https://www.prothomalony.com/
17860
opinion
নূহ-উল-আলম লেনিন। তিনি রাজনীতিবিদ, গবেষক ও লেখক। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও দলটির মুখপত্র মাসিক ‘উত্তরণ’ এর সম্পাদক। ২০২৪-এ হাসিনার পলায়নের পর তিনিও গা ঢাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ২০২৬ সালের ১ আগস্ট এসে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘বিপ্লব প্রতিবিপ্লব এবং আত্মঘাতী বামপন্থা’ শিরোনামে একটি বেশ দীর্ঘ লেখা লিখেছেন। লেখাটি খুবই আপত্তিজনক এবং উসকানিমূলক। পতিত হাসিনা নেতৃত্বের সংগঠন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পদধারী নেতা হয়ে এই সময়ে এমন উসকানিমূলক লেখা লিখবার মতো সাহসটাও কীভাবে করলেন, আমার বোধগম্য হচ্ছে না! তাই তার সেই লেখার সূত্র ধরে কিছু কথা নিচে তুলে ধরলাম।
কৌশলী এবং ধুরন্ধর মানুষ নূহ-উল-আলম লেনিনের লেখাটি পড়ে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, তিনি ইতিহাসের বিশ্লেষণ করছেন। কিন্তু একটু মন দিয়ে পড়লেই বোঝা যায়, তিনি আসলে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তাঁর লেখায় তথ্যের চেয়ে অভিযোগ বেশি। যুক্তির চেয়ে আবেগ বেশি। আর সবচেয়ে বেশি আছে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। তিনি জুলাই ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানকে ‘প্রতিবিপ্লব’ বলেছেন। এটি তার রাজনৈতিক মত। তিনি সেই মত প্রকাশ করতেই পারেন। কিন্তু কোনো মতকে সত্য প্রমাণ করতে হলে প্রমাণ লাগে। কেবল প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুড়ে দিলেই ইতিহাস লেখা যায় না।
জুলাই আন্দোলনে লাখো লাখো মানুষ অংশ নিয়েছিল। ছাত্র ছিল, তরুণ ছিল, সাধারণ মানুষ ছিল। তারা সবাই কি কোনো গোপন নকশার অংশ ছিল? সবাই কি জামায়াতের কর্মী ছিল? এমন দাবি করা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। একটি গণআন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতেই পারে। ইতিহাসে এমন বহুবার হয়েছে। কিন্তু তাই বলে পুরো আন্দোলনকে একটি দলের ষড়যন্ত্র বলা যায় না। যারা রাস্তায় জীবন দিয়েছে, আহত হয়েছে, নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের সংগ্রামকে এভাবে ছোট করা ঠিক নয়। কিন্তু ঠিক নয় জেনেও লেনিন সেই কাজটা করছেন আদা-জল খেয়ে।
নূহ-উল-আলম লেনিন তার লেখায় বারবার জামায়াতের প্রসঙ্গ এনেছেন। জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার, কোনো আন্দোলনে একটি রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি থাকলেই পুরো আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায় না। আন্দোলনের চরিত্র নির্ধারণ করে তার মূল দাবি এবং জনগণের অংশগ্রহণ। তিনি বলেছেন, বিদেশি শক্তি অর্থ দিয়েছে। যদি এমন অভিযোগ সত্য হয়, তবে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। আর তিনিও যখন এই অভিযোগ উত্থাপন করছেন, তার উচিত হলো কাগজপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করা। কিন্তু শুধু একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে পুরো গণঅভ্যুত্থানকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলা দায়িত্বশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়। মুক্তমত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে বলে ফ্যাসিস্ট পক্ষের কেউ ইচ্ছেমতো বলবেন, আর আমরা সেটা মেনে নেব, তা তো হতে পারে না।
তার লেখার আরেকটি বড় সমস্যা হলো, তিনি আওয়ামী লীগের ভুলকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, দলটি ভুল করেছে। কিন্তু সেই ভুলের বিচার শুধু নির্বাচনে হওয়া উচিত ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, যখন মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল, বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছিল, দমন-পীড়নের কথা উঠছিল, তখন মানুষের ক্ষোভ কি শুধু নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করবে? ইতিহাসে এমন কোনো নিয়ম নেই। যে সরকার জনগণের আস্থা হারায়, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। এটি গণতন্ত্রেরই অংশ। তিনি বারবার বঙ্গবন্ধুর বাড়ি, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়া, নির্বাচন এবং অন্যান্য বিষয় তুলে ধরেছেন। এসব বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে, সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু এসব ঘটনাকে সামনে এনে পুরো গণঅভ্যুত্থানকে অবৈধ বলা যায় না।
সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো তার বামপন্থীদের নিয়ে বক্তব্য। তিনি সরাসরি বাম রাজনীতিকে প্রশ্ন করেছেন। আবার একই সঙ্গে বামপন্থীদের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন যে তারা যেন বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘প্রতিবিপ্লব’ বলে ঘোষণা করে। প্রশ্ন হলো, কেন? যে ব্যক্তি বহু বছর আগে কমিউনিস্ট রাজনীতি ছেড়ে আওয়ামী লিগে যোগ দিয়েছিলেন, তিনি আজ হঠাৎ বামপন্থীদের এত দরদ দেখাচ্ছেন কেন?
এর উত্তর বোঝাটা খুব কঠিন নয়। কারণ তিনি বামপন্থীদের উসকানি দিচ্ছেন। তিনি চান বামপন্থীরা এমন একটি অবস্থান নিক, যা শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বয়ানকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু একটি স্বাধীন রাজনৈতিক দলের কাজ অন্য কোনো দলের ভাষ্য পুনরাবৃত্তি করা নয়। বাংলাদেশের বামপন্থীদের নিজস্ব ইতিহাস আছে, নিজস্ব সংগ্রাম আছে। তাদের ভুলও আছে, সীমাবদ্ধতাও আছে। কিন্তু তারা নিজেদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিজেরাই করবে, অন্য কারও নির্দেশে নয়।
নূহ-উল-আলম লেনিন সিপিবির সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, তারা ইউনূস সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক সংলাপ কি অপরাধ? গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়, মতবিনিময় হয়, দাবি তুলে ধরা হয়। এটিই স্বাভাবিক। সংলাপ মানেই সমর্থন নয়, আলোচনা মানেই আত্মসমর্পণ নয়।
তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের বক্তব্য নিয়েও আপত্তি তুলেছেন। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতা দেশের সংকট কাটাতে সংলাপের আহ্বান জানালে সেটিকে অপরাধ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং প্রশ্ন করা উচিত, রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কি শুধু সংঘাতের মাধ্যমে সম্ভব? বাংলাদেশের মানুষ সংঘাত চায় না; তারা স্থিতিশীলতা চায়, গণতন্ত্র চায়, জবাবদিহি চায়। এই বাস্তবতা মেনে নিতে না পারলে রাজনীতি আরও সংকটে পড়বে।
নূহ-উল-আলম লেনিন তার লেখায় নিজের অতীতের কথা বলেননি। তিনি একসময় কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন, পরে আওয়ামী লিগে যোগ দেন। দীর্ঘদিন সেই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন, ক্ষমতার রাজনীতির অংশ ছিলেন। সরকারের নানা সিদ্ধান্তের সময়ও তিনি নীরব ছিলেন। আজ তিনি আবার বামপন্থীদের শিক্ষা দিতে নেমেছেন। এটি রাজনৈতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।
একজন রাজনীতিকের নিজের ভূমিকাও ইতিহাসের অংশ। তাই অন্যদের সমালোচনা করার আগে নিজের অবস্থানও ব্যাখ্যা করা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইতিহাসের বিচার কোনো একক রাজনৈতিক দলের হাতে থাকে না। জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাও ইতিহাসের অংশ। এই ঘটনাকে কেউ বিপ্লব বলবেন, কেউ গণঅভ্যুত্থান বলবেন, কেউ অন্যভাবে মূল্যায়ন করবেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গবেষণা হবে, নতুন তথ্য আসবে, তখন আরও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন সম্ভব হবে।
কিন্তু আজই একে চূড়ান্তভাবে ‘প্রতিবিপ্লব’ ঘোষণা করে সবাইকে সেই ভাষা ব্যবহার করতে বলা রাজনৈতিক প্রচারণা হতে পারে, ইতিহাসচর্চা নয়। বামপন্থীদের উচিত নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জনগণের স্বার্থে নির্ধারণ করা; কোনো বড় দলের সুবিধা বা অসুবিধা দেখে নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে স্বাধীন চিন্তার ওপর, দলীয় প্রচারণার ওপর নয়।
তাই নূহ-উল-আলম লেনিনের এই লেখাকে রাজনৈতিক মতামত হিসেবেই দেখা উচিত, এটিকে ইতিহাসের চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়। কারণ ইতিহাস প্রশ্ন করতে শেখায়, কিন্তু ইতিহাস একই সঙ্গে নিজের অবস্থানকেও প্রশ্ন করার সাহস শেখায়। লেনিনের সেই সাহস নেই নিজেদের অপকর্মকে প্রশ্ন করার।
অনেকে বলতে পারেন তার এই লেখাকে গুরুত্ব দেওয়ার কী প্রয়োজন? প্রয়োজন এ কারণে যে অভ্যুত্থান-পরবর্তী কোনো আওয়ামী লীগ নেতার এই লেখা একটি দলিল হিসেবে থেকে যাবে। সে কারণেই আমি ওই লেখার প্রেক্ষিতে আমার বিবেচনায় কী প্রতিক্রিয়া হওয়া প্রয়োজন, তা সবার সামনে তুলে ধরলাম।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক
অভিমত থেকে আরো পড়ুন