https://www.prothomalony.com/

18001

opinion

অভিমত

রোহিঙ্গা সংকট: মানবিকতার দায় মিটিয়েও কূটনীতির সুযোগ হারানোর ইতিহাস

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০২:২৫

একটা দেশ যখন নয় বছর ধরে বারো লক্ষ শরণার্থীর ভার বহন করে, তখন সেই বোঝা শুধু বোঝাই থাকে না।তা একধরনের কূটনৈতিক পুঁজিতেও রূপান্তরিত হওয়ার কথা। বিশ্ব রাজনীতির নির্মম হিসেবে মানবিকতা প্রায়ই বিনিময়যোগ্য মুদ্রা। যে রাষ্ট্র সংকটের প্রথম আঘাত সয়ে নেয়, বিশ্ব বিবেকের চাপ তার পক্ষে কাজ করে বেশ কিছুকাল। আর সেই সময়টুকু ব্যবহার করেই দক্ষ রাষ্ট্রনায়করা অর্থনৈতিক প্যাকেজ, কূটনৈতিক স্বীকৃতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান আদায় করে নেন। 
বাংলাদেশ ২০১৭ সালে যে মানবিকতা দেখিয়েছিল, তা ইতিহাসে বিরল।কিন্তু সেই মানবিকতাকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তরের যে সুযোগ ছিল, নয় বছর পরও তার সদ্ব্যবহার হয়নি বললে ভুল হবে না।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার না পাওয়াটা এখানে কোনো আক্ষেপের বিষয় হতে পারে না কোনো রাষ্ট্রের কাছে। বিশ্বের সামনে নিজের ভূমিকাকে যথাযথভাবে বিক্রি করতে বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়েছে। আঙ্গেলা মেরকেল যখন ২০১৫ সালে দশ লক্ষ সিরীয় শরণার্থীর জন্য জার্মানির দরজা খুলে দিয়েছিলেন, তখন সমালোচনার মুখেও তিনি সেই সিদ্ধান্তকে জার্মানির নৈতিক নেতৃত্বের বয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন বিশ্বমঞ্চে। বাংলাদেশ ঠিক তেমনই একটি বয়ান তৈরি করতে পারত।একটি দরিদ্র, ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যে নিজের সীমিত সম্পদ নিয়েও মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছে, এমন এক জাতীয় পরিচয় যা কূটনৈতিক টেবিলে প্রতিটি আলোচনায় ব্যবহারযোগ্য হতে পারত। কিন্তু এই বয়ান নির্মাণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ কূটনীতি এখানে প্রতিক্রিয়াশীল থেকে গেছে, সক্রিয় হয়ে ওঠেনি।

তুরস্কের এরদোয়ান সরকারের দিকে তাকালে এই ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তুরস্ক প্রায় ছত্রিশ লক্ষ সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী-আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এরদোয়ান কখনোই এই সংকটকে নিছক মানবিক দায় হিসেবে গ্রহণ করেননি। তিনি একে রূপান্তরিত করেছেন কৌশলগত অস্ত্রে। ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে তুরস্ক অঙ্গীকার করে শরণার্থীদের ইউরোপমুখী স্রোত ঠেকাবে। আর বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিশ্রুতি দেয় ছয় বিলিয়ন ইউরো আর্থিক সহায়তা, তুর্কি নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত ভ্রমণ, শুল্ক ইউনিয়ন হালনাগাদ এবং ইইউ-তে তুরস্কের সদস্যপদ আলোচনায় নতুন গতির। প্রতিশ্রুত অর্থের পুরোটা বা ভিসামুক্তির প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলেও, এরদোয়ান বারবার শরণার্থী ইস্যুকে হাতিয়ার করে ইউরোপের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছেন। ২০২০ সালে সীমান্ত খুলে দেওয়ার হুমকি থেকে শুরু করে বারবার নতুন তহবিলের দাবি তোলা পর্যন্ত। এমনকি সিরীয়দের তিনি প্রকাশ্যে "অতিথি" ও "ভাই" বলে অভিহিত করে একটি ইতিবাচক জাতীয় বয়ান তৈরি করেছেন। যদিও তুরস্কের অভ্যন্তরেও শরণার্থীবিরোধী জনমত কম নয়। অর্থাৎ এরদোয়ান একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সামলেছেন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুরস্ককে একটি অপরিহার্য ভূরাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইউরোপের অভিবাসন ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য প্রবেশদ্বার হিসেবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধরনের কৌশলগত ধারাবাহিকতা একেবারেই অনুপস্থিত। রোহিঙ্গা সংকটের শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি তুঙ্গে ছিল। জাতিসংঘ মহাসচিব, বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান, মানবাধিকার সংস্থা—সবাই কক্সবাজার সফর করেছেন, প্রশংসা করেছেন। কিন্তু সেই সহানুভূতিকে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক অর্জনে রূপান্তরের কোনো সুসংহত কৌশল বাংলাদেশ কখনো প্রণয়ন করেনি। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে।মানবিক সহায়তার তহবিল বছরের পর বছর সংকুচিত হয়েছে, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ ক্রমাগত কমেছে। অথচ বাংলাদেশ প্রতিবারই একই ধরনের নিষ্ফল আবেদন জানিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। এটি অনেকটা এমন এক ব্যবসায়ীর মতো, যিনি প্রতি বছর একই ক্রেতার কাছে গিয়ে দয়া প্রার্থনা করেন, অথচ নিজের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে শেখেননি।

পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতা আরও প্রকট। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের মিত্ররা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে বহুবার মুখে মুখে। কিন্তু এই সদিচ্ছাকে বাংলাদেশ কখনো বাণিজ্য সুবিধা, বিনিয়োগ চুক্তি, বা কৌশলগত অংশীদারত্বের সুনির্দিষ্ট শর্তে রূপান্তরিত করতে পারেনি। জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল, শুল্কমুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, বা উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন কাঠামো—এসব ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ইস্যুকে কার্যকর দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের যে সুযোগ ছিল, তা বাংলাদেশ কাজে লাগায়নি পদ্ধতিগতভাবে। মুসলিম বিশ্বের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই দেশগুলোর সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সহযোগিতার আহ্বান বারবার জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন সরকার ওআইসি দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করে সহযোগিতা চেয়েছে। কিন্তু এই আহ্বান কখনো সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ প্রকল্প, প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ নেয়নি। ওআইসির নেতৃত্বে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের মামলা করেছে বটে। কিন্তু এই আইনি লড়াইয়ের গতি এতটাই মন্থর যে তা বাস্তবে শরণার্থীদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বাংলাদেশ সেই মামলাকে কেন্দ্র করে নিজের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও জোরালো করার সুযোগও কাজে লাগায়নি যথাযথভাবে।

এই ব্যর্থতার মূলে যে প্রশ্নটি বারবার উঠে আসে, তা হলো—আন্তরিকতার অভাব, নাকি দক্ষতার ঘাটতি? সম্ভবত দুটোরই সংমিশ্রণ। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত প্রতিক্রিয়াশীল থেকেছে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার বদলে তাৎক্ষণিক সংকট ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ থেকেছে। প্রশাসনের মধ্যে রোহিঙ্গা বিষয়ক নীতিনির্ধারণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে বিভক্ত। একটি কেন্দ্রীভূত ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অগ্রাধিকার তালিকায় রোহিঙ্গা ইস্যু প্রায়শই নির্বাচনী রাজনীতি বা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। ফলে যে সংকট একদিন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান এনে দিতে পারত, তা ক্রমেই পরিণত হয়েছে নিছক একটি বোঝায়, যার সমাধান খুঁজতে খুঁজতে বাংলাদেশ ক্লান্ত।

এরদোয়ানের তুরস্ক আর হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের মধ্যে তুলনাটা এখানেই সবচেয়ে তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। তুরস্ক যেখানে শরণার্থী সংকটকে ভূরাজনৈতিক অবস্থান সংহত করার হাতিয়ার বানিয়েছে, বাংলাদেশ সেখানে একই সংকটকে কেবল মানবিক দায় হিসেবে বহন করে গেছে, কোনো প্রতিদান ছাড়াই। রাখাইনে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া অবশ্যই জরুরি ও ন্যায্য পথ। কিন্তু তার পাশাপাশি যদি বাংলাদেশ নিজের কূটনৈতিক পুঁজিকে সচেতনভাবে ব্যবহার করতে শিখত—পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুবিধা আদায়, মুসলিম বিশ্বের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব তৈরি, এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের ভূমিকাকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা—তাহলে আজ হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতে পারত। এই ব্যর্থতা কোনো একটি সরকারের একার নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। যেখানে সংকটকে কেবল সামলানোর বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে, সুযোগ হিসেবে নয়। আর যে জাতি সংকটকে সুযোগে রূপান্তরিত করতে শেখে না, তাকে বারবার একই সংকটের মধ্যে দিয়েই যেতে হয়।কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে, কখনো কুশলী খেলোয়াড় হিসেবে নয়।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন