https://www.prothomalony.com/
17819
opinion
খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ ২৩:১২
মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদীর উপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয করেছেন। তন্মধ্যে ফজরের ছালাত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এটা ঈমান ও নিফাক্বের পার্থক্য নিরূপণকারী ছালাত। কেবল প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তিরাই এই ছালাতের ব্যাপারে যত্নশীল হ’তে পারেন; মুনাফিক্বদের কাছে এটি কঠিন মনে হয়। দুঃখজনক হ’লেও সত্য যে, বহু মুসলিম এই মহামূল্যবান ইবাদতের গুরুত্ব অনুধাবন না করে ফজর ছালাতে চূড়ান্ত গাফেলতি করেন, ফলে তারা নিজেদের অজান্তেই অসংখ্য বরকত, নিরাপত্তা ও নাজাতের পথ থেকে বঞ্চিত হন। মানুষ স্বভাবতই নিরাপত্তাকামী; নিজের জীবন, পরিবার, সম্মান ও রিযিকের নিরাপত্তার জন্য আমরা প্রভাবশালী মানুষের সুপারিশ খুঁজি, ক্ষমতাধরদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকতে চাই। অথচ মুমিনের জীবনে ফজরের ছালাত হ’ল সেই ইলাহী চুক্তিনামা, যার মাধ্যমে প্রতিদিন ভোরে আল্লাহ্র সাথে নিরাপত্তার চুক্তি নবায়ন করা হয়। জুন্দুব ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত জামা‘আতে পড়ল, সে আল্লাহ্র যিম্মায় চলে এল, সুতরাং আল্লাহ যেন তার কাছে জামানতের কিছু দাবী না করেন, কারণ যার কাছেই তিনি জামানতের কিছু দাবী করবেন তাকে পাকড়াও করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৫৭)। যিনি তীব্র ঘুম আর আরামের বিছানা ত্যাগ করে কনকনে শীত বা বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভোরে আল্লাহ্র দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন, আল্লাহ তাকে তাঁর বিশেষ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে নেন। ছাহাবী হারেছ ইবনে হাসসান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বিয়ের পরদিন সকালেই ফজরের ছালাতে উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন, যে স্ত্রী তাকে ফজরের জামা‘আত থেকে বাধা দেয় সে মন্দ স্ত্রী (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ, হাদিস নং ৩২৩১০)।
ক্বিয়ামতের দিন হবে অন্ধকারাচ্ছন্ন, আর সেদিন মানুষের সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন হবে আলোর। রাতের অন্ধকার মাড়িয়ে যারা ফজরের ছালাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে যান, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলোর সুসংবাদ দিয়েছেন। বুরায়দা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, অন্ধকারে মসজিদে গমনকারীদের ক্বিয়ামতের দিন পূর্ণ নূরের সুসংবাদ দাও (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদিস নং ৫৬১; সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং ২২৩)। হাফেয ইবনু রজব হাম্বলী বলেন, ফজর ও এশার সময় মসজিদে হেঁটে যাওয়া অধিক কষ্টসাধ্য বলেই এ আমলে পূর্ণাঙ্গ নূরের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। ইমাম ইবরাহীম নাখঈ (রহ.) বলেন, সালাফগণ মনে করতেন অন্ধকার রাতে ছালাতের জন্য হেঁটে যাওয়া জান্নাত লাভের কারণ।
মানুষ বড়ই দুর্বল, সারারাত জেগে ইবাদত করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই আল্লাহ এমন সুযোগ রেখেছেন যাতে ঘুমিয়েও সারারাত ইবাদতের ছওয়াব পাওয়া যায়। ওছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে এশার ছালাত জামা‘আতে আদায় করল সে যেন অর্ধরাত দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করল, আর যে ফজরের ছালাত জামা‘আতে আদায় করল সে যেন সারারাত দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করল (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৫৬)। তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ.)-এর মুক্তদাস বারদ (রহ.) বলেন, গত চল্লিশ বছর ধরে যখনই আযান দেওয়া হয়েছে তখনই সাঈদ মসজিদে উপস্থিত ছিলেন।
ফজর ও আছর ছালাতে অগণিত ফেরেশতা মুমিনদের ইবাদতের সরাসরি সাক্ষী হন। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ফেরেশতামন্ডলী পালাবদল করে আগমন করেন, ফজর ও আছরের ছালাতে উভয় দল একত্র হন এবং প্রতিপালকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা তাদের ছালাতরত অবস্থায় রেখে এসেছি (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫৫৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৩২)। সূরা বানী ইসরাঈলের ৭৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ফজরের ছালাত সাক্ষ্যপ্রাপ্ত হয়। শায়খ আব্দুর রহমান আস-সা‘দী বলেন, এতে দীর্ঘ কুরআন তেলাওয়াতের কারণে রাতের ও দিনের ফেরেশতা উভয়েই উপস্থিত থাকেন।
হজ্জ-ওমরাহ্র নেকী পাওয়ার সুযোগও ফজর কেন্দ্রিক আমলে নিহিত। উমামা বাহেলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, পবিত্র হয়ে ফরয ছালাতের জন্য মসজিদে গমনকারীর প্রতিদান ইহরাম পরিহিত হাজ্জীর ন্যায়, আর চাশতের ছালাতের জন্য গমনকারীর প্রতিদান ওমরাহ পালনকারীর ন্যায় (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদিস নং ৫৫৮)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন, যে জামা‘আতে ফজর আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে যিকিরে মশগূল থেকে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করে, তার জন্য একটি পূর্ণ হজ্জ ও ওমরাহ্র নেকী রয়েছে (সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং ৫৮৬)। জাবের ইবনু সামুরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফজরের পর সূর্য ভালোভাবে উদিত না হওয়া পর্যন্ত মুছাল্লায় বসে থাকতেন (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৭০)।
জান্নাত লাভের নিশ্চয়তাও ফজরের মাঝে নিহিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে দুই ঠান্ডার সময়ের ছালাত অর্থাৎ ফজর ও আছর আদায় করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫৭৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৩৫)। জান্নাতের সর্বশ্রেষ্ঠ নে‘মত আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখা, আর এর অন্যতম শর্ত ফজর ও আছর অাঁকড়ে ধরা। জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্ণিমার চাঁদের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, তোমরা শীঘ্রই তোমাদের রবকে এভাবেই দেখতে পাবে, অতএব সূর্যোদয়ের আগের ও সূর্যাস্তের পরের ছালাত আদায়ে পরাজিত হয়ো না (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫৫৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৩৩)।
ফজরের দুই রাক‘আত সুন্নাত ছালাতের মর্যাদাও অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ফজরের দুই রাক‘আত (সুন্নাত) ছালাত দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছুর চেয়ে উত্তম, এবং এটি আমার কাছে সমগ্র দুনিয়ার সম্পদের চেয়েও প্রিয় (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৭২৫)। মা আয়েশা ছিদ্দীক্বা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নফল ইবাদতের মধ্যে ফজরের দুই রাক‘আতের মতো আর কিছুর প্রতি এত গুরুত্ব দিতেন না (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১১৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৭২৪)।
জাহান্নামের আগুন থেকে নিরাপত্তা লাভের নিশ্চয়তাও ফজর ও আছরের সাথে জড়িত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে ছালাত আদায় করবে সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৩৪)। আল্লামা শামসুল হক আযীমাবাদী বলেন, ফজর ঘুমের সময় আর আছর ব্যস্ততার সময় হওয়ায় এ দুই ছালাত সংরক্ষণকারীর অন্যান্য ছালাতের প্রতিও যত্নশীলতা প্রতীয়মান হয়। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সুলায়মান ইবনে আবী হাছমাহকে ফজরে না দেখে বলেছিলেন, ফজরের ছালাত জামা‘আতে আদায় করা আমার কাছে সারারাত নফল ইবাদতের চেয়ে অধিক প্রিয় (মুয়াত্তা মালিক, হাদিস নং ৩০১; বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, হাদিস নং ৪৬৫৫)।
আজকাল আমাদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ‘বরকত’-এর অভাব; এর মূল কারণ দিনের সবচেয়ে বরকতময় সময় ঘুমিয়ে নষ্ট করা। ছাখর আল-গামেদী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দো‘আ করতেন, হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতকে ভোরের বরকত দান করুন, এবং তিনি বাহিনী প্রেরণ করলে ভোরেই পাঠাতেন। বর্ণনাকারী ছাখর নিজে ভোরে পণ্য পাঠিয়ে সম্পদশালী হয়েছিলেন (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদিস নং ২৬০৬; সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং ১২১২)। আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর ছেলেকে ফজরের পর ঘুমাতে দেখে বলেছিলেন, তুমি কি এমন সময় ঘুমাচ্ছ যখন রিযিক বণ্টন করা হয়? যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সন্তানদের ফজরের পর ঘুমাতে নিষেধ করতেন, এবং উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর (রহ.) বলতেন, কেউ সকালে ঘুমায় শুনলে তার প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেন, ফজরের পরের ঘুম রিযিককে বাধাগ্রস্ত করে, কারণ এটি রিযিক বণ্টনের সময়।
জীবনের যে সময়টুকু অবহেলায় পার হয়ে গেছে তার জন্য আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চাই, এবং আজ থেকেই ফজর ছালাতকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করি, যাতে প্রতিদিনের ভোরের স্নিগ্ধতায় আমরা আল্লাহ্র রহমত, নিরাপত্তা ও জান্নাতের সুসংবাদ নিয়ে দিনের সূচনা করতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত, বিশেষ করে ফজরের ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করার তাওফীক দান করুন-আমীন!
আজান ইকামাতের গুরুত্ব ও ফজীলত
মাওলানা ওসামা বিন আমীন
প্রিন্সিপাল, আন-নজম একাডেমী, কক্সবাজার।
আযান ইসলামের অন্যতম নিদর্শন এবং মহান আল্লাহ্র একত্ব ও বড়ত্বের সুমধুর ঘোষণা। প্রতিদিন পাঁচবার মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা এই সুললিত ধ্বনি মুমিনের হৃদয়ে ঈমানের জোয়ার বয়ে আনে এবং মানুষকে শাশ্বত কল্যাণ ও চিরন্তন সফলতার দিকে নিরন্তর আহবান জানায়। আযান ও ইক্বামত মহান আল্লাহ্র কাছে অত্যন্ত প্রিয়, আর যে ব্যক্তি আযানের জবাব দেয় সেও আল্লাহ্র প্রিয়ভাজন। মুয়াযযিনের কণ্ঠস্বর যতদূর পৌঁছায়, ক্বিয়ামতের দিন জিন-ইনসানসহ সব সৃষ্টি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। ‘আযান’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ঘোষণা করা, অবহিত করা বা ছালাতের আহবান জানানো, আর পারিভাষিক অর্থে শরী‘আত নির্ধারিত আরবী বাক্যসমূহের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে উচ্চকণ্ঠে ছালাতের আহবান করাকে আযান বলা হয় (ফিক্বহুস সুন্নাহ; আল-মাওসূ‘আহ আল-ফিক্বহিয়্যাহ)। শায়খ মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রহ.) বলেন, আযান হচ্ছে ছালাতের সময় শুরু হওয়ার পর তা জানানোর জন্য নির্দিষ্ট যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহ্র ইবাদত করা (আশ-শারহুল মুমতি‘)।
হিজরতের পর মসজিদে নববী নির্মাণের মাধ্যমে প্রথম হিজরীতে আযানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, মুসলিমরা মদীনায় আগমনের পর ছালাতের সময় অনুমান করে সমবেত হ’তেন, কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না। এ নিয়ে একদিন বৈঠকে কেউ নাছারাদের ন্যায় ঘণ্টা বাজানোর, কেউ ইহুদীদের মতো শিঙা ফুঁকানোর প্রস্তাব দিলেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক স্থগিত হয় (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬০৪)। পরদিন আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ বিন আব্দে রাব্বিহী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) স্বপ্নে দেখা আযানের বাক্যগুলো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে শোনান, তিনি তা সত্যায়ন করে উচ্চকণ্ঠের অধিকারী বেলাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে আযান দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই ধ্বনি শুনে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) দৌড়ে এসে জানান, তিনিও একই স্বপ্ন দেখেছেন; তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ্র জন্যই সকল প্রশংসা (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদিস নং ৪৯৯)। অন্য বর্ণনামতে, সেই রাতে মোট এগারো জন ছাহাবী এই স্বপ্ন দেখেছিলেন (মুসনাদে আহমাদ)।
অন্য কোন উম্মতের ওপর আযানের বিধান ছিল কি-না জানা যায় না; বরং এই উম্মতকে ছালাত ফরয করার সাথে সাথে আযানের বিধান দেওয়া হয়েছে। আযান শুরুর পর মদীনার অবিশ্বাসী ও মুনাফিকদের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, যখন তোমরা ছালাতের জন্য আহবান কর, তখন তারা একে উপহাস ও খেলাচ্ছলে গ্রহণ করে, কারণ তারা নির্বোধ সম্প্রদায় (সূরা মায়েদা ৫:৫৮)। বিদ্বানগণ বলেন, হিজরতের আগে মক্কায় আযান ছিল না, বরং ‘আছ-ছালাতু জামে‘আহ’ বলে আহবান করা হ’ত; হিজরতের পর ক্বিবলা পরিবর্তনের পর আযানের বিধান চালু হয়। আযান মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ থেকে মুক্ত করে শাশ্বত সাফল্যের দিকে ডাকে। আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ! জুমু‘আর দিন ছালাতের জন্য আযান দেওয়া হ’লে তোমরা আল্লাহ্র স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দাও, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা অনুধাবন কর (সূরা জুমু‘আ ৬২:৯)। কবি কায়কোবাদ তাঁর ‘আযান’ কবিতায় এই সুরের গভীর আবেদন তুলে ধরেছেন, যেখানে আযানের ধ্বনি শুনে হৃদয় আকুল হওয়ার অনুভূতি বর্ণিত হয়েছে।
আযান পৃথিবীর সর্বোত্তম কথাগুলোর অন্যতম, কারণ এতে আল্লাহ্র বড়ত্ব, তাওহীদ ও রিসালাতের ঘোষণা এবং ছালাতের দিকে আহবান নিহিত। আল্লাহ বলেন, ঐ ব্যক্তির চাইতে উত্তম কথা আর কার, যে আল্লাহ্র দিকে ডাকে, সৎকর্ম করে এবং বলে আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত (সূরা হা-মীম সাজদাহ ৪১:৩৩)। উল্লেখ্য, ছালাতের আহবানের জন্য শুধু আযানই যথেষ্ট; আযানের আগে অতিরিক্ত দো‘আ, জাগরণী গান বা ‘আছ-ছালাতু খায়রুম মিনান্নাউম’ জাতীয় কথা বলা সুন্নাহ পরিপন্থী, এবং রামাযানে সাহারীর সময় সাইরেন বা ঢাক-ঢোল বাজানো জাহেলী রীতি।
আযানের শব্দ শুনলে শয়তান পালিয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যখন ছালাতের জন্য আযান দেওয়া হয় তখন শয়তান হাওয়া ছেড়ে পলায়ন করে যাতে আযান না শোনে, আযান শেষ হ’লে ফিরে আসে, আবার ইক্বামতের সময় দূরে সরে যায় (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬০৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৯)। অন্যত্র তিনি বলেন, শয়তান আযানের ধ্বনি শুনলে ‘রাওহা’ নামক স্থান পর্যন্ত পালিয়ে যায়, যা মদীনা থেকে ছত্রিশ মাইল দূরে (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৯)। প্রতিদিন আযানের সময় আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং দো‘আ কবুল হয়। আনাস বিন মালেক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আযানের সময় আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং দো‘আ কবুল হয় (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদিস নং ২৫৪০)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন, নির্জন স্থানে ছালাতের সময় হ’লে ওযূ বা তায়াম্মুম করে ইক্বামত দিলে দুই ফেরেশতা সাথে ছালাত আদায় করে, আর আযান-ইক্বামত উভয়টি দিলে তার পিছনে আল্লাহ্র বিশাল বাহিনী ছালাত আদায় করে, যাদের সীমা দেখা যায় না (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬০৯)।
আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ অনুযায়ী উচ্চকণ্ঠে আযান দেওয়া উচিত, কেননা মুয়াযযিনের আওয়াজ যতদূর পৌঁছায় জিন, মানুষ ও অন্য যা কিছু তা শুনবে, তারা সবাই ক্বিয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬০৯)। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, মুয়াযযিনের আওয়াজ গাছপালা, জনপদ, পাহাড়, জিন ও মানুষ যা-ই শুনুক না কেন, সবাই তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে (সুনানে ইবনু মাজাহ)। আযানের সঠিক জবাব দিলে জান্নাত লাভ হয়। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, মুয়াযযিনের প্রতিটি বাক্যের যথাযথ জবাব দিয়ে অন্তর থেকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বললে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৫)।
সালাফগণ আযান দেওয়ার প্রতি গভীর আগ্রহ পোষণ করতেন। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলতেন, যদি খলীফার দায়িত্বের পাশাপাশি আযান দিতে পারতাম তবে অবশ্যই তা করতাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে নিয়মিত আযান দেননি; বরং বলেছেন, ইমাম দায়িত্বশীল আর মুয়াযযিন আমানতদার (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদিস নং ৫১৭; সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং ২০৭)। এজন্য বড় বড় ছাহাবীদের বাদ দিয়ে, এমনকি স্বপ্নদর্শনকারী আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কেও বাদ দিয়ে উচ্চকণ্ঠের অধিকারী বেলাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে আযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিজে আযান দেওয়ার ব্যাপারে কোন ছহীহ বর্ণনা পাওয়া যায় না; সফরে আযান দেওয়া সংক্রান্ত হাদীছটি যঈফ।
‘ইক্বামত’ অর্থ দাঁড় করানো, অর্থাৎ উপস্থিত মুছল্লীদের ছালাতে দাঁড়িয়ে যাওয়ার জন্য জানানো। জামা‘আতে হোক বা একাকী, ফরয ছালাতে আযান-ইক্বামত উভয়ই সুন্নাত। আযানের মাধ্যমে দূরবর্তী মুছল্লীদের আহবান করা হয়, আর ইক্বামত দেওয়া হয় জামা‘আত শুরুর প্রাক্কালে কাতারবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা হিসেবে। ইক্বামতের সময়ও আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জান্নাতের দরজা খোলা হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং জান্নাতের হুরগণ মুছল্লীদের জন্য দো‘আ করেন। জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, মানুষ যখন ছালাতের জন্য অথবা জিহাদের জন্য কাতারবদ্ধ হয়, তখন আসমান ও জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, আর হুরগণ সাজসজ্জিত হয়ে অগ্রসর হওয়া ব্যক্তির জন্য সাহায্যের এবং পশ্চাদপসরণকারীর জন্য ক্ষমার দো‘আ করেন (মুসনাদে আহমাদ)। ইক্বামতের সময়ও আসমানের দরজা খোলা হয় এবং দো‘আ কবুল করা হয় বলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানিয়েছেন (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদিস নং ২৫৪০)।
আযান-ইক্বামত এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, মহিলারাও নিজেদের মাঝে নিম্নস্বরে আযান-ইক্বামত দিতে পারেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) আযান-ইক্বামত দিয়ে মহিলাদের জামা‘আতে ইমামতি করেছেন। ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে মহিলাদের আযান দেওয়া প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন, আমি কি আল্লাহ্র যিকির করতে নিষেধ করব? আর হাফছাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ছালাতের সময় ইক্বামত দিতেন।
আযান ইসলামের অন্যতম ইবাদত ও অনন্য নিদর্শন, যাতে তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদানের পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ ইবাদত ছালাত ও চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে আহবান করা হয়েছে। আযান শোনামাত্রই দুনিয়াবী সকল ব্যস্ততা ত্যাগ করে রবের স্মরণে ছুটে যাওয়ার মাঝেই নিহিত মুমিনের প্রকৃত কল্যাণ। তাই আমাদের কর্তব্য হ’ল আযানের আদব রক্ষা করা, এর যথাযথ জবাব দেওয়া এবং আযানের আহবানে সাড়া দিয়ে জীবন পরিচালনা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে আযানের মর্যাদা অনুধাবন করার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!
অভিমত থেকে আরো পড়ুন