https://www.prothomalony.com/

18118

opinion

অভিমত

জলবায়ুর চাপে সুন্দরবন ও শস্যখেত

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:০৬

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এর প্রভাব বাংলাদেশের প্রকৃতি ও জনজীবনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোথাও তাপমাত্রা বাড়ছে, কোথাও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা কিংবা হঠাৎ অতিবৃষ্টি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়ছে লবণাক্ততা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও বনভূমির ওপর।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবেই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা এ দেশের মানুষের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব দুর্যোগের প্রকৃতি ও মাত্রায় পরিবর্তন আসছে। ঋতুচক্রেও দেখা যাচ্ছে অসামঞ্জস্যতা। কখনো বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়, আবার অল্প সময়ে অতিবৃষ্টিতে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা ও বন্যা।

এর সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি পড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলে। উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি সহজেই নদী ও খালপথ ধরে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার বিস্তার এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক গবেষণাতেও উপকূলীয় বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদ, জীবিকা ও পরিবেশের ওপর বাড়তি লবণাক্ততার প্রভাবের কথা উঠে এসেছে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের জন্য একটি প্রাকৃতিক ঢালও। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঝড়ের অভিঘাত থেকে উপকূলকে রক্ষায় বনটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল এই বন।

কিন্তু সুন্দরবনও আজ নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানুষের নানা কর্মকাণ্ডও বনের ওপর চাপ তৈরি করছে। ইউনেসকোর পর্যবেক্ষণেও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ এবং মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়াকে সুন্দরবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে বনের গাছপালা ও জীববৈচিত্র্যের সম্পর্কও গভীর। পরিবেশের তাপমাত্রা, পানির লবণাক্ততা কিংবা বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেলে উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্রে পরিবর্তন আসে। কোনো কোনো প্রজাতি নতুন পরিবেশে টিকে থাকতে পারে, আবার কোনো প্রজাতি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। রোগবালাই ও কীটপতঙ্গের বিস্তারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। সুন্দরবনের গাছের আগামরা রোগ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য পরিবেশগত চাপ মিলিয়ে এ ধরনের সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সুন্দরবনের সংকটের পাশাপাশি দেশের স্থলভাগের জীববৈচিত্র্যের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ ভিনদেশি আগ্রাসী উদ্ভিদ। বাইরে থেকে আনা সব গাছ অবশ্যই ক্ষতিকর নয়। কিন্তু কিছু বিদেশি প্রজাতি দ্রুত বিস্তার লাভ করে স্থানীয় উদ্ভিদকে টেক্কা দেয় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এদেরই বলা হয় আগ্রাসী ভিনদেশি প্রজাতি।

আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিদেশি বৃক্ষের চাষ হয়ে আসছে। অনেক গাছ এখন এতটাই পরিচিত যে মানুষ এগুলোকে দেশি গাছ বলেই মনে করেন। অথচ প্রজাতিগত বিচারে এগুলোর অনেকগুলোই ভিনদেশি। আবার সব ভিনদেশি গাছকে একইভাবে আগ্রাসী বলাও ঠিক নয়। কোন প্রজাতি কোথায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে, সেটিই বিবেচনার বিষয়।

সাম্প্রতিক গবেষণা ও সংরক্ষণ উদ্যোগে বাংলাদেশের উদ্ভিদবৈচিত্র্যের সংকটটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত দেশের প্রথম 'বাংলাদেশের উদ্ভিদের লাল তালিকা'তে ১ হাজার উদ্ভিদ প্রজাতি মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্যে ৩৯৫টি প্রজাতিকে কোনো না কোনো মাত্রায় হুমকির মুখে পাওয়া গেছে। একই উদ্যোগের আওতায় দেশের পাঁচটি সংরক্ষিত এলাকায় ১৭টি আগ্রাসী উদ্ভিদ শনাক্ত করে সেগুলো ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।

এখানেই আমাদের ভাবতে হবে—উন্নয়নের নামে আমরা এমন কোনো বৃক্ষ বা উদ্ভিদকে প্রকৃতিতে ছড়িয়ে দিচ্ছি কি না, যা একসময় স্থানীয় প্রজাতির জন্য প্রতিযোগী হয়ে উঠবে। একটি গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে বলেই যে সেটি পরিবেশের জন্য উপকারী, এমন ধারণা ঠিক নয়। স্থানীয় জলবায়ু, মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে খাপ খাওয়া দেশি প্রজাতির গুরুত্ব আলাদা। তাই বনায়নের ক্ষেত্রে শুধু দ্রুতবর্ধনশীল গাছ নয়, স্থানীয় প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত শুধু সুন্দরবনেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিতেও এর প্রভাব পড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি ও মিঠাপানির উৎসের ওপর চাপ বাড়ছে। মৎস্যসম্পদও এর বাইরে নয়। পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তন মাছের প্রজনন ও বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ধরনের সংকট। কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, কোথাও সেচনির্ভর কৃষিতে বাড়ছে পানির চাপ। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা, নদীর নাব্য ও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি। শুধু বৃষ্টির পানি পেলেই সমস্যার সমাধান হবে না; পানি ধরে রাখা ও ব্যবহারের সঠিক ব্যবস্থাপনাও দরকার।

সুন্দরবন রক্ষায় তাই শুধু বন বিভাগের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে বসে থাকলে চলবে না। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, লবণাক্ততা মোকাবিলা, অবৈধ সম্পদ আহরণ বন্ধ, বনের ভেতর ও আশপাশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ জরুরি। সুন্দরবনকে ঘিরে ২০২৬ সালে নতুন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যেখানে জলবায়ু সহনশীলতা, লবণাক্ততা, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে বনায়নের ধারণাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু সংখ্যায় বেশি গাছ লাগালেই বন সৃষ্টি হয় না। কোন জায়গায় কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ ও বিস্তারের পাশাপাশি আগ্রাসী ভিনদেশি প্রজাতির বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দেশের বন ও সংরক্ষিত এলাকায় এ বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তন রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এর ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতি এখনই নেওয়া সম্ভব। নদী ও জলাশয় রক্ষা, মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ, আগ্রাসী উদ্ভিদের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিকভাবে বেশি দায়ী শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের বাস্তব ক্ষতির চিত্র আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি আমাদের উপকূলের প্রাকৃতিক প্রহরী। আর দেশের দেশি বৃক্ষ ও উদ্ভিদ শুধু সবুজের অংশ নয়, এগুলো আমাদের জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও ভিনদেশি আগ্রাসনের মধ্যে এই দুই সম্পদকে রক্ষা করতে না পারলে ক্ষতিটা শুধু প্রকৃতির হবে না, শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপরও তার প্রভাব পড়বে।
 
লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন