https://www.prothomalony.com/
17722
opinion
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ ০১:৪৫
রামাযান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য রহমত, মাগফিরাত এবং নাজাতের এক মহামূল্যবান উপহার। এই মাসের প্রতিটি দিন ও রাতই বরকতময়, কিন্তু এর শেষ দশক এমন এক সময়, যা পুরো বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত। আর এই শেষ দশকের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এমন একটি রাত, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহলায়লাতুল ক্বদর।
লায়লাতুল ক্বদর এমন একটি রাত, যার মর্যাদা ও ফযীলত সম্পর্কে যতই বলা হোক, তা কমই বলা হবে। কারণ এটি এমন একটি রাত, যার মূল্য আল্লাহ নিজেই নির্ধারণ করেছেন এবং যার মর্যাদা বোঝাতে তিনি কুরআনে একটি পূর্ণ সূরা নাযিল করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি এই কুরআন ক্বদরের রাতে নাযিল করেছি। তুমি কি জানো ক্বদরের রাত কী? ক্বদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই রাতে ফেরেশতারা এবং জিবরাইল তাদের প্রতিপালকের অনুমতিতে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করেন। এই রাত শান্তিময়, যা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত থাকে।”(সুরা কদর ৯৭:১–৫)
এই আয়াতগুলোর দিকে গভীরভাবে তাকালে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা যায়।
প্রথমত, এই রাতের সাথে কুরআনের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় হিদায়াতের গ্রন্থ কুরআন যে রাতে নাযিল হয়েছে, সেই রাতের মর্যাদা কত বড় হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ নিজেই প্রশ্ন করেছেন “তুমি কি জানো ক্বদরের রাত কী?” এটি এমন একটি অলংকারপূর্ণ প্রশ্ন, যার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে মানুষ নিজের চিন্তা দিয়ে এর প্রকৃত মর্যাদা বুঝতে পারবে না, আল্লাহ নিজেই এর মর্যাদা জানাচ্ছেন।
তৃতীয়ত, হাজার মাসের তুলনা দিয়ে আল্লাহ বুঝিয়েছেন এটি শুধু একটি ভালো রাত নয়; বরং সময়ের দিক থেকে একটি অসাধারণ সুযোগ।
যদি আমরা হিসাব করি, হাজার মাস মানে প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস। অর্থাৎ একজন মানুষ যদি এই একটি রাত সঠিকভাবে ইবাদতে কাটায়, তাহলে সে যেন একটি পূর্ণ জীবনের ইবাদতের সমপরিমাণ সওয়াব পেয়ে যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি শুধু গাণিতিক হিসাব নয়; বরং এটি আল্লাহর রহমতের প্রকাশ। আল্লাহ চাইলে মানুষকে শুধু তার আমলের সমান প্রতিদান দিতেন, কিন্তু তিনি তাঁর দয়ার কারণে অল্প আমলেও অসীম প্রতিদান দেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় লায়লাতুল ক্বদরের রাতে ইবাদতে দাঁড়াবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”
(সহিহ বুখারি: ১৯০১, সহিহ মুসলিম: ৭৬০)
এই হাদিসে দুটি শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম শর্ত হলো ঈমান অর্থাৎ এই রাতে ইবাদত করতে হবে এই বিশ্বাস নিয়ে যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি বিশেষ রাত।
দ্বিতীয় শর্ত হলো সওয়াবের আশা অর্থাৎ লোক দেখানো বা অভ্যাসবশত নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করতে হবে।
এই দুটি শর্ত পূরণ হলে আল্লাহ অতীতের গুনাহ মাফ করে দেন। এটি কত বড় সুযোগ, তা আমরা অনেক সময় উপলব্ধি করতে পারি না।
লায়লাতুল ক্বদরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি তাকদীরের রাত। অনেক আলেম বলেন, এই রাতে পরবর্তী বছরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।আল্লাহ বলেন,“এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়।” (সুরা দুখান ৪৪:৪)
অর্থাৎ মানুষের রিযিক, মৃত্যু, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ইত্যাদি বিষয় ফেরেশতাদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত হয়। এটি আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা এই রাতে শুধু নফল ইবাদত নয়; বরং নিজের ভবিষ্যতের জন্যও আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন দেখলে আমরা বুঝতে পারি, তিনি এই রাতকে কত গুরুত্ব দিতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, “রামাযানের শেষ দশক আসলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাত জেগে ইবাদত করতেন, তাঁর পরিবারকে জাগাতেন এবং ইবাদতে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতেন।” (সহিহ বুখারি: ২০২৪, সহিহ মুসলিম: ১১৭৪)
এই হাদিসের একটি বড় শিক্ষা হলো রাসুল শুধু নিজে ইবাদত করতেন না; বরং তাঁর পরিবারকেও ইবাদতের দিকে উৎসাহ দিতেন।
এখান থেকে বোঝা যায় একজন প্রকৃত মুমিন শুধু নিজের আখিরাত নিয়ে চিন্তা করে না; বরং নিজের পরিবারকেও আখিরাতের পথে নিয়ে যেতে চায়।
লায়লাতুল ক্বদর অনুসন্ধানের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা রামাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লায়লাতুল ক্বদর অনুসন্ধান কর।” (সহিহ বুখারি: ২০১৭) এই কারণে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রাতগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোনির্দিষ্ট করে কোনো একটি রাতকে নিশ্চিতভাবে লায়লাতুল ক্বদর বলা হয়নি। এর একটি বড় হিকমত হলো যেন মানুষ শুধু একটি রাত নয়, বরং পুরো শেষ দশকই ইবাদতে কাটায়।
লায়লাতুল ক্বদরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল হলো নামাজ। বিশেষ করে তাহাজ্জুদ ও তারাবীহ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইমামের সাথে নামাজ আদায় করে শেষ পর্যন্ত থাকে, তার জন্য পুরো রাত ইবাদতের সওয়াব লেখা হয়।” (সুনানে তিরমিযি: ৮০৬)
এটি একটি বড় সুসংবাদ। কারণ অনেকেই মনে করে সারারাত জেগে না থাকলে হয়তো সওয়াব পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই হাদিস দেখায় সঠিকভাবে কিছু সময় ইবাদত করলেও আল্লাহ পূর্ণ রাতের সওয়াব দিতে পারেন।
কুরআন তেলাওয়াত এই রাতের একটি বিশেষ আমল। কারণ এই রাতই কুরআনের রাত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি কুরআনের একটি অক্ষর পড়বে, সে একটি নেকি পাবে, আর প্রতিটি নেকি দশগুণ বৃদ্ধি করা হবে।(সুনানে তিরমিযি: ২৯১০)
যদি আমরা এই হিসাব করি, তাহলে বোঝা যায় লায়লাতুল ক্বদরের রাতে কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব কত বিশাল হতে পারে।
দোয়া এই রাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, যদি আমি লায়লাতুল ক্বদর পাই তাহলে কী পড়ব? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন:
“হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাসো, তাই আমাকে ক্ষমা কর।”
(সুনানে তিরমিযি: ৩৫১৩)
এই দোয়াটি খুব ছোট, কিন্তু এর মধ্যে অনেক বড় অর্থ রয়েছে। এতে আল্লাহর একটি গুণের কথা বলা হয়েছে তিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অর্থাৎ বান্দা শুধু ক্ষমা চাইলে আল্লাহ খুশি হন।
এই রাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো তওবা। অনেক মানুষ সারা বছর গুনাহ করে, কিন্তু লায়লাতুল ক্বদরের রাত হতে পারে তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এই রাতে একজন মানুষ যদি আন্তরিকভাবে বলে হে আল্লাহ, আমি ফিরে আসতে চাই তাহলে আল্লাহ তার অতীত মাফ করে দিতে পারেন।
দান-সদকার গুরুত্বও এই রাতে অনেক বেশি। কারণ ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; বরং সামাজিক দায়িত্বের কথাও বলে। যদি কেউ এই রাতে একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দেয়, একজন এতিমকে সাহায্য করে, একজন অসহায়কে সহযোগিতা করে তাহলে সেটিও লায়লাতুল ক্বদরের ইবাদতের অংশ হয়ে যায়।
ই‘তিকাফ এই রাত পাওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমগুলোর একটি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বছর শেষ দশকে ই‘তিকাফ করতেন (সহিহ বুখারি: ২০২৬)।
ই‘তিকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে আলাদা করে শুধু আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা। আজকের যুগে মানুষ মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, ব্যস্ততা এবং দুনিয়ার নানা কাজে এতটাই ডুবে থাকে যে, আল্লাহর সাথে নিরিবিলি সময় কাটানোর সুযোগ খুব কম পায়। ই‘তিকাফ সেই সুযোগ তৈরি করে।
লায়লাতুল ক্বদরের একটি বড় শিক্ষা হলো সময় খুব মূল্যবান। অনেক মানুষ দুনিয়ার কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করে, কিন্তু ইবাদতের জন্য কিছু সময় বের করতে কষ্ট হয়। কিন্তু একজন বুদ্ধিমান মানুষ বুঝে এই রাতগুলোই তার আসল বিনিয়োগের সময়। কারণ দুনিয়ার বিনিয়োগ দুনিয়াতেই শেষ হয়ে যায়, কিন্তু এই রাতের ইবাদত আখিরাত পর্যন্ত স্থায়ী থাকে।
সবশেষে বলা যায় লায়লাতুল ক্বদর শুধু একটি রাত নয়; এটি একটি সুযোগ, একটি আহ্বান, একটি মোড় পরিবর্তনের সময়। এটি এমন একটি সময়, যখন একজন পাপী মানুষ আল্লাহর বন্ধু হয়ে যেতে পারে। একজন গাফেল মানুষ আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হতে পারে।একজন দুর্বল ঈমানের মানুষ নতুনভাবে ঈমানের শক্তি পেতে পারে।তাই আমাদের উচিত এই রাতগুলোকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় হিসেবে নেওয়া।হয়তো আমরা জানি না আমাদের জীবনে আর কতটি রামাযান আসবে। হয়তো এটি আমাদের জীবনের শেষ রামাযান।এই চিন্তা যদি আমাদের অন্তরে আসে, তাহলে আমরা কখনোই এই রাতগুলো অবহেলায় কাটাতে পারব না।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে লায়লাতুল ক্বদরের প্রকৃত মর্যাদা বোঝার তাওফিক দিন, এই রাতের ইবাদতের মাধ্যমে আমাদের জীবন পরিবর্তন করার তাওফিক দিন, আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন, আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন এবং আমাদেরকে জান্নাতুল ফেরদৌসের অধিকারী বানান। আমীন।
হৃদয়ের দূরত্ব কমাতে ইসলামের শিক্ষা
হাফেজ ফয়সাল আহমাদ।
পেশ ইমাম, মূহুরীপাড়া জামে মসজিদ, পশ্চিম সৈয়দপুর, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।
মানুষ সামাজিক জীব। একা থাকা মানুষের স্বভাব নয়। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী, আত্মীয় এই সম্পর্কগুলোর সমন্বয়েই মানুষের জীবন পূর্ণতা পায়। কিন্তু যেখানে সম্পর্ক আছে, সেখানে কখনো না কখনো ভুল বোঝাবুঝি, মান-অভিমান, কষ্ট বা দূরত্ব আসবেই। এটি মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির অংশ। সমস্যা মান-অভিমান হওয়া নয়; আসল সমস্যা হলো এই সাময়িক দূরত্বকে স্থায়ী শত্রুতায় পরিণত করা।
ইসলাম মানুষের সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে সুস্থ সম্পর্কের উপর। আর ভাঙা সম্পর্কের সমাজ কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। তাই ইসলাম শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয়নি, বরং হৃদয়কে কিভাবে পরিষ্কার রাখতে হয় এবং সম্পর্ককে কিভাবে টিকিয়ে রাখতে হয় তারও শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। তাই তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও” (সুরা হুজুরাত ৪৯:১০)।
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, মুসলমানদের সম্পর্ক শুধু সামাজিক নয়, এটি ঈমানের সম্পর্ক। তাই এই সম্পর্ক নষ্ট হওয়া মানে শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং এটি ঈমানী ভ্রাতৃত্বের দুর্বলতা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দু’জন মানুষের মাঝে দূরত্ব তৈরি হলে সেখানে শয়তান সবচেয়ে বেশি খুশি হয়। কারণ শয়তান জানে, যদি সে মুসলমানদের মধ্যে ভালোবাসা নষ্ট করতে পারে, তাহলে তাদের শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “শয়তান এই ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে যে, মুসলমানরা তাকে উপাসনা করবে। কিন্তু তাদের পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া লাগাতে সে এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে” (সহিহ মুসলিম: ২৮১২)।
অর্থাৎ যখন দুইজন মানুষ ঝগড়া করে এবং কথা বন্ধ রাখে, তখন তারা বুঝতে পারে না যে তারা আসলে শয়তানের একটি পরিকল্পনার অংশ হয়ে গেছে।
মান-অভিমানের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় বাধা হলো অহংকার বা ইগো। মানুষ ভাবে আমি কেন আগে কথা বলব? আমি কেন আগে ক্ষমা চাইব? আমি আগে এগিয়ে গেলে কি আমার সম্মান কমে যাবে?
কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সম্মান অহংকারে নয়; বরং বিনয়ে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে সে তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি কথা বন্ধ রাখবে… আর তাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে আগে সালাম দেয়” (সহিহ বুখারি: ৬০৭৭, সহিহ মুসলিম: ২৫৬০)।
একটু চিন্তা করলে বোঝা যায়, এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মনস্তত্ত্বের একটি বড় সমস্যা সমাধান করে দিয়েছেন। তিনি বলেননি কে সঠিক বা কে ভুল। বরং তিনি বলেছেন যে আগে সম্পর্ক ঠিক করার উদ্যোগ নেবে, সেই উত্তম।
অর্থাৎ ইসলামে সম্পর্ক ঠিক করা মানে হেরে যাওয়া নয়; বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক বিজয়।
অনেক সময় একটি সালামই ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর শুরু হতে পারে। একটি হাসি, একটি খোঁজ নেওয়া, একটি ছোট্ট বার্তা এসব অনেক বড় দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে” (সহিহ মুসলিম: ৫৪)।
এখানে একটি গভীর শিক্ষা আছে। ভালোবাসা শুধু আবেগ দিয়ে তৈরি হয় না; বরং কিছু ছোট ছোট আমলের মাধ্যমে তা তৈরি হয়। সালাম দেওয়া, কুশল জিজ্ঞেস করা, হাত মিলানো—এই ছোট কাজগুলো হৃদয়কে নরম করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, “দু’জন মুসলমান যখন সাক্ষাৎ করে এবং হাত মিলায়, তখন আলাদা হওয়ার আগেই তাদের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়” (সুনানে আবু দাউদ: ৫২১২)।
এটি প্রমাণ করে, সম্পর্ক ঠিক করা শুধু সামাজিক কাজ নয়; এটি একটি ইবাদতও। মান-অভিমান দূর করার আরেকটি সুন্দর মাধ্যম হলো উপহার দেওয়া। উপহার মানুষের অন্তরের কঠোরতা দূর করে। অনেক সময় মুখে ‘সরি’ বলা কঠিন হয়। কিন্তু একটি ছোট উপহার সেই কাজ সহজ করে দেয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা একে অপরকে উপহার দাও, তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে” (আল-আদাবুল মুফরাদ: ৫৯৪)।
এখানে বিষয়টি শুধু বস্তুগত উপহার নয়; বরং এর মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি মানসিক বার্তা—“তুমি এখনও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।” মান-অভিমান ধরে রাখার আরেকটি বড় ক্ষতি হলো—এটি মানুষের আমল নষ্ট করে দিতে পারে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সোমবার ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। তখন প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করা হয়, কিন্তু সেই দুইজনকে নয়, যাদের মধ্যে শত্রুতা আছে। বলা হয়—এদের অপেক্ষা করাও যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে” (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৫)।
এই হাদিস আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা হয়তো নামাজ পড়ছি, রোজা রাখছি, দান করছি কিন্তু একটি সম্পর্ক ঠিক না করার কারণে আমাদের ক্ষমা বিলম্বিত হচ্ছে। এটি কত বড় ক্ষতি একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়।
সম্পর্ক ঠিক করার জন্য ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো অন্যের জন্য অজুহাত খোঁজা। মানুষ সাধারণত অন্যের ভুলকে বড় করে দেখে, কিন্তু তার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে না। অথচ ইসলামী চরিত্র হলো ভালো ব্যাখ্যা খোঁজা। হাসান বসরী (রহ.) বলেছেন, “মুমিন তার ভাইয়ের জন্য অজুহাত খোঁজে, আর মুনাফিক তার ভুল খোঁজে।”
অর্থাৎ যদি কেউ এমন কিছু করে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, তাহলে সাথে সাথে খারাপ ধারণা না করে ভাবুন হয়তো সে কষ্টে ছিল, হয়তো সে ভুল বুঝেছে, হয়তো সে ইচ্ছা করে করেনি। এই মানসিকতা অনেক সম্পর্ক ভাঙা থেকে বাঁচাতে পারে।
ক্ষমা করার মানসিকতা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ প্রতিটি মানুষ ভুল করে। আপনি যেমন ভুল করেন, অন্যরাও তেমন ভুল করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা ক্ষমা কর এবং উদারতা প্রদর্শন কর। তোমরা কি পছন্দ কর না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?” (সুরা নূর ২৪:২২)।
এই আয়াত আমাদের সামনে একটি শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরে—আপনি যদি আল্লাহর ক্ষমা চান, তাহলে আপনাকেও মানুষের ভুল ক্ষমা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ক্ষমা করলে আল্লাহ বান্দার সম্মান বাড়িয়ে দেন” (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)।
অর্থাৎ মানুষের ধারণা হলো ক্ষমা করলে মর্যাদা কমে যায়। কিন্তু আল্লাহর কাছে বাস্তবতা উল্টো—ক্ষমা মর্যাদা বাড়ায়।
অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির মূল কারণ হলো যোগাযোগের অভাব। মানুষ সরাসরি কথা না বলে অন্যের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কিছু ধারণা পাপ” (সুরা হুজুরাত ৪৯:১২)। অর্থাৎ অনুমান করে সম্পর্ক নষ্ট করা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
তাই যদি কারো সাথে সমস্যা হয়, তাহলে নীরবে দূরে না সরে গিয়ে সরাসরি সম্মানজনকভাবে কথা বলা উচিত। অনেক সময় পাঁচ মিনিটের একটি আন্তরিক কথোপকথন পাঁচ বছরের দূরত্ব শেষ করে দিতে পারে।
সম্পর্ক ঠিক করার আরেকটি শক্তিশালী মাধ্যম হলো দোয়া করা। যখন সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত। কারণ মানুষের হৃদয় আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করতেন, “হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির রাখুন” (সুনানে তিরমিযি: ২১৪০)।
আপনি যদি কারো জন্য দোয়া করেন “হে আল্লাহ, আমাদের সম্পর্ক ঠিক করে দিন” তাহলে এই দোয়া প্রথমে আপনার নিজের হৃদয়কে নরম করবে।
আরেকটি বাস্তব সত্য হলো এই দুনিয়া খুবই ক্ষণস্থায়ী। আজ যার সাথে আপনি কথা বলছেন না, কাল হয়তো সে এই দুনিয়ায় থাকবে না অথবা আপনি থাকবেন না। তখন আফসোস করে লাভ হবে না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা হিংসা করো না, সম্পর্ক ছিন্ন করো না, বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো” (সহিহ বুখারি: ৬০৬৫)।
একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায় মানুষ সাধারণত বড় শত্রুর কারণে কষ্ট পায় না; বরং কাছের মানুষের দূরত্ব তাকে বেশি কষ্ট দেয়। তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা একটি ইবাদত, একটি চরিত্র, একটি আধ্যাত্মিক পরিপক্বতা।
সবশেষে মনে রাখতে হবে সম্পর্ক ঠিক করা দুর্বলতা নয়। বরং এটি শক্ত চরিত্রের পরিচয়। দুর্বল মানুষ প্রতিশোধ নেয়, শক্ত মানুষ ক্ষমা করে। একজন বুদ্ধিমান মানুষ তর্ক জিততে চায় না; সে সম্পর্ক জিততে চায়।
তাই আসুন আমরা সিদ্ধান্ত নিই কারো সাথে যদি দূরত্ব থাকে, আমরা অপেক্ষা করব না। আমরা নিজেরাই এগিয়ে যাব। একটি সালাম, একটি বার্তা, একটি দোয়া—হয়তো এটাই হবে জান্নাতের পথে আমাদের একটি বড় আমল।আল্লাহ আমাদের অন্তরকে হিংসা, অহংকার ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত রাখুন। আমাদেরকে ক্ষমাশীল, বিনয়ী এবং সম্পর্ক রক্ষাকারী বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমীন।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন