হেমন্তের সময় এখানে আসতে নেই। কেননা হেমন্তকালে এখানে শোকের উৎসব হয়। লোকে বলে থোরো দেবী এই সময় চান না বাইরের মানুষ আসুক এখানে।"
সমৃদ্ধ বলল, "আমরা পয়সা দিয়ে বুকিং করেছি দাদা, পুরো তিন দিন আমরা থাকব ওখানে।"
"আপনারা কি জঙ্গলের সামনের গেস্টহাউসটা নিয়েছেন?" জিজ্ঞেস করল ওই অফিসার।
উত্তরে বললাম, "হ্যাঁ, ওই সরকারি জায়গাটাকেই নিয়েছি।"
দেখলাম গাড়ি চালাতে চালাতে অফিসারের ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি এসে গেল। ও বলল, "সরকারি জায়গা বলেই এই সময় যে লোক এখানে আসে না, সেটা আপনাদের জানানো হয়নি। বেসরকারি লজ হলে জানিয়ে দিত।"
শ্রেয়সীও বলল, "হ্যাঁ দাদা, আমরা একদম হোমওয়ার্ক করে আসিনি এখানে। ফলে আমরা এই জায়গাটা সম্পর্কে খুব কমই জানি।"
রেয়সীর এই কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখলাম, অফিসার খুব জোরে ব্রেক কষলেন। আরেকটু হলেই আমার মাথাটা থেঁতলে যেত গাড়ির ড্যাশবোর্ডে। এখনকার গাড়ির ড্যাশবোর্ডগুলো বেশিরভাগই শক্ত প্লাস্টিকের, ফলে চোটটা ভালোই লাগত। কিন্তু আমরা অবাক বিস্ময়েই দেখলাম যে, আমাদের গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ওপর একটা মরা পেঁচা এসে পড়েছে। ড্রাইভারের সামনের গোটা কাচটা রক্তে ভেসে গিয়েছে। আর মরা পেঁচাটা চুম্বকের মতোই গাড়ির কাচে আটকে রয়েছে।
একটু জল-টল দিয়ে কাচ পরিষ্কার করা হল।
কিন্তু শ্রেয়সী, স্নিগ্ধাসহ আমাদের গোটা টিম এখন অদ্ভুত এক থমথমে নীরবতার মধ্যে ডুবে রয়েছে। কেউ কোনও কথা বলতে পারছে না। শুধু সমৃদ্ধ বলছে, "আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব, কেউ না গেলে আমি একাই পলাশডাঙ্গা যাব।"
পুলিশ অফিসারটি বলল, "এই পথের দুধারের জঙ্গলগুলোতে এখনও খুঁজলে বহু মানুষের কবর পাওয়া যাবে। বেশিরভাগই খুন হওয়া দলিত। গতবার যে দাঙ্গাটা হয়েছিল না, ওই বিয়েবাড়ির ব্যান্ড পার্টিকে নিয়ে—সেখানে এক বৃদ্ধ কনস্টেবলকে এই রাস্তায় পুড়িয়ে মারা হয়েছিল সততার সঙ্গে কাজ করার জন্য। সে রুখে দাঁড়িয়েছিল দলিত হত্যার বিরুদ্ধে। সেই বৃদ্ধই এই রাস্তায় ফিরে ফিরে আসে, মানুষকে এই সময় পলাশডাঙ্গা যেতে নিষেধ করে।"
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, "আপনি একজন পুলিশ অফিসার হয়ে এসবে বিশ্বাস করেন?"
কিন্তু আমার মনে হল, আমরা বোধহয় ভুল পথে চলেছি। আর তারপর দেখলাম, গাড়ির লুকিং গ্লাসে বেশ লম্বা-চওড়া চেহারার এই ড্রাইভারের কোনও প্রতিবিম্ব পড়ছে না। ব্যাপারটা বোঝার জন্য আমি এবার লোকটার শরীরে হাত রাখতে চাইলাম। ও আস্তে করে বলল, "Your game is over. হ্যাপি জার্নি।"
তারপরই আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, এই লোকটাও সম্পূর্ণ ভ্যানিশ হয়ে গেল ড্রাইভারের সিট থেকে। অথচ গাড়ির গেট বন্ধ। গাড়িটা চলছে।
কোনওভাবে ব্রেক কষে গাড়িটা থামানোর পর, ভয়ে যখন আমি ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছি, সেই সময় দেখলাম আতঙ্কে শ্রেয়সীকে জড়িয়ে ধরেছে সমৃদ্ধ। মনে মনে ভাবলাম, ওদের অভিমানের বরফ এবার গলবে। হয়তো এ যাত্রায় ডিভোর্স আর হবে না। স্নিগ্ধা এবার বলল, "বাড়ি যাব।"
আমি বললাম, "পুলিশ অফিসার সেজে যে লোকটা ড্রাইভ করতে উঠেছিল, তার ড্রাইভিংয়ে আমরা এক ইঞ্চিও আর পলাশডাঙ্গার দিকে নয়, বরং যে পথ ধরে এসেছিলাম সেদিকে এগিয়েছি। আর পাঁচ মিনিট ড্রাইভ করলেই গুগল ম্যাপ বলছে, আমরা পৌঁছে যাব রায়দিঘি। সেখান থেকে দেড় ঘণ্টায় কলকাতা, মানে বাড়ি।"
এই ঘটনার তিন মাস পরে আমি জেনেছিলাম, শুধু একজন বয়স্ক পুলিশ নয়, ওই ব্যান্ড পার্টি সংক্রান্ত ঘটনায় যে কজনের মৃত্যু হয়েছিল, তার মধ্যে এক যুবক ছিল—যার স্বপ্ন ছিল পুলিশ অফিসার হওয়ার।
প্রতিবিম্ব
সেলিনা আক্তার
অনিক দরজা খুলে জুতো না খুলেই সোজা বেডরুমে ঢুকল। এক বেডরুমের আলোহীন অ্যাপার্টমেন্টে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। ড্রেসারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুরনো বেলজিয়াম আয়নাটার দিকে তাকাতেই তার চোখ আটকে গেল। আয়নার ঠিক বাঁ কোণে একটা দাগ। খুব ছোট, প্রায় অদৃশ্য, কিন্তু ওখানেই সে অনড় বসে আছে।
সে কিচেন থেকে উইন্ডেক্স আর একটা পুরনো সুতির টি-শার্ট নিয়ে এলো। নীল তরল স্প্রে করল কাচে। ঘষতে শুরু করল। পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট। আধ ঘণ্টা। কাচটা ঘোলা হলো, আবার পরিষ্কার হলো। দাগটা গেল না। সে আঙুল বোলাল। একদম মসৃণ। কিছুই ঠেকছে না।
সকালে অফিসে জামাল বলেছিল, "তুমি আজকাল কারও চোখের দিকে তাকাও না, ম্যান।" লিসা বলেছিল, "তুমি ঠিক আছো তো?" অনিক শুধু হেসেছিল। সে সবসময় বিশ্বাস করে, জীবন একটা এক্সেল শিট। যুক্তি দিয়ে সব কলাম মেলানো যায়। ফর্মুলা ঠিক থাকলে রেজাল্ট ঠিক আসবেই।
অসহ্য অস্বস্তি নিয়ে সে ড্রেসিংরুম ও বাথরুমের সব কটা আলো জ্বালিয়ে দিল। আয়নার একদম কাছে মুখ নিয়ে ঝুঁকে এলো। আয়নার ভেতরের ছায়ামানুষটাও ঠিক একইভাবে ঝুঁকে এলো সামনে। একই কুঁচকানো শার্ট, না-কামানো রুক্ষ চোয়াল আর কোটরে বসা শুকনো দুটো চোখের দৃষ্টি।
ঠিক তখনই অনিক চমকে উঠল। কাচের ওপাশের মানুষটার কপালে ঠিক যেখানে দাগটা ছিল, সেখানে জমে আছে গাঢ় কালচে এক ছায়া। না, ওটা কাচের দাগ নয়; ওটা তার নিজেরই কপালে বাসা বেঁধে থাকা এক অদ্ভুত অন্ধকার।
মাথাটা গরম হয়ে গেল। সে টি-শার্ট ফেলে নখ দিয়ে আয়নাটা খুঁটতে শুরু করল। খচখচ শব্দে পুরো ঘর ভরে গেল। জোরে, আরও জোরে। একসময় একটা নখের কোণা ভেঙে গেল। এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে কাচের গা বেয়ে নিচে গড়িয়ে নামল। লাল একটা সরু রেখা।
অনিক থেমে গেল। হাঁপাচ্ছে।
রক্তের ওপাশে দাঁড়ানো লোকটা কিন্তু হাত সরায়নি। তার নখ ভাঙেনি। রক্তও বেরোয়নি। সে একদৃষ্টে অনিকের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। আর খুব ধীরে, খুব শান্তভাবে হাসছে।
অনিক ভয়ে দু-পা পিছিয়ে এলো। মেঝেতে পড়ে রইল নীল তরলের বোতল আর নোংরা টি-শার্ট। আয়নাটা এখন স্ফটিকের মতো পরিষ্কার। কোথাও কোনো দাগ নেই। আসলে কাচে কখনো কোনো দাগ ছিলই না।
শূন্য প্রদীপ
অভি রহমান
তিস্তা নদীর নির্জন চরে অপরাহ্ণের ম্লান আলো এসে পড়েছে। ধূ-ধূ বালুকা আর দূর দিগন্তের জলরেখার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মোহান্ত বাবার কুটিরে এসে বসেছিল সুজয়। সংসারের একটানা ব্যর্থতা, সবচেয়ে প্রিয়জনদের চরম বিচ্ছেদ আর বেঁচে থাকার অন্তহীন ক্লান্তিতে তার ভেতরের মানুষটা পুরোপুরি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। চারপাশের এত কোলাহলের ভেতরও জীবনের কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ বা উদ্দেশ্য সে আর খুঁজে পাচ্ছিল না।
ভেতরে জমে থাকা গভীর ক্ষত নিয়ে বাবার সামনে করজোড়ে বসল সুজয়। কম্পিত কণ্ঠে বলল, "সব তো শূন্য হয়ে গেল বাবা। যেটাকে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম, সেটাই খসে পড়ল। আমি কার জন্য আলো খুঁজব?"
বৃদ্ধ মোহান্ত হাসলেন। চৈত্র মাসের বাতাসে তখন নদীর জল মৃদু দুলছে। তিনি সুজয়ের সামনে মাটির একটা প্রদীপ রাখলেন, কিন্তু তাতে তেল ছিল না। শুধু একটা শুকনো পলতে পড়ে রইল।
বাবা বললেন, "বাতাসকে কি তুমি কোনো পাত্রে আটকে রাখতে পারো?"
সুজয় মাথা নাড়ল, "না।"
""অথচ চেয়ে দেখো, সেই অদৃশ্য বাতাসই অবিরত তোমার বুকে নিঃশ্বাস হয়ে প্রাণ টিকিয়ে রাখছে," মোহান্তের কণ্ঠস্বর গভীর নদীর মতো শোনাল। তিনি বললেন, "যা কিছু হারিয়ে গেছে বলে তুমি কাঁদছ, তা আসলে রূপের বদল মাত্র। তিস্তা শুকিয়ে গেলে জল ফুরিয়ে যায় না; বাষ্প হয়ে আবার মেঘের কোলে ফেরে। নিজের ভেতর থেকে 'আমি' আর 'আমার'—এই অহংবোধের খুঁটি দুটো উপড়ে ফেলো। যখন সব পাওয়ার বাসনা ছেড়ে মনকে সম্পূর্ণ শূন্য করতে পারবে, ঠিক তখনই পরম সত্তার শাশ্বত আলো সেখানে প্রবেশের পথ পাবে। মনে রেখো, শূন্য পাত্রেই শুধু অমৃত ধারণ করা সম্ভব, কানায় কানায় পূর্ণ পাত্র থেকে সব উপচে পড়ে।"
সুজয় চোখ বুজল। ঘাটের কাছে আছড়ে পড়া জলের শব্দ আর বাতাসের স্পর্শে তার ভেতরটা এক অদ্ভুত স্থিরতায় ভরে গেল। সে বুঝল, নিজেকে খোঁজার এই পথ আসলে কোনো কিছু অর্জনের নয়, বরং সমস্ত ভার নামিয়ে শান্ত হওয়ার।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন