https://www.prothomalony.com/
17820
north-america
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ ২৩:২১
শনিবার দুপুর, আইডাহোর টুইন ফলস শহর। এইমাত্র খোলা এক ইন-এন-আউট বার্গার আউটলেটের সামনে তখন স্বাভাবিক দুপুরের ভিড়। বার্গার আর মিল্কশেকের জন্য অপেক্ষারত গাড়ির সারি, ড্রাইভ-থ্রুতে বসে থাকা পরিবার, আর ভেতরে-বাইরে কর্মীদের ছুটোছুটি। বেলা দুইটা ঊনত্রিশ মিনিটে সেই স্বাভাবিকতা চুরমার হয়ে যায় একঝাঁক গুলির শব্দে। টুইন ফলস পুলিশের কন্ট্রোল রুমে তখন একের পর এক ৯১১ কল আসছিল, আর ফোনের ওপাশে অপারেটররা শুনতে পাচ্ছিলেন চিৎকার আর গুলির শব্দ মিলেমিশে একাকার।
পুলিশ প্রধান ম্যাথিউ হিক্স রোববারের সংবাদ সম্মেলনে যা বর্ণনা করেছেন, তা তার নিজের কথাতেই — কর্মজীবনে দেখা সবচেয়ে বিশৃঙ্খল দৃশ্যগুলোর একটি। বন্দুকধারী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন চব্বিশ বছর বয়সী চ্যাড উইলিয়ামস, যিনি একটি এআর-ধাঁচের রাইফেল নিয়ে রেস্তোরাঁর ভেতরে-বাইরে এলোমেলোভাবে গুলি চালান, তারপর পার্কিং লটে ছড়িয়ে পড়েন। কাছাকাছি একটি গাড়ি থেকে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, উইলিয়ামস একটি নীল রঙের টেসলার দিকে অস্ত্র তাক করে দুই দফা গুলি চালাচ্ছেন, তারপর অস্ত্র নামিয়ে হেঁটে সরে যাচ্ছেন, রাইফেলটি তখনও তার হাতে। ঘটনাস্থলেই নিজের বন্দুক দিয়ে নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন তিনি।
হামলার চূড়ান্ত হিসাব — তিনজন নিহত, সাতজন আহত, যাদের মধ্যে দুজন এখনও সংকটাপন্ন অবস্থায়। তিনজন স্থিতিশীল, আর দুজনকে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন ইন-এন-আউটেরই কর্মী। প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট লিন্সি স্নাইডার এক বিবৃতিতে লেখেন, তারা তাদের এক প্রিয় সহকর্মীকে হারিয়েছেন, যিনি সেই মুহূর্তে গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছিলেন, আর তার জীবন কেড়ে নিয়েছে এমন একজন, যার কাছে অন্যের কিংবা নিজের জীবনের কোনো মূল্যই নেই। পুলিশ এখনও নিহতদের নাম প্রকাশ করেনি, পরিবারগুলোকে যথাযথভাবে জানানোর প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই উঠে এসেছে এক ভিন্ন ধরনের গল্প — সাহসিকতার গল্প, যা হয়তো আরও বড় বিপর্যয় ঠেকিয়ে দিয়েছিল। একজন অফ-ডিউটি স্টেট ট্রুপার আর একজন সশস্ত্র সাধারণ নাগরিক, দুজনেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বন্দুকধারীর দিকে পাল্টা গুলি চালান। পুলিশ প্রধান হিক্সের ভাষায়, তাদের এই পদক্ষেপই বন্দুকধারীকে ঘটনাস্থল থেকে সরে যেতে বাধ্য করে, যা আরও প্রাণহানি ঠেকিয়ে দিয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করেন। ঘটনাস্থলের এক ছবিতে দেখা যায়, সেই ব্যক্তি হ্যান্ডগান হাতে উইলিয়ামসের সঙ্গে গুলি বিনিময় করছেন রেস্তোরাঁর ঠিক বাইরে।
তবে এই সাহসিকতার গল্পের পাশেই আছে সাধারণ মানুষের নিদারুণ ভোগান্তির আরেকটি অধ্যায়। টুইন ফলসের ট্যাক্সিচালক টেরি ডাডলি, স্ত্রীহারা এক ব্যক্তি এবং চার সন্তানের জনক, তার নিজের টেসলা গাড়ির দিকে দৌড়ে যাওয়ার সময় পিঠে দুটি গুলি খান। তার সহকর্মীরা এখন একটি গোফান্ডমি তহবিল চালু করেছেন তার চিকিৎসার খরচ মেটাতে। যেখানে তাকে বর্ণনা করা হয়েছে এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি নিঃশব্দে অন্যদের নিজের আগে রাখেন, পরিশ্রমী, গভীরভাবে ভালোবাসেন, আর কঠিন দিনেও আশপাশের মানুষদের হাসাতে জানেন।
তদন্তের এই পর্যায়ে বন্দুকধারীর হামলার উদ্দেশ্য এখনও অজানা। পুলিশ প্রধান হিক্স নিশ্চিত করেছেন, উইলিয়ামস একাই এই হামলা চালিয়েছেন, এবং তার পরিবার তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। "তাদের হৃদয়ও এই মুহূর্তে ভেঙে পড়েছে," উইলিয়ামসের পরিবার সম্পর্কে বলেন তিনি — একটি মন্তব্য, যা মনে করিয়ে দেয়, এই ধরনের ট্র্যাজেডির ক্ষতচিহ্ন কেবল ভুক্তভোগীদের পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে আরও গভীরে। এমনকি অপরাধীর নিজের পরিবারের কাছেও। এফবিআইয়ের সল্টলেক সিটি শাখার বিশেষ এজেন্ট রবার্ট বোলস জানিয়েছেন, তদন্তে তারা তাদের সম্পূর্ণ সক্ষমতা নিয়োগ করেছেন। এছাড়া পুলিশ প্রতিক্রিয়া চলাকালীন কাছেই আরেকটি পুলিশ-জড়িত গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে, যাতে কেউ আহত হননি — সেই ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পার্শ্ববর্তী জেরোম পুলিশ বিভাগকে।
স্থানীয় বাসিন্দা হেইলি ডোডারো, যিনি মায়ের সঙ্গে সেদিন দুপুরে খাবার খেতে গিয়েছিলেন, বর্ণনা করেছেন সেই মুহূর্তের আতঙ্ক । ড্রাইভ-থ্রু লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ দেখেন মানুষজন রাস্তা পার হয়ে দৌড়াচ্ছে, কর্মীরা রেস্তোরাঁ থেকে ছুটে বেরিয়ে আসছে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো আগুন লেগেছে, কিন্তু পরে একজন ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি জানান, ভেতরে বন্দুকধারী আছে। "তখনই বুঝলাম এটা গুলিবর্ষণ। মানুষ কাঁদতে কাঁদতে, চিৎকার করতে করতে দৌড়াচ্ছিল। ভীষণ ভয়ংকর ছিল," তিনি জানান।
পুলিশ জনসাধারণকে অনুরোধ করেছে যাচাই না করা তথ্য না ছড়াতে, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে ভুলভাবে অন্য একজনকে বন্দুকধারী হিসেবে শনাক্ত করার একটি পোস্ট ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ার পর। কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, সেই দাবি ভিত্তিহীন।
এই ঘটনা আমেরিকার ভেতরে এক পরিচিত অথচ প্রতিবারই নতুন করে হৃদয় বিদীর্ণ করা প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে আসে। একটি সদ্য খোলা, আনন্দের প্রতীক হয়ে ওঠা একটি বার্গার দোকান, যেখানে পরিবারগুলো ছুটির দুপুর কাটাতে যায়, কীভাবে চোখের পলকে পরিণত হয় গুলিবর্ষণের রণক্ষেত্রে। যতক্ষণ না তদন্তকারীরা উইলিয়ামসের ভেতরের সেই অন্ধকার প্রণোদনার উৎস খুঁজে বের করতে পারছেন, ততক্ষণ আমেরিকার মানুষদের একটাই প্রশ্ন অবশিষ্ট থেকে যাচ্ছে — কেন, এবং পরের বার কোথায়।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন