https://www.prothomalony.com/
17899
opinion
নির্দিষ্ট একটি জাতিকে ধারাবাহিকভাবে নির্মূল করার ইতিহাস অনেক পুরোনো হলেও, এটিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়ে ওঠেনি অনেক দিন। ১৯৯০-এর দশকে জাতিসংঘ (UN) এই নির্দিষ্ট অপরাধকে "Ethnic cleansing" (জাতিগত নিধন) সংজ্ঞায় আখ্যায়িত করেছে। দেখে নেওয়া যাক, এ বিষয়টি প্রকৃত অর্থে কী।
"Ethnic cleansing is rendering an area ethnically homogeneous by using force or intimidation to remove persons belonging to a given group from that area. It is a purposeful policy designed to forcibly remove a specific ethnic or religious population from a geographical territory, often constituting crimes against humanity."
অতীত থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশ্বে Ethnic Cleansing অসংখ্য দৃষ্টান্ত লিপিবদ্ধ আছে। উদাহরণ হিসেবে, ১৯১৫ সালে সংঘটিত "The Armenian Genocide"-এর ইতিহাস উল্লেখযোগ্য। অটোমান শাসনামলে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় তুরস্ক থেকে শতাধিক আর্মেনীয় বুদ্ধিজীবীসহ সাধারণ নাগরিকদের প্রথমে গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীতে আনাতোলিয়া থেকে সিরিয়ান মরুভূমিতে নির্বাসিত করা হয়। দিনের পর দিন তারা বদ্ধ মরুভূমিতে অনাহারে ও রোগে ভুগে মৃত্যুবরণ করে। অনেককে গুলি করে হত্যা করা হয়। নারীদের ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়। ধারাবাহিক আকারে এই বর্বরতা চলমান থাকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত। প্রায় ১.৫ মিলিয়ন আর্মেনীয় নাগরিক আনাতোলিয়া থেকে জোরপূর্বক বহিষ্কৃত হয়। এই সকল অন্যায়-অবিচারের পেছনে একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তুরস্কে মুসলিম অধ্যুষিত একটি সমসত্ত্ব সমাজ গড়ে তোলা।
১৪৯২ সালে স্পেন থেকে বহিষ্কার করা হয় বিশালসংখ্যক ইহুদি সম্প্রদায়কে এবং ১৫০২ সালে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের। উদ্দেশ্য একটাই—To promote Christianity.
উনিশ শতকের মাঝামাঝি, ১৮৬২ সালে উত্তর আমেরিকায় Homestead Act প্রবর্তন করা হয়। তৎকালীন এই আইন 'রেড ইন্ডিয়ান' উপজাতিদের বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট কিছু এলাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যা 'Red Indian Reservation" নামে পরিচিত। এই বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে উঠলে জাতিগত ভাবে নির্মূল করা হয়, Sioux, Comanche এবং Arapaho tribe'দের।
উদাহরণ হিসেবে আরও আসবে ১৯৯০-এর দশকে রুয়ান্ডার নির্মম অত্যাচারের ইতিহাস, যেখানে হুতু সম্প্রদায় কর্তৃক নিগৃহীত হয়েছিল সংখ্যালঘু তুতসি সম্প্রদায়। ১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়ায় সার্বীয়দের কর্তৃক বসনীয় এবং ক্রোয়েশিয়ানদের ওপর অত্যাচারের কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে অল্পবিস্তর।
বলাই বাহুল্য, Ethnic cleansing-এর চরম রূপ আমরা দেখেছি জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে ছয় মিলিয়ন ইহুদি নির্মূলের মাধ্যমে, যা ইতিহাসে "হলোকস্ট" নামে পরিচিত। শুধুমাত্র ইহুদিরাই নয়, প্রায় আড়াই লাখ (২৫০,০০০) জিপসি এবং সমসংখ্যক সমকামী মানুষকেও এই সময়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
Ethnic cleansing-এর এমন অসংখ্য ইতিহাস রয়েছে; স্বল্প পরিসরে এই লেখায় তা সব লিপিবদ্ধ করা অসম্ভব। সাম্প্রতিক বিশ্বে Ethnic cleansing-এর পথে ভারত হাঁটি হাঁটি পায়ে এগিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে অনেকটাই। মুসলিম সম্প্রদায়কে নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়ে সুনিপুন মুন্সিয়ানার সঙ্গে এগোচ্ছে ভারতের হিন্দুত্ববাদ। এর গোড়াপত্তন পুরোনো হলেও এতকাল তা অনেকটা অন্তরালেই ছিল। কিন্তু বিগত পনের বছরে হিন্দুত্ববাদের পদচারণা ক্রমশই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিজেদের ধর্মে বা পরিচয়ে রাজনীতি করায় কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি যে কখনোই নির্দোষ থাকতে পারে না—তা মানতেই হবে। যার ফলে প্রকাশ্যেই ঘটছে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।
২০০২ সালে ভারতে অযোধ্যাগামী একটি ট্রেনে অগ্নিসংযোগের কারণে ৫৯ জন তীর্থযাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এই নৃশংস ঘটনাটিকে ইসলামিক দলগুলোর সন্ত্রাসী কার্যক্রম বলে অভিযোগ ওঠে এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল এর ভয়াবহ প্রোপাগান্ডা উস্কে দেয় একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা; যার তাণ্ডব এবং নাশকতা একটানা তিনদিন ধরে অব্যাহত থাকে এবং একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল মুসলিম নিধন।
ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হুকুমে পুলিশের অকার্যকর ভূমিকা এই দাঙ্গাকে এক নির্মম ও রক্তক্ষয়ী হত্যাযজ্ঞে রূপ দেয়। এই বিষয়ে বিশদে আর কিছু বলবার প্রয়োজন বোধ করছি না, কারণ আমার বিশ্বাস, ভারতের প্রত্যেকটি সচেতন নাগরিকের স্মৃতিতে তা আজও একটি ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। বিজেপি প্রণোদিত হিন্দুত্ববাদের বিস্তার ও চর্চার যে নিরলস অভিযান, তা আজ সদর্পে গ্রাস করে চলেছে এককালের অসাম্প্রদায়িক ভারতকে। খর্ব করে চলেছে ভারতীয় মুসলিমসহ সকল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক অধিকার, যার প্রতিফলন এবারের নির্বাচনে পূর্ণমাত্রায় প্রকাশিত, বিশেষতঃ পশ্চিমবাংলায়। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভোটারদের বাদ দেয়া হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী দাঙ্গা হাঙ্গামায় ধ্বংস করা হচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসা বানিজ্য।
বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর উত্থানের বিষয়টিকেও বোধ করি একেবারে উপেক্ষা করা যায় না। তবে, এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ তাদের মতামত সুস্পষ্টভাবে স্পষ্ট করেছে। বিজেপির সাথে জামায়াতের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তা হলো—পদ্ধতিগতভাবে হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের নির্মূল করার কোনো ঐতিহাসিক রেকর্ড বা সুনির্দিষ্ট ভিত্তি এই দলটির নেই। এই সম্প্রীতি বজায় থাকার একটি বড় কারণ হলো—বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থান ও পারস্পরিক সম্প্রীতির চর্চা আজও বিদ্যমান। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর অন্যায় ও অত্যচারের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে-তা অস্বীকার করার উপায় নাই। এই প্রসঙ্গে বলতেই হয়, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে এই দেশের মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মের নাগরিকরাও। কিন্তু তুলনামূলকভাবে প্রতিবাদের এই দৃশ্য ভারতে খুব একটা দেখা যায় না।
সংশয় এবং সংকট হলো অন্য একটা জায়গায়। সাম্প্রতিক কালে বিশ্বজুড়ে ডানপন্থার উত্থান যে এক অজানা আশঙ্কার ইশারা দিচ্ছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উন্মাদনা যেকোনো মানুষকেই হত্যাযোগ্য করে কোলে, মানবতাকে হত্যা করে। ধর্মচর্চা এবং ধর্ম উন্মাদনার মধ্যে আসলে বিশাল ফারাক। যে কোনো ধর্ম মানুষকে যেমন সংযত হতে শেখায়, অন্যদিকে ধর্মীয় উন্মাদনা নাশকতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পরিশেষে বলতে চাই, ধর্ম ব্যক্তিগত চর্চার অনুষঙ্গ হোক, রাষ্ট্রের অবস্থান হোক এই বৃত্তের বাইরে। এই পৃথিবীতে প্রত্যেক ধার্মিক বা অধার্মিক এবং সংশয়বাদি বেঁচে থাকুক তার বিশ্বাসের স্বাধীনতা নিয়ে, একজন পরিপূর্ণ মানুষ পরিচয় নিয়ে। আমার এই অভিপ্রায় হয়তো উচ্চাভিলাষী, কিন্তু অসম্ভব নয়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন