https://www.prothomalony.com/
17266
literature
এইবার জেনে গেছে মন
রুদ্র সাহাদাৎ
এই বার জেনে গেছে মন এই সমাজে বাটপারের
জনপ্রিয়তা খুব বেশি
মুখে মধু অন্তরে বিষ সাদা জামা কালা মন রঙিন
যত্তসব আয়োজন
সাধু সাধু ভাব সততার অভাব.. স্বার্থহীন হাঁটে না
কোনো পা
চোরা শুনিয়ে যায় ধর্মের কাহিনী পাপপূণ্য হিসেব নিকেশ
ধূর্ত শিয়ালও অবাক বিস্ময়ে থমকে যায় চলতি পথে
সত্যি বলছি কমরেড
এই বার জেনে গেছে মন এই সমাজে বাটপারের
জনপ্রিয়তা খুব বেশি
নস্টালজিয়া
অলোক আচার্য
উঠানটা মৃত। শুয়ে আছে আমার পাশে
শোক-তাপ নেই, কয়েকটি শব্দের আহাজারি
কোরাসের সুর।
মানুষ মরে গেছে, উঠান মরে গেছে, বাতাস থেমে
পাশাপাশি ঘুমিয়ে শৈশবের গল্প ধরে-
বহুদিনের চেনা
কাদামাখা দুপুরের ঘ্রাণ, অচেনা পাখির শিষ
কিছু শোকার্ত পাখি বসে থাকে কফিনের পাশে!
কোথাও প্রস্তুত হয় শোকগীতি
কেউ সাদা পাঞ্জাবি গায়ে দেয়, আতর মাখে
মুখে গাম্ভীর্য নিয়ে উঠানে দাঁড়ায়-
তারপর?
নীরবতা, পাশাপাশি ঘুমিয়ে!
হতাশা বৃক্ষের দীর্ঘশ্বাস
আ ই না ল হ ক
অবশেষে একটা অর্ধমৃত নদীর মোহনায় এসে দাঁড়ালাম
পিছনে সারি সারি হতাশা-বৃক্ষের দীর্ঘশ্বাস।
নাগরিক মোহ যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে
তাতে আমাদের তৃতীয় নয়ন নির্ঘাত দৃষ্টি হারাবে;
বারবার মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে গিয়ে
ল্যাম্পপোস্টগুলো হয়ে উঠছে প্রতারক অবতার,
কথামালার উৎপাত চায়ের ধোঁয়ার ন্যায় বাষ্পীভূত হলে
জাতীয় ঐক্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয় নির্বোধ জনতা।
নরম ঠোঁটের কবিতা
অনিক খুরশীদ
আর এসো না বকুল-ফুল
পূর্ণতার চাঁদ ডুবে গেছে
তোমার ভোরের জানালায় এক টুকরো;
মুগ্ধতার রোদ হাসুক।
তোমার বুকের উষ্ণতার গন্ধ মেখে
নেশায় বুঁদ হয়ে;
মাতাল চোখে কবিতা আওড়াই
তোমার নরম ঠোঁটে এত্তো এত্তো কবিতা
আমি পড়ে শেষ করতে পারি না!
তোমার কিছু কবিতা আজন্ম হাতের মুঠোয় রাখি।
সুবাসিত কথোপকথন
মাহমুদা মৌ
জেগে আছে
স্বপ্নস্নাত মায়াবী ঝলমলে রাত
আর অতৃপ্তির কথোপকথন।
চাই কথোপকথন চলুক দীর্ঘ রাত,
দীর্ঘ সময়-ঠিক বহতা নদীর মতন।
তবুও আমাদের কথার চারুপাঠে
সুর আছে ছন্দ আছে
আছে মায়া।
আছে প্রেম
আছে নিবেদন।
আঙুলে আঙুল ছোঁয়াছুঁয়ি না হলেও
বেলি ফুলের সুবাসের মতো আবেগ ঘুরে বেড়ায়,
জেগে ওঠে শ্যাওলা-ধরা মনজমিন
কথা ফুরোলেও সুবাস রয়ে যায়
আরও খানিকটা সময়।
তাই তো,
অতৃপ্তির অযাচিত অভিমান দূরে রেখে
সুবাসিত কথোপকথন চলে সুখে-দুখে অসুখে।
ব্যাথার বাঁশি
দীপান্বিতা পালিত
বাঁশি বেজেছিল একদিন বুকের গভীরে। সেই বাঁশির
সুরে আমার হৃদয় চঞ্চল হলো;
উজান পথ বেয়ে, দুর্গম গিরি অতিক্রম করে তোমার
সামনে এসে দাঁড়ালাম।
বাঁশির ব্যথায় ভরা জলজ হৃদয়খানি নিয়ে করলাম আত্মনিবেদন।
ততক্ষণে আমার সকল আলোকপুঞ্জ আঁধারে ঢেকেছে। বুকের ভেতর না-বলতে-পারা কথার মেঘ জমেছে স্তবকে স্তবকে।
সকল শব্দ ঝরে পড়তে চাইছে, যেভাবে বৃষ্টি ঝরে পড়ে মাটির বুকের ওপর!
সেই বাঁশিটা আর বাজে না। ব্যথার বোঝায় বুজে গেছে বাঁশির সকল ছিদ্র।
আমি যে নদীর স্রোতে বয়ে চলছিলাম তোমার দিকে,
তা যেন হঠাৎ থমকে গিয়ে সরোবর হয়েছে— বিরহের সরোবর।
বিরহ-সরোবরে অবগাহন করতে করতে আমি এখনও অপেক্ষা করছি; এক আলোতে জ্বলে উঠব -
তুমি আর আমি।
অনাবিল সুখ এই বাংলায়
খালিদ বিন ওয়ালিদ
এই দেশ ছেড়ে আমি যাব বা কোথায়—
যেখানে প্রভাতকালে দোয়েলের গান,
যেখানে জুড়ায় মন অশ্বত্থের ছায়,
আশুরার বিলে মেলে কলমির ঘ্রাণ!
সাদা সাদা বকদের রোজ দেখি খেলা,
পানকৌড়ি ডুবে ডুবে করে যে আহার;
যত পাখি ঘরে ফেরে গোধূলির বেলা—
আশ্বিনে কচুরিফুলে বেগুনি বাহার।
দিনান্তে রঙিন হয় কুলিকের জল,
বুনো হাঁস সাঁতরায় রঙিন ধরায়;
বনের গহীনে গায় ঝিঁঝিদের দল,
সবুজ সাগুনী বন মমতা ছড়ায়।
এই দেশ ছেড়ে আমি যাব বা কোথায়?
অনাবিল সুখ মেলে এই বাংলায়!
রামিসার জন্য পুষ্পাশ্রু
এম এ ওয়াজেদ
রামিসা! বালিকা আমার—
নির্বাক কষ্টপাথরে চাপা পড়েছে
নীল-কাতর নীপবনের লতাগুল্ম;
বেদনার পুষ্পাশ্রুতে ভরে গেছে
হৃদয়-চৌহদ্দির অজাত ধূর্ত পরাগায়ন।
সেই কবে আদিম মানুষের বিচরণে
ক্ষয়ে গেছে লাল গোলাপের শীত-সন্ত্রাস মঞ্জুরিকা,
বেপরোয়া উন্মত্ততার নগ্ন এপস্টেইন ফাইলস—
বারবার উঁকি মারে গাঢ় নিদ্রার মৃত্তিকাতলে,
নিষিদ্ধ মূর্খতার সিম্পোজিয়ামে প্রবল আর্তস্বর!
নষ্টতার দিগম্বর যুবতী ঘ্রাণে
শুকিয়ে গেছে দোয়েলিকার শ্বাসনালি,
অসভ্য বুনোহাঁস না চিনে পুষ্পের প্রেমরস,
না চিনে মধুময় আলোকরশ্মির বর্ণালিরেণু;
মেধাহীন নষ্টাচারে ছিঁড়ে গেছে সবুজ গালিচা।
মানুষের জীবন অন্ধকারে হারিয়ে যায়,
মাটিতে পড়ে থাকে অভিযোগহীন লাল রক্ত!
নরপিশাচের উদ্ধত শিশ্ন নিঃশেষ করে—
মমতাময়ী দুঃখচাদরের অবিন্যস্ত খোলা চিঠি;
হে বালিকা রামিসা! আমাদের আজ ক্ষমা করো।
শ্রেষ্ঠ পাঠশালা
ফারহানা ইয়াসমিন তৃপ্তি
দাদু আর রাফি—দুজনের মধ্যে চরম মিল। বাবার সঙ্গে সময় না পেলেও দাদুর সার্বক্ষণিক সঙ্গ পায় সে। দাদা যে কী জিনিস, দাদার মায়া-মমতা, আদর-ভালোবাসা, সেটা ও খুব ভালোভাবেই পেয়েছে।
রাফি ছেলেটি খুব চঞ্চল আর হাসিখুশি। বয়স মাত্র ৯ বছর, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ওর সারাটা দিন কাটে পড়াশোনা, খেলাধুলা আর বন্ধুদের সাথে হৈ-হুল্লোড়ে। কিন্তু মনের ভেতরটা তুলোর মতো নরম, তাই ভুল করলে ওর খুব কষ্ট হয়।
একদিন বিকেলে খেলা শেষে বাড়িতে ফিরে এসে হাত-পা ধুতে শুরু করে। খেলার উত্তেজনা তখনও ওর মনে ছিল, তাই ট্যাপ বন্ধ না করেই ঘরে চলে যায়। শীতল পানি সরু ধারায় বয়ে যাচ্ছিল, আর বাগানের শুকনো মাটি দ্রুত তা শুষে নিচ্ছিল।
বাগানটি ঘরের সামনেই, আর পানির ট্যাপটিও বাগানেই ছিল। দাদু বারান্দায় বসে এই কাজটা দেখলেন। তিনি শান্তস্বরে ডাকলেন, "রাফি!"
রাফি মাথা নিচু করে দাদুর সামনে দাঁড়াল, ওর বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছিল; কিছু একটা ভুল হয়েছে কী?
"হ্যাঁ দাদু।"
দাদু মৃদু হেসে কাঁধে হাত রাখলেন। সেই হাসিতে ছিল গভীর ভালোবাসা। বললেন, "দাদুভাই, বাগানে যে পানি নষ্ট হচ্ছে, সেটা কি দেখেছ?"
রাফি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে ভাবছিল, দাদু বুঝি বকা দেবেন। কিন্তু দাদু আবার বললেন, "দাদুভাই আমার, মনে রেখো, প্রিয় নবিজি (সা.) বলেছেন: 'অতিরিক্ত পানি নষ্ট কোরো না, যদিও তুমি প্রবাহমান নদীর ধারে থাকো।' (ইবনে মাজাহ)"
রাফির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ভাবলো, অল্প একটু পানি নষ্ট করাও আল্লাহর কাছে কত বড় অপরাধ। দাদুর কথা শুনে মনে মনে এক ধরনের অনুশোচনা বোধ তৈরি হলো ওর। সে দ্রুত পায়ে গিয়ে কলটি বন্ধ করল। কল থেকে যখন শেষ ফোঁটাটি মাটিতে পড়ল, তখন অনুভব করল—সে শুধু একটি কল বন্ধ করেনি, বরং একটি ভুল থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে।
কয়েকদিন পর। রাফি দাদুর সঙ্গে বাজারে যায়। বাজারের সবুজ শাকসবজি আর নানা রঙের ফলের মনমাতানো গন্ধে ওর মন নেচে ওঠে। এক দোকানে থরে থরে সাজানো ছিল আঙুরের থোকা। ঝুড়িতে থাকা রসালো আঙুরগুলো দেখে রাফির জিভে জল আসে।
দাদু অন্যমনস্ক হয়ে ফল কিনছিলেন। রাফি চারপাশে একবার তাকিয়েই ঝট করে একটি আঙুর মুখে পুরে ফেলে। দাদুর চোখ দুটি কিন্তু সজাগ ছিল; তিনি বিষয়টি খেয়াল করে বললেন,
"রাফি, মনে রেখো, প্রিয় নবিজি (সা.) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।' (সহিহ মুসলিম)।"
ওর বুকটা ধড়াস করে উঠল। আঙুরটি মুখে তিতো হয়ে গেল, লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেল ওর। সেই মুহূর্তে যেন মাটির ভেতরে মিশে যেতে পারলে ভালো হতো। দাদুর সামনে এই লজ্জার চেয়ে বড় শাস্তি আর কিছু হতে পারে না।
সে সঙ্গে সঙ্গে দাদুর কাছে নিজের ভুল স্বীকার করল এবং দোকানদারকে জানাল যে সে একটি আঙুর খেয়েছে। দাদু কিছু আঙুর কিনলেন আর রাফির হয়ে দোকানদারের কাছে ক্ষমা চাইলেন। দোকানদার হেসে বলল, "থাক চাচা, সামান্য একটি আঙুর!"
কিন্তু রাফি বুঝতে পারছিল, এই সামান্য ভুলের কী বিশাল শিক্ষা! সে অনুভব করল, অন্যের জিনিস তার মালিককে না বলে নিতে বা খেতে নেই; এতে অনেক বড় পাপ হয়।
আরেকদিন, রাফি ওর বন্ধু সাইফের সাথে খেলতে গিয়ে রেগে যায়। খেলাটি ছিল দৌড় প্রতিযোগিতা, আর রাফি হেরে যায়। সাইফ হাসতে হাসতে বলল, "তুই হেরে গেছিস!"
সাইফের কথা শুনে রাফির মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। হাত মুঠি করে সাইফকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল মাটিতে। তারপর দৌড়ে পালিয়ে এল দাদুর কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "দাদু, সাইফকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছি।"
দাদু ভালোবাসাভরা চোখে ওর দিকে তাকালেন, হাত ধরে টেনে কাছে বসিয়ে বললেন—
"রাফি, দাদুভাই আমার। প্রিয় নবিজি (সা.) বলেছেন: 'শক্তিমান সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে হারায়; বরং শক্তিমান সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।' (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।"
দাদুর শান্ত কণ্ঠস্বর রাফির রাগকে এক শীতল পানির মতো নিভিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, আসল শক্তি শরীরের নয়, বরং মনের ভেতরের। সে খুশি হয়ে বলল, "তাহলে আমি শক্তিমান হতে চাই দাদু! আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখব।" এরপর সে দৌড়ে গিয়ে সাইফের কাছে তার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইল।
এভাবে দিন কেটে যাচ্ছিল। রাফি প্রতিদিন দাদুর জ্ঞানের বাগান থেকে নতুন কিছু শিখত। পানি অপচয় না করা, সৎভাবে চলা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা, এতিম-দরিদ্রের প্রতি মমতা রাখা—সবকিছুই দাদু তাকে হাদিসের আলোকে শিখিয়ে দিচ্ছিলেন। রাফি ওর বন্ধুদেরকেও এই শিক্ষাগুলো দিতে শুরু করল।
এক সন্ধ্যায় দাদু রাফিকে কাছে ডেকে বললেন,
"রাফি, আমার দাদুভাই—মনে রেখো, রাসুল (সা.)-এর পুরো জীবনটাই আমাদের জন্য শিক্ষার আলো। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন আল্লাহকে ভয় করতে, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে, মিথ্যা না বলতে, আমানত রক্ষা করতে আর সবসময় সৎ পথে থাকতে। যে পথ সুমহান পথ। নবিজি (সা.) ছিলেন আলোকবর্তিকা। তিনি ছিলেন মানবতার শান্তির প্রতীক, মুক্তির প্রতীক, রহমাতুল্লিল আলামিন। যিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জীবনের পাঠশালা—সবার শিক্ষক তিনি।"
রাফি উজ্জ্বল চোখে উৎসুক হয়ে দাদুর দিকে তাকাল-যেন সে আজ শুধু কিছু কথা শোনেনি, বরং জীবনের পথ খুঁজে পেয়েছে। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
"দাদু, আমি নবিজি (সা.)-এর পথেই চলতে চাই। আমি জীবনের প্রতিটি কাজে তাঁর শিক্ষা আঁকড়ে ধরব।"
দাদু আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন:
"হে আল্লাহ! আমার এই নাতিকে রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর পথে চলার তৌফিক দিন। ওকে সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত করুন।"
রাতের আকাশে তারারা জ্বলজ্বল করে উঠল। জোনাকিরা মিটিমিটি আলো জ্বালে। রাফির মনেও যেন হাজারো তারার আলো জ্বলে উঠল। সে প্রতিজ্ঞা করল—সে আর ভুল করবে না। আর যদি ভুল হয়ও, তবু সে দাদুর শেখানো পথেই ফিরে আসবে; চলবে দয়ার নবি, মায়ার নবির জীবনের পাঠশালা অনুযায়ী। যে পাঠশালায় ভর্তি হয়েছিলেন আকাশের তারার মতো উজ্জ্বল সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহু।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন