https://www.prothomalony.com/
17670
opinion
যারা মানুষের আচরণের সংস্কৃতি বিষয়ে কৌতূহলী এবং মনোযোগী, তারা নিশ্চয় লক্ষ্য করে থাকবেন—স্বাভাবিক কথামালায় আমাদের স্বর অনেকটা উঁচু হয়ে গেছে। সমাজে বিভেদ, বিভক্তি যত বেড়ে যায়, প্রতিহিংসাও সমতালে বৃদ্ধি পায়। মানুষের স্বাভাবিক স্বর অস্বাভাবিকভাবে উঁচুতে উঠতে থাকে। আক্রমণাত্মক হয়ে যায় কণ্ঠস্বর। বাঙালি স্বভাবজাতভাবে কিছুটা উচ্চস্বরে যোগাযোগে অভ্যস্ত। সমসাময়িক কালে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে মার্জিত, চিন্তা-উদ্রেককারী বক্তব্য খুব কম শোনা যায়। সকলেই ভাবেন, স্বর যত উচ্চ হবে, শ্রোতাদের কাছে বক্তব্য তত গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে খুব বেশি চিন্তা না করলেও চলে, বক্তব্যের শালীনতাও চিন্তার বিষয় নয়। অশালীন শব্দের অধিকতর ব্যবহার বক্তব্যকে ক্ষমতায়িত করে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের পেছনে যুক্তির কোনো অভাব নেই। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত বিপ্লবীদের কথাও শোনা যায়। অনেকেই প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বা সূত্র ছাড়াই বলে থাকেন, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা অশ্লীল শব্দাবলীর চর্চা নিয়মিত করতেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাই আমরা মহাজ্ঞানী চে কিংবা কাস্ত্রোর মতো গড়ে তুলছি। তাই মনে হয়, সংস্কৃতি বিনির্মাণের পথের পথিকদের আমাদের "চরৈবেতি" বলা মহৎ কর্ম। রাজনৈতিক সংস্কৃতির উর্বর ক্ষেত্রে আমরা মহানন্দে, মুক্তভাবে অশ্লীলতার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি বাক্স্বাধীনতার নামে।
ষাটের দশকে জন্ম। লেখাপড়ার দৌড় খুব সীমিত। চে গুয়েভারার অশ্লীল শব্দচর্চার দর্শনের কথা জানা নেই। তবে মানুষ হিসেবে এতটুকু বুঝি, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যতই অশ্লীলতা প্রবেশ করবে, সামাজিক সংস্কৃতি ততই অগ্রহণযোগ্য এবং পশ্চাৎপদ হতে থাকবে দ্রুত। যেহেতু ষাটের দশকে জন্ম, আন্দোলন, অভ্যুত্থান, যুদ্ধ দেখেই বড় হয়েছি। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন কীভাবে সংগঠিত হয়েছে, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের শিক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে গেছে। বড় বড় জাতীয় নেতাকে সামনে থেকে দেখার এবং বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। রসসিক্ত, ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। এসব মহান নেতার মেঠো বক্তৃতাতেও কখনো সূক্ষ্ম কিংবা স্থূল অশ্লীলতার ইঙ্গিত পাইনি। মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, মনি সিংহের বক্তব্যে সৌজন্য ও শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘিত হতে দেখিনি। ভিন্ন আদর্শের নেতাদের মতাদর্শের বিরোধিতা করতে দেখেছি, কিন্তু এ কারণে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কোনো বক্তব্য শুনতে পাইনি। সাম্প্রতিক কালের রাজনীতির মাঠের মেঠো বক্তৃতা, দেয়াললিখন ও স্লোগানে যখন উচ্চারণ-অযোগ্য খিস্তি-খেউড়ের দৌরাত্ম্য দেখি, তখন মনে হয় সময়ের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছি বোধ হয় আমরা বহু মানুষ। আশার কথা, এখনও অগণন রাজনৈতিক নেতা ও নাগরিক সমাজের সদস্য বিশ্বাস করেন, এসব খিস্তি-খেউড় বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির অংশ নয়। মানুষের মুখের ভাষাই মূলত রাজনীতি এবং সমাজের ভাষা। নির্লিপ্তভাবে উচ্চারিত এসব অশ্লীল শব্দাবলি ক্ষণিকের জন্য চমক সৃষ্টির উপাদান মাত্র; এসব বক্তব্য দীর্ঘমেয়াদি আবেদন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হবে।
ভাষা, শ্রেণি ও সমাজের একটি সভ্য কাঠামো রয়েছে। এই কাঠামো ভেঙে যাওয়ার জন্য দুঃখবোধ, ভাঙন রোধের জন্য সামাজিক অভিভাবকদের নির্লিপ্ততা, উদাসীন আচরণ মোটেই কাম্য নয়। ভয়ের দিক হলো, সমাজের বাতিঘর হিসেবে যাদের আমরা চিহ্নিত করে রেখেছিলাম, তারা কেউ এর প্রতিবাদ করছেন না। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ বলার চেষ্টা করছেন, এটি ভাষার রূপান্তর বা বদলে যাওয়া। এটি নতুন প্রজন্মের নতুন অভিব্যক্তি। যদিও তারা গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না। বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসে এরকম অস্বাভাবিক বাঁকবদলের নজির কখনো দেখা যায়নি।
অশ্লীলতার বৈধকরণ যারা করছেন, তারা অনেকেই সমাজের জ্ঞানী মানুষ হিসেবে পরিচিত। তারা সমাজের নৈতিকতার দেয়াল ভাঙার জন্য উৎসাহ প্রদান করছেন। নেতৃত্বের আসন থেকে 'অশ্লীলতা বৈধ'—এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা পরবর্তী প্রজন্ম এবং সমাজকে নিশ্চিতভাবেই আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। গবেষণা না করেই এ কথা বলা যায়।
আশ্চর্যের বিষয়, অশ্লীল শব্দ এবং বাক্যগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে সরাসরি নারীদের উদ্দেশ্যে। আমাদের দেশের নৈতিকতায় মাতৃজাতির প্রতি অভাবনীয় শ্রদ্ধার জায়গা নির্দিষ্ট করা ছিল এবং এ বিষয়ে সমাজের সকলেই একই সুরে কথা বলতেন। সংবেদনশীল কোনো মানুষ যখন উন্মুক্ত আকাশের নিচে অশ্রাব্য শব্দে মাতৃজাতির প্রতি অপমানসূচক স্লোগান তোলেন, তখন আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতির মানের অবস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে পারা যায় না। অসভ্যতাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দেওয়া কিংবা নীরবতার সংস্কৃতি পালন করাকে দায়িত্বশীল, দেশপ্রেমিক নাগরিকের লক্ষণ হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। দায় না থাকলে সামাজিক, রাষ্ট্রনৈতিক অভিভাবকত্বের যোগ্যতা অর্জন করা যায় না। নির্লিপ্ততা, এড়িয়ে যাওয়া, উদাসীনতার দায় কিংবা জবাবদিহিতা সামাজিক অভিভাবকদের একসময় বহন করতে হবে—এ কথা মনে রাখা উচিত।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির দ্রুত অধঃপতনের এই সময়ে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা নিয়ত শুনে থাকি। তবে যারা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতির জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলেন, তারা নিশ্চয় জানেন যে আক্রমণাত্মক যোগাযোগ সমাজে প্রতিহিংসা বাড়িয়ে দেয় এবং রাজনীতিতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। এরকম অস্থির এক সময়ে নানা ভাবে বিভক্ত সমাজে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি চর্চার কথা অনেক ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক বয়ান বলে মনে হয়।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক চর্চার প্রয়োজন। সব কিছুর পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিশুদ্ধকরণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের সদস্য, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে আমাদের সামনে হাজির হয়েছিলেন। সাধারণ নাগরিকদের কর্ণকুহরে বহু মধুর শব্দ এবং বাক্য এখনও অনুরণন করে বেড়াচ্ছে। নির্বাচনের পর সব পথ, সব মত বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি হবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে সবচেয়ে সাহসী উচ্চারণ আমরা শুনেছি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কণ্ঠে।
গণতন্ত্রের মৌলবাণী হচ্ছে শত ফুল বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা। নির্বাচনী জনসভায় আমরা ডানপন্থী দলগুলোর কাছ থেকেও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে, ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বাম প্রগতিশীল দলগুলোর নবগঠিত জোট 'গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট'-এর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান বলেছিলেন, একটি আধুনিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে আস্তিক-নাস্তিক, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী—সকল শ্রেণির মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। (৫ জানুয়ারি ২০২৬, দৈনিক বাংলা) যারা রাজনীতিতে সক্রিয় নন, উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তারা অনেকেই এরকম সাহসী উচ্চারণ শুনে নড়ে-চড়ে ওঠেন।
সাতচল্লিশের পর থেকে আমরা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অঙ্গীকারের কথা শুনে আসছি। পাকিস্তানের তেইশ বছর, স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চান্ন বছর অতিক্রম করার সময়ও আমরা একই অঙ্গীকারের কথা শুনছি। প্রশ্ন হলো, আমরা কি অনেক দূর অতিক্রম করেও যাত্রা শুরুর বিন্দুতেই অবস্থান করছি? মনে রাখতে হবে, ভৌত কাঠামোর উন্নয়নের চেয়ে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মানোন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। ভৌত কাঠামোর উন্নয়নের সঙ্গে যদি আমাদের সংস্কৃতির উন্নয়ন না ঘটে, তাহলে উন্নয়ন কখনো টেকসই হবে না। ভৌত কাঠামো বালির বাঁধের মতো ভেঙে যাবে।
ফিরে আসি রাজনৈতিক সংস্কৃতির আলোচনায়। অশ্লীলতার নহর বয়ে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর থেকে ঐক্যবদ্ধ, সভ্য, গণতান্ত্রিক জাতি গঠন কি সম্ভব? এ জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্লেটো, এরিস্টটল কিংবা মার্ক্স পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। জাতিকে কদর্য পথ থেকে ফেরানোর জন্য সামাজিক অভিভাবক, বিশেষ করে শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, বিবেকসম্পন্ন সাংবাদিকসহ সব শ্রেণির মানুষের সচেতন প্রয়াস খুব জরুরি। রাজনৈতিক ভাষার বিবর্তন, রূপান্তর ঘটবে—এ কথা মনে রেখেই এগোতে হবে। বিবর্তন মানে বিপথে গমন নয়। বিবর্তন হলো কাঙ্ক্ষিত জাতীয় স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা। মনে রাখতে হবে, আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনাকাঙ্ক্ষিত, লক্ষ্যহীন বিবর্তন চাই না। আমরা চাই এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে আলোচনার গভীরতা থাকবে, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। মার্জিত, রুচিসম্পন্ন স্লোগান, দেয়াললিখন ও মেঠো বক্তৃতায় জাতি নতুন পথের সন্ধান পাবে। এরকম লক্ষ্যে যদি জাতীয় ঐক্য গড়ে না ওঠে, তাহলে আমাদের সার্বিক উন্নয়নের সব চেষ্টা যে দূর আকাশে উবে যাবে—এরকম উপসংহারে পৌঁছানো অন্যায় কোনো কাজ হবে বলে মনে হয় না।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক
অভিমত থেকে আরো পড়ুন