https://www.prothomalony.com/
17755
north-america
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ ২০:২১
প্রবাসে দাঁড়িয়ে বাঙালি কেবল জীবিকার সন্ধান করেনি। সঙ্গে করে বহন করেছে একটি ভাষা, একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি এবং একটি আত্মপরিচয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থেকেও বাংলা ভাষার প্রতি এই টান, সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি এই দায়বদ্ধতাই আজ বিশ্ববাংলার সবচেয়ে বড় শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমের অঙ্গরাজ্য ইন্ডিয়ানায় আয়োজিত ১৬তম উত্তর আমেরিকা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনে বক্তাদের কণ্ঠে বারবার ফিরে এসেছে সেই আত্মবিশ্বাসের উচ্চারণ—বিশ্বের যেখানেই বাঙালি গেছে, সেখানেই সে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।
ইন্ডিয়ানার নোবলসভিলে অনুষ্ঠিত হয় ১৬তম উত্তর আমেরিকা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন (NABLCC) ২০২৬। দ্বিবার্ষিক এই সম্মেলন প্রবাসের মাটিতে এক টুকরো বাংলায় রূপ নেয়। উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও বাংলা ভাষাপ্রেমীরা মিলিত হন এক ছাদের নিচে। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলার সঙ্গে যুক্ত হয় স্মৃতি, শেকড় আর আত্মপরিচয়ের গভীর অনুরণন।
সম্মেলনের একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল বাংলা বইয়ের মেলা। প্রথমবারের মতো ইন্ডিয়ানার এই অঞ্চলে বসা বইমেলায় নিউইয়র্ক থেকে অংশ নেয় মুক্তধারা। সমসাময়িক সাহিত্য থেকে শুরু করে গবেষণাধর্মী ও মূল্যবান প্রকাশনায় সাজানো স্টলে পাঠকদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, প্রবাসের এত দূরে বাংলা বইয়ের প্রতি মানুষের এমন ভালোবাসা তাঁকে নতুন করে আশাবাদী করেছে। প্রায় চার দশকের পথচলার পরও বই যে মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঠিকানা, এই মেলাই যেন তার প্রমাণ।
শুক্রবার বিকেলে শিশুদের কবিতা আবৃত্তি, পিঠা উৎসব, সাহিত্য আলোচনা এবং স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। শিশুদের কণ্ঠে বাংলা কবিতা, মায়ের হাতে তৈরি পিঠার ঘ্রাণ আর মঞ্চে ভেসে ওঠা বাংলা গানের সুর মিলেমিশে এক অনন্য আবহ তৈরি করে। মুহূর্তের জন্য হলেও মনে হয়েছে, হাজার হাজার মাইল দূরে নয়—বাংলার কোনো জনপদেই যেন সবাই একত্রিত হয়েছে।
সম্মেলনের আহ্বায়ক আজাদ হোসেন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক দিলরুবা আমিন মিতা ও অঞ্জন রায়ের নেতৃত্বে পুরো আয়োজন ছিল সুশৃঙ্খল, আন্তরিক ও প্রাণবন্ত। দূরবর্তী এই অঙ্গরাজ্যে এত বড় একটি সাহিত্য-সংস্কৃতির আয়োজন সফল করার পেছনে যাঁরা নীরবে কাজ করেছেন, তাঁদের প্রতি অংশগ্রহণকারীদের কৃতজ্ঞতা ছিল আন্তরিক ও অকপট।
আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় যাদের নাম দেখা গেছে: ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সেক্রেটারি অব স্টেট দিয়েগো মোরালেস, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি অনিন্দিতা কাজী, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কণা, শিকাগোতে ভারতের কনসাল জেনারেল সোমনাথ ঘোষ, শিকাগোতে বাংলাদেশের অনারারি কনসাল জেনারেল মুনির চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ড. আবদুর চৌধুরী, লেখক ও প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা–এর সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জয়শ্রী বড়ুয়া, লেখক ড. মোস্তাক আহমেদ, শিক্ষাবিদ ও লেখক ড. শিরিন সিদ্দিকী, সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোহাম্মদ আলম পান্না, ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহ জে. চৌধুরী, নন্দিতা গঙ্গোপাধ্যায় দাসসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা–এর সম্পাদক ও লেখক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন বলেন, “প্রবাসীদের হাত ধরেই আজকের বিশ্ববাংলার ভিত নির্মিত হয়েছে। আগামী প্রজন্ম সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পতাকা আরও উঁচুতে বহন করবে।” তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগে অর্জিত বাংলাদেশ তার ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করেই বিশ্বসভায় আরও শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলবে।
প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন এবং ব্যবস্থাপনার নানা পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন সোনিয়া আজাদ,লীনা আলী,ড ওয়াকার মোয়াজ্জেম,লিখন রশীদ প্রমূখ।
শুভেচ্ছা বক্তব্য রেখেছেন,
নন্দিতা দাস গাংগুলি,বিশ্বজিৎ সাহা, দিদারুল আলম পান্না,অনারারি কন্সাল জেনারেল মনির চৌধুরী,সাংবাদিক হাসানুজ্জামান সাকী,পিনাকী তালুকদার প্রমূখ।
সম্মেলনের আরেকটি অনন্য অনুষঙ্গ ছিল আলোকচিত্র ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি পোশাক ও অলংকারের প্রদর্শনী, বাঙালি খাবারের আয়োজন এবং প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের পরিচয় ও সংযোগের সুযোগ। এসব আয়োজন একটি বার্তাই ছিল অংশগ্রহণকারীদের চোখেমুখে-প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি কোনো স্মৃতির নাম নয়; এটি এক চলমান জীবনধারা।
নোবলসভিলের শান্ত আকাশের নিচে কয়েক দিনের জন্য যেন আরেকটি বাংলার জন্ম হয়েছিল। ভাষা, সাহিত্য, গান, বই আর মানুষের মিলনে তৈরি হয়েছিল এমন এক সাংস্কৃতিক পরিসর, যেখানে বোঝা যায়—ভৌগোলিক দূরত্ব মানুষকে মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। বরং দূরত্বই কখনো কখনো শেকড়কে আরও গভীর করে। বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা বাঙালির সবচেয়ে বড় পরিচয় তাই আজও তার ভাষা, তার সাহিত্য এবং তার সংস্কৃতি।
সম্মেলনের মিডিয়া পার্টনার ছিল প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা, সময় টেলিভিশন, টিবিএন-২৪ এবং দেশি ট্রিবিউন ডটকম।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন