https://www.prothomalony.com/

17160

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ ০৮:৩৯

অবুঝ মনের ভালোবাসা

রকিবুল ইসলাম

নদীমাতৃক আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। এ দেশেরই একটি অতি প্রাচীন জনপদ যশোর। এই যশোরের বুক চিরে বয়ে চলেছে ভৈরব নদ। অতি প্রাচীন নদ এটি। শহর থেকে একটু পূর্বে গেলেই বাংলাদেশ রাইফেলসের সদর দপ্তর। দক্ষিণে বিসিক শিল্পনগরী এলাকা। তারও দক্ষিণে অখ্যাত একটা গ্রাম, নাম সীতারামপুর। বুড়ি ভৈরব এই গাঁয়েরই পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজারের মতো অধিবাসীর বসবাস এই ভৈরব উপকূলে। এটাই আমার প্রিয় জন্মভূমি।

ছোটবেলা থেকেই অতি হর্ষ-আমোদে বেড়ে উঠেছি। বলতে পারেন সোনার চামচ মুখে নিয়েই জন্মেছি। বাবা যশোর পৌরসভার স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত ছিলেন। বড় ভাই ছিলেন সিঙ্গাপুরপ্রবাসী। আর তা ছাড়া দাদার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি নিয়ে বেশ ভালো সম্পত্তিই ছিল আমাদের। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে দুর্দশায় পতিত হয়ে সবটাই খোয়া গেছে। যাই হোক, সেসব কথা থাক। আমার শৈশবটা কিন্তু খুব মধুর কেটেছে।

আমি, লিওন, পলাশ, আজাদ একসাথে বেড়ে উঠেছি। ভালো বোঝাপড়া বা সখ্য ছিল আমাদের মাঝে বেশ। এখনও আছে। তবে কেন জানি সেই দিনগুলোর সুখের কাছে এখনকার সুখ কিছুই না। সীমা, রেখা আর স্বপ্না ছিল আমাদের সহপাঠী। লিওন ও আজাদ রেখাকে, পলাশ সীমাকে আর আমি স্বপ্নাকে ভালোবাসতাম। ধ্যাৎ! ওইটুকু বয়সে ভালোবাসা হয় নাকি! ভালোবাসার কী বুঝতাম আমরা! তবে পছন্দ করতাম, এটা তো ঠিকই।

বিকালে আমবাগানে গোল্লাছুট (গ্রামের ভাষায়: গাদি ভোম) খেলতাম আমরা সকলে মিলে। আমাদের সহপাঠী ছিল কয়েকজন বড় আপা। শীতের সন্ধ্যায় একযোগে আগুন পোহাতাম, আর তারপর লুকোচুরি খেলতাম। কেউ বাড়ির কোণে, কেউ খড়ের গাদায় লুকাত। কেউ আবার লুকানোর নাম করে বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। ভাবা যায়! একে কীভাবে খুঁজে পাবেন আপনি?! বেশ কাটছিল দিনগুলো। সোনার খাঁচায় বন্দি করে রাখার মতো।

বড় ভাইদের পিরিতের চিঠি বিলি করতাম। বড় কেউ প্রেমঘটিত কারণে পরস্পর দেখা করতে গেলে পাহারা দিতাম। পাছে অভিভাবক গোছের কেউ যদি দেখে নেয়! পলাশ-সীমার সম্পর্কটা অনেক দিন পর্যন্ত গড়িয়েছিল, যদিও তা পূর্ণতার স্বাদ পায়নি। লিওন বা আজাদের রেখার কাহিনী তো এগোলই না।

আর আমি? এক চড়েই সব শেষ! স্বপ্নার ভাই টিপু আমার আবাসিক শিক্ষক ছিলেন। মানে উনি আমাদের বাড়িতে থাকতেন আর আমাকে পড়াতেন। ওদের পরিবার আর আমাদের পরিবারের মাঝে সম্পর্কটাও ছিল মধুর। একবার স্বপ্নাকে চিঠি লিখলাম। আমাদেরই সহপাঠী ওর এক চাচাতো ভাই সাইফুলকে দিয়ে চিঠিটি পাঠালাম। আমার সাথে যেন দেখা করে, এটাও বলে পাঠিয়েছিলাম।

কিন্তু বিধি বাম। স্বপ্না এলো না। এলো ওর বড় বোন শিউলি। এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, "তুই লিখেছিস এটা?" অস্বীকার করার কোনো উপায় ছিল না। হাতের লেখা যে আমার! আমাকে সে বলল, "তুই আমাদের নিজেদের লোক হয়ে এমন কাজ করতে পারলি?" বলতে বলতেই আমার প্রশস্ত গালে একটা চড় বসিয়ে দিল সপাটে। আর বাবা-মাকে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে দেবে বলে ভয়ও দেখাল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি চোয়ালে হাত দিয়ে বেরিয়ে আসলাম ওখান থেকে। আমার অবুঝ মনের ভালোবাসার ইতি বা যবনিকা পাত ঘটল ওখানেই।

আজ বেলা শেষের দিকে এসে সেই সব কথা খুব মনে পড়ে। কেমন ছেলেমানুষ ছিলাম আমরা!

রেমিট্যান্সের অশ্রু

মাসুদ রানা

আমি মাসুদ রানা। দূর প্রবাসের দেশ ইরাকে বসবাস করি। এখানে একটি কোম্পানিতে কাজ করি—আমাদের মতো প্রায় সাতশো শ্রমিক দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে। এই প্রবাস জীবনের প্রতিটি দিন যেন একেকটি সংগ্রামের গল্প, একেকটি অশ্রুর ইতিহাস। বাইরে থেকে মানুষ দেখে শুধু টাকার অঙ্ক, কিন্তু সেই টাকার পেছনে যে কতটা কষ্ট, ত্যাগ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে—তা খুব কম মানুষই বোঝে।

ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি—"কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।" কিন্তু সেই কষ্টটা কেমন? কেমন সেই দিনরাতের ঘাম ঝরানো জীবন? সেটা বুঝতে হলে প্রবাসীর জীবনে একদিন কাটালেই যথেষ্ট।

আমি যখন প্রথম ইরাকে আসি, তখন আমার মায়ের চোখে যে জল দেখেছি, তা আজও ভুলতে পারিনি। মা বলেছিলেন, "বাবা, নিজের খেয়াল রাখিস।" কিন্তু আমি জানতাম, নিজের খেয়াল রাখার চেয়ে বড় দায়িত্ব হলো পরিবারের খেয়াল রাখা। তাই মা-মাটি, আপনজনদের ছেড়ে দূরে এসে শুরু হলো আমার প্রবাস জীবন। এখানে কাজের সময় নির্দিষ্ট থাকলেও, বাস্তবে কাজের কোনো শেষ নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা, কখনো রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। প্রচণ্ড গরম, ধুলাবালি, ক্লান্তি—সবকিছু সহ্য করে আমরা কাজ করে যাই। কারণ আমাদের মাথায় একটা কথাই ঘোরে—"পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে হবে।"

আমাদের এই সাতশো মানুষের দলে প্রত্যেকেরই আলাদা গল্প আছে। কেউ এসেছে ঋণ শোধ করতে, কেউ এসেছে সন্তানদের পড়াশোনা চালাতে, কেউ এসেছে ভাঙা ঘর মেরামত করতে। কিন্তু সবার লক্ষ্য একটাই—পরিবারের সুখ।

আমার পাশের বেডে থাকে রহিম ভাই। তার দুইটা মেয়ে। প্রতিদিন রাতে কাজ শেষে সে ফোনে মেয়েদের সাথে কথা বলে। মেয়েরা বলে, "আব্বু, তুমি কবে আসবা?" সে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখে হাসিমুখে বলে, "আর কিছুদিন পরেই আসবো মা।" এই "আর কিছুদিন" কখন যে বছরের পর বছর হয়ে যায়, তা কেউ টের পায় না। সে জানে—এখনই ফিরে গেলে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। 

প্রবাস জীবনে সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত হলো—যখন কোনো খারাপ খবর আসে। আমাদের কোম্পানিতে অনেক সময় এমন হয়েছে, কাজ করতে করতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছে, কেউ দুর্ঘটনায় মারা গেছে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—সব লাশই দেশে পাঠানো যায় না। অনেকের লাশ বিদেশের মাটিতেই দাফন হয়ে যায়। সেই পরিবারের কান্না, সেই মায়ের বুকফাটা আহাজারি—এসব ভাবলেই বুকটা ভারী হয়ে যায়।

একবার আমাদের এক সহকর্মী, করিম ভাই, কাজের সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন। তার ছোট একটা ছেলে ছিল। সে বাবাকে আর কোনোদিন দেখতে পাবে না। তার লাশ দেশে পাঠানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সম্ভব হয়নি। সেই দিন আমরা সবাই নিঃশব্দে কেঁদেছিলাম। মনে হয়েছিল—আমরা সবাই যেন একেকটা জীবন্ত লাশ, যারা শুধু পরিবারের জন্য বেঁচে আছি।

প্রবাসীদের জীবনে আনন্দ বলতে খুব কম কিছুই আছে। ঈদের দিনটাও আমাদের জন্য অন্যরকম। যখন দেশে সবাই নতুন কাপড় পরে, পরিবারের সাথে আনন্দ করে, তখন আমরা এক কোণে বসে মোবাইলে ভিডিও কলে সেই আনন্দ দেখি। নিজের চোখের জল লুকিয়ে রেখে বলি—"আমি ভালো আছি।" আসলে আমরা ভালো থাকি না, ভালো থাকার অভিনয় করি।

তবুও আমরা হাল ছাড়ি না। কারণ আমরা জানি—আমাদের এই কষ্টের ফলেই পরিবারের মুখে হাসি ফুটছে। আমাদের পাঠানো টাকায় ঘর তৈরি হচ্ছে, সন্তানরা স্কুলে যাচ্ছে, বাবা-মা ভালোভাবে চিকিৎসা পাচ্ছে। এই ছোট ছোট সুখই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।

আমাদের দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে যে টাকা পাঠাই, সেটাই দেশের উন্নয়নের চাকা ঘুরিয়ে রাখে। তাই আমাদের বলা হয় "রেমিট্যান্স যোদ্ধা।" কিন্তু এই যোদ্ধাদের জীবনের গল্প কেউ খুব একটা জানতে চায় না। সমাজে আমাদের সম্মান দেওয়া উচিত। শুধু টাকা পাঠানোর জন্য নয়, আমাদের ত্যাগের জন্য, আমাদের কষ্টের জন্য। শ্রমিক দিবসে আমাদের কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে আমাদের সমস্যাগুলো কতটা সমাধান হয়? 

অনেক প্রবাসী ভাই আছে যারা বছরের পর বছর দেশে যেতে পারে না। তাদের সন্তানরা বড় হয়ে যায়, কিন্তু বাবার সাথে তাদের সম্পর্কটা দূরত্বেই থেকে যায়। অনেক বাবা আছে যারা নিজের সন্তানের জন্মের সময় পাশে থাকতে পারে না। এই কষ্টগুলো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

আমি নিজেও অনেক সময় একা বসে ভাবি—এই জীবনের শেষ কোথায়? আমরা কি শুধু টাকা উপার্জনের জন্যই জন্মেছি? কিন্তু তারপরই মনে পড়ে—আমার পরিবার, আমার দায়িত্ব। তখন আবার নতুন করে শক্তি পাই।

প্রবাস জীবন আমাদের অনেক কিছু শিখায়। শিখায় ধৈর্য, শিখায় ত্যাগ, শিখায় দায়িত্ববোধ। আমরা নিজের সুখ ত্যাগ করে অন্যের সুখ নিশ্চিত করি। এটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

আজ আমি গর্ব করে বলতে পারি—আমি একজন প্রবাসী শ্রমিক। আমি আমার পরিবারের জন্য, আমার দেশের জন্য কাজ করি। আমাদের চোখের অশ্রুতেই লুকিয়ে আছে একটি দেশের উন্নয়নের গল্প, একটি পরিবারের হাসির গল্প, একটি মায়ের দোয়ার গল্প। এই কষ্টের মধ্যেই আছে ভালোবাসা, আছে দায়িত্ব, আছে জীবনের অর্থ। আমরা হয়তো দূরে আছি, কিন্তু আমাদের হৃদয় সবসময় দেশের মাটিতেই থাকে। এই হলো রেমিট্যান্সের অশ্রু—যেখানে কষ্ট আছে, ত্যাগ আছে, কিন্তু আছে অশেষ ভালোবাসাও।

অমুদ্রিত সিলমোহর 

মেশকাতুন নাহার

গ্রামের নাম শালবন। মেঠোপথ, ধানের ক্ষেত আর কচি বাতাসের ভেতরেই যেন উৎসবের গন্ধ মিশে থাকত। নির্বাচন এলেই শালবন অন্য রূপ নিত—বাড়ির উঠোনে উঠোনে আলাপ, চায়ের দোকানে তর্ক, রাস্তায় রঙিন পোস্টার। ছোট্ট নাঈম তখন বাবার হাত ধরে এসব দেখত, মনে হতো ঈদের চাঁদ উঠেছে বুঝি।

নাঈমের বাবা হানিফ উদ্দিন ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। সবার কাছে তিনি "হানিফ সাহেব" নামেই পরিচিত। অফিসপাড়ায় তাঁর সুনাম ছিল একটাই কারণে—সততা। লোকজন বলত, "ওনার সামনে অন্যায় টেকে না।" তাঁর টেবিলে ফাইল এলে সেটি নিয়ম মেনেই চলত; তদবির, সুপারিশ, লোভ—কিছুই তাঁকে স্পর্শ করতে পারত না।

নির্বাচনের সময় এলেই তাঁর ব্যস্ততা বাড়ত। নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি নিয়মিত প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই বেরিয়ে যেতেন, রাত গভীর করে ফিরতেন। সাদা পাঞ্জাবির ওপর গাঢ় রঙের কোট, হাতে ফাইল আর চোখে এক ধরনের দায়িত্ববোধের দীপ্তি।

নাঈম একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "আব্বু, তুমি ভোট দাও না কেন?"

হানিফ সাহেব মৃদু হেসে বলেছিলেন, "বাবা, যেদিন দায়িত্বে থাকি, সেদিন নিজের ভোটটা আর দেওয়া হয় না। সবাই যেন ঠিকভাবে ভোট দিতে পারে, সেটাই বড় কথা।"

শিশু মন তখন পুরোটা বুঝতে পারেনি। কিন্তু বাবার চোখে যে গর্ব দেখেছিল, সেটুকু মনে গেঁথে গিয়েছিল।

বছরের পর বছর কেটে গেল। হানিফ সাহেব কখনো ভোটকেন্দ্রে নিজের ব্যালট পেপারে সিল মারার সুযোগ পাননি। কখনো দূর-দূরান্তে দায়িত্ব, কখনো সারাদিনের টানটান দায়িত্ব শেষে ভোটের সময় পেরিয়ে যাওয়া। সহকর্মীরা মাঝে মাঝে বলত, "আপনি চাইলে তো একটু সুবিধা নিতে পারেন!"

তিনি হাসতেন, "সুবিধা নিতে গেলে দায়িত্ব থাকে না।"

অফিসে তাঁর নিরপেক্ষতার গল্প ছড়িয়ে পড়েছিল। কোনো প্রার্থীর প্রতিনিধি তাঁর কাছে বিশেষ সুবিধা পায়নি।একবার এক প্রভাবশালী ব্যক্তি তাঁকে আলাদা ডেকে বলেছিল, "একটু খেয়াল রাখবেন।" তিনি জবাব দিয়েছিলেন, "আমি শুধু নিয়মের খেয়াল রাখি।"

২০০৭ সালে তিনি অবসরে গেলেন। অবসরের পর তাঁর জীবন বদলে গেল। ভোরে মসজিদে যাওয়া, কোরআন তেলাওয়াত, গ্রামের মানুষকে পরামর্শ দেওয়া—দিনগুলো শান্ত ছন্দে কাটতে লাগল। আগে ধর্মপ্রাণ ছিলেন, এখন আরও মনোযোগী হলেন। তাঁর চোখে এক ধরনের প্রশান্তি নেমে এসেছিল। তবে একটি আক্ষেপ রয়ে গিয়েছিল—নিজের ভোট দেওয়া হয়নি কখনো।

এক সন্ধ্যায় উঠোনে বসে নাঈমকে বলেছিলেন, "জানো বাবা, সারাজীবন মানুষের ভোটের নিরাপত্তা দিলাম, কিন্তু নিজের ভোটটা আর দেওয়া হলো না।"

নাঈম বলেছিল, "এবার তো অবসর, এবার নিশ্চয়ই দেবে।"

তিনি মৃদু হাসলেন, চোখে যেন শিশুর মতো আশা।

বছর ঘুরে এলো আরেকটি জাতীয় নির্বাচন। শালবনের চায়ের দোকানে উত্তেজনা, রাস্তায় মিছিল, মাইকে গান। হানিফ সাহেব নতুন পাঞ্জাবি পরে প্রস্তুত হলেন। নাঈম অবাক হয়ে দেখল, বাবার চোখে আজ অন্যরকম উজ্জ্বলতা।

"চলো বাবা, আজ আমার নিজের ভোটটা দেবো," তিনি বললেন।

ভোরবেলা তারা ভোটকেন্দ্রে গেল। কেন্দ্রটি ছিল সেই স্কুলেই, যেখানে বহুবার তিনি প্রিজাইডিং অফিসার ছিলেন। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। যেন স্মৃতির ভেতর দিয়ে হাঁটছেন।

ভেতরে গিয়ে লাইনে দাঁড়ালেন। তাঁর বয়সী মানুষ কমই ছিল। কেউ তাঁকে চিনে ফেলল, ফিসফিস করে বলল, "এই যে হানিফ সাহেব!"

কিছুক্ষণ পর দায়িত্বে থাকা এক কর্মী এসে কানে কানে বলল, "চাচা, আপনার ভোট তো হয়ে গেছে।"

হানিফ সাহেব চমকে উঠলেন। "কীভাবে? আমি তো এখনো লাইনে দাঁড়িয়ে আছি!"

কর্মী বিব্রত মুখে বলল, "তালিকায় টিক চিহ্ন আছে... ভোট দেওয়া দেখাচ্ছে।"

হানিফ সাহেব শান্ত গলায় বললেন, "আমি সারাজীবন দায়িত্বে থেকে নিশ্চিত করেছি যেন কারও ভোট নষ্ট না হয়। আজ আমারটাই হলো?"

কেউ স্পষ্ট জবাব দিল না। তাঁকে একপাশে বসতে বলা হলো, পরে জানানো হলো কিছু করার নেই—"ভোট হয়ে গেছে।"

নাঈম বাবার হাত শক্ত করে ধরলো। হানিফ সাহেব কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, "চলো বাবা, দায়িত্ব শেষ।"

স্কুলের গেট পেরিয়ে তিনি একবার পেছনে তাকালেন। চোখে কষ্ট ছিল, কিন্তু রাগ ছিল না। যেন নিজের জীবনের একটা অধ্যায় চুপচাপ বন্ধ করে দিলেন।

সেদিন বিকেলে তিনি বাড়ির উঠোনে বসে ছিলেন। পাখির ডাক, দূরের মাইকের শব্দ, আর তাঁর নীরবতা—সব মিলিয়ে এক ভারী আবহ।

"আব্বু, তোমার খারাপ লাগছে?" 

তিনি বললেন, "খারাপ তো লাগবেই। তবে মনে রেখো, সততা কখনো বৃথা যায় না। মানুষ না জানুক, আল্লাহ জানেন।"

 

এরপর থেকে তিনি আরও চুপচাপ হয়ে গেলেন। নিয়মিত নামাজ, তেলাওয়াত—সব চলত, কিন্তু চোখের ভেতর সেই দিনের স্মৃতি যেন ছায়ার মতো লেগে থাকত।

২০২৩ সালের এক ভোরে, ফজরের নামাজ শেষে তিনি চুপচাপ শুয়ে পড়লেন। নাঈম ডাকতে এসে দেখল, তাঁর মুখে অদ্ভুত শান্তি। যেন দীর্ঘ দায়িত্ব শেষে তিনি বিশ্রামে গেছেন।

 

গ্রামের মানুষ বলল, "হানিফ সাহেব ভালো মানুষ ছিলেন।" অফিসপাড়ায় খবর গেল, পুরোনো সহকর্মীরা স্মৃতিচারণ করল। কেউ বলল তাঁর কঠোরতা, কেউ বলল তাঁর নিষ্ঠা। কিন্তু নাঈমের মনে রয়ে গেল একটি দৃশ্য—স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ, যার নিজের ভোটটি দেওয়া হলো না।

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নাঈম মনে মনে বলল, "আব্বু, তুমি ভোট দিতে পারনি, কিন্তু আমাদের শিখিয়ে গেছ—সততার সিলটাই সবচেয়ে বড় সিল।"

 

শালবনের আকাশে তখন বিকেলের আলো। ধানের ক্ষেতে বাতাস বইছে। নির্বাচন আসবে যাবে, উৎসব হবে আবার। কিন্তু হানিফ উদ্দিনের মতো একজন নিরপেক্ষ মানুষের গল্প গ্রামটার মাটিতে মিশে থাকবে—একজন বাবা, এক সৎ অফিসার, আর এক 'শেষ ভোট'-এর অসমাপ্ত ইতিহাস হয়ে।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন