https://www.prothomalony.com/

17432

literature

সাহিত্য

বাবা দিবস সংখ‍্যা

প্রথম পাতা

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ ০৩:০৪

আমার প্রিয় বাবা 

সুমন শামসুদ্দিন

একটা বটবৃক্ষের নিচে ছিল বাস, যাপন ছিল নিশ্চিন্ত। তার ছায়াতল ছিল নির্ভরতায় সুশীতল। বৃক্ষশাখার ঘামসম বর্ষণে ফলতো আহার। বটবৃক্ষটি শেখাতো সকল যাপনশিখার অগ্নিবিদ‍্যা, সুশিক্ষার নিমিত্তে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। বয়সের ভার আর পরিশ্রমের আদিচিহ্ন তার বাকলে, শাখায়, পাতায়, অথচ নিজের যত্নে উদাসীন বৃক্ষের আদ‍্যপান্ত চিন্তাই তার ছায়াতলের পরিজনবর্গের দেখভাল।

 

জীবনের পংকিল ও বন্ধুর পথে সৎ ও সততা ছিল বটবৃক্ষের মূল পথিকৃৎ। ঝড় মাদলে আড়ালে রাখতেন পরিবারের শাখা-প্রশাখার প্রতি অঙ্গকে। নিঃস্বার্থ বটবৃক্ষ ছিলেন প্রতিটি পদক্ষেপে অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস। 

কাব‍্যচেতনায় বটবৃক্ষ ছিলেন ঋদ্ধ, যদিও তার মূল্য বুঝতে গত হয়েছে অন্তর্ধান পর্ব। ফলবান বৃক্ষের আয়ুস্কাল শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়েছে তার প্রাণবায়ু। অপূরনীয় তার অভাব, যিনিই আমার প্রিয় বাবা।

 

 

আব্বাকে মনে পড়ে 

অনিক খুরশীদ 

আমার জীবনে আব্বা ছিলেন বটবৃক্ষের ছায়া। সাধ্যমতো তিনি আমার প্রতিটি আবদার পূরণ করেছেন। যখনই কোনো কঠিন সমস্যায় পড়ে তীব্র দুঃশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়েছি, তখনই আব্বার মাথায় রাখা ভালোবাসার হাত আর আশ্রয় আমাকে সাহস জুগিয়েছে। তাঁর পরম ছায়ায় আমার সমস্ত বিপদ আর মানসিক টেনশন মুহূর্তে দূরে পালিয়ে যেত।  সহজ সরল এবং সৎ-সাধারণ জীবন যাপন করা আব্বার কোন উচ্চাকাঙ্খা ছিলো না। তিনি ছিলেন আমার বন্ধুর মতো; অনেক কিছু শেয়ার করতাম, আব্বাও নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। আব্বা বলতেন, "সৎ পথে থাকবা, অন্যের হক মাইরা খাইবা না, সময়ের যথাযথ ব্যবহার করবা। এগুলো মাইনা চললে জীবনে কোথাও ঠেকবা না।" 

আজ আব্বা নেই; খুব মনে পড়ে। তাঁর  কথাগুলো আমার জীবনে চলার পথে পাথেয় হয়ে মিশে আছে; থাকবে যতোদিন বেঁচে থাকি। 

 

 

বাবা মানে বিশাল বটবৃক্ষের ছায়া 

এস ডি সুব্রত

পরিবারের সুখ-দুঃখ ও আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থল হলেন বাবা। পাহাড়ের মতো স্থির থেকে, সমস্ত দায়িত্ব মাথায় নিয়ে নিজের সুখের কথা না ভেবে সন্তানকে গড়ে তোলেন তিনিই। বাবা একা খেতে গেলে কমদামি হোটেলের খাবার বেছে নেন, হেঁটে বা বাসে চড়ে পয়সা বাঁচান। অথচ স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বের হলে ভালো গাড়ি আর দামি হোটেলের ভালো খাবার অনায়াসে বেছে নেন। নিজের কাপড় কেনার জন‍্য ভীষণ কিপটে, কিন্তু পরিবারের জন্য তিনি বেহিসাবি। বাবা হলেন বিশাল বটবৃক্ষের ছায়া। পৃথিবীতে খারাপ পুরুষ থাকতে পারে, কিন্তু খারাপ বাবা নেই। বাবা দিবসে কামনা—সব বাবা যেন শেষ বয়সে সন্তানের স্নেহ-ভালোবাসায় কাটাতে পারেন। কোনো বাবার জায়গা যেন কখনো কোনো বৃদ্ধাশ্রমে না হয়।

 

 

বাবা 

আবু জুবায়ের

বাবা মানে উপন্যাসের সেই বিশাল বটবৃক্ষ-টৃক্ষ গোছের কিছু নয়। আমাদের মধ্যবিত্ত সংসারে বাবা মানে হলেন সেই মানুষটি, যিনি খবরের কাগজ পড়ার সময় চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে রাখেন, আর অকারণে ঘুরঘুর করে ঘরের বাড়তি ফ্যান বা লাইট বন্ধ করে বেড়ান। বাজার থেকে সেরা মাছটা কিনে এনে এমন ভাব করেন যেন ভারী সস্তায় পেয়ে গেছেন!

ভালোবাসার কথা তিনি মুখে বলতে পারেন না, বড়জোর ধমক দিয়ে বলেন, "পড়াশোনাটা কি একেবারে শিকেয় উঠল?" বাইরে থেকে ভীষণ কড়া, কিন্তু সন্তানের জ্বর হলে রাতের বেলা সন্তর্পণে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া মানুষটার নামই বাবা। খুব সাধারণ, একটু গম্ভীর, অথচ পুরো সংসারের আসল খুঁটিটা ওই মানুষটাই।

 

আমার বাবা 

নূরজাহান শিল্পী 

আমার কাছে বাবা মানে এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় আমি নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত থাকি। জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে বাবা শক্তির উৎস হয়ে পাশে দাঁড়ান। তিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। বাবার ভালোবাসা অনেক সময় প্রকাশ পায় না, কিন্তু তাঁর প্রতিটি ত্যাগ ও পরিশ্রমের মধ্যেই সেই ভালোবাসার গভীরতা লুকিয়ে থাকে। তিনি আমাদের জীবনের পথপ্রদর্শক, সাহসের প্রতীক এবং নির্ভরতার আশ্রয়স্থল। ঝড়-ঝাপটা যতই আসুক, বাবার স্নেহ ও আশীর্বাদ আমাদের এগিয়ে যেতে শক্তি জোগায়। তাই আমার কাছে বাবা শুধু একজন মানুষ নন, তিনি একটি ছায়াদানকারী বটবৃক্ষ।

 

 

বাবা

সুফিয়া ডেইজি 

বাবার অবস্থান জন্মগতভাবেই শীর্ষে। একটি শিশুর বেড়ে ওঠা থেকে স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত সব খেয়াল রাখেন তিনি। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে, শারীরিক ও মানসিক চাপ মেনে নিয়ে সন্তানের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়েন বাবা। সন্তানের বেড়ে ওঠার সাহস ও শক্তি তিনিই। কন্যাসন্তানকে মায়ের মতো আগলে রাখেন, আর পুত্রসন্তানকে নিজের আদর্শে গড়ে তোলেন। ছেলের জন্য নিজের কাঁধ এগিয়ে দেন। তবে ব্যতিক্রমও আছে; কিছু বাবা জন্ম দেন ঠিকই তবে দায়িত্ব নেন না বা দায়ভার নিলেও আক্রমণাত্মক হন, কখন উপার্জন করে খাওয়াবে সেই আশায় থাকেন। আবার কেউ কেউ দূরে চলে যান। 

বাবা মায়ের স্থান দুনিয়ার সব চাহিদার উপরে। তাই সন্তান হিসেবে বাবার প্রতি খেয়াল রাখা এবং বাবার যত্ন করা প্রতিটি সন্তানের কাম্য।

 

 

বাবা: মহান শিক্ষক 

সৈয়দ নূরুল আলম 

জন্ম থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যদি কোনো শিক্ষকের নাম বলতে হয়, তা হলে সবার আগে এবং একমাত্র বাবার নামই সামনে চলে আসে। প্রচলিত অর্থে শিক্ষক বলতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা শিক্ষা দেন তাঁদের কে বুঝায় কিন্তু সেটা আর কতদিন? জীবনের একটা খণ্ডাংশে। আর বাবা, জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি শিক্ষা দিয়ে, নির্দেশনা দিয়ে, সমস্ত মমতা ঢেলে জীবনকে তৈরি করতে  সহায়তা করেন। বাবার কাছে সন্তান কখনও বড় হয় না।  বাবা কোনটা ঠিক, কোনটা ঠিক নয়, সে শিক্ষা দিয়ে সন্তানের জীবনকে সুন্দর-সার্থক ও মানবিক করে তোলেন। 

 তাই সব কিছু ছাপিয়ে বাবা আমার কাছে একজন  মহান এবং নিবেদিত শিক্ষক।

 

 

 

বাবা মানে 

দিল মোহাম্মদ 

যার মাথার উপর বটবৃক্ষ নেই সে-ই জানে ছায়াহীন ধুধু উত্তপ্ত কেমন তপ্ত দুপুর। মুষলধারের ঝড়ো ঝাণ্ডার কেমন বাদলা দিন। বাবা মানে সেই বটবৃক্ষ;সেই অকৃত্রিম উদ্দাম,উচ্ছ্বাস,সাহসের পটভূমি। 

বাবারা যদিও সবাই তেমন রাজা না কিন্তু সবার কাছে তাদের সন্তান-সন্ততি রাজপুত্র, রাজকন্যা; জগত সেরা হাসি আনন্দের কচিকাঁচা মুখ, পরম সুখ-সমৃদ্ধির আদর গেলা ঠোঁট। বাবা মানে দৃঢ় বক্ষের আয়তনহীন প্রসস্থ সু-নিরাপদ অতুল খেলার মাঠ। কড়া শাসন ও নিরাপত্তার অপ্রতিরোধ্য মজবুত ভিত্তি। 

বাবা মানেই- বাবা; তুলনাহীন ভালোবাসার অনন্তহীন এক উজ্জ্বল সাফল্যমণ্ডিত পরম আপন ত্যাগ ও তিতিক্ষার বৃহত্তর শাখা। বাবা মানে- সে আমার বাবা। যার হস্ত ধরে ঝুলে আছি আমি, আমার শৈশব, কৈশোর,অস্তিত্বকাল। 

 

 

বাবা মানে নির্ভরতার জায়গা

শামছুন ফৌজিয়া

একটা সংসারে বাবা থাকা মানে নির্ভরতার জায়গা।বাবারা সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করেন। নিজেদের শখ, ইচ্ছাগুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে স্ত্রী,সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের চাহিদাগুলোকে প্রাধান্য দেন। নীরবে নিভৃতে মোমবাতির মতো আলো দিতে গিয়ে নিজেকে রোগ শোকে পিষ্ট করে ফেলেন। অনেক বাবা সন্তানের জন্য রাত জাগতে জানেন, যত্ন নেন। বাবাহীন সন্তানের জীবন অনিরাপদ, অনিশ্চিত যাত্রা। সন্তানের সাফল্যে বাবারা গর্বিত হন, এর পেছনে রয়েছে জনকের ঘাম ঝরানো উপার্জন এবং ভালোবাসা। বাবা নেই বলে বোধহয় বাবাকে আরো বেশি ভালোবাসি। যখন কোন বিপদ আসে, কষ্টের সময়ে বাবাকে খুব মনে পড়ে । মেয়েদের জীবনে প্রথম ভালোবাসার মানুষের নাম বাবা।রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগীরা।

 

 

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ আমার আব্বু 

গোলাম সরোয়ার 

শৈশব থেকেই আমরা চার ভাই আব্বুকে ভীষণ ভয় পেতাম, পড়ার জন্য মারও খেয়েছি। তবে বরাবর দোষ আমারই ছিল। নিজে কষ্ট করেও তিনি আমাদের সব প্রয়োজন পূরণ করতেন। অসুস্থ শরীরেও চাঙ্গা মনোবল আর অমায়িক হাসি নিয়ে সবার উপকারে এগিয়ে যেতেন তিনি। আজ নিজে বাবা হওয়ার পর বুঝেছি তাঁর ভালোবাসা কতটা গভীর ছিল। 

আব্বুর চলে যাওয়ায় আমার চেনা পৃথিবীটা ভেঙে পড়েছিল। বিদায়বেলায় তাঁর শান্ত, হাস্যোজ্জ্বল মুখটি আজও চোখে ভাসে এবং প্রতি রাতে কাঁদায়। জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট—আব্বুর সাথে আর কোনোদিন কথা হবে না, তাঁকে কিছু দেওয়ার সুযোগ পাব না। তাঁর উপদেশ আজও খুঁজে ফিরি। মহান আল্লাহ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ আব্বুকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন। আমিন।

 

 

বটবৃক্ষের ছায়া 

রাহেলা আক্তার

বাবা ছিল আমার কাছে বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়া। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকলেও বাবার ছায়া আমার সঙ্গে থাকতো সব সময়। একদিন বাবার ইচ্ছায় এতিম-মিসকিনদের খাওয়ানোর আয়োজন করি। সেদিন রাতেই বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়। পরদিন সকালে বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। বাবাকে আইসিইউতে রেখে জরুরি অফিসের কাজে কক্সবাজার যেতে হয়। কাজ শেষে পরদিন ফিরে যাবো কিন্তু গভীর রাতে ছোট ভাইয়ের ফোনে জানতে পারি, বাবা আর নেই। 

খবর শুনে পৃথিবী যেন অন্ধকার হয়ে যায়। আজও মনে হয়, বাবার শেষ সময়ে পাশে থাকতে না পারার কষ্ট আমায় প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। মাথার উপর ছায়া আর পায়ের নিচের মাটি হারিয়ে গেছে চিরতরে। 

 

 

বাবা মানে 

এস এ বিপ্লব

জন্মের পর বাবাকে তেমন একটা কাছে না পেলেও আমি বুঝি বাবা কী। আমার কাছে বাবা মানে বটবৃক্ষ, ভরসা, উৎসাহ আর অসীম সাহস। বাবা না থাকার যন্ত্রণা আমি প্রতিনিয়ত অনুধাবন করি। 

বাবা মানেই সন্তানের জন্য সব উজাড় করে দেওয়া এবং একাই পুরো পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া। অভাব ও বিপদেও বাবা কখনো পর হন না। নিজে অক্লান্ত কষ্ট করে, সব আড়াল করে তিনি হাসিমুখে বলেন—"আমার মতো এত সুখী নয়তো কারও জীবন!" আবার বাবার করে যাওয়া আশ্রয়ে যখন সন্তান আরাম-আয়েশে একই কথা বলে, তখন দুই হাসির পেছনের ত্যাগের পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাবার বিশ্বাসেই একদিন সন্তান ঠিকই নাম করে।

 

 

আমার বাবা

শাহানাজ মিজান

ছোটবেলায় মনে হতো- আলাদীনের চেরাগের দৈত্যের মতো আমার বাবাও আমার সব ইচ্ছে পূরণের সেই দৈত্য।

বাবা মানে, আমার কাছে সীমাহীন আকাশ, কিংবা গভীরতম সমুদ্র, কিংবা এভারেস্টের মতো উচু পর্বত, কিংবা তাজিংডং- এর মতো অটল পাহাড়। বাবা আমার কাছে, কচি কচি সবুজ পাতা ভরা বটগাছের শীতল ছায়া, সদ্য উদিত সূর্য রাঙা সকাল, গোধূলি বিকেল, কিংবা জোনাক জ্বলা সন্ধ্যা- সর্বোপরি  বাবা ছিলেন আমার সমস্ত পৃথিবী।

আজ পাঁচ বছর হলো আমার ইচ্ছে পূরণের দৈত্যটা হারিয়ে গেছে। মাঝেমাঝে নিজেকে ভীষণ একা আর অসহায় মনে হয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করি "রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বিইয়ানী সাগীরা"

 

 

 

বাবার তুলনা হয় না 

হাসান মুসান্না মিশু 

আমাদের জীবনে বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একজন মানুষ। কারো জীবনে বাবা বর্ষার ছাতার মত। কারো জীবনে বটবৃক্ষের মতো। কেউ মনে করে বাবা হচ্ছেন আকাশে জ্বলে থাকা দেদীপ্যমান সূর্য। যার অনুপস্থিতিতে পুরো পৃথিবীটাই যেন আঁধারের মহাসম্মেলন। 

বাবা মানেই একটা সুন্দর সকাল। আনন্দময় দিন, চিন্তামুক্ত জীবন। অর্থ কষ্টের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়ে পরিবারের সকলের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে বাবার নিরন্তর সংগ্রাম অস্বীকার করার মত এমন দুঃসাহস নেই। বৃষ্টিতে ভিজে রোদে পুড়ে, রক্ত মাংস এক করে উপার্জন করে  অপেক্ষাকৃত মন্দ জিনিসটাকে নিজের জন্য রেখে উৎকৃষ্ট সবটুকুই পরিবারে বিলিয়ে দেয়া মানুষটিই বাবা। দোয়া করি বাবা আপনি রবের রহমে থাকুন প্রতিনিয়ত। ভালবাসি বাবা।  

 

 

বাবা

শেখ একেএম জাকারিয়া 

আমার মতে বাবা মানে শুধু একজন অভিভাবক নন, তিনি পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা ও শক্তির উৎস। বাবা সেই মানুষ, যিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। তাঁর ভালোবাসা অনেক সময় প্রকাশ পায় না, কিন্তু প্রতিটি কাজে তা অনুভব করা যায়। তিনি বিপদে সাহস দেন, ভুল হলে শাসন করেন এবং সঠিক পথে চলার শিক্ষা দেন। বাবা মানে ত্যাগ, দায়িত্ব, সততা ও আদর্শের প্রতীক। পরিবারের সুখের জন্য তিনি নীরবে অনেক কষ্ট সহ্য করেন। তাই আমার কাছে বাবা একজন জীবন্ত আশ্রয়, যাঁর স্নেহ, পরামর্শ ও ত্যাগ আমাদের জীবনকে সুন্দর ও সফল করে তোলে।

 

 

বাবা পরিবারের শক্ত ভিত্তি

সাঈদুর রহমান লিটন

বাবা শুধু একটি সম্পর্কের নাম নয়, তিনি পরিবারের শক্ত ভিত্তি ও সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়। সন্তানের সুখ, শিক্ষা ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একজন বাবা নিরলস পরিশ্রম করেন। তাঁর ত্যাগ, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে যায়। অনেক সময় তিনি কঠোর মনে হলেও তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে সন্তানের মঙ্গল কামনা। সন্তানের সাফল্যে তিনি আনন্দিত হন এবং ব্যর্থতায় সাহস জোগান। বাবার ভালোবাসা সব সময় প্রকাশ পায় না, কিন্তু তা গভীর ও নিঃস্বার্থ। তাই বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য।

 

 

বাবারা এমনি

রওশন মতিন

বাবা যেন এক মহীরুহ বটগাছ, যার ছায়ায় আমরা আশ্রিত। কোমলে-কঠিনে মেশানো আদর্শ শিক্ষক ছিলেন তিনি। পড়াশোনায় উৎসাহ দিতে আমাদের অজান্তে গৃহশিক্ষকের হাত দিয়ে পুরস্কার পাঠাতেন, যা প্রায়ই আমি জিততাম। জ্ঞানার্জন, খেলাধুলা ও সততার পাঠ দিয়ে বাবার হাত ধরেই বিশাল পৃথিবীর পথে হাঁটতে শিখেছি। মহৎ ও পরিশ্রমী এই মানুষটি নিজের চোখে আমাদের বিশ্বকে দেখতে শিখিয়েছেন। শৈশব -কৈশোরের সেই একাগ্রতা, জ্ঞানার্জনের আগ্রহ,নীতি-আদর্শের, জীবন ও জগতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী -সব কিছু বাবা

অন্তরে জাগিয়ে দিয়েছেন।

"সংসার মাঝে কয়েকটি সুর, রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর, তারপর ছুটি নিব"—লাইনটির মতোই বাবা সংসার থেকে ছুটি নিয়েছেন সত্য, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও পথনির্দেশনা আমাদের আত্মায় চিরজাগ্রত থাকবে। ওপারে নক্ষত্রলোকে বাবা ভালো থাকুন।

 

 

 

                    দ্বিতীয় পাতা 

চেরি ব্লসমের সেই না-ফোটা ফুল

রোকেয়া দীপা 

সব অনুভূতি কি আসলেই লিখে বোঝানো যায়? কিছু কষ্ট বুকের ভেতর এমন এক পাথর হয়ে জমে থাকে, যা কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব না। আজ যখন চারপাশের এই চেনা পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হই, বড্ড একা লাগে। মনে হয় মাথার ওপর থেকে পরম শান্তির সেই বটগাছটি আচমকা হারিয়ে গেছে। এখন আর আগের মতো নিশ্চিন্তে থাকা যায় না, মনের অবুঝ আবদারগুলো নিয়ে ছুটে যাওয়ার মতো কোনো মানুষ নেই।

 

​মাঝেমধ্যেই আমি একা একা 'মুলান' ছবিটা দেখি। অনেকবার দেখেছি, কিন্তু যতবারই দেখি, অজান্তেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। পর্দার সেই বাবা আর মেয়ের নিখাদ সম্পর্কটার দিকে তাকিয়ে আমি আসলে আমার বাবাকে খুঁজি। ছবিতে যখন দেখি, সমাজের সব নিয়ম আর ব্যর্থতার গ্লানি মাথায় নিয়ে মুলান যখন মন খারাপ করে বসে থাকে, তখন তার বাবা তাকে বকুনি না দিয়ে পরম মমতায় কাছে টেনে নেন। চেরি ব্লসম গাছের নিচে বসে বাবা যখন একটি না-ফোটা ফুলের কলি দেখিয়ে মুলানকে বলেন, "এই ফুলটি ফুটতে একটু সময় নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যখন এটি ফুটবে, তখন সব ফুলের চেয়ে সুন্দর হবে,"-তখন আমার বুকটা হাহাকার করে ওঠে। 

বারবার মনে হয়, আমার বাবাও তো আমার প্রতিটা ব্যর্থতায়, আমার মন খারাপের দিনে ঠিক এভাবেই আমার শক্তির উৎস হয়ে উঠতেন। সারাজীবন তিনি আমাকে নিজের ছায়ার মতো আগলে রেখেছিলেন, নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিলেন।

​ছবির সেই দৃশ্যটা আমাকে সবচেয়ে বেশি কাঁদায়, যেখানে বাবা অসুস্থ জেনেও মেয়েটি নিজের নারীত্ব লুকিয়ে, চুল কেটে, বাবার বর্ম আর তলোয়ার নিয়ে রাতের অন্ধকারে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। বাবার জীবন বাঁচাতে মেয়ের এই যে ব্যাকুলতা, তা দেখার পর নিজের ভেতরের আক্ষেপটা আরও দ্বিগুণ হয়ে যায়।

 

​আমার একটা বিরাট আক্ষেপ থেকে গেল-বাবার জন্য আমার তেমন কিছুই করা হলো না। বাবা, তুমি এত তাড়াতাড়ি কেন চলে গেলে? এই প্রশ্নের উত্তর আজও আমি খুঁজে পাই না। আজ আমার এত ইচ্ছে করে তোমাকে একটা বার শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে, মনের জমানো সব কথা বলতে, কিন্তু আমি চাইলেও তা পারি না। ছবির শেষে মুলান যখন যুদ্ধ জিতে সম্রাটের দেওয়া সব রাজকীয় উপহার বাবার পায়ে সমর্পণ করে, তখন তার বাবা সেই উপহার দূরে সরিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, তার মেয়েই তার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। 

 

আমার আজ উপহার দেওয়ার মতো কিছু নেই বাবা, শুধু তোমাকে জড়িয়ে ধরার এই অপূর্ণতা, এই শূন্যতা বোধহয় সারাজীবনই আমার বুকে এক নীরব হাহাকার হয়ে থেকে যাবে।

​বাবা, তুমি হয়তো আজ শারীরিকভাবে আমার পাশে নেই, আমি তোমাকে ছুঁতে পারি না, তোমার ডাক শুনতে পাই না। কিন্তু আমি জানি, আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, আমার ভালো থাকায় আর আমার স্মৃতির পাতায় তুমি চিরকাল বেঁচে থাকবে। আমি বিশ্বাস করি, ওপর থেকে তুমি এখনো আমাকে দেখছ। তোমার দেওয়া শিক্ষা আর ভালোবাসা আমাকে আজীবন পথ দেখাবে। চেরি ব্লোসম- এর সেই না-ফোটা ফুলটির মতোই আমি একদিন তোমার গর্ব হয়ে ডালপালা মেলব বাবা। ওপারে অনেক ভালো থেকো আমার প্রিয় বাবা। তোমার মেয়ে তোমাকে খুব ভালোবাসে।

 

 

আব্বা, আমার সুদূর পারের গান

ফরিদা ইয়াসমীন 

একটা সময় ছিল যখন ভাবতাম, বাবা মা না থাকলে মানুষ বেঁচে থাকে কিভাবে? কালের পরিক্রমায় আজ বাবা-মা কেউ নেই কিন্তু দিব্বি বেঁচে আছি আমরা এই পৃথিবীতে!

তাদের নিয়ে এক পৃথিবীর সুখ স্মৃতি আছে সে সব ভেবেই যাপিত জীবন পার হয়ে যায়।

একসময় দেশে ছিলাম এরপর চলে আসি আমেরিকা। দেখা-সাক্ষাৎ কমে যায় কিন্তু ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়।

আমি আমেরিকা চলে আসার পর  আব্বা আমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। আমি  কবে দেশে ফিরবো। যেদিন বলতাম আব্বা আমি দেশে আসবো-সেদিন থেকেই তার দিন গণনা করা শুরু হতো। ক্যালেন্ডার এ দাগ দিয়ে রাখতেন। প্রতিদিন গুনতেন আর কদিন বাকি আছে? 

যেদিন বাংলাদেশে গিয়ে পৌঁছাতাম বুকে জড়িয়ে ধরতেন! বলতেন, সারারাত ঘুমাইনি। শুধু ভেবেছি কখন বিমান নিরাপদে অবতরণ করবে। এরপর দিন সকালে উঠে বলতেন রাতে অনেক ঘুমিয়েছি, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। তার মানে, আমি যখন প্লেনে উঠতাম তারপর থেকেই আমি ঘরে না ঢোকা পর্যন্ত তিনি চিন্তায় থাকতেন।

 

বাবার কথা মনে হলে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন সফল বাবার পরিতৃপ্ত মুখের ছবি। সাতটি সন্তানকে মানুষ করেছেন, উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। এই যে সাতটি সন্তানকে মানুষ করার দীর্ঘ পরিক্রমা এই পথ যাত্রায় কখনো ক্লান্ত হয়েছেন কিন্তু ভেঙে পড়েননি।

আম্মা অনেক আগেই গত হয়েছেন। তাই আমরা গেলে আব্বার ব্যস্ততা বেড়ে যেত। নাস্তা কি হবে, দুপুরে খাবার কি হবে, রাতের খাবার কি হবে সব নিজে তদারকি করতেন। আমি দেশে গেলে আব্বা খুব পছন্দ করতেন আমাকে নিয়ে ঘুরতে, বাজারে যেতে। আম -কাঠাল খেতে খুব পছন্দ করতাম; তাই আমাকে নিয়ে বাজারে যেতেন আম-কাঠাল কিনতে। খেতে বসলে নিজ হাতে  মাছের বড় পিসটা পাতে তুলে দিতেন।

আমার আব্বা খুব সংস্কৃতি মনা ছিলেন। প্রচুর বই পড়তেন। পঠিত বই নিয়ে আমার সাথে কত গল্প করতেন। ইতিহাস, সাংস্কৃতিক এসব নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আমি আব্বার সাথে কথা বলতাম। আমি দেশে গেলে আব্বা আমাদের গানের টিচারকে খবর দিতেন। বলতেন, "একদিন একটা প্রোগ্রাম করো আমার মেয়ে এসেছে।" 

সে অনুযায়ী চমৎকার এক গানের আসর বসতো আমাদের ঘরে। হাসি আনন্দে টইটুম্বুর হয়ে উঠতো আমাদের ঘর। কিন্তু এর ভেতরেই দেখতাম আব্বার মনে একটি সুক্ষ বেদনানুভূতি। একদিন গানের টিচারকে বললেন, "যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে"-এই রবীন্দ্রসংগীতটা গাইতে। টিচারের সাথে আমরা সবাই গলা মিলিয়ে গাইলাম আর আব্বার চোখ কোন সুদূরে যেন হারিয়ে গেল!

আব্বা দেখতে খুব সুশ্রী ছিলেন। মাঝে মাঝে আমার খুব আফসোস হতো, কেন আমি আব্বার মত দেখতে হলাম না। 

 

২০০২ সালে আম্মা ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে পরপারে পাড়ি জমান। তার আগে ১৯৯৯ সালে বড় ভাই প্লেন এক্সিডেন্ট এ অকালে চলে যান পরপারে। এ দুটো শোক আব্বাকে অনেক আঘাত করে। আব্বা অনেকটা চুপচাপ হয়ে যান। কিন্তু ভেঙে পড়েন না। হয়তো ভেবেছেন তার অন্যান্য সন্তানরা আছে, তাদের প্রতি তার দায়িত্ব আছে। তাই শক্ত থেকেছেন, আমাদের মাথায় হাত রেখেছেন, সান্ত্বনা দিয়েছেন নিজের কষ্ট ভুলে।

সন্তানদের সাফল্যে অনেক গর্ব অনুভব করতেন। কোন এক বাবা দিবসে আমার সেজো ভাই ডিস্ট্রিক্ট জজ মীর শফিকুল আলম এবং ছোট ভাই এডিশনাল আইজিপি মীর রেজাউল আলম দুজনে এলেন আব্বার সাথে দেখা করতে। আব্বা দুজনকে দুপাশে রেখে ছবি তুললেন। তারপর বললেন এই ছবিটা হবে বাবা দিবসের শ্রেষ্ঠ ছবি।

২০২৩ সালে দেশে যাই। ততদিনে আব্বা গত হয়েছেন।২০২১ সালে সাড়া দুনিয়া যখন কোভিড আক্রান্ত, তখন আব্বা চিরবিদায় নিলেন। তবে কোভিডে নয়, বয়সজনিত স্বাভাবিক মৃত্যু। যেন‌ স্রষ্টার অমোঘ আহ্বানে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন।

আব্বা বিহীন ঘরে প্রবেশ করাটা ছিল আমার জন্য একটা মানসিক যুদ্ধ। বুঝতে পারছিলাম না কিভাবে ঘরে ঢুকবো! ভাই বোনরা সাথে করে নিয়ে গেল আব্বার রুমে! আহা সেই ঘর, সেই খাট, চেয়ার টেবিল, আলমিরা সব আছে। শুধু এঘরের মানুষটা নেই। টেবিলের উপরে তার ব্যবহৃত বই -খাতা, কলম, কোরআন শরীফ, চশমা সব আছে। শুধু নেই ঘরের মালিক। আমি সব কিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। খুঁজে ফিরি সেই চির পরিচিত ঘ্রাণ! 

রাতের বেলা আমি আব্বার ঘরে ঘুমাই,একা। ব্যালকনির স্লাইডার একটু ফাঁকা রেখে পর্দা টেনে দেই। সারারাত সেই দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে মনে ভাবি আব্বা আমাকে দেখতে আসবে! নিশ্চয়ই আসবে। তার এত আদরের রিনা মনি এসেছে দেখতে আসবে না!

 

 

বাবা এক 'দূরের নদী'

কুলসুম আক্তার সুমী

বাবা' শব্দটি মাত্র দুই অক্ষরের হলেও এর অন্তর্নিহিত গভীরতা ও আবেদন অত্যন্ত মোহনীয়। তিনি কারও কাছে কিছুটা অচেনা, আবার কারও কাছে পরম চেনা এক পরম নির্ভরতার নাম। আমার চোখে বাবা এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার স্নেহময় আশ্রয়ে জীবনের সব ক্লান্তি জুড়ায় আর নয়ন জুড়ে শীতলপাটি বিছানো থাকে। তাঁর ছায়াতেই সন্তান পরম নিশ্চিন্তে চোখ মেলে এই অবাক সুন্দর পৃথিবীকে দেখতে এবং চিনতে শেখে।

লোকমুখে বাবারা সাধারণত কঠিন ও তীব্র তেজি স্বভাবের হন বলে শোনা গেলেও, বাস্তবে তাঁরা একদম অন্যরকম—ভীষণ স্নেহশীল ও কোমল হৃদয়ের মানুষ। তাঁদের ঠোঁটের কোণের মৃদু মুচকি হাসির আলো সন্তানকে এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি দেয়। বাবা কখনো যেন এক জ্যান্ত বিশ্বকোষ, জ্ঞানতাপস ও পথপ্রদর্শক, আবার কখনো দেশের বা মায়ের প্রয়োজনে নিজের জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধাবোধ করেন না। নিজের জীবনের সমস্ত মানবিক সীমাবদ্ধতা বা ভুলত্রুটি পেরিয়েও তিনি সন্তানের কাছে এক পরম আদর্শ হিসেবেই বেঁচে থাকেন।

আমার কাছে বাবা আসলে এক 'দূরের নদী'র মতো—যাকে সবসময় ছোঁয়া না গেলেও মনে মনে তার অস্তিত্বের পবিত্র জলে অবগাহন করা যায়, জীবনের সাঁতার শেখা যায়। বাবার সান্নিধ্য পাওয়ার এবং তাঁর আরও কাছে যাওয়ার এক তীব্র ব্যাকুলতা আমার মনে সকাল-সন্ধ্যা নিরবধি বয়ে চলে।

 

 

আব্বা এবং ইমেইল

সোহানা নাজনীন

আগেকার দিনের মানুষদেরকে টেকনোলজি বোঝানো সম্ভব না, মানে আব্বা-চাচা-মামা টাইপ আগেকার মানুষ। কম্পিউটার দেখলে উনারা বিষম খান, বিশেষ করে ইন্টারনেট ব্যবহারে। প্রথম যখন বেক্সিমকোতে চাকরি শুরু করলাম আব্বা বললেন,

"সব কিছুর ডকুমেন্ট ফাইল করে রেখে দেবে নিজের কাছে।"

"আব্বা, পেপারলেস অফিস হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। আজকাল ফাইল লাগে না, কম্পিউটারে সেভ করা থাকে।"

"ঐ তোমাদের এক কথা, কি এক ইন্টারনেট, সবকিছুই সম্ভব দেখি।"

 

আমেরিকা চলে আসার পর গোলমাল বাঁধল দেশে কথা বলা নিয়ে। কলিং কার্ডের আগুন ছোঁয়া দাম, পাঁচ ডলারের কার্ডে মাত্র ২০ মিনিট কথা বলা যায়। তাও আবার লাইন কেটে গেলে কানেকশন চার্জ কেটে নেয়। আব্বা চিঠি লিখতেন প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর, চিঠিতে ব্যাপক বিশ্লেষণ থাকতো, না বোঝার কিছুই নাই। একেকটা চিঠি যেন ঢাকার বর্তমান সময়ের প্রতিফলন। আমি নেই কিন্তু তাই বলে আমার অজানা নেই কিচ্ছু। একদিন আব্বাকে বললাম,

"বাসায় তো কম্পিউটার আছে। তুমি একটা ইমেইল অ্যাকাউন্ট খুলে ফেল না, ওখানেই চিঠি লিখবে।"

"ওসব আমার দ্বারা হবে না বাবা, আমি পুরোনো দিনের মানুষ, হাতে লেখা চিঠিতেই বেশ আছি।"

 

আসলেই তাই, আব্বাকে দিয়ে ইমেইল চালানো যাবে না। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে কলিং কার্ডেই কথা বলি, আব্বাও চিঠি লেখায় পারদর্শিতা দেখিয়ে যাচ্ছেন। একদিন আব্বা আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন,

"শোন, আমি ইমেইল অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলেছি, তোমরা মেইল করতে পার।"

"আরে তাই নাকি? কবে করলে আব্বা এসব?"

"রাস্তার উল্টা পাশে যে দোকান থেকে আমরা ডিশের লাইন নিয়েছি ঐ দোকানেরই ছেলেটা। খুব ভালো ছেলে, আমাকে আংকেল বলে ডাকে। ছেলেটাই আমাকে বুদ্ধি দিল অ্যাকাউন্ট খোলার, দুইশোটা টাকাও নিল।"

"দাদা না ডেকে আংকেল ডাকল, আর তাতেই তুমি গলে যেয়ে দুইশ টাকা দিয়ে দিলে? আরে ঐ অ্যাকাউন্ট তো আমিই করে দিতে পারতাম।"

"তুমি আমেরিকায় বসে আমার অ্যাকাউন্ট খুলতে কিভাবে?"

"আব্বা, এটাতো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না। নাহ! তোমাকে বোঝানো অসম্ভব।"

 

এই ঘটনা প্রায় ১৫-২০ বছর আগের। আব্বার নামে এখন একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে, যদিও ওইটা আম্মা চালায়। আটলান্টিক সাগর পাড়ে দুজনের দাঁড়ানো ছবি দিয়ে প্রোফাইল পিকচার দিয়েছেন, তালিকায় বন্ধুর সংখ্যাও কম না। এইদিক থেকে আম্মা অনেকটাই এগিয়ে, আইপ্যাড দিয়ে আম্মাকে ছবি তুলে আপলোড করা শিখিয়েছি। ইনবক্সে মুভি লিঙ্ক পাঠালে আম্মা ঠিকই দেখতে পারেন, এমনকি আলপনা হাবিবের রান্নার রেসিপি খোলাও আম্মার কাছে কোন ব্যাপার না। একদিন শুনলাম আম্মাদের ছাদের বাগানে অনেক চাইনীজ করল্লা ধরেছে। বললাম ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড কর। পরের দিনই স্কাইপে আব্বার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর,

"শোন, তোমার আম্মা করল্লার ছবি তুলে ফেসবুকে ছেড়ে দিয়েছেন, আশা করছি দু-এক দিনের মধ্যেই পেয়ে যাবে।"

হায়রে আব্বা! কিভাবে বোঝাই, এই ছবি পিয়নের মারফৎ আসবে না।

 

ছয় বছর পার হয়েছে আব্বা নেই, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে উনার নামে, কিন্তু মেসেঞ্জারে "হ্যালো আব্বা?" বলে কোন সম্বোধন নেই। অথচ প্রতিদিন সকালে বাচ্চাদেরকে স্কুলে ড্রপ করেই সিগন্যাল বাতির মোড়ে দাঁড়িয়ে মেসেঞ্জার টিপেছি। প্রতিদিনকার দিনলিপি প্রতিদিনই ভাগাভাগি করেছি। কিন্তু আব্বাকে কোনদিন ইমেইল করা হয়নি। কাজী শামসুল হুদা নামের ইমেইলের ইনবক্সে আমার কোন লেখালিখির আদান-প্রদান হয়নি। এক বদ্ধ কুঠুরীর মতোই ফাঁকা পড়ে আছে, যেখানে আমার বিচরণ ছিল না, চেনা জানা ছিল না। আব্বা টেকনোলজি খুব একটা বুঝতেন না, তাই ইলেকট্রনিক ইমেইলে কোন চিহ্নই রাখতে পারেন নাই। অথচ বুক জোড়া ভালোবাসা দিয়ে চলে গেছেন যার ভার সইতে পারা কঠিন হয়ে যায় মাঝে মাঝে।

অথচ গভীর রাতে কত শতবার ভেবেছি, আব্বাকে ইমেইল পাঠাতে হবে। আব্বা কি পাবেন সেই বার্তা, পড়তে পারবেন কি আমার এলোমেলো ছেলেমানুষী কথা? ওই ইমেইলের ইনবক্স আনকোরা নতুনের মতো, যা কখনো ব্যবহৃত হয়নি। আব্বাকে আজ খুব ইমেইল পাঠাতে ইচ্ছা করে। আব্বা.........।

 

 

 

 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন