https://www.prothomalony.com/

18097

opinion

অভিমত

ফজর ছালাতের গাফিলতি: পরিণাম ও প্রতিকার

খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড চট্টগ্রাম। 

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:০৪

রাতের নিকষ কালো আঁধার পেরিয়ে যখন ফজরের স্নিগ্ধ আলো পৃথিবীর বুকে উঁকি দেয়, তখন সমগ্র প্রকৃতি যেন এক অনির্বচনীয় প্রশান্তির আবরণে আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে। যারা নিদ্রার কোমলতা ও দেহের অলসতাকে জয় করে আজানের আহবানে সাড়া দিয়ে ফজরের জামাতে শামিল হন, তারা প্রতিটি প্রভাতে নিজেদের ঈমানকে নতুন করে জাগিয়ে তোলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক যুগে আমাদের অনেকের কাছে এই ফজরের সালাতই সবচেয়ে অবহেলিত ইবাদতে পরিণত হয়েছে, যার ফলে আমরা হারাচ্ছি আত্মিক প্রশান্তি, বরকত এবং পরকালীন সফলতার বহু দরজা।

একজন মুসলিমের ঈমানের পারদ মাপার সবচেয়ে বড় থার্মোমিটার হলো ফজরের সালাত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকদের কাছে ফজর ও এশার সালাতের চেয়ে অধিক ভারী সালাত আর নেই; যদি তারা জানত এই দুই সালাতে কী পুরস্কার রয়েছে, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা উপস্থিত হতো (সহিহ বুখারি: ৬৫৭, সহিহ মুসলিম: ৬৫১)। ইমাম সানআনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একজন মুমিন যখন এই দুই সালাতের মর্যাদা জানে, তখন যেকোনো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ছুটে আসে; পক্ষান্তরে মুনাফিকদের অনুপস্থিতির মূল কারণ তাদের ঈমানের দুর্বলতা (সুবুলুস সালাম: ১/৩৬০)।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সাহাবায়ে কেরামের যুগে স্পষ্ট মুনাফিক ব্যতীত কেউ জামাত থেকে পিছিয়ে থাকত না; এমনকি অসুস্থ ব্যক্তিকেও দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে আনা হতো (সুনানে আবু দাউদ: ৫৫০)। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, কাউকে এশা ও ফজরের সালাতে অনুপস্থিত দেখলে তারা তার সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করতেন (ইবনে খুযাইমাহ: ১৪৮৫)।

ফজর ত্যাগকারীর জীবনে শয়তানের প্রভাব সুস্পষ্ট। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘাড়ে শয়তান তিনটি গিঁট বেঁধে দেয় এবং প্রতিটি গিঁটে বলে, তোমার সামনে দীর্ঘ রাত, ঘুমিয়ে থাকো; জেগে আল্লাহকে স্মরণ করলে একটি গিঁট খোলে, অজু করলে আরেকটি, সালাত আদায় করলে শেষটিও খোলে, ফলে সে সকালে প্রফুল্ল চিত্তে জাগে, অন্যথায় অলস ও কলুষিত মনে (সহিহ বুখারি: ১১৪২, সহিহ মুসলিম: ৭৭৬)। যে ব্যক্তি সারারাত ঘুমিয়ে থাকে সে সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, শয়তান তার উভয় কানে পেশাব করে দিয়েছে (সহিহ বুখারি: ৩২৭০, সহিহ মুসলিম: ৭৭৪)।

আমল বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও এতে জড়িত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আসরের সালাত ছেড়ে দিল তার আমল বিনষ্ট হয়ে গেল (সহিহ বুখারি: ৫৫৩), আর আসর ছুটে যাওয়া যেন পরিবার-সম্পদ হারানোর সমতুল্য (সহিহ বুখারি: ৫৫২, সহিহ মুসলিম: ৬২৬)। ইমাম ইবনে আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই হাদিসে আসরের কথা বলা হলেও এর উদ্দেশ্য সকল ফরজ সালাত, আর দিনের প্রথম সালাত হিসেবে ফজরের মর্যাদা আরও বেশি (আত-তামহীদ: ৯/২৯)।

