https://www.prothomalony.com/
17903
opinion
মাস কয়েক আগের কথা। আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় একদিন মন খারাপ করে আমাকে জানালেন তার এক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। বিকাশের বড় কর্মকর্তা সেজে এক সুচতুর লোক তাকে ফোন করে এমন বিশ্বস্ততার সঙ্গে কথা বললেন যে তিনি সরল বিশ্বাসে নিজের ওটিপি নম্বরটি বলে দিলেন। অমনি চোখের পলকেই তার হিসাব থেকে হাজার হাজার টাকা উধাও হয়ে গেল। যখন হুঁশ হলো, ততক্ষণে উপলব্ধি করলেন, তিনি সুপরিকল্পিত ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন।
এ ধরনের ঘটনা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; বরং আমাদের যাপিত জীবনের চলমান বাস্তবতা। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে অসংখ্য মানুষ এমন সাইবার জালের শিকার হচ্ছেন। কেউ হয়তো সরল বিশ্বাসে নিজের জমানো টাকা হারাচ্ছেন, আবার কেউ নিজের ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন। বিশেষ করে প্রেমের ফাঁদ কিংবা বড় ধরনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যেভাবে সাধারণ মানুষের পকেট খালি করা হচ্ছে, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। এই ডিজিটাল জমানায় প্রতারক চক্র এখন দূর থেকেই একটি অদৃশ্য বার্তার মাধ্যমে একজন মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয় লুটে নিতে পারে, যা আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় এক নিত্যনৈমিত্তিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
প্রতারকদের কৌশলী জাল এখন এনআইডি অফিস কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কল সেন্টার পর্যন্ত বিস্তৃত। তাদের কণ্ঠের সেই সুনিপুণ অভিনয় আর বিশ্বাসযোগ্য বাচনভঙ্গি সাধারণ মানুষকে মুহূর্তেই বিভ্রান্ত করে ফেলে। ‘আপনার এনআইডি কার্ডে সমস্যা আছে’ কিংবা ‘আপনার হিসাবটি এখনই যাচাই না করলে বন্ধ হয়ে যাবে’ এমন সব ভয় দেখিয়ে তারা মানুষের মস্তিষ্ক দখল করে নেয়। আর বিপদে পড়ার সেই তীব্র আতঙ্কে মানুষ যখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ওটিপি বা পাসওয়ার্ড বলে দেয়, তখনই ঘটে যায় সেই অপূরণীয় ক্ষতি।
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, এই ডিজিটাল আগ্রাসনে এখন যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার। ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রিয়জনের কণ্ঠ হুবহু নকল করে যখন কেউ বিপদের কথা বলে টাকা চায়, তখন না বলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই বলা যায়, একসময় চোর আসত রাতের অন্ধকারে সিঁদ কেটে, আর এখন চোর হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনের মাধ্যমেই অন্দরে ঢুকে পড়ছে। এই নতুন ধরনের প্রতারণা কেবল আর্থিক ক্ষতিই করে না, এটি মানুষের বিশ্বাসকেও নাড়িয়ে দেয়। যখন একজন মানুষ তার প্রিয়জনের কণ্ঠস্বর শুনে প্রতারিত হন, তখন সেই আঘাত কেবল টাকার অঙ্কে মাপা যায় না, মানসিকভাবে সমস্যায় পড়েন।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মূলে রয়েছে আমাদের ডিজিটাল সচেতনতার অভাব। আমরা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে শিখেছি ঠিকই, কিন্তু এর নিরাপদ ব্যবহার আজও আমাদের অজানা। অনেকেই পাসওয়ার্ড হিসেবে নিজের জন্মতারিখ বা অতি সহজ কিছু সংখ্যা ব্যবহার করেন, যা প্রতারকদের কাজকে আরও সহজ করে তোলে। এই অসচেতনতার অন্ধকার দূর করা এখন সময়ের দাবি। কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতাই নয়, আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদ্যমান সাইবার নিরাপত্তা আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। অনেক ভুক্তভোগীই জানেন না কোথায় অভিযোগ করতে হবে, ফলে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এই আইনি দুর্বলতা এবং প্রয়োগের শিথিলতা প্রতারকদের আরও শক্তিশালী করে তুলছে, যা সমাজের জন্য এক অশনিসংকেত।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে বিস্তর ফারাক। আইন আছে, কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে শরণাপন্ন হন, তখন অনেক সময় তাঁদের অভিযোগ গ্রহণ করতেও অনীহা দেখা যায়, অথবা প্রক্রিয়াটি এতটাই জটিল যে সাধারণ মানুষ মাঝপথেই হাল ছেড়ে দেন। ফলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয় এবং তাদের চক্র আরও শক্তিশালী হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, বরং তাদের ডিজিটাল অপরাধ দমনে আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি সাইবার অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের জন্য একটি সহজবোধ্য এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত।
এই অন্ধকার থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সচেতন হওয়া। এর জন্য স্কুল পর্যায় থেকেই আমাদের সন্তানদের ডিজিটাল দক্ষতার শিক্ষা দিতে হবে। তাদের শেখাতে হবে কীভাবে সন্দেহজনক লিংক চিনতে হয়, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি করতে হয় এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হয়। এই শিক্ষা কেবল পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিয়ে তাদের হাতে-কলমে শেখাতে হবে। অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল দায়সারা খুদে বার্তা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; বরং নিয়মিত প্রচারণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গ্রাহকদের সুরক্ষিত রাখতে হবে। তাদের জন্য সহজ ভাষায় নিরাপত্তা নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সেগুলো প্রচার করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, পরিবার থেকেই সচেতনতার এই লড়াই শুরু করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম যদি তাদের পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের প্রযুক্তির এই মারপ্যাঁচ বুঝিয়ে দেয়, তবে এই জালিয়াতির পথ অনেকটাই রুদ্ধ হবে। বর্তমানে অনেক পরিবারে তরুণ প্রজন্মই বয়স্কদের ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়ে সহায়তা করছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে শুধু পারিবারিক উদ্যোগেই নয়, সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগেই সাইবার অপরাধ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া সাফল্য আসবে না।
সাইবার অপরাধের ঝুঁকি সবার জন্য একরকম নয়। বয়স, পেশা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করে ঝুঁকির ধরনও ভিন্ন হয়। বয়স্করা প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনামূলক কম পরিচিত, তারা সহজেই প্রতারকদের কথায় বিশ্বাস করে ফেলেন। অন্যদিকে তরুণ ও শিক্ষার্থীরা চাকরি, স্কলারশিপ বা সহজে আয়ের প্রলোভনে বেশি প্রতারিত হন। নারীরা অনেক সময় ফেসবুক আইডি হ্যাক, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন। তাই সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সময় বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একটি সর্বজনীন সচেতনতা কর্মসূচির পাশাপাশি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য বিশেষায়িত কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।
এই সমস্যা মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা উন্নয়ন। পাশাপাশি সরকার, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবার; সবার সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। সম্মিলিতভাবে কাজ না করলে সাইবার অপরাধের বিস্তার আরও বাড়বে। তাই সময় থাকতে সতর্ক হওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ সাইবার জগতে একবার প্রতারণার শিকার হলে সেই ক্ষতি পূরণ করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। নিরাপদ ডিজিটাল জীবন নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি পদক্ষেপে সচেতনতা ও সতর্কতার বিকল্প নেই। এটি শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে এবং একটি নিরাপদ ও বিশ্বস্ত ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে। তবে মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিগত সতর্কতাই এ ধরনের প্রতারণার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট
অভিমত থেকে আরো পড়ুন