https://www.prothomalony.com/
17776
opinion
মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মুখ, যা মহান আল্লাহর যিকর এবং পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের প্রধান মাধ্যম। এই মুখ ও দাঁতকে রোগমুক্ত, সতেজ ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখার জন্য ইসলামে যে সুন্নাহভিত্তিক আমল নির্দেশিত হয়েছে তা-ই হলো মিসওয়াক। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও নবীগণের সুন্নাহর অনুসরণের এক অনন্য মাধ্যম। পরিভাষায় দাঁত থেকে হলুদ বর্ণ বা ময়লা দূর করার জন্য কোনো গাছের ডাল ব্যবহার করাকে মিসওয়াক বলা হয় (উইকিপিডিয়া: মেসওয়াক)। তবে মিসওয়াকের মূল উদ্দেশ্য হলো মুখ পরিষ্কার ও পবিত্র করা (সহিহ বুখারী: ২৭, মিশকাত: ৩৮১)। ইসলামের দৃষ্টিতে মিসওয়াক মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব বা ফিৎরাতের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, দশটি কাজ প্রকৃতিগত আচরণের অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে গোঁফ ছাটা, নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা, নখ কাটা, আঙুলের জোড়া ধোয়া, বগলের লোম তোলা, গুপ্তাঙ্গের লোম পরিষ্কার করা, পানি দ্বারা শৌচকর্ম ও কুলির পাশাপাশি মিসওয়াক অন্যতম (সহিহ মুসলিম: ২৬১, তিরমিযী: ২৭৫৭)।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমগ্র জীবনে মিসওয়াকের প্রতি গভীর অনুরাগ, যত্ন ও ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়। আমির ইবনু রাবীআহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তিনি নবীজীকে রোজা অবস্থায়ও অসংখ্যবার মিসওয়াক করতে দেখেছেন (সহিহ বুখারী: ১৯৩৪)। কেবল দাঁত নয়, পূর্ণাঙ্গ পরিচ্ছন্নতার জন্য তিনি জিহ্বাও নিয়মিত পরিষ্কার করতেন। আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একদা তিনি নবীজীর নিকট প্রবেশ করে দেখেন মিসওয়াকের একদিক তাঁর জিহ্বার উপর রাখা (সহিহ বুখারী: ২৪৪, মুসলিম: ৬১৫)। রাসূলের সুন্নাহর হুবহু অনুসরণে সাহাবায়ে কেরামও মিসওয়াককে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছিলেন। আবু সালামাহ বলেন, তিনি যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখেছেন, মসজিদে বসে থাকা অবস্থায় মিসওয়াক তাঁর কানের সেই স্থানে লেগে থাকত যেখানে লেখকের কলম থাকে; সালাতের জন্য দাঁড়ানোর আগে তিনি তা ব্যবহার করতেন (আবু দাউদ: ৪৭, তিরমিযী: ২৩)। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবীজী মিসওয়াক করে তা ধোয়ার জন্য তাঁকে দিতেন, তিনি প্রথমে নিজে তা দিয়ে মিসওয়াক করতেন, অতঃপর ধুয়ে নবীজীকে দিতেন (আবু দাউদ: ৫২, বায়হাকী: ১৭২)। এই গভীর সুন্নাহপ্রেম প্রমাণ করে যে, মিসওয়াক মুমিনের ব্যক্তিত্ব ও ইবাদতের এক মর্যাদাপূর্ণ অলঙ্কার।
মিসওয়াকের গুরুত্ব ও মর্যাদা এতই বেশি ছিল যে, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটি উম্মতের উপর ফরয হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবীজী বলেছেন, জিবরীল আলাইহিস সালাম তাঁকে এত বেশি দাঁতন করতে আদেশ করেছেন যে তাতে তিনি দাঁত ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা করতেন (মুসনাদে বাযযার: ৬৯৫২, সিলসিলা সহীহাহ: ১৫৫৬)। অন্য বর্ণনায় ওয়াসেলাহ বিন আসকবা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এত বেশি দাঁতন করার আদেশ ছিল যে তা ফরয হয়ে যাওয়ার ভয় হতো (মুসনাদে আহমদ: ১৬০০৭, সহিহুল জামে: ১৩৭৬)। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবীজী বলেছেন, তাঁকে মিসওয়াকের আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর ধারণা হতে লাগল যে এ সম্পর্কে কুরআন বা ওহী নাযিল হবে (মুসনাদে আহমদ: ৩১২২, আবু ইয়ালা: ২৩৩০)। এই বর্ণনাগুলো প্রমাণ করে, মিসওয়াক কোনো সাধারণ অভ্যাস নয়, বরং শরীআতের এক বিশেষ আমল।
উম্মতের প্রতি দয়া-ভালোবাসার কারণে নবীজী প্রত্যেক ওযূ ও সালাতে মিসওয়াক আবশ্যক করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও তা করেননি, যেন উম্মত কষ্টের সম্মুখীন না হয়। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবীজী বলেছেন, উম্মতের উপর কঠিন মনে না করলে প্রতিটি সালাতের সাথে মিসওয়াকের আদেশ দিতাম (সহিহ বুখারী: ৮৮৭, মুসলিম: ৬১২)। অন্যত্র বলেছেন, কষ্টকর মনে না করলে প্রতি ওযূর সাথে মিসওয়াক ফরয করতাম এবং এশার সালাত অর্ধেক রাত পর্যন্ত দেরি করে পড়তাম (হাকেম: ৫১৬, বায়হাকী: ১৪৬)। তিনি উম্মতকে বারবার তাকিদ দিয়ে বলেছেন, আমি তোমাদেরকে মিসওয়াকের জন্য বেশি তাকিদ করেছি (সহিহ বুখারী: ৮৮৮, নাসাঈ: ৬)। সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমার পবিত্রতা অর্জনেও মিসওয়াক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নবীজী বলেছেন, জুমার দিন প্রত্যেক বালিগের জন্য গোসল কর্তব্য এবং তারা মিসওয়াক করবে ও সুগন্ধি ব্যবহার করবে (সহিহ বুখারী: ৮৮০, মুসলিম: ৮৪৬)।
মিসওয়াককারীর জন্য পরকালীন পুরস্কারের পাশাপাশি ইবাদতের মুহূর্তে বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ ও ফেরেশতাদের নৈকট্য তৈরি হয়। নবীজী বলেছেন, কেউ সালাতে দাঁড়াতে চাইলে সুন্দর করে ওযূ ও মিসওয়াক করে সালাত আদায় করলে একজন ফেরেশতা তার নিকটবর্তী হয়ে মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে দেয়, ফলে তিলাওয়াত ফেরেশতার মুখে প্রবেশ করে; মিসওয়াক না করলে এমনটি হয় না (আয-যুহদ: ১২০৫, সহিহুল জামে: ৭২৩)। তাই কুরআনের ধারক হিসেবে মুখকে মিসওয়াকের মাধ্যমে পবিত্র রাখা কর্তব্য। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, নবীজী বলেছেন, মিসওয়াক মুখ পরিষ্কারকারী ও প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের অনন্য উপায় (মুসনাদে আহমদ: ২৪২০৩, নাসাঈ: ৫, সহিহুত তারগিব: ২০২)। প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ হাদীছে মিসওয়াকের দুটি মহান উপকারিতা বর্ণিত হয়েছে দুনিয়াতে মুখ পরিষ্কার হওয়া এবং আখেরাতে প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভ।
সামাজিক মেলামেশা, বিশেষত জামায়াতে সালাত বা জনসমাবেশে মুখের দুর্গন্ধ অন্যের কষ্টের কারণ হতে পারে, যা ভ্রাতৃত্বের পরিবেশে ব্যাঘাত ঘটায়। নিয়মিত মিসওয়াকে মুখ দুর্গন্ধমুক্ত ও সতেজ থাকে, যা অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সামাজিক শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। জুমার মতো বড় সমাবেশে নবীজীর মিসওয়াকের বিশেষ নির্দেশ প্রমাণ করে, একজন মুমিনের উপস্থিতি হতে হবে পরিচ্ছন্ন ও আনন্দদায়ক। এভাবে মিসওয়াক মুমিনের ব্যক্তিত্বকে মার্জিত করার পাশাপাশি সামাজিক বন্ধনও সুদৃঢ় করে।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও দন্ত বিশেষজ্ঞরাও মিসওয়াকের বহুমুখী উপকারিতা স্বীকার করেছেন। নিয়মিত মিসওয়াক দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করে; দাঁতের এনামেল রক্ষা করে ক্ষয়রোধ নিশ্চিত করে এবং মাড়িকে মজবুত করে তোলে। মিসওয়াক মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে দুর্গন্ধ দূর করে ও দীর্ঘক্ষণ মুখ সতেজ রাখে। মুখের পরিচ্ছন্নতা শরীরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত বলে নিয়মিত মিসওয়াকে ক্ষতিকর জীবাণু সহজে পেটে প্রবেশ করতে পারে না, যা হজমপ্রক্রিয়ার উন্নতি ঘটায়। গবেষকদের মতে মিসওয়াক মস্তিষ্কের স্নায়ু সচল রাখে, যা স্মৃতিশক্তি প্রখর করতে ও দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে পরোক্ষভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
নবীজী বিশেষ কিছু সময়ে নিয়মিত মিসওয়াক করতেন, যার অন্যতম ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর। হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ঘুম থেকে উঠে তিনি মিসওয়াক দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতেন (সহিহ বুখারী: ২৪৫, মুসলিম: ৬১৬-৬১৮)। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাতে জাগ্রত হয়ে তিনি মিসওয়াক করে ওযূ করে সালাত পড়তেন (মুসলিম: ১৭৭৩)। ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ঘুমানোর সময় মিসওয়াক পাশে রাখতেন, জেগে প্রথমেই তা ব্যবহার করতেন (মুসনাদে আহমদ: ৫৯৭৯, সিলসিলা সহীহাহ: ২১১১)। ঘরে প্রবেশের পরও প্রথম কাজ হিসেবে তিনি মিসওয়াক করতেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবীজী ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে মিসওয়াক করতেন (মুসলিম: ২৫৩, মুসনাদে আহমদ: ২৫৫৫৩)। শুরায়হ ইবনু হানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি আয়েশাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন নবীজী ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে কী করতেন, তিনি বলেছিলেন, মিসওয়াক (মুসলিম: ২৫৩, মিশকাত: ৩৭৭)।
সালাতের আগে ও ফাঁকে ফাঁকেও তিনি মিসওয়াক করতেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, সালাতের জন্য তিনি আগে থেকেই নবীজীর মিসওয়াক ও ওযূর পানি প্রস্তুত রাখতেন, নবীজী জাগ্রত হয়ে প্রথমে মিসওয়াক করতেন, তারপর ওযূ করতেন (মুসলিম: ৭৪৬, মিশকাত: ১২৫৭)। ইবনে শিহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নবীজী মিসওয়াক না করে কখনও সালাতে দাঁড়াতেন না (সহিহুল জামে: ৭২৩)। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবীজী রাতে দু-রাকাত সালাত আদায়ের পর মিসওয়াক করতেন (মুসনাদে আহমদ: ১৮৮১, নাসাঈ: ৭০৫)। এমনকি জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি এই সুন্নাহ আদায় করেছেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবীজী তাঁর ঘরে, তাঁর গণ্ড ও সীনার মধ্যস্থলে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তখন আব্দুর রহমান ইবনু আবূ বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হাতে একটি তাজা মিসওয়াকের ডাল নিয়ে এলে নবীজী সেদিকে তাকান। আয়েশা তা বুঝতে পেরে নিজে চিবিয়ে, ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করে নবীজীকে দেন। তিনি এত সুন্দরভাবে দাঁত পরিষ্কার করেন যা আগে কখনও করেননি। আল্লাহ তাআলা তাঁর এই দুনিয়ার শেষ দিনে ও আখিরাতের প্রথম দিনে আয়েশার থুথুকে নবীজীর থুথুর সঙ্গে মিলিয়ে দেন (সহিহ বুখারী: ৪৪৫১)।
মিসওয়াক আমাদের আত্মিক ও শারীরিক সুস্থতার এক অপূর্ব সমন্বয়। নিয়মিত মিসওয়াকের অভ্যাস একদিকে আমাদের আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খাঁটি অনুসারী হিসেবে গড়ে তোলে, অন্যদিকে সমাজ ও পরিবারে আমাদের ব্যক্তিত্বকে সতেজ, পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয় করে তোলে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সমগ্র জীবনকে সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করার এবং নিয়মিত মিসওয়াকের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক দান করুন। আমীন!
অভিমত থেকে আরো পড়ুন