https://www.prothomalony.com/

17816

north-america

উত্তর আমেরিকা

ভুলে যাওয়া মানুষ: সৈয়দ রাব্বানী এবং টেক্সাসের এক নীরব বিভীষিকা

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ ০২:৫১

যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনের একটি প্রিজন বেডে, চোখে ছানি পড়ে যাওয়া, স্ট্রোকের কারণে প্রায় নিশ্চল একটি শরীর। এই হলো সেই মানুষটির বর্তমান অবয়ব, যাকে টেক্সাস রাজ্য একসময় মৃত্যুদণ্ডের জন্য প্রস্তুত করেছিল। তারপর যাকে নিজেরই বিচার ব্যবস্থার গোলকধাঁধায় হারিয়ে ফেলেছিল প্রায় তিন দশকের জন্য। নাম সৈয়দ রাব্বানী। বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি। পরিচয় — বাংলাদেশি অভিবাসী। হত্যা মামলার আসামি। শেষ পর্যন্ত এমন একজন মানুষ, যার কাহিনি আমেরিকার বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে অন্ধকার এক কোণকে আলোয় এনে দিয়েছে।
গল্পের শুরু ১৯৮৭ সালে। হিউস্টনের একটি কুইক-এন-ইজি কনভেনিয়েন্স স্টোরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মোহাম্মদ জাকির হাসান।  নিজেও একজন বাংলাদেশি অভিবাসী, যিনি সেই দোকানে কাজ করতেন। একজন বাংলাদেশি অন্য একজন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছেন। এই ট্র্যাজেডির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক নিষ্ঠুর প্রতীকী বার্তা, যা বহু বছর পরও ডায়াস্পোরার মনে দাগ কেটে থাকবে। ১৯৮৮ সালে হ্যারিস কাউন্টির একটি জুরি রাব্বানীকে ক্যাপিটাল মার্ডারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। যদিও বিচার চলাকালীন তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে গেছেন শেষ পর্যন্ত। তখন তার বয়স মাত্র তেইশ। শাস্তি — মৃত্যুদণ্ড।

এখানেই গল্পটা যেন থমকে যাওয়ার কথা ছিল। একটি দুঃখজনক কিন্তু সমাপ্ত অধ্যায়। কিন্তু বাস্তবতা হয়ে উঠল আরও অদ্ভুত, আরও ভয়ংকর। ১৯৯৪ সালে রাব্বানীর আইনজীবীরা তার সাজার বিরুদ্ধে একটি আপিল দাখিল করেন হ্যারিস কাউন্টি আদালতে। এরপর যা ঘটে, তা যেন কাফকার কোনো উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা।  সেই আপিল আদালতের ফাইলের স্তূপে হারিয়ে যায়। এবং কেউ তা খুঁজে দেখার প্রয়োজনও বোধ করে না। ততদিনে রাব্বানী রয়ে যান ডেথ রোয়ে। একা, বিস্মৃত, প্রায় তিন দশক ধরে। যতদিন না ২০২২ সালে হ্যারিস কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট ক্লার্কের অফিস তার ফাইলটি খুঁজে পায়।  এমন একশোরও বেশি "হারিয়ে যাওয়া" মামলার মধ্যে একটি হিসেবে।

যে মানুষটি একদিন সুস্থ-সবল তেইশ বছর বয়সী তরুণ ছিলেন, তিনি হয়ে উঠেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অস্তিত্ব। তার আইনজীবী বেন উলফ, যিনি টেক্সাস অফিস অব ফরেনসিক অ্যান্ড ক্যাপিটাল রাইটসের পরিচালক, প্রথমবার রাব্বানীর সেলে গিয়ে যা দেখেছিলেন তা নিজের পঁচিশ বছরের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য বলে বর্ণনা করেছেন। দেয়ালে মলের দাগ, মেঝেতে নোংরা বিছানার প্যাড ছড়ানো, টয়লেটে ছত্রাক জমে আছে। রাব্বানী তখন নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে একটি শক্ত কম্বল মুখের উপর টেনে নিতেন। ২০২২ সালের শুরুতে হাইপোথার্মিয়া, হার্ট অ্যাটাক এবং তীব্র প্যানক্রিয়াটাইটিসের এক বিভীষিকাময় পর্বের পর রব্বানী চোখে দেখা হারান ছানির কারণে। স্ট্রোকে প্রায় নিশ্চল হয়ে পড়েন, এবং মস্তিষ্কের ক্ষতিসহ মৃগীরোগেও আক্রান্ত হন। এমন এক অবস্থা, যাকে তার আইনজীবীরা "সেমি-ভেজিটেটিভ" বলে বর্ণনা করেছেন।

আইনি লড়াই অবশেষে ফল দেয় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। যখন টেক্সাস কোর্ট অব ক্রিমিনাল আপিলস রাব্বানীর সাজা বাতিল করে দেয় এই যুক্তিতে যে বিচারক জুরিকে মিটিগেটিং এভিডেন্স বিবেচনার ব্যাপারে সঠিকভাবে নির্দেশনা দেননি। তারপর ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর হ্যারিস কাউন্টি জেলা অ্যাটর্নির অফিস আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেয়, তারা আর মৃত্যুদণ্ড দাবি করবে না। বিচারক লরি চেম্বার্স গ্রে-র আদালতে রাব্বানীকে নতুন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। প্যারোলের সুযোগসহ। পঁয়ত্রিশ বছরের বন্দিত্বের সুবাদে তিনি এখন প্যারোলের জন্য যোগ্য।

শুনানিতে বেন উলফ যখন আদালতে তার মক্কেলের চিকিৎসাগত দুর্দশার কথা বর্ণনা করছিলেন। তখন তিনি কেঁদে ফেলেন, কথা বলতে গিয়ে থেমে যান বারবার। "এই মামলা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার আত্মায় একটি কলঙ্ক," তিনি বলেছিলেন। উলফ আদালতের কাছে অনুরোধ করেন, রাব্বানীকে যেন হসপিসে স্থানান্তর করার সুপারিশ করা হয়। এরপর প্যারোলের মাধ্যমে যেন তাকে বাংলাদেশে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই অনুরোধের পেছনে ছিল আরেকটি নাটকীয় মোড়। ২০২৩ সালের প্রথম দিকে, হিউস্টন ল্যান্ডিং পত্রিকায় রাব্বানীর মামলার প্রতিবেদন পড়ে তার ভাইবোনেরা তার সন্ধান পান। যাদের সঙ্গে ১৯৯৫ সালে বাবার মৃত্যুর পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। রাব্বানীর ছোট ভাই সৈয়দ ফাসাইনি বাংলাদেশের পশ্চিম শিকারপুর থেকে বিচারকের কাছে চিঠি লেখেন। জানান পরিবার তার ভাইকে যত্ন নিতে প্রস্তুত, তার অসুস্থতা সত্ত্বেও।

কিন্তু এখানেও কাহিনি সহজ পথে এগোয়নি। রাব্বানীকে বহুবার টেক্সাস ডিপার্টমেন্ট অব ক্রিমিনাল জাস্টিসের নিজস্ব কর্মীরাই হসপিসে স্থানান্তরের সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু যতদিন তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন, ততদিন সেই সুপারিশ কার্যকর করা সম্ভব ছিল না। নিয়মের বেড়াজালে তিনি ছিলেন এমন এক শাস্তির জন্য অযোগ্য, যা এখন নিজেই সাংবিধানিকভাবে অকার্যকর বলে বিবেচিত। রায়ের তিনদিন পর, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর, বিচারক চেম্বার্স গ্রে হসপিস বা প্যারোলের সুপারিশ দিতে অস্বীকৃতি জানান। বলেন এই ধরনের সিদ্ধান্ত "নির্বাহী বিভাগ অথবা বোর্ড অব পার্ডনস অ্যান্ড প্যারোলস"-এর এখতিয়ারভুক্ত। উলফ তখন আদালতে বলেছিলেন, "আমি চাই না তাকে আবার হারিয়ে যেতে দেওয়া হোক।"

সেই মুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত রাব্বানীর ভাগ্য ঝুলে আছে এক অনিশ্চয়তার সুতোয়। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তিনি এখনও হান্টসভিলের এস্টেল ইউনিটে বন্দি। একটি প্রিজন বেডে শায়িত অবস্থায়, তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে টেক্সাসের বোর্ড অব পার্ডনস অ্যান্ড প্যারোলসের সিদ্ধান্তের ওপর। যে বোর্ড কবে তার মামলা বিবেচনা করবে বা রায় দেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রবিন মাহের এই মামলা সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, এত অসহায় একজন মানুষকে এভাবে ভুলে যাওয়া যায় !  এই বাস্তবতাই ন্যায়বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু বলে না, বরং তার ব্যর্থতা সম্পর্কে অনেক কিছু বলে।

সৈয়দ রাব্বানীর কাহিনি আমেরিকার বিচার ব্যবস্থার মেরুদণ্ডের দিকে তাক করা। একটি রাষ্ট্রযন্ত্র যখন নিজের কাগজপত্র হারিয়ে ফেলে, তখন তার মাশুল কে দেয়? তিন দশক ধরে একজন মানুষের জীবন যখন একটি ফাইলের ভেতর চাপা পড়ে থাকে। তখন সেই মানুষটির অন্ধত্ব, তার পক্ষাঘাত, তার মস্তিষ্কের ক্ষয় — এসবের দায় কার? পশ্চিম শিকারপুরে অপেক্ষারত এক ভাইয়ের চিঠি। একটি প্রিজন বেডে শায়িত নিশ্চল শরীর।আদালতকক্ষে আইনজীবীর অশ্রুসজল কণ্ঠ। এসব দৃশ্য মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই শতাব্দীর অন্যতম নিঃশব্দ ট্র্যাজেডি, যার শেষ দৃশ্য এখনও লেখা হয়নি। 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন