https://www.prothomalony.com/
17252
literature
ইমতিয়াজ মাহমুদ আনাস
খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।
ঈদুল আজহা ইসলামী শরীয়তের একটি মহান ইবাদতপূর্ণ দিন, যা ত্যাগ, তাকওয়া, আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। এই দিনের মূল ভিত্তি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ এবং হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর পূর্ণ আনুগত্য। এই ঘটনা কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি নয়; বরং এটি কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মুমিনের জন্য ঈমান, ইখলাস ও তাওহীদের বাস্তব পাঠ।
ইসলামে ঈদুল আজহা শুধুমাত্র আনন্দ-উৎসবের নাম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইবাদত-ব্যবস্থা, যেখানে সালাত, তাকবীর, কোরবানি, যিকির এবং আত্মশুদ্ধির সমন্বয় ঘটে। তাই এই দিনের প্রতিটি আমল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর আদব ও সীমারেখা রক্ষা করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
করণীয়
ঈদের দিনের সূচনা হয় পবিত্রতা, প্রস্তুতি এবং ইবাদতের মানসিকতা দিয়ে। ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করা সুন্নত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের নামাজের আগে গোসল করতেন। (মুয়াত্তা মালিক, হাদীস: ৪২৮)
এই আমল শুধু বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা নয়; বরং এটি অন্তরের প্রস্তুতি, আল্লাহর সামনে হাজির হওয়ার শিষ্টাচার এবং ঈদের পবিত্রতা রক্ষার প্রতীক।
ঈদের দিনে উত্তম পোশাক পরিধান করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই ঈদ এবং জুমার দিনে সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৯৮৬)
ইসলাম সৌন্দর্যকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং ইবাদতের দিনে সৌন্দর্যকে ইবাদতের অংশ বানিয়েছে, যাতে বান্দা আল্লাহর সামনে সুন্দরভাবে উপস্থিত হয়।
ঈদুল আজহার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হলো ঈদের নামাজের আগে কিছু না খাওয়া। হযরত বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল আজহার দিন কোরবানি সম্পন্ন না করা পর্যন্ত কিছু আহার করতেন না। (জামে তিরমিযী, হাদীস: ৫৪২; ইবনে মাজাহ, হাদীস: ১৭৫৬)। এর মাধ্যমে বান্দা কোরবানির প্রতি আগ্রহ, কৃতজ্ঞতা এবং আল্লাহর নির্দেশ পালনের মানসিকতা প্রকাশ করে।
ঈদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো তাকবীর পাঠ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
“তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ কর।” (সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২০৩) এই তাকবীর কেবল শব্দ উচ্চারণ নয়; বরং এটি তাওহীদের ঘোষণা, আল্লাহর বড়ত্বের স্বীকৃতি এবং হৃদয়ের ঈমানী জাগরণ।
ঈদের নামাজ আদায় করা এবং সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব আমল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
“অতএব আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।” (সূরা আল-কাওসার, আয়াত: ২)
কোরবানি শুধু পশু জবাই নয়; বরং এটি নিজের প্রবৃত্তি, অহংকার এবং দুনিয়াপ্রীতির প্রতীকী জবাই। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ প্রকাশ করে।
কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়দের মাঝে বিতরণ করা এবং গরিব-মিসকিনদের সাহায্য করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইবাদত। এটি ইসলামের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতার বাস্তব রূপ।
ঈদের দিনে মুসলমানদের পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নত। সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম একে অপরকে বলতেন: “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।” এটি মুসলিম সমাজে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও হৃদ্যতার পরিবেশ তৈরি করে।
বর্জনীয়
ঈদের দিনে রোজা রাখা সম্পূর্ণ হারাম। হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৯৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৮২৭)
ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রমাণিত নয়। কোনো দিনকে বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে নির্ধারণ করে কবর জিয়ারত করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।
ঈদের আনন্দে মগ্ন হয়ে ঈদের নামাজ ত্যাগ করা অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ। কারণ ঈদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত, কেবল আনন্দ-উৎসব নয়।
মুসাফাহা বা কোলাকুলিকে শরীয়ত নির্ধারিত বাধ্যতামূলক ইবাদত মনে করা ভুল। এটি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের কাজ, তবে এটিকে ধর্মীয় বিধান হিসেবে নির্ধারণ করা যাবে না।
কোরবানির পশুর কোনো অংশ বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির পশুর কোনো অংশ বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৭১৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩১৭)
ঈদুল আজহা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, তাকওয়া এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহাসুযোগ। এই দিনের প্রতিটি আমল যদি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত অনুযায়ী পালন করা হয়, তবে তা কেবল দুনিয়ার আনন্দ নয়; বরং আখিরাতের মুক্তির পথ হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের উচিত এই দিনের শিক্ষা শুধু পালন নয়, বরং জীবনব্যাপী ধারণ করা, যাতে আমাদের ঈদ হয় ইবাদতে পরিণত এক জীবন্ত প্রশিক্ষণ।
কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা
মেহেদী হাসান
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।
কোরবানি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা মুসলিম উম্মাহর জীবনে ত্যাগ, তাকওয়া, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের এক মহান প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এটি কেবল পশু জবাই করার একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করার বাস্তব শিক্ষা। মুসলমানরা প্রতি বছর ঈদুল আজহার দিনে যে কোরবানি আদায় করে, তার পেছনে নিহিত রয়েছে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের অবিস্মরণীয় ত্যাগের ইতিহাস। এই ইতিহাস মানবজাতিকে শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর আদেশের সামনে দুনিয়ার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসও তুচ্ছ হয়ে যায়। একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয় হলো সে নিজের প্রবৃত্তি, আবেগ ও ভালোবাসার ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে স্থান দিতে পারে কি না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “হে আমার রব! আমাকে এক নেক সন্তান দান করুন।” সূরা আস-সাফফাত : ১০০। দীর্ঘদিন নিঃসন্তান থাকার পর আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দান করেন সহনশীল পুত্র হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে। বৃদ্ধ বয়সে সন্তান লাভ করে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ হন। তিনি বলেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে বৃদ্ধ বয়সে ইসমাঈল ও ইসহাক দান করেছেন। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক দোয়া শ্রবণকারী।” সূরা ইবরাহীম : ৩৯। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁকে স্ত্রী হাজেরা ও শিশু ইসমাঈলকে জনমানবহীন মক্কার প্রান্তরে রেখে আসার নির্দেশ দিলেন। তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন। এভাবেই শুরু হয় ত্যাগ ও আনুগত্যের এক মহিমান্বিত ইতিহাস।
যখন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছলেন, তখন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি করছেন। নবীদের স্বপ্ন যেহেতু ওহীর অন্তর্ভুক্ত, তাই তিনি বুঝতে পারলেন এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ। তিনি পুত্রকে বললেন, “হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখছি যে, তোমাকে যবেহ করছি। এখন তোমার মতামত কী?” উত্তরে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, “হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” সূরা আস-সাফফাত : ১০২। পৃথিবীর ইতিহাসে পিতা-পুত্রের এমন আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের দৃষ্টান্ত বিরল। একদিকে পিতা আল্লাহর নির্দেশ পালনে প্রস্তুত, অন্যদিকে পুত্রও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। যখন তাঁরা উভয়েই আল্লাহর আদেশের সামনে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁদের এ ত্যাগ কবুল করলেন এবং ইসমাঈল আলাইহিস সালামের পরিবর্তে একটি মহান দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আর আমি এক মহান কোরবানির বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম।” সূরা আস-সাফফাত : ১০৭।
এই ঘটনাই কোরবানির মূল ভিত্তি এবং এ কারণেই কোরবানিকে “সুন্নতে ইবরাহীমী” বলা হয়। কোরবানি মূলত আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাকওয়া ও নিঃশর্ত আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “অতএব আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।” সূরা আল-কাওসার : ২। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও প্রতি বছর কোরবানি করতেন এবং উম্মতকে এর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন, “হে মানুষ! প্রত্যেক পরিবারের উপর প্রতি বছর কোরবানি করা আবশ্যক।” জামে তিরমিযী : ১৫১৮।
তবে ইসলামে কোরবানি কবুল হওয়ার জন্য শুধু পশু জবাই করাই যথেষ্ট নয়; বরং এর পেছনের নিয়ত, আন্তরিকতা ও তাকওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” সূরা আল-হাজ্জ : ৩৭। এ আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কোরবানির বাহ্যিক জৌলুস বা পশুর আকার-আকৃতি নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত হৃদয়ই মূল বিষয়। তাই কোরবানি কখনো লোক দেখানো, অহংকার বা প্রতিযোগিতার মাধ্যম হতে পারে না। বরং এটি বান্দার আন্তরিক ঈমান ও আল্লাহভীতির পরিচায়ক।
কোরবানির পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ইসলামী শরীয়ত অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। কারণ আল্লাহর পথে যা উৎসর্গ করা হবে, তা যেন হয় উত্তম, পবিত্র ও ত্রুটিমুক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও সুন্দর ও উত্তম পশু কোরবানি করতেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি শিংওয়ালা, সাদা-কালো বর্ণের সুন্দর দু’টি দুম্বা কোরবানি করেছেন। সহীহ বুখারী : ৫৫৫৮, সহীহ মুসলিম : ১৯৬৬। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। তবে প্রতিটি পশুর জন্য নির্ধারিত বয়স পূর্ণ হওয়া জরুরি। উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর, গরু ও মহিষের দুই বছর এবং ছাগলের এক বছর পূর্ণ হতে হবে। ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রেও এক বছর পূর্ণ হওয়া আবশ্যক। তবে যদি ছয় মাস বয়সী ভেড়া বা দুম্বা হৃষ্টপুষ্ট হওয়ার কারণে দেখতে এক বছরের মতো মনে হয়, তাহলে তা দিয়েও কোরবানি করা বৈধ। সহীহ মুসলিম : ১৯৬৩।
কোরবানির পশু অবশ্যই সুস্থ, সবল ও দৃশ্যমান ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার ধরনের পশুর কোরবানি নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, “স্পষ্ট অন্ধ পশু, সুস্পষ্ট রোগাক্রান্ত পশু, এমন খোঁড়া পশু যা ঠিকমতো চলতে পারে না এবং অতিমাত্রায় দুর্বল ও জীর্ণ পশু যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে এসব পশু দ্বারা কোরবানি বৈধ নয়।” জামে তিরমিযী : ১৪৯৭। একইভাবে কান বা লেজের অধিকাংশ কাটা, গোড়া থেকে শিং ভেঙে যাওয়া কিংবা মারাত্মক শারীরিক ত্রুটিযুক্ত পশু কোরবানির জন্য অপছন্দনীয়। কারণ ইসলামের শিক্ষা হলো, আল্লাহর পথে সর্বোত্তম জিনিস উৎসর্গ করা।
বর্তমান সময়ে কোরবানিকে কেন্দ্র করে অনেক ক্ষেত্রে বাহ্যিক প্রতিযোগিতা, অহংকার ও প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা যায়। কেউ বিশাল পশু কিনে মানুষের প্রশংসা অর্জন করতে চায়, কেউ আবার সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে কোরবানিকে ব্যবহার করে। অথচ ইসলামের শিক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য পশুর বিশালতায় নয়; বরং নিয়তের বিশুদ্ধতায়। যে হৃদয়ে তাকওয়া আছে, যে অন্তর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাঁদে, সেই কোরবানিই আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তাই একজন মুমিনের উচিত কোরবানিকে আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা।
কোরবানি সমাজে মানবিকতা ও সহমর্মিতারও শিক্ষা দেয়। কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব-দুঃখীদের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ধনী-গরিব সবাই ঈদের আনন্দে শরিক হওয়ার সুযোগ পায়। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্য দিয়েও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই কোরবানি শুধু ব্যক্তিগত তাকওয়ার প্রকাশ নয়; বরং সামাজিক মানবিকতারও উজ্জ্বল নিদর্শন।
একজন মুমিন যখন কোরবানির পশু জবাই করে, তখন মূলত সে নিজের প্রবৃত্তি, অহংকার, লোভ ও দুনিয়ামুখী ভালোবাসাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জবাই করার অঙ্গীকার করে। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো তাওহীদে অবিচল থাকা, আল্লাহর আদেশের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানানো। তাই কোরবানি নিছক ধর্মীয় রীতি নয়; এটি ঈমান, ভালোবাসা, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য প্রতীক।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করে বিশুদ্ধ নিয়ত, আন্তরিক তাকওয়া ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে কোরবানি আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন