https://www.prothomalony.com/

17869

opinion

অভিমত

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পর: নতুন সরকার, পুরনো অস্থিরতা — বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ ০৩:৪৩

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট — বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি তারিখ, যা এখন সরকারিভাবেই "জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস" নামে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। টানা ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা ছাত্র-নেতৃত্বাধীন এক গণআন্দোলনের মুখে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। একটি আন্দোলন, যা শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে, তারপর রূপ নেয় সম্পূর্ণ ক্ষমতা পরিবর্তনের এক জাতীয় বিস্ফোরণে। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক ভিন্ন বাস্তবতায় — একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়, কিন্তু স্থিতিশীলতা এখনও অধরা।

হাসিনার পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। যার মূল দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আনা, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, আর একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ তৈরি করা। প্রায় আঠারো মাস ধরে এই অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বিচার প্রক্রিয়া, বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন, এবং অবশেষে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে — জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন, যেখানে ভোট দিতে পেরেছেন প্রায় সাড়ে বারো কোটি যোগ্য ভোটার।

সেই নির্বাচনের ফলাফল ছিল চমকপ্রদ রকমের একতরফা। বিএনপি — যার নেতৃত্বে ছিলেন সতেরো বছরের লন্ডন নির্বাসন শেষে মাত্র দুই মাস আগে দেশে ফেরা তারেক রহমান। তিনশ আসনের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি, দুইশত নয়টি আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে, ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ঊনষাট শতাংশ। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী। ২০১৩ সালের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা আটষট্টিটি আসন পায়, যা দলটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ অর্জন। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, আর ১২ মার্চ জাতীয় সংসদ পুনরায় অধিবেশনে বসে — সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, দেড় দশকেরও বেশি সময়ের "ফ্যাসিবাদী ও পরাধীন শাসনের" পর অবশেষে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে সংসদের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তারেক রহমানের সরকার একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। যা প্রমাণ করে দিচ্ছে নির্বাচনী বিজয়ই স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা নয়। সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রে আছে "জুলাই সনদ" — অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রস্তাবিত একটি ব্যাপক সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার পরিকল্পনা, যা ফেব্রুয়ারির গণভোটে প্রায় সাতষট্টি থেকে সত্তর শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছিল। বিএনপি সরকার সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় কার্যত সেই গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়ন থেকে বিরত থেকেছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ। জামায়াতে ইসলামীর প্রধান শফিকুর রহমান গত ১৪ জুন এক সমাবেশে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকার যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণ তার "উপযুক্ত জবাব" দেবে — একাদশ-দলীয় জোটের এই হুঁশিয়ারি রাজপথে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। টরন্টো স্টারের একটি প্রতিবেদনে (১২ জুলাই) উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতা এখনো বাংলাদেশের নতুন সরকারের ওপর ছায়া ফেলে আছে। কিছু বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের সহিংসতার পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি ঘটেনি একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও, এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধের পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও এই ধরনের পরিসংখ্যান ও এর ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে। সরকারপন্থীরা এই সমালোচনাকে বিরোধী প্রচারণা হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

অন্যদিকে, নতুন গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি) — যা ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের হাতে প্রতিষ্ঠিত — নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য না পেলেও রাজনৈতিক ভাষ্যে নিজেদের একটি নতুন কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত জুলাই আন্দোলনের মূল আদর্শ ও প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও একটি স্পর্শকাতর অধ্যায় — নয়াদিল্লি যেভাবে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে এবং আওয়ামী লীগপন্থী বিভিন্ন বিবৃতি সমর্থন করেছে, তা তরুণ বাংলাদেশিদের চোখে ভারতকে একটি বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে তুলেছে। যদিও তারেক রহমান নিজে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন — এমনকি নির্বাচনের ফলাফলের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

গত ৪ জুলাই জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত "জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬"-এ যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান — একটি প্রতীকী মুহূর্ত, যা মনে করিয়ে দেয় তার সরকারের বৈধতার মূল উৎসই এই আন্দোলন। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তেই প্রশ্ন উঠছে, যে আন্দোলন একটি গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হয়েছিল, বিএনপি সরকার কতটা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে, নাকি পুরনো ক্ষমতার কাঠামোতেই ফিরে যাচ্ছে নতুন মুখ নিয়ে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ এখন এক জটিল উত্তরণ পর্বে দাঁড়িয়ে — একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসান হয়েছে। একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরও ঘটেছে। কিন্তু নির্বাচনী বৈধতা অর্জন করলেই যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, আর সড়কে নেমে আসা ক্ষোভের সমাধান হয়ে যায় না। বাংলাদেশের গত দুই বছরের ইতিহাস তারই একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে টানাপোড়েন, জামায়াতের রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষ — এই তিনটি বিষয়ই আগামী মাসগুলোতে নির্ধারণ করে দেবে, তারেক রহমানের সরকার সত্যিকার অর্থে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে, নাকি বাংলাদেশ আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতার এক নতুন চক্রে প্রবেশ করবে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন