https://www.prothomalony.com/

17999

opinion

অভিমত

জলবায়ুর আঘাতে বাস্তুচ্যুত জীবন

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ ০৫:০৩

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং তা আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা কিংবা নদীভাঙনজনিত দুর্যোগের কারণে মানুষ বাধ্য হচ্ছেন জন্মভিটা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে। তাদের এই স্থানান্তরের পেছনে কোনো যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই, আছে শুধু প্রকৃতির রুক্ষ আচরণ। একে অনেকেই বলছেন নীরব বাস্তুচ্যুতি।

সিডর, আইলা কিংবা আম্ফানের মতো ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলীয় জেলাগুলোতে যে ক্ষতচিহ্ন থেকে যায়, তা সহজে মোছার নয়। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা কিংবা ভোলার বিস্তীর্ণ এলাকায় আগে যেসব জমিতে ধানসহ নানা ফসল হতো, সেখানে এখন ঢুকছে লবণাক্ত পানি। পদ্মা, যমুনা কিংবা তিস্তার ভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার জমি ও বসতভিটা হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাগুলোর হিসাব বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে লাখো মানুষ পরিবেশগত কারণে বাস্তুচ্যুত হন। এই সংখ্যা কমার কোনো লক্ষণ নেই, বরং দিন দিন বাড়ছে।

শহরে এসে বেশির ভাগ মানুষ প্রথমে বস্তিতে আশ্রয় নেন। বিশেষ করে ঢাকার কড়াইল, মিরপুরের বেড়িবাঁধ এলাকা কিংবা মহাখালীর বস্তিগুলোতে প্রতিদিন নতুন নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে। রুটি-রুজির তাগিদে তাঁরা বাধ্য হয়ে রিকশা চালান, নির্মাণকাজ করেন কিংবা দিনমজুরি বেছে নেন। আর নারীরা কাজ নিচ্ছেন পোশাক কারখানায় বা বাসা-বাড়িতে। গ্রামের উন্মুক্ত পরিবেশ ছেড়ে শহরের ঘিঞ্জিতে ঢুকে পড়া এসব মানুষের জন্য জীবনযাত্রার এই পরিবর্তন মোটেও সহজ নয়; বরং তারা প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়ে শিশুরা। গ্রামের বিদ্যালয় ছেড়ে শহরে এসে অনেক শিশুই আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে না। পরিবারের আয় কমে যাওয়ায় কোমল বয়সেই তাদের নামতে হয় জীবিকার তাগিদে—কেউ চায়ের দোকানে, কেউ গ্যারেজে, আবার কেউবা রাস্তায় ফেরি করে জিনিসপত্র বিক্রি করে। যে বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সেই তাদের কাঁধে চাপে সংসারের ভার। শৈশবের মধুর দিনগুলো এভাবেই হারিয়ে যায়।

এই বাস্তুচ্যুতির প্রভাব শুধু একটি পরিবারের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না, গোটা দেশের প্রধান শহরগুলোর ওপরও এর তীব্র চাপ পড়ে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, কারণ এমনিতেই এটি এক জনবহুল মহানগরী। প্রতিবছর হাজার হাজার নতুন মানুষ এখানে আসেন জীবিকার তাগিদে। ফলে বাড়িভাড়া বাড়ছে, তীব্র হচ্ছে যানজট ও বিদ্যুৎ-সংকট। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া থেকে শুরু করে ওয়াসা-র পানি সরবরাহ সংকট—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে এই অতিরিক্ত জনচাপ।

বস্তিগুলোর পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। ময়লা-আবর্জনা জমে এবং ড্রেন বন্ধ হয়ে বর্ষাকালে তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। অনেক স্থানে দেখা দেয় বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাব। ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ নানা জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে এসব এলাকায়; জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।

শহরের সামাজিক সম্পর্কেও এই বাস্তুচ্যুতি ছাপ ফেলছে। নতুন মানুষের আগমনে কাজের প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি সীমিত সুযোগ-সুবিধার ওপরও চাপ বাড়ছে। এর ফলে অনেক সময় পুরোনো বাসিন্দাদের সঙ্গে নতুন আসা মানুষদের একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, এই মানুষগুলো স্বেচ্ছায় ঘরবাড়ি ছেড়ে আসেননি; স্রেফ টিকে থাকার তাগিদেই বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। গ্রামের যে মানুষটি একসময় কৃষক ছিলেন, শহরে এসে তাঁর পরিচয় হয় শুধু একজন দিনমজুর হিসেবে। এতে তাঁর আত্মসম্মান ও মর্যাদাবোধে আঘাত লাগে। নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নীরব কষ্ট অনেকেই প্রকাশ করতে পারেন না, যা ধীরে ধীরে গভীর বিষণ্নতায় রূপ নেয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের মনে একধরনের অসহায়ত্বও জন্ম নিচ্ছে। নিজ জন্মভিটা ত্যাগ করা সহজ কথা নয়। একজন মানুষ যখন তার শৈশবের বাড়ি, গাছপালা, মাঠঘাট ও নদ-নদী সব হারান, তখন তার মনে যে ক্ষত তৈরি হয়, তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিকও। এমন সংকট ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামেও। যাঁরা শহরে চলে আসছেন, তাদের ফেলে যাওয়া জমি অনাবাদি পড়ে থাকছে, ফলে দুর্বল হয়ে পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। অন্যদিকে যারা থেকে যাচ্ছেন, তারাও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন—কখন নদী ভাঙবে কিংবা ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে, এই আতঙ্ক তাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সংকট মোকাবিলা কীভাবে সম্ভব? প্রথমত, গ্রামীণ মানুষের জীবিকার সুযোগ বাড়াতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় লবণসহনশীল ধানের চাষ বাড়াতে হবে, মাছ চাষ ও হাঁস পালনের মতো বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। নদীভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ও স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। উপকূলে বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি যারা শহরমুখী হচ্ছেন, তাদের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত পুনর্বাসন ব্যবস্থা। শুধু বস্তিতে থাকতে না দিয়ে তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ কর্মীবাহিনীতে রূপান্তর করতে হবে।

একই সঙ্গে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোকে সমানভাবে উন্নত করতে হবে। আঞ্চলিক পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে সবাই আর ঢাকামুখী হবেন না। জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের সমস্যাকে আলাদা করে না দেখে একে মানবিক ও জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে; কারণ, দেশের সামাজিক স্থিতি ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়ছে।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের জোরালো ভূমিকা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। শিল্পোন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণই বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ, অথচ এর চরম ভুক্তভোগী বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো। তাই জলবায়ু ক্ষতিপূরণ ও অভিযোজন তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা আদায় করা জরুরি, যা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে ব্যয় করা সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর নিছক পরিবেশের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। নদীভাঙন, লবণাক্ততা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে যারা ঘর ছাড়ছেন, তারা আমাদেরই স্বজন। তাঁদের দুর্ভোগকে আলাদা না ভেবে সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সংস্থা ও সচেতন নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগেই এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব। সময় থাকতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও নিরাপদ, বাসযোগ্য ও মানবিক করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট

অভিমত থেকে আরো পড়ুন