https://www.prothomalony.com/
18133
literature
মাস তিনেক আগে আমি ও আমার বন্ধু সেলিম ঢাকা থেকে পারাবত ট্রেনে সিলেট ফিরছিলাম। পাশের বগি থেকে আমার কানে ভেসে এলো একটি গান—
‘‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী আমারে
কেউ ছুঁইও না গো সজনী’’।
বন্ধুর চোখ ফাঁকি দিয়ে সে বগিতে গিয়ে দেখি এক অন্ধ বাউল দোতারা বাজিয়ে গান গাইছেন, সাথে ১২/১৩ বছরের এক কিশোর। আমি তার পেছনে পেছনে ট্রেনের শেষ প্রান্তে চলে গেলাম। ততক্ষণে গানটি মুখস্থ করে ফেলেছি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে বন্ধুটি দেখল বাউলের পাশে বসে আমি গানটি শুনছি। আমি এসব গান পছন্দ করি। আমার খালাতো বোন শেফালী আপা আমাকে এ গানের ক্যাসেটটি উপহার দিয়েছিলেন। এরপর অনেক গান শুনেছি। যত শুনেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি। সে থেকে আমার হৃদয়ে অদৃশ্য প্রেম জাগ্রত হতে থাকল শাহ আবদুল করিমের ব্যাপারে। জানতে ইচ্ছা হচ্ছে তার জীবন, সৃষ্টি, তান্ত্রিক, আধ্যাত্মিক ও সুফি ভাবনাকে। যিনি সহজ কথার গাঁথুনিতে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার জাল বুনে, একাধারে হাওর, নদী ও জীবনঘনিষ্ঠ, দেহতত্ত্ব, বাউলতত্ত্ব, বিচ্ছেদ, ধামাইল, গণসংগীত, রাজনীতি, আল্লাহ, নবী ও ভাটির মানুষের দুঃখ-দুর্দশার গন্ধসুধা গায়ে মেখে একের পর এক গান রচনা করেছেন। সুর দিয়েছেন নিজে, দরাজ কণ্ঠে গেয়েছেন এসব গান দেশে ও বিদেশে। কোথায় নেই তার বিচরণ? কে জানত? ১৯১৬ সালে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া অবহেলা আর ক্ষুধার যন্ত্রণায় বেড়ে ওঠা এই শিশুটিই পৃথিবীর আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে। তিনি তার গাঁথুনি ও সুরমাধুর্যের সৌরভ ছড়িয়ে সারা বিশ্বের মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তারই আঙিনায়।
দিনটি ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি, কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম আর নাইয়রজান বিবির কোলজুড়ে এলো প্রথম সন্তান। তার নাম আবদুল করিম। দাদা নসীব উল্লাহ ফকির জিকিরে মগ্ন থাকতেন। উদ্দেশ্য ছিল আত্মসাধন। তিনি ছিলেন শান্তমতি, ত্যাগী, ঊর্ধ্বগতি ও জ্ঞানী। দাদার আদর্শে স্নেহভরা কোল জুড়েছিল এই শিশুটি। দাদার মুখে শোনা এই গানটি তার কচি মনে দোলা দেয়—
“ভাবিয়া দেখ মনে,
মাটির সারিন্দানে বাজায় কোনজনে”।
হাওর-বাওড়, খাল-বিল, কালনীর ঢেউ, ভাটির গানের হোগলা-হিজল, নলখাগড়া, হাওরে কচু, শাপলা, সিঙাড়া, কোড়া-সারসের কিচিরমিচির শব্দের সাথে যেন সখ্য গড়ে তুলে দিনে দিনে বেড়ে উঠেছেন। অভাব যেন তার নিত্যসঙ্গী। অর্ধাহারে, অনাহারে আবার কখনোবা কেবল পানি খেয়ে দিনাতিপাত করেছেন। জীবিকার অন্বেষণে রাখালের চাকরি করেছেন এই বালক। তিনি মুরিদ হলেন সুনামগঞ্জের মৌলা বক্স মুন্সীর কাছে। তখন জানলেন পীর-মুর্শিদ ভজতে হলে নিজেকে জানতে হয়। পেতে চাইলেন মুর্শিদের সন্ধান। গুরু বলেন, আগে নিজের মন ঠিক করো, পরে এ কাজে ব্রতী হও। তবেই পাবে তার দেখা, সে দূরে নয়। আশিক হয়ে খুঁজলে মাশুকপুরে তার সন্ধান মিলবে। তিনি আরো বলেন—
“ঘুরতে ঘুরতে মন যেথায় গিয়ে রয়,
তথায় তোমার প্রাপ্য বস্তু জানিও নিশ্চয়”।
বাউলগান বাউলদের ধর্মসাধনার অঙ্গ। বাউল সাধকগণ আধ্যাত্মিক পিপাসা নিবারণ করে গান গেয়েও রচনা করেন। বাউলগানের মূল চালিকাশক্তি সাঙ্গীতিক চেতনা, ধর্মীয় আবেগ ও আত্মোন্নতির বাসনা। বাউল আত্মভোলা বিবাগী, ঘরছাড়া বৈরাগ্যপন্থী মানুষ। তারা একতারা হাতে মাঠে-ঘাটে পথে-প্রান্তরে খুঁজে বেড়ায় মনের মানুষকে। বাবরি চুলে আবার কখনো ঝুঁটি বেঁধে হৃদয়বিহারী এই বাউল খুঁজে চলে আশিকের ধন পরশ রতনকে। বাউলরা ভাবের পাগল। কেতাব-কোরআন মানে না নবীর তরিকা ছাড়া, আবার যারা চন্দ্রভেদী তারা পঞ্চরস সাধন করে। আধ্যাত্মিক ধারায় পরমাত্মাকে পাওয়ার জন্য ভক্তের মধ্যে যে আকুলতা, ব্যাকুলতা লক্ষ করা যায় তাতেই ‘‘আকুল থেকে আউল’’ আর ‘‘ব্যাকুল থেকে বাউল’’ হওয়ার বিষয়টি চিন্তা করা যায়। তারা বেদ-কোরআন, মন্দির, মসজিদ, ভজন-সাধন, নামাজ-উপাসনা ইত্যাদি শাস্ত্রীয় ধর্মের রীতিনীতির বিরোধিতা করে। তারা সহজ পথে আরাধ্যকে পাওয়ার সাধনা করে। লিখিত কোনো শাস্ত্র নেই। গানের ভাষায় তারা ধর্মের কথা প্রকাশ করে। বাউল হতে হয় গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে। বাংলার অতি সাধারণ মানুষ হৃদয় দিয়ে বাউলভাব লালন করেছে। বাউলরা মানুষ ধরার মন্ত্র জানে। তারা ‘‘ভাবের মন্ত্রে প্রেমের মন্ত্রে’’ মজাত কৃষক, মজুর এবং সাধারণ শ্রেণির শত শত মানুষকে। এটাই তাদের শক্তির উৎস। তারা মুক্ত মন ও স্বাধীন চিন্তার অধিকারী, তারা হলো, “বিহারী অচিন পাখিকে ধরিতে চেষ্টা করিয়া মনের মানুষকে মর্মে দিয়া জানিতে চায়।” প্রেমময় পরশ রতন লভিতে নিজেকে উদাসীন করেছেন ভাবজগতে। তারা বৈরাগ্যপন্থী বলে বাউলগানের প্রধান সুর কান্নার। উদাসী বাউল সর্বস্ব ত্যাগ করে একদিকে মনের মানুষের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। না পাওয়ার চিরন্তন বেদনা বাউলের দেহ, মন ও আত্মাকে ভারাক্রান্ত করে তোলে, তাই বাউলগানের মূল সুর কান্নার; বাউল, সুফি ও বৈষ্ণবের এই কান্না কখনো থামার নয়। বাউলরা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী। আজ তার দেহ নেই, তবে রেখে গেছেন তার নিঃশ্বাস-স্পন্দন অসংখ্য ভক্তানুরাগীর জন্য। তাই প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত ও সংগীতপিপাসুদের পদচারণায় মুখরিত উজানধল গ্রাম। আমি সে লোভ সামলাতে না পেরে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ তারিখে ছুটে গেলাম সুনামগঞ্জের মরমি কবি হাছন রাজার মিউজিয়ামে। প্রবেশপথেই দেখলাম, প্রথমেই হাছন রাজার গানের উৎসবের সংগীতে বিভোর বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের জীবন্ত একখানা ছবি। ছবির সামনে দাঁড়িয়ে দুচোখ বুলিয়ে দেখলাম এবং কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম ছবির পাশে। নিজের অজান্তে কখন যে দুচোখ বেয়ে অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে তা টের পাইনি। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালাম মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা সামারিন দেওয়ানকে এত সুন্দর একটি ছবি সম্মুখে রাখার জন্য। ছোটবেলার সে লালিত স্বপ্নটি আমাকে আরো ব্যাকুল করে তুলেছে। এখানেই শেষ নয়, পাশের দেয়ালেই আর্ট করা রয়েছে মরমি কবি হাছন রাজার বিরাট একটি ছবি, সমস্ত কক্ষজুড়েই রয়েছে তার ব্যবহৃত বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী।
