https://www.prothomalony.com/
16939
literature
বেহাত বিপ্লব
কাকন রেজা
কী লিখি বলো তো, কার কথা লিখি
তোমাকে হারিয়েছি রাজপথে,
তারপর থেকে নেমেছি পদব্রজে
বলতে পারো পাবার শপথে।
স্লোগানে মুঠিবদ্ধ হাত যখন ওঠে
নিশ্চিত বিনাশ ডেকে যায়,
জানি তো, কৃষ্ণচুড়ার লালিত ইচ্ছা
খোদ পথও নিশানা হারায়।
মিছিলে নেমেছি বিদ্রোহে বিক্ষোভে
শহিদের ক্ষুব্ধ লাশ ডাকে,
নপুংসক জীবনে কী লাভ বলো
কেউ যদি মীরজাফর নামে ডাকে।
চলো আবার শুরু হোক রাজপথে
ফেরাই পথে বেহাত বিপ্লব,
অতঃপর আজাদি সম্পন্ন হলে
জশনে-জুলুস, হোক উৎসব।
তোমার জন্য
আহসান জামান
তোমার জন্য চোখের নীচে জেগে উঠেছে
অনিদ্রা তীর, ফুল মুকুলে জমেছে অটুট
কথার পাহাড়, মেঘ ছুটেছে বৃষ্টি হবে।
তোমার জন্য অপেক্ষারত চড়ুই পাখির
ছটফোটানি, খাঁচায় বন্ধি পাখিটি যেমন
পথ খুঁজতেই হয়রানি হয় প্রহর জুড়ে।
তোমার জন্য ঝর্ণা নামে, নদীর জন্ম
উজান ভাটি, কৃষ্ণচূড়ার সমস্ত ফুল,
কদম কিম্বা কাঠালচাপার গন্ধমুখর
রাত্রিটি একেলা জাগে, জোছনা বিলায়।
তোমার জন্য ছন্নছাড়া, গোছাতে যেতে
হারিয়ে ফেলা স্বপ্নপুর, একটা পলক
অধীর হয়ে তাকিয়ে থাকে।
তোমার জন্য আবাদী জমিন, সবুজ ধানে
নাচের ঢেউ, একটা ফড়িং আনমনা এক
দুপুরবেলায় খুব গোপনে ব্যস্ত থাকে।
তোমার জন্য দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামে
চাতক পাখি বৃষ্টি ডাকে, রাত্রি নামে
একেলা ঘরে খুব নীরবে।
একদল বেওয়ারিশ আততায়ী
আ ই না ল হ ক
আমাকে কারিগরি কৌশলে হত্যা করে
পরিচ্ছন্নভাবে চলে গেল একদল বেওয়ারিশ আততায়ী
একটু ঘুরে দাঁড়ালেই মেকআপহীন মুখ ধরা পড়তো
প্রথম যখন ছুরি চালালো
রক্তের ফিনকিতে স্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে প্রান্তরে
বিষাদ বাতাসে কৃতঘ্নতা উড়িয়েছে নিশান
উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে শেষ দৃষ্টিহীনতার আগে দেখি গুটিকতক মুখোশধারী আমার পূর্বপরিচিত
নিবেদক...
যদি ফিরে আসতো
তোফায়েল তফাজ্জল
সূর্যোদয়ে শিশু বাবা-মা'কে ঘোড়া খেলে।
বেড়ে ওঠে স্বজনের আদরে-আহ্লাদে।
খেলা, পড়া, ঘুম, গল্পসল্প, আহার-বিহার ছাড়া
ভারাক্রান্ত কোনোকিছু পড়ে না গ্রীবায়।
চিন্তার আকাশ অনেকটা বৃষ্টি থামা পরিষ্কার।
যৌবনে যখন কাঁধে দায়
ঘাড়ে ভারে ব্যথা বাড়ে,
ভারোত্তোলন ও বহনে কোমর টের পায় কদ্দিনে বছর।
পঞ্চাশোর্ধ্ব আমিও দশের অনুরূপ
এঘাট ওঘাট গড়ানো অধ্যায় থেকে জল খাওয়া পাঠ নিয়ে
ঠেকনা ধরে টিকে আছি চরম চাপেও।
সিঁড়ি ভাঙতে উদ্যম রয়েছে অব্যাহত।
ভাবি, স্কন্ধে থাকা দায়িত্বের বানর তাড়িয়ে যদি ফিরে আসতো
নতুন পানিতে রঙ খেলা করা শৈশবের সেই পুঁটি-দিন।
অপ্রেমের সরাইখানায়
সাজ্জাদুর রহমান
তোমার নিয়মের শহরে
বাদুড়ের মতো ঝুলে আছি শতাব্দীকাল
কানাগলির পথ ধরে ট্যারায় ট্যারায়
পাতাকুড়ানির মতো অন্ধকার কুড়িয়ে
জমা রাখো আমার বিকলাঙ্গ বুকে
অন্ধকারে হৃদয় ঘষতে ঘষতে
কতো অজানা যুগ ক্ষয়িষ্ণু জলে যায় ডুবে
কতো শতাব্দী আকাশ সূর্য জ্বালিয়ে
দেখায়না নাক্ষত্রিক দেহের লাবণ্যতা
বাদুড়ঝোলা পরার্থ নিঃশ্বাসে হেমলক মেখে
আমি অপ্রেমের সরাইখানায় প্রেম হাতড়াই ।
প্রহেলিকা গাদ্দারি
আব্দুল কাদের
আমার শ্রেষ্ঠ সুরোত্তম পঙক্তিমালা
তোমার পাণ্ডিত্যে ধরা দেয় না কভু।
হৃদয় নিংড়ানো যতো শব্দের কারুকাজ,
তোমার বিচারে তা অবহেলা শুধু।
সৃজন প্রকাশে তুমি আজও করে যাও
নিপুণ এক প্রহেলিকা গাদ্দারি।
আমার বর্ণমালাকে তুচ্ছজ্ঞান করে
সাজাও তোমার সুনিপুণ চাতুরী।
হাতে তুলে নিই বিষণ্ণ মাটির কলসি
পঙক্তি সাজাই অগোছালো ছলে।
কেন জানি তোমার মন ভেজে না তাতে,
আনন্দ আসে না পাষাণ অন্তরালে।
এতো ক্ষমতার অতি বিষম প্রভাবে
অবিরত চলে হীন এই গাদ্দারি।
কত কবির স্বপ্ন এভাবেই প্রতিনিয়ত
অবহেলার তোড়ে হয় ঘরছাড়া ভিখারি।
তবুও কলম থামবে না কোনোদিন
ব্যথাগুলো সব ছন্দ হয়ে ঝরবে।
মোর পঙক্তিমালাই একদিন মহাকালের
বিচারের দরবারে সত্য সাক্ষ্য দেবে।
সমঝোতার শান্তিচুক্তি
অনন্য কাওছার
পৃথিবী আজ ডলারের সঙ্গে করেছে সমঝোতার
শান্তিচুক্তি।
ধূসর মস্তকে আটকে থাকে বিভীষিকাময় অন্ধকার
সমুদ্রগামী সুখদ জাহাজের নিয়ন্ত্রণ জলদস্যুদের হাতে।
শরবত ভেবে ডুবে আছি শতাব্দীর অন্ধকারে
দেখেছি ভিনদেশি জাহাজসহ হাঙরের হা-মুখের
তিরস্কার—
একে একে উন্মোচিত হয়েছে মানুষের অলীক সমীহ;
কালো মুখোশ।
মানুষ যদিও
মোঃ রহমত আলী
জানা ছিল না... জানলাম,
মানুষ কী আছে? হয়তো...!
মানুষের রঙ লাল নীল সাদা কালো আহা!
দেখা ছিল না... দেখলাম,
আরো মানুষ এই! সেই তো...!
মানুষের রূপ রূপালি অপরূপ ঢঙ বাহ্!
চেনা ছিল না... চিনলাম,
আজ মানুষ কই? তাই তো...!
মানুষের জন্য মানুষ বড়ো দুষ্কর আহ্!
শোনা ছিল না... শুনলাম,
মানুষ কী সেই? বেশ তো...!
তবুও মানুষ মানুষের কেউ যদিও হায়্!
আমি আজও দরজাটা বন্ধ করিনি
আব্দুস সাত্তার সুমন
দরজাটা আজও খোলা।
বছরের পর বছর কেটে গেছে, তবুও সেটি বন্ধ করার অভ্যাসটুকু আমার হয়নি। মা এখনও মাঝেমধ্যে বলেন, রাতে দরজাটা লাগিয়ে দিস। আমি শুধু চুপ করে থাকি। কারণ এই খোলা দরজার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আমার স্বাধীনতার গল্প।
সেদিনটাও ছিল অন্য দিনের মতোই সাধারণ। বিকেলের আলোয় কোনো অশনি সংকেত ছিল না, বাতাসে ছিল না কোনো অস্থিরতা। বাবা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, "দরজা বন্ধ করে রাখিস।"
কথাটা খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিটা ছিল অদ্ভুত গভীর।আমি ইচ্ছে করেই দরজাটা বন্ধ করিনি। মনে হয়েছিল, তিনি ফিরে এসে মৃদু হেসে বলবেন, "কথা শুনোস নাই।" সেই হাসিটা দেখার জন্যই যেন অপেক্ষা করে ছিলাম।
কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।
কয়েকদিনের মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল যুদ্ধের খবর, গুলির শব্দ, আগুনের লেলিহান শিখা। গ্রামের মানুষজন আতঙ্কে দিন কাটাতে লাগল। একদিন খবর এল বাবা আর নেই।
কেউ উচ্চস্বরে কাঁদেনি। শুধু নিঃশব্দে একটা শূন্যতা নেমে এলো ঘরের ভেতর, আঙিনার ওপর, আমাদের জীবনের প্রতিটি কোণে।
তারপর একদিন এলো সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। গ্রামের মাঠে লাল-সবুজ পতাকা উড়ল, মানুষের মুখে উচ্ছ্বাস, চোখে আনন্দের অশ্রু। সবাই বলল আমরা স্বাধীন।
আমি ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু আমার চোখে সেই পতাকার রঙ অন্যরকম লাগছিল। সবুজের মাঝে যে লাল বৃত্ত, সেটি আমার কাছে সূর্য ছিল না ছিল বাবার রক্তের এক নিঃশব্দ প্রতিচ্ছবি।
সেদিন প্রথমবার বুঝলাম, স্বাধীনতা কেবল একটি রাষ্ট্রের অর্জন নয়; এটি অসংখ্য ব্যক্তিগত হারানোর সমষ্টি। কারও বাবা, কারও স্বামী, কারও সন্তান অসংখ্য অজানা মানুষের ত্যাগে গড়ে ওঠা এক মহাকাব্য।
বছর পেরিয়ে আমি বড় হয়েছি। মানুষ আমাকে এখন "শহীদের সন্তান" বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই পরিচয়ের মধ্যে গর্ব আছে, সম্মান আছে কিন্তু এর আড়ালে যে শূন্যতা, তা কেউ দেখে না।
আমি যখন রাতের নীরবতায় সেই খোলা দরজার দিকে তাকাই, তখন মনে হয় স্বাধীনতা মানে শুধু একটি পতাকা নয়; স্বাধীনতা মানে সেই দরজা, যেটি আর কোনোদিন বন্ধ করা যায় না, কারণ যার জন্য অপেক্ষা, সে আর ফিরবে না।
তবুও আমি দরজাটা বন্ধ করি না।
কারণ এই খোলা দরজার মধ্যেই আমার বাবার শেষ পদচিহ্ন, শেষ দৃষ্টি, শেষ অসমাপ্ত কথাগুলো বেঁচে আছে।
স্বাধীনতা আমাকে একটি দেশ দিয়েছে কিন্তু কেড়ে নিয়েছে একটি মানুষকে। আর সেই শূন্যতার ভেতর দিয়েই আমি প্রতিদিন স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ অনুভব করি।
হয়তো এটাই স্বাধীনতার সবচেয়ে নীরব সংজ্ঞা যেখানে অর্জনের আনন্দ আর হারানোর বেদনা একই সঙ্গে বেঁচে থাকে, একই পতাকার দুই রঙ হয়ে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন