https://www.prothomalony.com/

17770

opinion

অভিমত

কোলেস্টেরল: নীরব ঘাতক, নাকি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সংকট?

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ ০২:১৩

আমরা নিয়মিত গাড়ির ইঞ্জিন পরীক্ষা করি, বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ ঠিক আছে কি না তা দেখি, এমনকি মোবাইল ফোনের ব্যাটারির অবস্থাও খেয়াল রাখি। অথচ যে হৃদ্‌যন্ত্রটি আমাদের জন্ম থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তার যত্ন নেওয়ার কথা অনেক সময়ই ভুলে যাই। আর এই অবহেলার অন্যতম কারণ হলো উচ্চ কোলেস্টেরল। এটি এমন একটি নীরব সমস্যা, যা বছরের পর বছর শরীরের ভেতরে ক্ষতি করলেও শুরুতে কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না।

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ, বিশেষ করে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিস উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এসব রোগের অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণহীন কোলেস্টেরল। তাই এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সংকট।

কোলেস্টেরল হলো শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় এক ধরনের চর্বিজাতীয় উপাদান। এটি কোষের গঠন, বিভিন্ন হরমোন উৎপাদন এবং ভিটামিন ডি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ কোলেস্টেরল নিজে কোনো শত্রু নয়। সমস্যা সৃষ্টি হয় যখন এর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

সাধারণভাবে কোলেস্টেরলকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। এলডিএল বা লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিনকে বলা হয় "খারাপ কোলেস্টেরল"। কারণ এটি রক্তনালির দেয়ালে জমে ধমনিকে ধীরে ধীরে সরু করে দেয়। অন্যদিকে এইচডিএল বা হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিনকে বলা হয় "ভালো কোলেস্টেরল", যা অতিরিক্ত কোলেস্টেরল অপসারণে সহায়তা করে। এছাড়া ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে গেলেও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

উচ্চ কোলেস্টেরলকে নীরব ঘাতক বলা হয় কারণ এটি দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরের ভেতরে ক্ষতি করে। বিষয়টি অনেকটা এমন যে একটি পানির পাইপের ভেতরে ধীরে ধীরে ময়লা জমছে। প্রথমদিকে কিছুই বোঝা যায় না। কিন্তু একসময় পাইপ এতটাই সরু হয়ে যায় যে পানির প্রবাহ ব্যাহত হয়।

রক্তনালির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। বছরের পর বছর খারাপ কোলেস্টেরল জমে ধমনির ভেতরে প্লাক তৈরি করে। একসময় রক্ত চলাচল কমে যায় অথবা হঠাৎ রক্তনালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তখনই ঘটে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক মানুষের ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষণই হয় জীবনহানিকর এমন একটি ঘটনা।

দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বাংলাদেশিদের মধ্যে তুলনামূলক কম বয়সেই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

প্রথমত, জিনগত বৈশিষ্ট্য। অনেকের শরীরে বাইরে থেকে ওজন স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে, বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমে থাকে। এই লুকানো চর্বি বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

দ্বিতীয়ত, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত তেল, ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত চিনি এখন আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

তৃতীয়ত, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া। নগরায়ণ, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে হাঁটা ও নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

চতুর্থত, দেশে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার হার দ্রুত বাড়ছে। এই তিনটি সমস্যা যখন উচ্চ কোলেস্টেরলের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

কোলেস্টেরল নিয়ে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, অনেকেই মনে করেন রোগা মানুষের কোলেস্টেরল হওয়ার কথা নয়। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক স্বাভাবিক ওজনের মানুষেরও কোলেস্টেরল অনেক বেশি থাকতে পারে। আবার অনেক স্থূল ব্যক্তির কোলেস্টেরল তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকতে পারে। তাই আয়নায় নিজেকে দেখে নয়, রক্ত পরীক্ষা করেই প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব।

২০ বছর বয়সের পর প্রত্যেকের অন্তত একবার লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করা উচিত। আর পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকলে, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে, ধূমপানের অভ্যাস থাকলে কিংবা অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।

উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, ডাল, ওটস, বাদাম ও মাছ খাদ্যতালিকায় রাখুন। লাল মাংস, অতিরিক্ত তেল, ভাজাপোড়া, ট্রান্স ফ্যাট, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং চিনিযুক্ত পানীয় যতটা সম্ভব সীমিত করুন।

সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা সমমানের ব্যায়াম করুন। ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করুন। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। অনেকের ক্ষেত্রে শুধু এই জীবনযাত্রার পরিবর্তনেই কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে যাদের ঝুঁকি বেশি, তাদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে স্ট্যাটিনজাতীয় ওষুধ বহু মানুষের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক প্রতিরোধে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ করতে হলে শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমাজব্যাপী সচেতনতা। স্কুলে স্বাস্থ্যশিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খাবারে ট্রান্স ফ্যাট কমানো, হাঁটার উপযোগী নগর পরিকল্পনা, ধূমপান নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কারণ প্রতিরোধে বিনিয়োগ সবসময় চিকিৎসার চেয়ে বেশি সাশ্রয়ী এবং কার্যকর।

মনে রাখতে হবে, কোলেস্টেরল কোনো শত্রু নয়। নিয়ন্ত্রণহীন কোলেস্টেরলই প্রকৃত বিপদ। আজকের একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা, একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং প্রতিদিনের কিছুটা হাঁটা হয়তো আগামী দিনের একটি হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক প্রতিরোধ করতে পারে।

হৃদ্‌রোগের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয় হাসপাতালে নয়। এটি শুরু হয় আমাদের ডাইনিং টেবিল, রান্নাঘর, হাঁটার পথ এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্ত থেকে। সুস্থ হৃদয় মানে শুধু দীর্ঘ জীবন নয়, সুস্থ পরিবার, কর্মক্ষম সমাজ এবং একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ।

লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন