https://www.prothomalony.com/
18010
opinion
রংপুরের পরিবারসহ শিক্ষক হত্যাকাণ্ড। একটা পৈশাচিক ব্যাপার। একটি পরিবারকে শেষ করে দেয়া। কিন্তু এই ঘটনার পর বিষাদ ও বিস্ময়ের চেয়ে ভয় কাজ করছিল আমার। কারণটা নিশ্চয়ই খুব করে ব্যাখ্যা করার কিছু নেই। আমাদের দেশের কথিত সেক্যুলার নামের দিল্লিপন্থীরা এটাকে ক্যাশ করে দেশে একটা সাম্প্রদায়িক পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করবে। যেহেতু নিহত শিক্ষক পরিবার হিন্দু, তাও আবার ব্রাহ্মণ। সাথে জুলাইকে বদনাম দেবে। বলবে, দেখো জুলাই বিপ্লবের পর দেশে উগ্রবাদীদের উত্থান ঘটেছে। দেশ তালেবানদের দখলে। বাংলা আফগানিস্তান হয়ে গেছে। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন, পুলিশ হত্যাকাণ্ডেরদু’দিনের মধ্যে কারণ উদঘাটনের দাবি করেছে, সাথে দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে খুনের দায়ে। গ্রেপ্তারকৃতরা দায় স্বীকারও করেছে। আর খুনের দায়ে অভিযুক্ত দুজনেই হিন্দু। পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর, অনেকটাই আশাহত হয়েছেন আমাদের কথিত সেক্যুলারকুল। অবশ্য হত্যাকাণ্ডের পরপরই সেক্যুলাকুলের পূর্বজ যারা জুলাই বিপ্লবের পর দেশ ছেড়েছেন তাদের কেউ কেউ সরাসরি সাম্প্রদায়িকতার আলাপ তুলে সামাজিকমাধ্যমে জানান দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের হিন্দুরা নিরাপদ নন। তাদের ভাষায় জুলাই বিপ্লবের পরই দেশেসাম্প্রদায়িকতার চরম উত্থান ঘটেছে।
জুলাই বিপ্লবের বিরোধীদের কথা তো বললাম। এখন আসি, জুলাই বিপ্লবের অংশগ্রহণকারী একটা অংশের কথায়। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ যখন খুনের দায়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করলো, তখন তারা একটু থমকে গেল। কিন্তু তারপর বয়ান সৃষ্টির চেষ্টা করলো, পুলিশের কথা বিশ্বাসযোগ্য কিনা, সেই বিষয়ে। তারা বলতে চেষ্টা করলো দু’জনের পক্ষে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয়। তারা আরো কয়েকটা ঘটনার স্টাডি এরসাথে জুড়ে দিয়ে প্রমাণের চেষ্টা করলো, পুলিশের এই বক্তব্যের মধ্যে ঘাপলা আছে। কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়, পুলিশের দীর্ঘদিনের প্র্যাকটিসে এমন ঘটনায় ঘাপলা করা অসম্ভব কিছু না। বিগত আওয়ামী রেজিমে পুলিশ গ্রেপ্তারকৃতদের পিটিয়ে খুনের স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেছে। তবে জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ স্বল্প সময়ে অতটা সাহস করবে এমনটা চিন্তা করা সম্ভবত ফিকশন তৈরির লক্ষণ। আর ফিকশন তৈরিটা কোনো কাজের কথা নয়।
এখন বলি, জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী এই অংশটা কারা। এরা হলো মূলত অ্যাডভেঞ্চারিস্ট। আর এদের বেশিরভাগই বাম ঘরানার। এরা জুলাই বিপ্লবে যোগ দিয়েছিল অ্যাডভেঞ্চারিজমের ধারণায়। এদের যারা রাজনৈতিক গুরু, তারা এই অ্যাডভেঞ্চারের মানসিকতাকেই ক্যাশ করে এতদিন চলে এসেছে। এদের রাজনৈতিক গুরুরা কেউই প্রকৃত অর্থে জুলাই বিপ্লবের পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু তরুণ অংশ যখন দেখলো, সহপাঠীরা-বন্ধুরা আন্দোলনে যাচ্ছে, তখন তাদের মনের ভেতর থাকা অ্যাভেঞ্চারিজম জেগে ওঠে, তারাও যোগ দেয় জুলাই বিপ্লবে। অবস্থাদৃষ্টে গুরুদের সেসময় কিছুই করার ছিল না। কিন্তু জুলাই বিপ্লব পরবর্তীতে যখন দেখা গেল, তারা বিপ্লবের খুব বড় একটা অংশ নয়। জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিটের সাথে তাদের রাজনৈতিক চিন্তার অনেকটাই মিলছে না, তখন তাদের হতাশার কাল শুরু হলো। এবং এখনো যা চলমান। এই সুযোগতাদের রাজনৈতিক গুরু, যাদের টিকি বাঁধা সাউথব্লকের খুঁটিতে, তারা নড়েচড়ে বসলেন। তারা বুঝতে পারলেন, এখনই মোক্ষম সময়। তারা বয়ান তৈরি করে ছড়িয়ে দিলেন, জুলাই বিপ্লব বেহাত হয়ে গেছে। মৌলবাদীদের হাতে চলে গেছে। ফলে জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ। অ্যাডভেঞ্চারিস্টরা হতাশা থেকে এমন বয়ান লুফে নিলেন। দেখবেন, এদের সাথে জুলাই বিপ্লবে বিরোধীতাকারীদের সুর অনেকটাই মিলে যায়। এরা সবাই এখন জুলাইয়ে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ খুঁজে পাচ্ছেন। একইভাবে এরাই এখন রংপুরের শিক্ষক হত্যাকাণ্ডে সাম্প্রদায়িকতা খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
নিহত শিক্ষকের পরিবারের পদবি চক্রবর্তী অর্থাৎ ব্রাহ্মণ। আর অভিযুক্তরা নিচু জাতের। ভারতে হলে আরএসএস এটাকে ক্যাশ করতো, নিচু জাতের হাতে উঁচু জাতের মানুষের নিহত হবার ঘটনা হিসেবে। তারপর চলতো দলিত নিধনযজ্ঞ। কিন্তু আরএসএস’র অঘোষিত বাংলাদেশ অংশ এটাকে ক্যাশ করতে চেয়েছিল সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে। কিন্তু পুলিশ তাদের ঘৃণাযজ্ঞে পানি ঢেলে দিয়েছে। সুতরাং তারা রাস্তায় নামতে পারছে না। প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশও করতে পারছে না। এবং তা উপায় নেই বলেই। তবু তারা হাল ছেড়ে দেয়নি। সামাজিকমাধ্যমে তারা লিখে চলেছে বয়ানের মহাকাব্য। যারমধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই, ভেরিয়েশন নেই। সেই পুরানো বস্তাপচা আলাপ। ওহ, আরেকটা কথা জানিয়ে দিই, আরএসএস’র বিরুদ্ধেও উগ্রবাদী হিসেবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আলাপ উঠেছে।
অনেকে এতটুকু পড়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, বাংলাদেশে কি উগ্রপন্থী নেই? নিশ্চয়ই আছে। আলকায়েদা আছে, আরএসএস আছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল কায়েদা’র উত্থানের চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। উত্থান ঘটেছে কিংবা আলকায়েদা’র বড় নেটওয়ার্ক আছে কিংবা এটা অ্যালার্মিং এমন কথা উল্লেখ করা হয়নি সে প্রতিবেদনে। এত বড় প্রতিবেদনে শুধু বাংলাদেশের নামে একটি লাইন যোগ করে বলা হয়েছে, ‘There was some concern about AQIS trying to exploit Bangladesh to establish cells there’, অর্থাৎ এটুকুই হলো মোদ্দাকথা। সারা প্রতিবেদন জুড়ে ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্তান নিয়ে আলাপ, আর বাংলাদেশের কথা শুধু একলাইনেই। আর এই নিয়েই অ্যাডভেঞ্চারিস্ট ও পতিতদের বয়ান তৈরির কারখানা চালু হয়ে গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের আফিগানিস্তান একটা অংশ। যেখানেআলকায়েদা প্রতিষ্ঠিত। ক্ষমতায় তালেবান সরকার। আর এই তালেবান সরকারের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক হলো ভারতের। আর খারাপ সম্পর্ক পাকিস্তানের। হ্যাঁ, এটাই রিয়েলিটি। এই রিয়েলিটিকেই ধারণ করেছে নিরাপত্তা পরিষদের সেই প্রতিবেদন। এই রিয়েলিটিকেই আড়ালে রেখে অ্যাডভেঞ্চারিস্ট আর পতিতরা মিলে একটি ফিকশিয়াস ন্যারেটিভ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট। যে ন্যারেটিভে বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে দেখানো সম্ভব হবে। যার শেষ ফলাফল হলো, ফ্যাসিজমকে ফিরিয়ে আনা। তাই সুযোগ পেলেই সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি সামনে আনছে তারা। রাজনৈতিক ভাবে পতিত ফ্যাসিস্টদের উত্থান অনেকটাই অসম্ভব যদি তাদের চেয়েও বড় কোনো ফ্যাসিস্ট সৃষ্টি না হয়। সুতরাং বিকল্প পথ একটাই, সেই পুরানো পথ যা এতদিন ফ্যাসিজমকে টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছিল। ফিরে আসাও সম্ভব সেপথেই। তাই মরিয়া হয়ে সামাজিক-পারিবারিক অপরাধের ক্ষেত্রেও সাম্প্রদায়িকতার বয়ান সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এই প্রক্রিয়ায় যোগ হয়েছে কিছু গণমাধ্যমও। This is sad but true.
অভিমত থেকে আরো পড়ুন