ফজর ছেড়ে দেওয়া মূলত আখিরাতের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, বস্তুত তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকো, অথচ আখিরাত উৎকৃষ্ট ও চিরস্থায়ী (সূরা আ'লা: ১৬-১৭)। অন্যত্র বলা হয়েছে, যে সীমালঙ্ঘন করেছে এবং পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছে, জাহান্নামই তার ঠিকানা (সূরা নাযিআত: ৩৭-৩৯)। হাফেজ ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ এর ব্যাখ্যায় বলেন, সে দ্বীন ও আখিরাতের ওপর দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছে (তাফসিরে ইবনে কাসির: ৮/৩১৭)।

ফজর ত্যাগকারীর জন্য কবরের আজাবও ভয়াবহ। সামুরা ইবনে জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বপ্নে দেখা এমন এক ব্যক্তির কথা বলেন, যার মাথায় বারবার পাথর নিক্ষেপ করা হচ্ছিল; ফেরেশতারা জানান, এই ব্যক্তি কুরআন শিখে তা পরিত্যাগ করত এবং ফরজ সালাত না পড়ে ঘুমিয়ে থাকত (সহিহ বুখারি: ৭০৪৭)। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফজর-এশার জামাত ত্যাগ করত তাদের প্রতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতটাই ক্ষুব্ধ হতেন যে তিনি বলেছেন, আমার ইচ্ছা হয় মুয়াজ্জিনকে ইকামত দিতে বলে কাউকে ইমামতির নির্দেশ দিয়ে যারা সালাতে আসেনি তাদের ঘরে আগুন ধরিয়ে দিই (সহিহ বুখারি: ৬৫৭, সহিহ মুসলিম: ৬৫১)।

আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু তুসতার নগরী বিজয়ের কথা স্মরণ করে কাঁদতেন, কারণ যুদ্ধের ব্যস্ততায় সেদিনের ফজর সময়মতো আদায় করতে না পারায় তিনি বলতেন, সেই ছুটে যাওয়া ফজরের বিনিময়ে গোটা দুনিয়া দেওয়া হলেও তা আমাকে আনন্দিত করবে না (সহিহ বুখারি, কিতাবুল খাউফ)। শারয়ি অপারগতা সত্ত্বেও এই আক্ষেপ আমাদের শেখায়, সামান্য ঘুমের মোহে বছরের পর বছর ফজর হারানো কতটা গুরুতর।

আধুনিক বিজ্ঞানও ভোরে জাগার উপকারিতা সমর্থন করে। ২০১৭ সালে সারকাডিয়ান রিদম আবিষ্কারের জন্য নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক ঘড়ির সাথে তাল মিলিয়ে ভোরে জাগলে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে। হার্ভার্ড ও কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বিশাল সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভোরে জাগা মানুষদের বিষণ্নতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। তবে একজন মুসলিমের জন্য ফজরে জাগার মূল কারণ আল্লাহর আদেশ পালন ও সন্তুষ্টি অর্জন, এসব গবেষণা কেবল সহায়ক দিক মাত্র।

ফজরের গাফিলতি থেকে বাঁচার কিছু কার্যকর উপায় রয়েছে। প্রথমত, রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া, কেননা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এশার পরে গল্পগুজব অপছন্দ করতেন (সহিহ বুখারি: ৫৪৭)। দ্বিতীয়ত, সুন্নাতি আদব মেনে ঘুমানো অজু করা, ডান কাতে শোয়া, আয়াতুল কুরসি ও তিন কুল পাঠ করা। তৃতীয়ত, রাতে হালকা খাবার গ্রহণ করা। চতুর্থত, পাপাচার থেকে দূরে থাকা হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহকে এক ব্যক্তি রাতে জেগে উঠতে না পারার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, তোমার গুনাহই তোমাকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে (আল-ইকদুল ফরিদ: ৩/১৩৫)। পঞ্চমত, ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে থাকা। ষষ্ঠত, পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে জাগিয়ে তোলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন দম্পতির জন্য রহমতের দোয়া করেছেন (সুনানে আবু দাউদ: ১৪৫)। সপ্তমত, দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া যে ইনশাআল্লাহ ফজরে উঠবই।

ফজর সালাত আমাদের ঈমানের সবচেয়ে বড় থার্মোমিটার এবং প্রতিদিন শয়তানের বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রথম হাতিয়ার। আমরা যদি সামান্য দুনিয়াবি স্বার্থে রাতের ঘুম বিসর্জন দিতে পারি, তবে মহান আল্লাহর ডাকে কেন সাড়া দিতে পারব না? আসুন, অতীতের সকল ভুলের জন্য তওবা করে আজই দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হই এবং ফজরের পবিত্র বাতাসে সিজদাবনত হয়ে দিন শুরু করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে জামাতের সাথে ফজর আদায়ের তাওফিক দান করুন এবং গাফিলতির ভয়াবহ পরিণাম থেকে হেফাজত করুন। আমীন।


রাসূলের প্রতি ভালোবাসা 

তানভীর ফুয়াদ 

শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম। 

পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে, এমনকি নিজের ও নিজ পরিবারের চেয়েও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সর্বাধিক ভালোবাসা প্রত্যেক মুসলমানের উপর অবশ্য কর্তব্য। তাঁকে ভালোবাসার দাবি হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত সকল বাণী ও বিধান মেনে নেওয়া এবং তার কোনোটিকেও উপেক্ষা না করা। অথচ দুঃখজনকভাবে কতিপয় মুসলমান এই পবিত্র ভালোবাসার ক্ষেত্রে অতিভক্তির আতিশয্যে বিভিন্ন শিরক-বিদআতে লিপ্ত হয়ে থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ভালোবাসার কয়েকটি মহান উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি সকল নবী-রাসুলের মধ্যে সর্বশেষ এবং কিয়ামতের দিন সমস্ত আদম সন্তান থেকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হবেন। তিনি আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীনকে যথাযথভাবে প্রচার করেছেন, উম্মতের প্রতি রহমদিল ছিলেন এবং মহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তাঁকে ভালোবাসা দুনিয়া ও আখিরাতে সওয়াব লাভের অন্যতম মাধ্যম, তাই এ বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।

নবীজিকে ভালোবাসার প্রথম আলামত হলো, সৃষ্টির সকলের চেয়ে তাঁর ভালোবাসাকে প্রাধান্য দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তুমি বলো, তোমাদের পিতা, পুত্র, ভাই, স্ত্রী, বংশ ও ধন-সম্পদ যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তবে তোমরা আল্লাহর শাস্তির অপেক্ষা করো (সূরা তওবা: ২৪)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষ থেকে অধিক প্রিয় হব (সহিহ বুখারি: ১৫, সহিহ মুসলিম: ৪৪)। অন্য বর্ণনায় পরিবার ও ধন-সম্পদের কথাও উল্লেখ আছে (সহিহ মুসলিম: ৪৪)।

নিজের জীবনের চেয়েও নবীজিকে অধিক ভালোবাসার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম রাযিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নবীজিকে বললেন, নিজের জীবন ব্যতীত আপনি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যতক্ষণ না আমি তোমার জীবনের চেয়ে প্রিয় হবো, ততক্ষণ তুমি পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এখন আপনি আমার নিজের জীবনের চেয়েও অধিক প্রিয়, আর নবীজি বললেন, এখন হে উমর, তুমি প্রকৃত ঈমানদার হতে পারলে (সহিহ বুখারি: ৬৬৩২)।

দ্বিতীয় আলামত হলো নবীজির সুন্নাহকে যথাযথভাবে মেনে নেওয়া এবং কোনো ওজর-আপত্তি না করা। আল্লাহ বলেন, মুমিনদের কথা এটাই যে, আল্লাহ ও রাসূলের দিকে আহবান করা হলে তারা বলবে, আমরা শুনলাম ও মানলাম, আর তারাই সফলকাম (সূরা নূর: ৫১)। তৃতীয় আলামত নবীজির সীরাত গুরুত্বের সাথে অধ্যয়ন করে জীবনকে সেই আদর্শে সাজানো। চতুর্থ আলামত নবীজির প্রতি অধিক হারে দরুদ ও সালাম পাঠানো আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠান, হে মুমিনগণ, তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠাও (সূরা আহযাব: ৫৬)।

পঞ্চম আলামত হলো নবীজির সাহাবি ও পরিবারবর্গকে ভালোবাসা। আল্লাহ বলেন, যারা পরে এসেছে তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের ও আমাদের ঈমানে অগ্রবর্তী ভাইদের ক্ষমা করো এবং আমাদের অন্তরে মুমিনদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রেখো না (সূরা হাশর: ১০)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিও না, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বত পরিমাণ স্বর্ণ দান করে, তবুও তাদের একজনের এক মুদ পরিমাণ আমলের সমান হবে না (সহিহ বুখারি: ৩৬৭৩, সহিহ মুসলিম: ২৫৪০)। ষষ্ঠ আলামত নবীজির সাথে সাক্ষাতের প্রবল আকাঙ্ক্ষা রাখা— নবীজি বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু মানুষ থাকবে যারা তাদের পরিবার ও ধন-সম্পদের বিনিময়েও আমাকে দেখতে চাইবে (সহিহ মুসলিম: ২৮৩২)।

সপ্তম আলামত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করা। আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী, তুমি তাদের কাউকে পাবে না যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতাকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করে, যদিও তারা তাদের পিতা, সন্তান বা আত্মীয় হয় (সূরা মুজাদালা: ২২)।

নবীজিকে ভালোবাসার আমলি নিদর্শনও রয়েছে বহু। প্রথমত, তাঁর নির্দেশ দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করা। মদ হারামের আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবিরা প্রশ্ন ছাড়াই তাৎক্ষণিক তা মেনে নিয়েছিলেন (সহিহ বুখারি: ৪৬১৭)। আল্লাহ বলেন, রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো (সূরা হাশর: ৭)। দ্বিতীয়ত, সুন্নাহ রক্ষার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা বিরে মাউনার ঘটনায় হারাম বিন মিলহান রাযিয়াল্লাহু আনহু আহত অবস্থায় বলেছিলেন, আল্লাহু আকবার, কাবার রবের কসম, আমি সফলকাম হয়েছি (সহিহ বুখারি: ২৮০১, সহিহ মুসলিম: ৬৭৭)।

তৃতীয়ত, নবীজিকে শরিয়তের সর্বোচ্চ ধারক হিসেবে মেনে নেওয়া, আল্লাহ বলেন, তোমার প্রতিপালকের কসম, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ তাদের বিরোধের বিষয়ে তোমাকে ফয়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে (সূরা নিসা: ৬৫)। চতুর্থত, ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি না করা, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা আমার বিষয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন খ্রিস্টানরা মরিয়ম-তনয় ঈসাকে নিয়ে করেছে, আমি আল্লাহর বান্দা মাত্র, তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল বলো (সহিহ বুখারি: ৩৪৪৫)। মৃত্যুর সময়ও তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, আল্লাহর লানত ইহুদি ও খ্রিস্টানদের উপর, যারা তাদের নবীদের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়েছে (সহিহ বুখারি: ৪৩৫-৪৩৬, সহিহ মুসলিম: ৫৩১)।

পঞ্চমত, নবীজির সম্মান যথাযথভাবে বজায় রাখা,  আল্লাহ বলেন, যারা এই নিরক্ষর নবীর অনুসরণ করে, তাঁকে সম্মান করে ও সাহায্য করে এবং তাঁর সাথে নাযিলকৃত জ্যোতির অনুসরণ করে, তারাই প্রকৃত সফলকাম (সূরা আরাফ: ১৫৭)। ষষ্ঠত, তাঁর বাণীকে উপেক্ষা না করা— আল্লাহ বলেন, কোনো মুমিন পুরুষ বা নারীর সেই বিষয়ে নিজস্ব কোনো অধিকার নেই যেখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সিদ্ধান্ত দিয়েছেন; যে আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্যতা করে, সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হয় (সূরা আহযাব: ৩৬)। সপ্তমত, তাঁর আনীত বিধানকে বাস্তবায়ন করা, কেননা তা আল্লাহরই প্রেরিত ওহি, আল্লাহ বলেন, সে খেয়াল-খুশিমতো কোনো কথা বলে না, এটি কেবল ওহি যা তার প্রতি প্রেরণ করা হয় (সূরা নাজম: ৩-৪)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ভালোবাসা শুধু মৌখিক দাবি নয়, বরং তাঁর নির্দেশ পালন, সুন্নাহ রক্ষা, সাহাবি ও পরিবারবর্গের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসায় সীমা রক্ষার মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত বাস্তবায়ন সম্ভব। আল্লাহ আমাদের সকলকে যথাযথভাবে নবীজিকে ভালোবাসার এবং তাঁর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমীন।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন