https://www.prothomalony.com/
17893
opinion
খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ ০২:৫২
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য এবং পৃথিবীতে তাঁর বিধান কায়েম করার জন্য। এ লক্ষ্যে যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়ে মানুষকে সত্য ও হেদায়াতের পথ দেখানো হয়েছে। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ বারবার হক্বের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, কখনো নিজে বিভ্রান্ত হয়েছে, কখনো অন্যদের এ পথে আসতে বাধা দিয়েছে। ফলে তারা শয়তানের মতোই অভিশপ্ত হয়ে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়েছে। এই লেখায় দ্বীনের পথে বাধাদানের পরিণতি নিয়ে আলোচনা করা হলো।
শয়তানের এই ষড়যন্ত্রের সূচনা আদম আলাইহিস সালামের সময় থেকেই। আল্লাহ যখন সবাইকে আদমকে সিজদা করতে বলেন, ইবলীস অহংকারবশত তা অমান্য করে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয় (বাক্বারাহ: ৩৪)। আদমের কারণে নিজের মর্যাদাহানি হয়েছে মনে করে সে আদম ও তাঁর সন্তানদের চিরশত্রুতে পরিণত হয় এবং তাদের বিভ্রান্ত করার সংকল্প করে। এরপর সে আদম ও হাওয়াকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে, নানা কৌশলে তাদের বিশ্বাস অর্জন করে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ায়, ফলে তাঁদের লজ্জাস্থান প্রকাশ পায় এবং পরে অনুতপ্ত হয়ে তাঁরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন (আ'রাফ: ২০-২২)। নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের মধ্যেও শয়তান একই কৌশলে কাজ করে। সে সময়ে পাঁচজন সৎকর্মশীল ব্যক্তির স্মরণে তৈরি প্রতিকৃতিকে ধীরে ধীরে মূর্তিপূজায় রূপান্তরিত করে শয়তান মানুষকে ধোঁকা দেয়, প্রথমে ইবাদতে উৎসাহ সৃষ্টির অজুহাতে মূর্তি তৈরি করানো হয়, পরবর্তী প্রজন্ম সেগুলোকেই সরাসরি পূজা করতে শুরু করে। এভাবে পৃথিবীতে প্রথম মূর্তিপূজার সূচনা হয়।
বনী ইসরাঈলের ক্ষেত্রেও একই প্রতারণা দেখা যায়। মূসা আলাইহিস সালাম তূর পাহাড়ে চল্লিশ দিনের জন্য গেলে সামেরী নামক এক কপট ব্যক্তি সুযোগ বুঝে জিব্রীলের পদচিহ্নের বিশেষ মাটি ব্যবহার করে গলিত অলংকার থেকে একটি গো-বৎসের অবয়ব তৈরি করে, যা থেকে অদ্ভুত শব্দ বের হতো। সে সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করে বলে, এটাই তাদের প্রকৃত উপাস্য, যা মূসা ভুলে গেছেন (ত্বোয়াহা: ৮৩-৯৭)। ফিরে এসে মূসা আলাইহিস সালাম অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও অনুতপ্ত হয়ে নেতৃত্বদানকারীদের কঠোর শাস্তি দেন এবং সামেরীকে আজীবনের জন্য লাঞ্ছনার শাস্তি দেন। বদর যুদ্ধের সময়ও ইবলীস মানুষের রূপ ধরে মুশরিকদের যুদ্ধে প্ররোচিত করেছিল এবং তাদের পক্ষ নেয়, কিন্তু ফেরেশতাদের উপস্থিতি দেখে ভয়ে পালিয়ে যায় এবং বলে, আমি তা দেখছি যা তোমরা দেখছ না, আমি আল্লাহকে ভয় করি (আনফাল: ৪৮)। এভাবে আদ, ছামূদ, কওমে লূত্ব, আহলে মাদইয়ান, ফিরাউন, কারূণ, হামান, শাদ্দাদ, আবরাহা, আবু জাহলসহ বহু প্রতাপশালী গোত্র ও শাসক আল্লাহর পথে বাধা দিয়েছে, কিন্তু কারো পরিণতিই শুভ হয়নি; আল্লাহ প্রত্যেককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং তাদের ইতিবৃত্ত পরবর্তীদের জন্য শিক্ষা হিসেবে রেখে গেছেন।
দ্বীনের পথে বাধাদান মূলত আল্লাহর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন। দ্বীনে হক্বের কাজ মূলত আল্লাহর নির্দেশ, যা বাস্তবায়নে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বান্দাকে বিভিন্নভাবে তাগিদ দিয়েছেন। পাশাপাশি এই কাজে বাধা প্রদান করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ মুমিনদের সতর্ক করে বলেছেন, পথে-ঘাটে বসে বিশ্বাসীদের হুমকি দেওয়া বা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে বক্রতা অনুসন্ধান করা থেকে বিরত থাকতে, এবং অতীতে সংখ্যায় অল্প থেকে বহু হওয়ার নে'আমত স্মরণ করে অনর্থকারীদের করুণ পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে (আ'রাফ: ৮৬)। যারা অহংকার ও লোকদেখানো উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে আল্লাহর পথে বাধা দেয়, তাদের মতো না হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ তাদের সকল কার্যকলাপ আল্লাহর আয়ত্তে রয়েছে (আনফাল: ৪৭)। প্রকৃতপক্ষে দ্বীনের পথে বাধা সৃষ্টি করা একটি শয়তানী কাজ, যা মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে আজও অব্যাহত আছে। শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে মানুষের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে তাদের আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখতে চায় (মায়েদাহ: ৯১), আর শয়তানের এই কাজে কিছু মানুষও সহযোগী হয়ে দ্বীনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাস সাক্ষী, আল্লাহর পথে বাধাদান বিশেষভাবে ইহুদী-নাছারাদের একটি অভ্যাসগত বৈশিষ্ট্য ছিল। তারা নবী-রাসূলগণকে অস্বীকার করার পাশাপাশি ঈমানদারদের দ্বীনের পথে বক্রতা সৃষ্টি করে বাধা দিত, যদিও তারা নিজেরাই এই পথের সত্যতা সম্পর্কে অবগত ছিল (আলে-ইমরান: ৯৯)। অনুরূপভাবে মুনাফিকরাও প্রকাশ্যে আল্লাহর পথে থাকার ভান করলেও প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশনা থেকে সরে যেত (নিসা: ৬১)।
দ্বীনের পথে বাধাদানের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রথমত, এর ফলে বান্দা বহু কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। ইহুদীদের পাপাচার ও আল্লাহর পথে বাধাদানের কারণে তাদের জন্য পূর্বে হালাল থাকা বহু পবিত্র বস্তু হারাম করে দেওয়া হয়েছিল (নিসা: ১৬০)। দ্বিতীয়ত, বাধাদানকারী নিজেই সুদূর বিভ্রান্তিতে পতিত হয়, কারণ যারা কুফরী করে ও আল্লাহর পথে বাধা দেয় তারা সত্য পথ থেকে বহু দূরে সরে যায় (নিসা: ১৬৭, ইবরাহীম: ৩)। তৃতীয়ত, এটি একটি জঘন্য পাপ, যার জন্য পরকালে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি (মুজাদালাহ: ১৬)। এমনকি সম্মানিত মাসে যুদ্ধ করার চেয়েও আল্লাহর পথে বাধাদান ও মসজিদে হারামে প্রবেশে বাধা দেওয়াকে অধিক গুরুতর পাপ বলা হয়েছে, আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা সৃষ্টি করাকে হত্যার চেয়েও মহাপাপ বলা হয়েছে (বাক্বারাহ: ২১৭)।
চতুর্থত, আল্লাহর দ্বীনের পথে বাধাদান কুফরীর নামান্তর, কারণ যারা আল্লাহর পথে বাধা দেয় ও বক্রতা অনুসন্ধান করে তারা পরকাল সম্পর্কেও অবিশ্বাসী বলে আখ্যায়িত হয়েছে (আ'রাফ: ৪৫)। পঞ্চমত, এটি এমন এক অপরাধ যা তওবা ব্যতীত ক্ষমাযোগ্য নয়; যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে আল্লাহ কখনোই তাদের ক্ষমা করবেন না (মুহাম্মাদ: ৩৪)। ষষ্ঠত, এর জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। মসজিদে হারামে প্রবেশে বাধাদানকারীদের আযাব থেকে রেহাই নেই (আনফাল: ৩৫), অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগকারী ও আল্লাহর পথে বাধাদানকারী পন্ডিত-সংসারবিরাগীদের জন্য রয়েছে কঠোর আযাবের সংবাদ (তওবা: ৩৪), এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের আযাবের উপর আযাব বৃদ্ধি করা হবে (নাহল: ৮৮, ৯৪)। মসজিদে হারাম থেকে মানুষকে বাধাদানকারীদের জন্যও রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি (হজ্জ: ২৫)।
সপ্তমত, দ্বীনের পথে বাধাদানকারীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাদের ব্যর্থতা ও পরাজয় বরণ করতেই হয়। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, যারা কুফরী করে ও আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে তাদের সকল কর্ম তিনি ব্যর্থ করে দেন (মুহাম্মাদ: ১, ৩২)। অষ্টমত, দ্বীনের কাজে বাধা দিতে ব্যয়িত সম্পদও শেষ পর্যন্ত আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যারা এ উদ্দেশ্যে ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পরাজয় ও অনুশোচনায় পর্যবসিত হয় এবং তারা জাহান্নামের দিকে তাড়িত হবে (আনফাল: ৩৬)।
বর্তমান যুগেও সুনামি, ভূমিকম্প, ভূমিধ্বসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করেন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা থেকে শিক্ষা নেয় না; বিপদ কেটে গেলেই তারা অভ্যাসবশত আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়। অথচ পবিত্র কুরআনে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ইতিহাস পরবর্তীদের জন্য স্পষ্ট উপদেশ হিসেবে রাখা হয়েছে, যাতে মানুষ সৎপথে ও দ্বীনের উপর অবিচল থাকতে পারে।
ব্যক্তিস্বার্থে, দলীয় স্বার্থে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যারা আল্লাহর দ্বীনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তারা সাময়িকভাবে সফল মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ইহকালে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি পরকালেও এই ক্ষমার অযোগ্য পাপের কারণে মুক্তি পাবে না। তাই আমাদের সতর্ক থাকা উচিত, যেন আমাদের কোনো কথা, কাজ বা আচরণে দ্বীনের প্রচার-প্রসারে বিঘ্ন না ঘটে; বরং হক্বের প্রচারে আমাদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনে হক্বের সেবায় আত্মনিয়োগ করার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!
গোপন পাপ থেকে পরিত্রাণের উপায়
তানভীর ফুয়াদ
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।
পার্থিব জীবনের এই সফরে আমরা সবাই পরকালের যাত্রী। এই পথে শয়তান প্রতিনিয়ত আমাদের পদস্খলনের চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। মানুষের সামনে আমাদের আমল-আখলাক্ব ভালো দেখালেও নির্জনে আমাদের প্রকৃত স্বরূপ ফুটে ওঠে। লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহর অবাধ্যতা করার নামই গোপন পাপ, যা উইপোকার মতো তিল তিল করে গড়ে তোলা নেক আমলগুলোকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে। তাই গোপন পাপ থেকে ঈমান ও আমল রক্ষা করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য। নিচে এ থেকে পরিত্রাণের কয়েকটি কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো।
প্রথমত, তাক্বওয়ার সাথে একাকীত্ব নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে গোপন পাপের সবচেয়ে সহজলভ্য হাতিয়ার আমাদের হাতের স্মার্টফোন। একাকীত্বের সুযোগ পেলেই শয়তান অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। নির্জনে নিজেকে পাপমুক্ত রাখা কতটা কঠিন, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইমাম শাফেঈ বলেছেন, নির্জনে পরহেযগারিতা অবলম্বন করা সবচেয়ে কঠিন আমলগুলোর একটি (ইমাম শাফেঈ)। নির্জনে আল্লাহর পর্যবেক্ষণের ভয় অন্তরে জাগ্রত রাখাকে বলা হয় মুরাক্বাবা এই অনুভূতি যে, আল্লাহ সর্বদা আমাদের দেখছেন ও জানছেন। ইবনুল ক্বাইয়িম বলেন, আল্লাহর সর্বজ্ঞতা, সর্বদ্রষ্টা ও পর্যবেক্ষণকারী গুণের দাবি অনুধাবন করে জীবন পরিচালনা করলেই প্রকৃত মুরাক্বাবা অর্জিত হয় (ইবনুল ক্বাইয়িম)। আমরা রাস্তায় সিসিটিভি দেখলে সংযত হই, অথচ ভুলে যাই আল্লাহর কাছে আমাদের প্রতিটি কাজ অবিকল সংরক্ষিত থাকে। আল্লাহ বলেন, তিনি চোখের চোরাচাহনি ও অন্তরের গোপন বিষয়ও জানেন (মুমিন: ১৯)। ইমাম শাফেঈ কবিতায় বলেছেন, নির্জনে থাকলেও ভেবো না তুমি একা, বরং জেনো তোমার উপর একজন পর্যবেক্ষক রয়েছেন (ইমাম শাফেঈ)।
গোপন পাপের ভয়াবহতা হলো, এটি হৃদয় থেকে আল্লাহর প্রতি লজ্জা দূর করে দেয়। ইবনুল ক্বাইয়িম বলেন, যে ব্যক্তি গুনাহের সময় আল্লাহকে লজ্জা করে, আল্লাহও তাকে শাস্তি দিতে লজ্জাবোধ করবেন (ইবনুল ক্বাইয়িম)। তাবেঈ বেলাল ইবনু সা'দ সতর্ক করে বলেছেন, প্রকাশ্যে আল্লাহর বন্ধু সেজে গোপনে তাঁর শত্রুতা করা উচিত নয় (বেলাল ইবনু সা'দ)।
দ্বিতীয়ত, ফেরেশতাদের উপস্থিতির অনুভূতি জাগ্রত রাখা প্রয়োজন। মানুষ নির্জনে ভাবে সে সম্পূর্ণ একা, অথচ সম্মানিত ফেরেশতারা সার্বক্ষণিক তার পাশে থাকেন। আল্লাহ বলেন, তোমাদের উপর সম্মানিত লেখক ফেরেশতা নিযুক্ত আছেন, যারা তোমাদের সব কাজ জানেন (ইনফিতার: ১০-১২)। হাসান বাছরী এর তাফসীরে বলেন, বান্দার কোনো আমলই তাদের কাছে গোপন থাকে না (হাসান বাছরী)। যেভাবে আমরা সম্মানিত ব্যক্তির সামনে গুনাহে লিপ্ত হওয়ার সাহস পাই না, তেমনি ফেরেশতাদের উপস্থিতি অনুভব করলে গোপন পাপের স্পৃহা দূর হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, ছোট-খাটো পাপের ব্যাপারেও সতর্ক থাকা জরুরি। শয়তান প্রথমে ছোট পাপকে আকর্ষণীয় করে তোলে, অথচ ছোট ছিদ্রই বিশাল জাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে। বেলাল ইবনু সা'দ বলেন, গুনাহ ছোট কি না তা না দেখে, কার অবাধ্যতা করছ তা লক্ষ্য করো (বেলাল ইবনু সা'দ)। ইবনু বাত্তাল বলেন, মুমিনের উচিত সামান্য ভালো কাজকে অবহেলা না করা এবং সামান্য খারাপ কাজকেও তুচ্ছ জ্ঞান না করা, কারণ কোনটির জন্য আল্লাহ সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হবেন তা জানা যায় না (ইবনু বাত্তাল)। ইমাম গাযালী আক্ষেপ করে বলেছেন, সালাফরা আমাদের আমল দেখলে বলতেন আমরা যেন হিসাবের দিনেই বিশ্বাস করি না (ইমাম গাযালী)। ডিজিটাল যুগে আমাদের গোপন পাপ যেমন কোনো হারাম ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা মৃত্যুর পরও ইন্টারনেটে থেকে যায় এবং কবরে আযাব বাড়াতে থাকে। যুন-নূন আল-মিছরী বলেন, আল্লাহর ক্রোধ কোন অবাধ্যতায় লুকিয়ে আছে তা কেউ জানে না, তাই কোনো গুনাহকে তুচ্ছ মনে করা উচিত নয় (যুন-নূন আল-মিছরী)।
চতুর্থত, নিয়মিত আত্মসমালোচনা বা মুহাসাবা করা কর্তব্য। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করা উচিত, একাকীত্বের সুযোগে আজ আমরা আল্লাহর নযরদারীর মর্যাদা রেখেছি কি না। গুনাহ হয়ে থাকলে তাৎক্ষণিক তওবা করা এবং বেঁচে থাকলে আলহামদুলিল্লাহ বলে শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য। সাঈদ ইবনু জুবাইরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সবচেয়ে বড় ইবাদতগুযার কে, তিনি বলেছিলেন, যে ব্যক্তি অতীতের পাপের কথা স্মরণ করে নিজের নেক আমলকে তুচ্ছ মনে করে (সাঈদ ইবনু জুবাইর)। গোপন পাপ আমাদের হাজারো প্রকাশ্য নেক আমলের মাঝে সেই কালো দাগের মতো, যা লজ্জায় মাথা নত করে দেয় এবং অহংকার থেকে রক্ষা করে।
পঞ্চমত, পাপের পরিণাম নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। একজন সালাফ বলেছিলেন, ভালো কাজের তিক্ততা সামনে থাকে বলে তা ভারী মনে হয়, আর মন্দ কাজের মিষ্টতা সামনে থাকে বলে তা হালকা মনে হয়; কিন্তু এই হালকা বা ভারী বোধ যেন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে (সালাফ)। সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেইক আইডির আড়ালে অশ্লীল ভিডিও বা গুজব ছড়ানোর পরিণাম ভয়াবহ, কারণ মৃত্যুর পরও তা প্রবহমান থাকে। ইসলামি পরিভাষায় একে বলা হয় গুনাহে জারিয়া। ইমাম শাতেবী বলেন, সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি যে মারা যায় এবং তার পাপও তার সাথে নিঃশেষ হয়ে যায়; দুর্ভাগা সে, যার পাপ শত বছর পরও অবশিষ্ট থাকে এবং সে তার জন্য কবরে শাস্তি ভোগ করতে থাকে (ইমাম শাতেবী)।
ষষ্ঠত, চোখের পাপের ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। চোখ যা দেখে, অন্তর তার ছবি এঁকে নেয়। ইবনুন্ নাহহাস দিমাশকী বলেন, বারবার অন্যায় দেখলে অন্তর তার প্রতি অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং তা আর গর্হিত মনে হয় না (ইবনুন্ নাহহাস দিমাশকী)। যেমন ময়লার স্তূপের পাশে বসবাসকারীর নাকে দুর্গন্ধ আসে না, তেমনি বারবার হারাম দৃশ্য দেখলে অন্তর পাপের প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। আত্বা ইবনু আবী রাবাহ বলেন, যে দৃষ্টির প্রতি অন্তর আসক্তি পোষণ করে তাতে কোনো কল্যাণ নেই (আত্বা ইবনু আবী রাবাহ)। একটি লোলুপ দৃষ্টি বছরের পর বছরের ইবাদতের ছওয়াবকেও জ্বালিয়ে দিতে পারে।
সপ্তমত, গোপন ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া প্রয়োজন। যে ময়দানে শয়তান আমাদের পরাজিত করে, সেই ময়দানেই তাকে পর্যুদস্ত করতে হয়। একাকীত্বে নফল সালাত বা ইস্তেগফারের মাধ্যমে গোপন পাপের স্পৃহা বিনাশ করা যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোনো ব্যক্তি মানুষের দৃষ্টিতে জান্নাতীদের মতো আমল করেও জাহান্নামী হতে পারে, আবার জাহান্নামীদের মতো আমল করেও জান্নাতী হতে পারে এটি তার অন্তরের গোপন অবস্থার উপর নির্ভর করে (বুখারী)। ইবনু রজব হাম্বলী ব্যাখ্যা করেন, অন্তরের গোপন কোনো কল্যাণকর গুণ জীবনের শেষ মুহূর্তে প্রাধান্য পেয়ে উত্তম পরিণতি নিশ্চিত করে দিতে পারে (ইবনু রজব হাম্বলী)। ইবনুল জাওযী বলেন, মানুষের অন্তরে ভালোবাসা লাভের মূল কারণ বাহ্যিক ইবাদতের আধিক্য নয়, বরং অন্তরের গোপন নেক আমল ও বিশুদ্ধ নিয়ত (ইবনুল জাওযী)।
অষ্টমত, ভুলবশত কোনো পাপ হয়ে গেলে সাথে সাথে নেক আমল করা কর্তব্য। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই সৎকর্ম মন্দ কর্মকে বিদূরিত করে দেয় (হূদ: ১১৪)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো এবং মন্দ কাজের পরপরই একটি সৎকাজ করো, তা মন্দ কাজটিকে মিটিয়ে দেবে (হাদীছ)। গোপনে কোনো হারাম দৃশ্য দেখে ফেললে তৎক্ষণাৎ কুরআন তেলাওয়াত বা ছাদাক্বা করা যেতে পারে। ইবনে তায়মিয়াহ বলেন, কখনো একটি মাত্র নেক আমলের সঙ্গে এমন একনিষ্ঠতা যুক্ত থাকে যা তাকে বড় গুনাহের কাফফারা বানিয়ে দেয় (ইবনে তায়মিয়াহ)।
আমাদের নফস স্বভাবতই কুপ্রবৃত্তি ভালোবাসে, আর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে অবাধ্য করতে চায়। তাই সিরাতে মুস্তাক্বীমে অটল থাকতে নফসের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। তাবেঈ মুজাহিদকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন বারবার গুনাহ হয়ে গেলে করণীয় কী, তিনি বলেছিলেন, তোমার কাছে কি ইস্তিগফাররূপ মুছনী নেই (মুজাহিদ)? তাই গোপন পাপের কারণে নিরাশ না হয়ে দ্রুত ইস্তিগফার করে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের অন্তরকে প্রকাশ্য ও গোপন পাপের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র রাখেন এবং নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার তাওফীক্ব দান করেন। আমীন!
অভিমত থেকে আরো পড়ুন