পরদিন গেলাম শাহ আবদুল করিমের গ্রামের বাড়িতে। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না আমি তারই বাড়িতে! শ্রদ্ধা জানালাম সে মাটিকে, যেখানে শায়িত আছেন শাহ আবদুল করিম। আমি মুগ্ধ হলাম তারই একমাত্র সন্তান শাহ নূর জালাল ও তার সহধর্মিণীর হৃদয়স্পর্শী ভালোবাসায়। শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা যে রোবটে পরিণত হয়েছি, তা এই ভাটির মানুষের সান্নিধ্যে না আসলে বোঝার সাধ্য নেই। আমি অধীর আগ্রহে জানতে চাইলাম তার আরো কিছু। তার একমাত্র পুত্র নূর জালাল বললেন, বাবা এগারো দিন ছিলেন পানি না খেয়ে, আর চল্লিশ দিন চিল্লায় থাকতেন, কেবল দুধ আর হালকা খাবার খেয়ে। তিনি প্রায় সময় গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। কারো সাথে কোনো কথাই বলতেন না। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণসংগীত, সমাজে নিপীড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন তার গানে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম তার কথাগুলো।
মরমি ধারায় যেসব বাউল কবি বাঙালির চিন্তাভাবনা ও দর্শনে লোকসাহিত্যের সমন্বয় ঘটিয়েছেন, বাউলসম্রাট ‘‘শাহ আবদুল করিম’’ তাদের অন্যতম। তিনি ২০০০ সালে রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পদক, ২০০১ সালে একুশে পদক, ২০০৪ সালে মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, ২০০৫ সালে নিউইয়র্ক হাছন রাজা লোক উৎসব সম্মাননা, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আজীবন সম্মাননাসহ আরও অনেক সম্মাননা ও পদক পেয়েছেন।
‘‘কোন মিস্ত্রি নাও বানাইছে কেমন দেখা যায়’’, বিকেলে এই গানটি শুনলাম মনোযোগ সহকারে। চমৎকার উপস্থাপনা। এরপর শাহ আবদুল করিমের আরও কিছু আমার প্রিয় গান শোনালেন তারই শিষ্য ড. কাইয়ুম, উবেদ পাগলা, দুখু মিয়া, শাহ নূর জালাল, শ্যামলা ও অনেকে। বাউল ঢঙে নেচে-গেয়ে বাড়ির মহিলারা আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করেছেন। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে তেজোদীপ্ত শরীরে ফর্সা ত্বক আর সাদা চুলের অধিকারী অসাধারণ রূপের পুরুষটিকে আর কেউ দেখতে পাবে না। তবে তার সৃষ্টির সাগরে ডুব দিলেই আমরা খুঁজে পাব এই প্রেমের মানুষটিকে। শুনে দুঃখ পেলাম যে তার জীবনের বড় স্বপ্ন ছিল, তার বাড়িতেই ‘‘শাহ আবদুল করিম সংগীতালয়’’ হবে। অর্থের অভাবে আজ সেই সংগীতালয়টি অসমাপ্ত রয়ে গেছে। বিভিন্ন খাতে যা অনুদান পেয়েছেন তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। অন্তত আমরা সংগীতপ্রিয় মানুষগুলো কি পারি না, দেশ-বিদেশের ভক্তের হৃদয় কাঁপানো বাউলসম্রাট ‘‘শাহ আবদুল করিমের’’ শেষ ইচ্ছানুযায়ী তার অসমাপ্ত সংগীতালয়ের কাজটি সম্পন্ন করতে? আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই সংগীতালয়ের কার্যক্রম শুরু হলে এখানে শুদ্ধ বাউলগানের চর্চা হবে। দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত ছুটে আসবে বাউলগান শুনতে এবং গবেষণা করবে নবীন বাউলরা।
১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ সকাল ৭ টা ৫৮ মিনিটে অগণিত ভক্ত, শিষ্য আর সংগীতপ্রিয় মানুষগুলোকে শোকসাগরে ভাসিয়ে হৃদয়সম্রাটের জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হলো। এই ক্ষণজন্মা পুরুষটি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, হয়তো আমার মতো অনেক ভক্ত ও অনুরাগী তাকে একনজর দেখা থেকে বঞ্চিত হতো না। তিনি যুগে যুগে অমর হয়ে থাকবেন ভক্তের হৃদয়ে তারই সৃষ্টির মাধ্যমে। হয়তো নিজের জন্যই লিখেছিলেন—
‘‘কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি,
কেমনে রাখিব তোর মন
আমার আপন ঘরে বাঁধি”।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন