https://www.prothomalony.com/
17891
literature
সফট টেক্সট
হাশিম কিয়াম
দেশ, বক্ররেখা, মানুষের আয়ু...
ভাতের মাড় ইলিশ ভাজায় খিদের কারণ খুঁজছে,
মাছির বাসরঘরে হেমন্তের রোদ মানচিত্র পেঁচিয়ে বর্ষার
মেঘের স্বরলিপি মুখস্থ করছে
ডোরাকাটা দাগ মুছে বাঘ ঘাপটি মেরে আছে সৈকতে, ঢেউগুলো আতঙ্কিত হরিণী, ছুটে আসছে জলের
গভীরের বন থেকে...
মানুষের গন্ধ নেই, খুলির নোনা জল উপচে
পড়ছে বাঘের গায়ে
ফাঁসির দড়ির ছায়া অপ্রামাণিক জীবনের সফট টেক্সট জল্লাদের চোখে পেস্ট করছে
তর্জনীর কমপাসে বালুর উপর বৃত্ত এঁকে কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে
আছে খুদে গণিতবিদ, চোখ থেকে তার টপটপ পড়ছে
সবুজ বিন্দু...
ধর্ষিতার শরীরে মানচিত্র
তুহীন বিশ্বাস
তবুও বেঁচে আছি নরপিশাচের কঙ্কালরাজ্যে—
যেখানে তাজা রক্তে লাল হয়ে থাকে ঠোঁটগুলো,
বিদঘুটে বীভৎস দুর্গন্ধ ছড়িয়ে আছে সর্বস্তরে,
রাক্ষুসে চোখের স্ফুলিঙ্গে পুড়ে ছারখার স্তম্ভ।
নখের আঁচড়ে মানচিত্র আঁকে ধর্ষিতার শরীরে,
চেয়ে দেখ ওই রক্তে ভেজা মানচিত্রের ভূখণ্ডের দিকে;
কতটা খাবলে খেয়েছিস—যার হিসাব নেই রাজস্বে!
পূর্বসূরির দোহাই দিয়ে খনন করছিস মৃত্যুকূপ।
আমারও বাঁচতে ইচ্ছে করে, হাসতে ইচ্ছে করে,
কিন্তু তোদের মুখের দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়;
সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে—
মরণঘাতী ক্যানসার জীবাণু, ধ্বংস করে মনুষ্যত্ব
আর মধ্যবিত্তের কান্না, হতদরিদ্রের আর্তনাদ!
এসো তবে সবাই মিলে প্রতিবাদ করি অন্যায়ের,
সুস্থ জীবনের তাগিদে প্রতিষ্ঠা করব ন্যায়ের।
স্মৃতিচূড়া
মাসুদ চয়ন
মৃতিচূড়া একা হলো—নেপথ্যে গতিরোধক।
স্মৃতিচূড়া গুলিবিদ্ধ—
অবচেতনে টেনে নাও গতিরোধক;
হয়তো জানোই, বেদনা-রচিত দিনগুলো নদীর মতোই
সেই থেকে নদী—দৃঢ় পরিচারণ।
আয়েশের স্রোতধ্বনিটুকুই,
শুনে যাও!
কূলে কূলে অনূদিত ভাঙন—খাপছাড়া সাহারা!
বধির,
গোধূলিমাখা!
বিধাতার ঘরনি তুমি—আমি মহাজাগতিক।
নদীময় হয়েছি অথৈ—রেশ-ক্লেশে ঘোর আসে,
ঘিয়ে ভাজা রূপবতী ওম, আলোর নৈশভোজে,
বিত্তসূচির বিধাতার!
রয়টার্স নিউজে এল—তাই বিলাপের বিলুপ্ত রোদ।
এখনও তেমনি, অভিমানী ভেজা মেঘ—
অরণ্যে নদীটাকে দেখে যেও,
আঁধারে গেঁথে যাওয়া দেখে যেও।
কালো টিপ
সুনীল শৈশব
কালো টিপ যে পথে হারিয়েছে চোখের আড়ালে,
সেই পথ আজও তোমার নামেই নীরব হয়ে জ্বলে।
কৃষ্ণচূড়া ফুটুক কিংবা ধুলো উড়ুক নির্জন মাঠজুড়ে—
ভালোবাসা পথ ভোলে না, থাকে হৃদয়ের অক্ষিকোঠোরে।
তুমি খবর না রাখলেও,
মায়া ঝরে প্রতিটি বিকেলের আলোয়;
কালো টিপ হয়ে আজও
তুমি লেগে আছ আকাশের কপালে।
বর্ষারাণীর প্রেমে
কাব্য কবির
আষাঢ় মাস। মেঘলা আকাশ
সারাদিন অবিরাম বৃষ্টি।
টিনের চালে বৃষ্টির মন মাতানো ছন্দ,
বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ।
কলাবতী, কদম, ভূঁইচাঁপা ফুল
হাসে বৃষ্টির জলে ভিজে।
একজোড়া কাক বৃষ্টির জলে
ভিজে ভিজে খুনসুটিতে মাতে।
ময়ূর বৃষ্টির জলে ভিজে মন খুশিতে নাচে।
কেয়া বনে শুনি ডাহুকের ডাক।
পদ্ম ফুল যেন বৃষ্টির জলে ভিজে ভিজে
হয়ে উঠছে আরও রঙিন।
খাল, বিল, নদী পানিতে ফুলছে,
বাতাসে গাছের পাতা দুলছে।
মাছেরা নতুন পানি পেয়ে আনন্দে মেতে উঠছে।
এমন দিনে বর্ষারাণী তোমায় পড়ে মনে,
তুমি কী পাহাড়, সবুজ বনে লুকিয়ে আছো?
বাতাসের কানে কানে বলি—তুমি এসো, তুমি এসো।
স্মৃতির আ্যলকোহল
ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয়
আমাকে ধরে রাখে পানশালার ভ্রম, ইংলিশ
মিউজিকের কড়া বেজ।
স্কচ মদে উন্মাদ জীবন; সুর বড়ই নির্মম সান্ত্বনা, জানো?
যা কিছু ভাবতে চাই না আর—সেইসবই মাইন্ড গেম
খেলে অনবরত।
নষ্ট রাতের গান, নষ্ট জীবন, নষ্ট প্রেম, নষ্ট টাকার রাত;
আর কত ছারখার করবে আমাকে?
থেঁতলে যাওয়া বুকের ভেতর বন্দি আগুনের নদী।
পাথরকুচির পাতার মতো স্বচ্ছ ভালোবাসাও ম্লান
হয় একদিন।
তবুও নিজের সাথে জমে ওঠে হাজারো কনভারসেশন;
রাত যত বাড়তে থাকে, অ্যাশট্রে ভরে ওঠে মৃত
সিগারেটের শোক।
মৃত্তিকার অ্যালগরিদম
তানভীর আহমেদ হৃদয়
ঘুমের ভেতর একটি বীজ বারবার নিজের জন্মের
হিসাব কষে।
মাটি কোনো উত্তর দেয় না—শুধু অন্ধকারের পরিমাণ
বাড়িয়ে দেয়।
পুরোনো চিঠির ভাঁজে আটকে থাকা গন্ধটি কোনো
ঠিকানায় পৌঁছায়নি।
সমুদ্র তার নোনাজল দিয়ে প্রতিটি স্মৃতির পাসওয়ার্ড
মুছে ফেলে।
যা হারিয়ে গেছে, তারই অদৃশ্য নকশায় পৃথিবী প্রতিদিন পুনর্গঠিত হয়।
অস্তিত্ব তাই হয়তো এক অসমাপ্ত গণনা—যার কোনো
শেষ সংখ্যা নেই।
তারকারাজির মেলাতে
রকিবুল ইসলাম
মেঘমালা ছিল না তখন আমার গগনতলে।
"তারাভরা আকাশ" আমার পূর্ণ ছিল অগণিত
নক্ষত্রের দীপ্তিতে।
ভেসেছি আলোর ভেলায় মনের হরষে,
গভীর আহ্লাদে, চরম পুলকে।
অতঃপর, একদা তুমি বিদায় নিলে
আমার হৃদয়াঙ্গন ছেড়ে।
অসহায় আমার পুরো পৃথিবী গেল ঢেকে,
অমাবস্যার নিম রজনীর ঘোর আঁধারে।
প্রতীক্ষা করো, আসছি আমি মিলতে
তোমার সাথে!
বসবে আবার তারকার মেলা—
তোমার-আমার মিলনে,
সুনীল ওই আকাশের "তারকারাজির মেলাতে।"
শেষ যাত্রার সঙ্গী
ইদ্রিস মণ্ডল
শহরের এক প্রান্তে ছোট্ট একটি ভাড়া বাড়ি। টিনের চালের ওপর বৃষ্টি পড়লে যেমন শব্দে ঘর ভরে ওঠে, তেমনই সেই ঘরটিও ভরে থাকত ছোট ছোট স্বপ্নে। মন্টু মিয়া একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। মাস শেষে বেতন হাতে পেলে সংসারের হিসাব মেলাতেই প্রায় সব শেষ হয়ে যেত। তবু তাঁর একমাত্র ছেলে সিফাদকে ঘিরেই ছিল ভবিষ্যতের সব আলো। স্ত্রী হাসনা বানুরও একটাই বিশ্বাস—ছেলেটা একদিন মানুষ হবে, তাদের সব কষ্ট মুছে দেবে।
কলেজে ওঠার পর থেকেই সিফাদের ভেতরে অদৃশ্য এক পরিবর্তন দেখা দিল। বন্ধুদের চকচকে মোটরসাইকেল দেখে তার মনে জন্ম নিল একরাশ অস্থিরতা। কৈশোরের সেই জেদ আর নিজেকে অন্যদের চেয়ে কম না ভাবার গোপন অহংকার তাকে প্রতিদিন একই আবদারের দিকে ঠেলে দিল।
"বাবা, আমাকে একটা মোটরসাইকেল কিনে দাও।"
মন্টু মিয়া মৃদু হেসে বলতেন,
"বাবা, এখন পারব না। সংসারের অবস্থা তো দেখছ।"
কিন্তু জেদ কখনো বাস্তবতার হিসাব বোঝে না। হাসনা বানুও ছেলের মুখের বিষণ্নতা সহ্য করতে পারলেন না।
"ধার করে হলেও কিনে দাও। একটাই তো ছেলে।"
অনেক রাত পর্যন্ত হিসাবের খাতা খুলে বসেছিলেন মন্টু মিয়া। কোথায় কত টাকা ধার করা যায়, কাকে কীভাবে শোধ দেবেন—এসব ভাবতে ভাবতেই রাত ফুরিয়ে গিয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত নিজের স্বস্তির দিনগুলো বন্ধক রেখে, পরিচিত মানুষের কাছে হাত পেতে, ধারদেনা করে একটি নতুন মোটরসাইকেল কিনে আনলেন।
মোটরসাইকেলটি উঠোনে দাঁড়াতেই আনন্দে ছুটে এল সিফাদ। নতুন গাড়ির গায়ে হাত বুলিয়ে সে যেন নিজের স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখছিল। মুহূর্তেই বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
"বাবা, সত্যিই তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয় বাবা।"
ছেলের সেই উজ্জ্বল হাসি দেখে মন্টু মিয়ার মনে হলো, পৃথিবীর সব ঋণ যেন এই একটি মুহূর্তেই শোধ হয়ে গেছে। হাসনা বানুও দরজায় দাঁড়িয়ে মুচকি হেসেছিলেন। সেদিন তাদের ছোট্ট উঠোনে অভাব ছিল, কিন্তু আনন্দের কোনো অভাব ছিল না।
পরদিন সকালটা ছিল শান্ত, নির্মল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মোটরসাইকেলের চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে সিফাদ বলল,
"মা, আজ ফিরতে একটু দেরি হতে পারে।"
হাসনা বানু ছেলের শার্টের কলারটা ঠিক করে দিয়ে বললেন,
"খুব সাবধানে যাবি, বাবা।"
মন্টু মিয়া দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু বললেন,
"আস্তে চালাবি। রাস্তায় তাড়াহুড়ো করিস না।"
সিফাদ হেসে উত্তর দিল,
"চিন্তা কোরো না, বাবা। বিকেলেই ফিরে আসব।"
ইঞ্জিনের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। মন্টু মিয়া অনেকক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কে জানত, ওই বিদায়ই হবে তাদের শেষ বিদায়!
কয়েক মিনিট পরই কলেজে যাওয়ার পথে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটল। মুহূর্তেই থেমে গেল একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন।
মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা সিফাদের বন্ধু সাফিদ গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে লাগল। আর সিফাদ... সে আর কোনো দিন ফিরল না।
সংবাদ পেয়ে ছুটে এলেন মন্টু মিয়া। মানুষের ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল। রক্তাক্ত রাস্তায় নিথর পড়ে আছে তার একমাত্র ছেলে সিফাদ। ভাঙাচোরা মোটরসাইকেলের পাশে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে সাফিদ।
মন্টু মিয়া আর এক পা-ও এগোতে পারলেন না। তাঁর দুই চোখ স্থির হয়ে রইল ছেলের মুখে। ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না।
হাসনা বানু ছেলের নিথর শরীর জড়িয়ে ধরে বিলাপ করতে লাগলেন। সেই কান্নায় যেন চারপাশের বাতাসও ভারী হয়ে উঠল। অবাক, শূন্য চোখে স্বামী-স্ত্রী শুধু তাকিয়ে রইলেন তাদের সব স্বপ্নের দিকে। নীরবে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রু—যে অশ্রুর কোনো ভাষা নেই, কোনো সান্ত্বনা নেই।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন