https://www.prothomalony.com/
18093
opinion
ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন—লেখক, সাংবাদিক, সংগঠক। সিলেট শহরে তাঁর দীর্ঘ বিচরণ। সেই বিচরণের সীমানাও ছিল বিস্তৃত—রাজনীতি থেকে সমাজ, সংস্কৃতি থেকে সাংবাদিকতা, মানুষের অধিকার থেকে জনকল্যাণ; নানা পথের নানা মানুষের সঙ্গে তাঁর অবাধ চলাচল।

সময়ের কাছে এসে এই দীর্ঘ পথচলার একটি বিষয় অন্তত স্পষ্ট হয়েছে—এ চলার পেছনে ব্যক্তিগত প্রাপ্তির কোনো হিসাব ছিল না। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা গ্রাম থেকে উঠে আসা এক দুরন্ত যুবকের সৃষ্টিশীল পথচলা যেন তারই প্রমাণ। নিজের গ্রাম, নিজের শহরকে হৃদয়ে ধারণ করেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর বিস্তৃত বিচরণ অনেকের কাছেই বিস্ময় জাগায়। কিন্তু সেই বিস্তৃতির মধ্যেও শিকড়টি হারিয়ে যায়নি। বরং যত দূরে গেছেন, ততবার ফিরে এসেছেন নিজের মানুষ, নিজের মাটি আর নিজের সময়ের কাছে।

৭ সেপ্টেম্বর, সোমবার। কর্মদিবসের শেষভাগে জিন্দাবাজারের বাতিঘর মিলনায়তনে ধীরে ধীরে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। উপলক্ষ— প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের একাধিক প্রকাশনা ঘিরে আলোচনা ও আড্ডা। কিন্তু বইয়ের আলোচনা খুব বেশিক্ষণ বইয়ের মধ্যে আটকে থাকেনি। ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনকে নিয়ে কথা উঠলে তাঁকে শুধু বইয়ের পাতায় আটকে রাখা কঠিন। তাঁর জীবনও যেন অনেকগুলো গল্পের সমষ্টি। ফলে আলোচনাও এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে ছুটে যায়।

তাঁর পুরোনো বন্ধুরা কেউ কেউ আসেন মাথা নুইয়ে—স্মৃতির ভার নিয়ে। নতুন প্রজন্মের অনুরাগীরা আসে মাথা উঁচু করে, শিরদাঁড়া সোজা রেখে—একজন অগ্রজের দীর্ঘ পথচলার প্রতি শ্রদ্ধা আর কৌতূহল নিয়ে।
রাজনীতিবিদ, শ্রমিকনেতা, অভিনেতা, সংস্কৃতিকর্মী, অধ্যাপক, সাংবাদিকসহ নানা পেশা ও পরিচয়ের মানুষের উপস্থিতিতে একসময় মিলনায়তন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আড্ডা জমে। কথা বাড়ে। ইব্রাহীম চৌধুরী, স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে, বারবার নিজের কথা থেকে সরে গিয়ে অন্য মানুষের গল্পে চলে যান। তাঁর আলাপচারিতার একটি জায়গা বেশ স্পষ্ট। গুরুত্বপূর্ণ কোনো নেতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল না। অভিনেতা হওয়ারও নয়। জীবনের চলার পথে দেওয়ার চেয়ে পাওয়ার পরিমাণই বেশি—এমনটাই মনে করেন তিনি। পাশের মানুষটিকে জানা, তার ভেতরের মহত্বটুকু আবিষ্কার করা, তার সৃষ্টিশীলতাকে সম্মান করা—এই আনন্দেই তাঁর আগ্রহ। অন্যের এগিয়ে যাওয়া তাঁকে আনন্দ দেয়। অন্যের ভাবনার সঙ্গে নিজের ভাবনাকে মিলিয়ে দেখা তাঁকে টানে। অন্যের ভালোবাসায় অংশ নেওয়া, অন্যের কষ্টে সহমর্মী হওয়া, অন্যের গল্পের সঙ্গে নিজের গল্পের কোনো এক জায়গায় মিল খুঁজে পাওয়া—এগুলোই তাঁর কাছে জীবনের বড় প্রাপ্তি।

সম্ভবত এই কারণেই তাঁর পথচলা শুধু শহরের গণ্ডিতে থেমে থাকেনি। আম্রিকা থেকে সাম্প্রতিক স্বদেশযাত্রায় একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গেছেন। টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলে গেছেন। ঢাকার বস্তিতে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সিলেটের জকিগঞ্জ ও কালীগঞ্জে জনকল্যাণমূলক নানা কর্মকাণ্ড পরিদর্শনে যুক্ত হয়েছেন। ফিরে গেছেন নিজের গ্রাম বাঘায়। গ্রামবাসীর সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। মাত্র কয়েক দিনে দেখা করেছেন সিলেটের বহু প্রবীণের সঙ্গে—যাঁদের কেউ একসময় ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, আবার কেউ সময়ের আড়ালে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছেন। তাঁদের সঙ্গে দেখা করেছেন।

কথা শুনেছেন। তারপর সেই মানুষগুলোর গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন। নিজেকে সামনে রেখে নয়, মানুষকে সামনে রেখে। এই স্বভাবটাই হয়তো তাঁর দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে আলাদা দিক।
তাঁকে ঘিরে সিলেট শহরে হয়েছে একাধিক পারিবারিক ও সামাজিক আড্ডা। কোথাও পুরোনো বন্ধুরা, কোথাও নতুন প্রজন্ম, কোথাও রাজনৈতিক সহযাত্রী, কোথাও সংস্কৃতির মানুষ—সবাই কোনো না কোনোভাবে এসে যুক্ত হয়েছে তাঁর এই স্বদেশযাত্রার গল্পে। ৭ সেপ্টেম্বরের বাতিঘরের সন্ধ্যাটিও শেষ পর্যন্ত তেমনই এক মিলনস্থলে পরিণত হয়।

বই ছিল উপলক্ষ। মানুষ হয়ে উঠেছিল বিষয়। আর ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন যেন সেই গল্পের মাঝখানে থেকেও নিজেকে একটু আড়ালেই রাখলেন। স্বভাবসুলভ বিনয় আর গল্পের ছলে তিনি বললেন প্রতিবেশের কথা, সময়ের কথা, অসময়ের কথা। বললেন মানুষের কথা। বললেন এই শহরের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, বদলে যাওয়া সমাজ এবং নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনার কথা। তাঁর কথায় নিজের কৃতিত্বের হিসাব কম, মানুষের প্রতি কৌতূহল বেশি।

বাতিঘরের সেই সন্ধ্যায় বাঘা গ্রাম থেকেও যেন এক টুকরো গ্রাম এসে হাজির হয়েছিল। সঙ্গে ছিল বাঘার পেয়ারা, কলা আর নানা ধরনের দেশি নাশতা। আপ্যায়নের মধ্যেও ছিল মাটির গন্ধ। যেন দূরদেশে বিচরণ করেও নিজের গ্রামের উঠোনটুকু তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। এটাই হয়তো ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক। তিনি যত দূরেই যান, তাঁর ভেতরের বাঘা গ্রামটি তাঁকে ছেড়ে যায় না। 'বাঘা ইব্রাহীম' নামে একটা পডকাস্টও পরিচালনা করেন বাঘার সন্তান ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন। মানুষকে নিয়ে তাঁর যে দীর্ঘ পথচলা—তারও কোনো শেষ ঠিকানা নেই। এক শহর থেকে আরেক শহর, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম, এক গল্প থেকে আরেক গল্পে তিনি হেঁটে চলেছেন। কিছু পাওয়ার জন্য নয়। বরং মানুষের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার, মানুষের গল্পকে নিজের গল্পের অংশ করে নেওয়ার আনন্দে। সেই কারণেই হয়তো বাঘা থেকে বাতিঘর পর্যন্ত তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা কেবল একজন লেখক-সাংবাদিকের ব্যক্তিগত যাত্রা নয়।
এ এক মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তোলার গল্প। একটি শহরকে ভালোবেসে তাকে বহন করে পৃথিবীর নানা প্রান্তে যাওয়ার গল্প। শেষ পর্যন্ত ফিরে এসে আবার সেই শহরেরই কোনো এক বাতিঘরের আলোয় বসে নিজের নয়— সময়ের গল্প বলার গল্প।


আব্দুল করিম কিম এবং রোমেনা রোজীর ব্যবস্থাপনায় এ আড্ডা আলোচনায় যুক্ত ছিলেন, বেদানন্দ ভট্টাচার্য, নিরেশ চন্দ্র দাস, ড মোহাম্মদ জহিরুল হক,মিহির কান্তি চৌধুরী,আব্দুল মালিক জাকা,আবু তালেব মুরাদ,কামকামুর রাজ্জাক রুনু,বোস্তান চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান চৌধুরী ওয়েছ,সৈয়দ মুহিবুর রহমান,অধ্যাপক জফির সেতু, শামসুল বাসেত শেরো, মনির হেলাল, লিয়াকত শাহ ফরিদী, নীলাঞ্জন দাস টুকু, অপূর্ব শর্মা, রুমেনা বেগম রোজী,
তারেক আল মঈন চৌধুরী, দেলওয়ার হোসেন জিলন, জাবেদ আহমদ, মুহিবুর রহমান, আব্দুর রহমান হিরা, শেখ কায়সার আহমদ, মো: আমিনুল জামান চৌধুরী, জাহেদ, মুহিত উদ্দিন আহমেদ, সালাউদ্দিন চৌধুরী, আলী আশরাফ চৌধুরী খালেদ, এমদাদুল হক, তাহমিদ আহমদ, নিয়াজ মোহাম্মদ, শামসুল বাসিদ, সপ্ন ধর, মোহাম্মদ আবদুল আওয়াল, মুসা রেজা চৌধুরী, মুক্তাদির আহমদ মুক্তা, ফারুক আহমদ, লিসা রহমান, ফারাজ মুততাকি, মোহাম্মদ জহিরুল হক, তানভির চৌধুরী, কাশফা রাজ্জাক চৌধুরী, সিদ্দিকা চৌধুরী (বেবী), জাহান ফেরদৌসী, মুহিবুর রহমান, আব্দুর মুঈদ চৌধুরী, মাহফুজ আহমদ চৌধুরী, রাহনামা শাব্বির চৌধুরী, সেনুয়ারা চৌধুরী চিনু, ফারুক আহমেদ,
সলমান চৌধুরী, তারেক রহমান চৌধুরী, আহামেদ ইয়াসিন, সৈয়দ মাসুদুর রহমান, প্রণবকান্তি দেব, সাহেল আহমদ, মো: আব্দুল মালিক, সহিদুর ইসলাম, মাহফুজ আমিন, মো: নিজাম উদ্দিন, মোহাম্মদ বিলাল, মোতাক চৌধুরী, রিমল আহমদ চৌধুরী, শেখ সিদ্দিক, পুলিন রায়, মোনতাজির চৌধুরী, শাহেল আহমদ চৌধুরী, ধ্রুব গৌতম, মাসুদা সিদ্দিকা রুহি,থামোয় সিংহ,হাসিনা বেগম প্রমুখ।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন