https://www.prothomalony.com/

17621

literature

সাহিত্য

এবারের বিশ্বকাপে রেফারিং বিতর্ক: প্রযুক্তি বাড়ছে, ন্যায়বিচার কি বাড়ছে?

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ ০৭:১৫

ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খেলাটির সবচেয়ে অপছন্দের চরিত্র সম্ভবত একজনই—রেফারি।

একটি ম্যাচে দুই দলের সমর্থক কখনো একমত হন না। কিন্তু খেলা শেষে দু'পক্ষই যদি রেফারির সমালোচনা করে, তাহলে ধরে নেওয়া যায় তিনি হয়তো খুব কঠিন একটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। আবার অনেক সময় উল্টোও হয়—একটি বাঁশি, একটি কার্ড বা একটি অফসাইডের সিদ্ধান্তই পুরো ম্যাচের গল্প বদলে দেয়।

২০২৬ বিশ্বকাপও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়। মাঠে খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যের পাশাপাশি রেফারিং নিয়েও চলছে তুমুল আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশনের বিশ্লেষণ, সাবেক খেলোয়াড়দের মন্তব্য—সবখানেই প্রশ্ন একটাই: প্রযুক্তি এত উন্নত হওয়ার পরও বিতর্ক কেন কমছে না?

এক সময় রেফারির সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা। ভুল হলেও সেটাই মেনে নিতে হতো। এখন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR), সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি, গোললাইন প্রযুক্তি—সবই এসেছে সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করার জন্য। তবুও বিতর্ক যেন কমার বদলে আরও দৃশ্যমান হয়েছে। কারণ প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু বিচার করতে পারে না।

একটি হ্যান্ডবলের ঘটনা ইচ্ছাকৃত কি না, কোনো ফাউল "রেকলেস" নাকি "এক্সেসিভ ফোর্স"—এসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো মানুষের। আর মানুষের বিচার মানেই ব্যাখ্যার সুযোগ থাকবে। সেই ব্যাখ্যার মধ্যেই জন্ম নেয় বিতর্ক।

বিশ্বকাপের মতো আসরে এই বিতর্কের মূল্য আরও বেশি। এখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত মানে শুধু একটি ম্যাচ নয়; একটি দেশের স্বপ্ন, একটি প্রজন্মের স্মৃতি, কখনো কখনো একটি কিংবদন্তির ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যেতে পারে। ফুটবলের ইতিহাস এমন ঘটনার অভাবে ভুগছে না।

১৯৬৬ সালের বিতর্কিত গোল, ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার "হ্যান্ড অব গড", ২০০২ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচগুলো নিয়ে প্রশ্ন, ২০১০ সালে ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের বৈধ গোল বাতিল হওয়া—এসব ঘটনাই শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি জোরালো করেছিল। কিন্তু প্রযুক্তি আসার পরও বিতর্ক শেষ হয়নি। বরং বিতর্কের ধরন বদলেছে।

আগে প্রশ্ন ছিল—রেফারি দেখলেন না কেন? এখন প্রশ্ন—VAR দেখে কেন সিদ্ধান্ত বদলাল না? আরেকটি প্রশ্নও উঠছে। VAR কি সত্যিই রেফারির সহকারী, নাকি ধীরে ধীরে মাঠের মূল রেফারিতে পরিণত হচ্ছে?

মাঠের রেফারি কয়েক সেকেন্ডে একটি সিদ্ধান্ত দেন। এরপর খেলা থেমে যায়। কানে নির্দেশ আসে। ভিডিও দেখা হয়। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল বিশ্লেষণ করা হয়। দর্শক অপেক্ষা করেন। খেলোয়াড় অপেক্ষা করেন। তারপর আসে সিদ্ধান্ত। এই অপেক্ষার মধ্যে ফুটবলের স্বাভাবিক ছন্দ অনেক সময় ভেঙে যায়।

গোল হওয়ার পর যে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত, সেটিও এখন অনেক সময় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সমর্থকেরা উদ্‌যাপন করার আগে আকাশের দিকে নয়, স্টেডিয়ামের বড় পর্দার দিকে তাকান—VAR চেক চলছে কি না। ফুটবল এমন খেলা ছিল না।

এখন আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠছে—বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের রেফারিদের মধ্যে সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা কি যথেষ্ট?
এক ম্যাচে একই ধরনের ট্যাকল লাল কার্ড। অন্য ম্যাচে শুধু হলুদ। কোথাও সামান্য ধাক্কায় পেনাল্টি, কোথাও একই ধরনের ঘটনায় খেলা চলতে থাকে। আইন একই হলেও ব্যাখ্যা যেন এক নয়।

ফিফার সামনে এটিও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বকাপে শুধু খেলোয়াড় নয়, রেফারিরাও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা, লিগ, ম্যাচ পরিচালনার ধরণ ভিন্ন। কিন্তু বিশ্বকাপে এসে প্রত্যাশা থাকে—সিদ্ধান্তের মান হবে অভিন্ন।

সমর্থকদের আরেকটি অভিযোগও অমূলক নয়। অনেক সময় VAR রুমের অডিও বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয় না। ফলে মানুষ সিদ্ধান্তটি দেখেন, কিন্তু সিদ্ধান্তের যুক্তি জানতে পারেন না। স্বচ্ছতা যত কম, সন্দেহ তত বেশি।

কয়েকটি খেলায় ইতোমধ্যে রাগবি ও ক্রিকেটের মতো খেলাধুলায় রেফারিদের সিদ্ধান্তের অডিও দর্শকদের শোনানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফুটবলেও ভবিষ্যতে এমন ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। এতে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হবে না, কিন্তু সিদ্ধান্তের যুক্তি অন্তত পরিষ্কার হবে।

তবে একটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। রেফারিরাও মানুষ। বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ পরিচালনার মানসিক চাপ কোনো অংশে খেলোয়াড়দের চেয়ে কম নয়। কোটি কোটি মানুষ দেখছেন। হাজারো ক্যামেরা প্রতিটি মুহূর্ত ধারণ করছে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত তাঁর পুরো ক্যারিয়ারের পরিচয় হয়ে যেতে পারে।

তাই সমালোচনা অবশ্যই হওয়া উচিত, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজকাল অনেক রেফারি ম্যাচ শেষে ঘৃণামূলক বার্তা, অপমান, এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও পান। এটি কোনোভাবেই খেলাধুলার সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।

ফুটবল আবেগের খেলা। কিন্তু আবেগ যদি বিবেচনাকে হারিয়ে ফেলে, তাহলে খেলাটির সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমাদের বিশ্বাস, আগামী দিনের রেফারিং আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অফসাইড শনাক্ত করবে, বলের গতিপথ বিশ্লেষণ করবে, হয়তো একদিন কিছু সিদ্ধান্তও সুপারিশ করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি বাঁশি বাজাবেন একজন মানুষই।

আর মানুষ ভুল করবে। প্রশ্ন হলো—ভুল শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব কি? সম্ভবত নয়। তবে ভুল কমানো সম্ভব। সিদ্ধান্তকে আরও স্বচ্ছ করা সম্ভব। একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যাখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব। রেফারিদের আরও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব। আর সবচেয়ে বড় কথা, প্রযুক্তিকে মানুষের সহকারী হিসেবেই রাখা সম্ভব—মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়।

বিশ্বকাপের আসল নায়ক হওয়ার কথা খেলোয়াড়দের। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা গোল, কৌশল, সাহস এবং সৃজনশীলতা। রেফারির নাম সংবাদ শিরোনামে যত কম আসে, ফুটবলের জন্য সেটাই তত ভালো।
কারণ একটি আদর্শ ম্যাচ শেষে দর্শক যেন বলেন—"কী দারুণ খেলল দলটি।" "রেফারি কী করলেন"—এই প্রশ্ন যেন মূল আলোচনায় পরিণত না হয়। ফুটবলের সৌন্দর্য সেখানেই।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন