https://www.prothomalony.com/

16776

literature

সাহিত্য

উত্তরের স্বাস্থ‍্য-সচেতনতা পাতা 

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৩:৪৪

ঋতু পরিবর্তন ও সুস্থতা 

নিউ ইয়র্কের এপ্রিল মানেই এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ—কখনো বসন্তের মিঠে রোদ, আবার কখনো কনকনে উত্তুরে হাওয়া। আবহাওয়ার এই দ্রুত পরিবর্তনের সাথে আমাদের শরীর সবসময় মানিয়ে নিতে পারে না। যখন তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলের চাপ  হঠাৎ বাড়ে-কমে, তখন শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য বা 'হোমিওস্ট্যাসিস' বিঘ্নিত হয়। 

গবেষণায় দেখা গেছে, হঠাৎ ঠান্ডায় রক্তনালী সংকুচিত হয়ে রক্তচাপ বাড়তে পারে এবং পেশিতে টান সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, আর্দ্রতার পরিবর্তন শ্বাসতন্ত্রের শ্লেষ্মা ঝিল্লিকে প্রভাবিত করে ভাইরাস সংক্রমণের পথ প্রশস্ত করে।

এই 'ট্রানজিশন পিরিয়ড' আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, ফলে সর্দি-কাশি ও জয়েন্টের ব্যথার মতো সমস্যা প্রকট হয়। বিশেষ করে যাদের অ্যাজমা বা সিওপিডি আছে, তাদের জন্য এই সময়টি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায় বলে প্রবীণদের ক্ষেত্রে হাইপোথার্মিয়া বা দীর্ঘমেয়াদী রোগগুলো আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া জরুরি।

ঝুঁকিগুলো বুঝে প্রতিটি ঋতুতে নিরাপদ থাকার জন্য 'কনভিভা সিনিয়র প্রাইমারি কেয়ার' তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে:

১: আবহাওয়ার উপযোগী পোশাক পরুন: শীতের ঠান্ডা সকাল হোক বা গরমের ঝলমলে দুপুর—সঠিক পোশাক সবার জন‍্যই নিরাপত্তা এবং স্বস্তি আনে। অনিশ্চিত আবহাওয়ায় আরামদায়ক থাকতে পোশাক একাধিক স্তরে পরা সবচেয়ে কার্যকর। ভেতরের স্তরে এমন পোশাক পড়ুন যা ঘাম শোষণ করে বাতাস চলাচলযোগ্য এবং শরীর ভেজা বা ঠান্ডা না লাগে। মাঝের স্তরের জন‍্য ফ্লিস বা উলের মতো ইনসুলেটিং কাপড় শরীরের তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। ‌বাইরের স্তরে প্রয়োজন হলে বাতাস ও বৃষ্টি/তুষার ঠেকাতে উইন্ডপ্রুফ বা ওয়াটারপ্রুফ কোট ব্যবহার করুন। 

বাইরে বেরোনোর আগে নিয়মিত নির্ভরযোগ্য অ্যাপের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও রিয়েল-টাইম সতর্কবার্তা দেখে নেওয়া জরুরি, যাতে হঠাৎ ঝড় বা তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে পড়তে না হয়। ঋতু অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম যেমন- শীতের জন্য টুপি-গ্লাভস এবং গরমের জন্য সানগ্লাস ও সানহ্যাট হাতের কাছে রাখা প্রয়োজন। এছাড়া ত্বক রক্ষায় বছরের সব ঋতুতেই বাইরে যাওয়ার সময় সানস্ক্রিন ব্যবহার করা একটি অপরিহার্য স্বাস্থ্যকর অভ্যাস।

২: রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখুন: তাপমাত্রার দ্রুত ওঠানামা, জীবাণুর বেশি সংস্পর্শ, আর চরম আবহাওয়ার প্রভাব শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। তাই মৌসুমি অসুস্থতা ও আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনের চাপ থেকে শরীরকে রক্ষা করতে শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা দরকার। তাছাড়া, বয়স বাড়ার সঙ্গে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা দুর্বল হয়। তাই বয়স্কদের জন্য প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। এর জন্য কিছু সহজ অভ্যাস খুবই কার্যকর হতে পারে। পুষ্টিকর খাবার যেমন-ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি এবং জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। সাইট্রাস ফল ও বেল পেপারে ভিটামিন সি, ফোর্টিফায়েড দুধ ও ডিমে ভিটামিন ডি, আর চর্বিহীন মাংস ও বাদামে জিঙ্ক পাওয়া যায়। 

যাদের বাতের সমস্যা বা পুরোনো চোট রয়েছে, তাঁদের জন্য এপ্রিল মাসটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। বায়ুমণ্ডলের চাপ কমে গেলে শরীরের টিস্যুগুলো কিছুটা প্রসারিত হয়, যা স্নায়ুর ওপর চাপ তৈরি করে ব্যথার উদ্রেক ঘটায়। এক্ষেত্রে 

হাঁটা, যোগব্যায়াম বা হালকা স্ট্রেচিংয়ের মতো কম চাপের ব্যায়াম রক্তসঞ্চালন ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে। ঘরোয়া পরিবেশে হালকা ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং রক্ত সঞ্চালন সচল রাখে এবং জয়েন্টের জড়তা দূর করে।

হঠাৎ ঠান্ডা পড়লে জয়েন্টগুলোকে গরম কাপড়ে ঢেকে রাখা এবং হালকা গরম জলের সেঁক পেশির নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

ঘুমের ঘাটতি শরীরের অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। প্রতিরাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম শরীরকে মেরামত ও পুনর্গঠন করতে সময় দেয়। টিকা নিতে ভুলবেন না। ফ্লু, নিউমোনিয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কোভিড বুস্টার নেওয়া মৌসুমি সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।

৩: অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্ট থেকে সুরক্ষা নিন: ঋতু 

ঋতু পরিবর্তনের সময়, বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্ট প্রতিরোধে সতর্ক থাকা জরুরি। ঠান্ডা, শুষ্ক বাতাস বা পরাগরেণু অ্যাজমা, সিওপিডি ও অ্যালার্জির উপসর্গ বাড়াতে পারে। এছাড়া, আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে ইনডোর হিটিং বা এয়ার কন্ডিশনার বাতাস শুষ্ক করে দিতে পারে, যা শ্বাসনালীতে জ্বালা ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।  এই ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত স্থানীয় খবরের মাধ্যমে পরাগরেণু ও বায়ুদূষণের মাত্রা যাচাই করে নিন; দূষণ বেশি থাকলে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলাই ভালো। ঘরের বাতাস নির্মল রাখতে নিয়মিত 'এইচভিএসি' ফিল্টার পরিবর্তন করুন এবং শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে আর্দ্রতা বজায় রাখতে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন। এছাড়া তীব্র ঠান্ডায় বাইরে বেরোনোর সময় মাস্ক বা স্কার্ফ ব্যবহার করলে শ্বাসনালীতে সরাসরি ঠান্ডা বাতাস ঢোকা রোধ করা যায়। বিশেষ করে ভোরবেলা বা সন্ধ্যায় যখন দূষণ ও পরাগরেণু বেশি থাকে, তখন বাইরে ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকুন।

সারা বছর সুস্থ ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে হলে আবহাওয়া অনুযায়ী রুটিন বদলানো জরুরি। পোশাক, খাদ্য, ঘুম, ব্যায়াম, টিকা এবং শ্বাসযন্ত্রের যত্ন-এসব একসঙ্গে মেনে চললে ঋতু পরিবর্তন শরীরের জন্য কম কষ্টকর হয়।

অটিজম ও ইমোশনাল ডিসরেগুলেশন: যেভাবে সামলাবেন

এপ্রিল মাস বিশ্বব্যাপী অটিজম সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হচ্ছে। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার আক্রান্ত শিশু বা ব্যক্তিদের জীবনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো 'ইমোশনাল ডিসরেগুলেশন' বা আবেগীয় ভারসাম্যহীনতা। 

এটি মূলত দৈনন্দিন পরিস্থিতিতে আবেগকে শনাক্ত করা, প্রকাশ করা এবং পরিচালনা করার অক্ষমতা। অটিজম আক্রান্তরা ছোটখাটো মানসিক চাপে সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। এটি রাগ, কান্না, অতি উত্তেজনা বা হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। আমাদের দৈনন্দিন ব্যস্ত জীবনে যেখানে উদ্দীপনা এবং চাপের অভাব নেই, সেখানে অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য এই বিষয়টি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

আবেগীয় ভারসাম‍্যহীনতার লক্ষণ: অটিজম বিশেষজ্ঞ ডলি ভার্গবের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যেকোনো ছোট পরিবর্তন বা শব্দ অনেক সময় তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। তারা এক কাজ থেকে অন্য কাজে যেতে বা নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে প্রচণ্ড হিমশিম খান। অনেক সময় তাদের মেজাজ খুব দ্রুত বদলে যায়, যাকে মুড সুইং বলা হয়; শান্ত অবস্থা থেকে মুহূর্তেই তারা প্রচণ্ড রাগান্বিত বা বিষণ্ণ হয়ে পড়তে পারেন। যখন এই মানসিক চাপ তাদের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন তারা মেল্টডাউন (চিৎকার, কান্নাকাটি বা আঘাত করা) অথবা শাটডাউন (একেবারে চুপ হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া)-এর মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখান।

তাদের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অ্যালেক্সিথাইমিয়া, অর্থাৎ নিজের ভেতরে ঠিক কী অনুভূতি কাজ করছে (ভয় নাকি রাগ) তা সঠিকভাবে চিনতে বা প্রকাশ করতে না পারা। এই অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাহিদা তাদের মধ্যে সারাক্ষণ উদ্বেগ ও খিটখিটে মেজাজ তৈরি করে। এই অস্থিরতা কমাতে তারা অনেক সময় স্টিমিং বা একই কাজ বারবার করার (যেমন হাত নাড়ানো বা দোল খাওয়া) মাধ্যমে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। এছাড়া সেন্সরি ওভারলোড বা অতিরিক্ত আলো-শব্দের কারণে তারা অনেক সময় ভিড় বা সামাজিক অনুষ্ঠান পরিহার করেন এবং পরিস্থিতির চাপে পড়ে চিন্তা না করেই হুটহাট কোনো কাজ করে ফেলেন। একবার মন খারাপ বা রাগ করলে তাদের পক্ষে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

 

যখন একটি অটিস্টিক শিশু বা ব‍্যক্তি আবেগের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন তার প্রতিক্রিয়াগুলো অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়-যা শিশুটির পরিবার ও চারপাশের মানুষের ওপরও মানসিক ও শারীরিক প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞ ডলি ভার্গব-এর মতে, এই আবেগীয় ভারসাম্যহীনতা ব্যবস্থাপনার জন্য কয়েকটি স্তরে ধৈর্য ও কৌশলের সাথে কাজ করতে হয়:

•পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কৌশল: সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হলো সবচেয়ে কার্যকর উপায়।কোন শব্দ, আলো, গন্ধ বা পরিস্থিতির কারণে শিশুটি উত্তেজিত হয়ে পড়ে, তা আগে থেকেই নোট করে রাখুন। তারা অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না। সারাদিন কী কী কাজ করা হবে, তা ছবি বা চার্টের মাধ্যমে সাজিয়ে রাখলে তাদের উদ্বেগ কমে। বাড়িতে এমন একটি কোণ তৈরি করুন যেখানে কোলাহল কম। উত্তেজিত বোধ করলে তারা যেন সেখানে গিয়ে বিশ্রাম নিতে পারে।

•তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনা: যখন তারা আবেগের বশবর্তী হয়ে পড়বে, শান্ত খাকুন। আপনি নিজে উত্তেজিত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। শান্ত কণ্ঠে কথা বলুন এবং যতটা সম্ভব কম কথা বলুন (বেশি কথা বললে তাদের মস্তিষ্ক প্রসেস করতে পারে না)। মেল্টডাউনের সময় তারা যেন নিজের বা অন্যের ক্ষতি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। ধারালো বা শক্ত বস্তু সরিয়ে ফেলুন। সেন্সরি টুলস ব্যবহার করা যায়। অনেক সময় ভারী কম্বল, ফিজেট টয় বা নয়েজ-ক্যানসেলিং হেডফোন তাদের স্নায়ুকে শান্ত করতে সাহায্য করে।

•আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা শেখা: ছবি বা কার্ডের মাধ্যমে তাদের শেখান —'সুখী', 'রাগী', 'উদ্বিগ্ন' বা 'ক্লান্ত' বোধ করা বলতে কী বোঝায়। অনেক সময় তারা নিজের অনুভূতি বুঝতে পারে না বলেই বেশি রিয়্যাক্ট করে। রাগ হলে চিৎকার না করে গভীর শ্বাস নেওয়া, গোনা বা কোনো বল চাপ দেওয়ার মতো বিকল্প কৌশল শেখান। কোনো কাজ কঠিন মনে হলে বা বিরক্তি লাগলে কীভাবে 'ব্রেক' চাইতে হয়, তা শিখিয়ে দেওয়া।

•পেশাদার থেরাপি ও সহায়তা: শিশুদের ক্ষেত্রে সমাজ যতটা সহনশীল, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ততটা নয়। বড়দের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় যে তারা নিজেদের আবেগ স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন। এই অতিরিক্ত প্রত্যাশা তাদের ওপর মানসিক চাপ ও উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞ ডলি ভার্গব এর মতানুসারে, অটিজম আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের আবেগীয় ভারসাম্যহীনতা ব্যবস্থাপনার জন্য 

কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি কার্যকর, যার  মাধ্যমে নেতিবাচক চিন্তার ধরণ পরিবর্তন করা যায়। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে কাজের সময় বা পরিবেশে সামান্য পরিবর্তন তাদের কর্মক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সহায়ক নেটওয়ার্ক যেমন-পরিবার ও বন্ধুদের মাঝে এমন একটি ভরসার জায়গা থাকা, যেখানে তারা নিরাপদ বোধ করেন। তাছাড়া, শুরুতেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। 

আবেগীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে একটি শক্তিশালী সাপোর্ট সিস্টেম অপরিহার্য। অভিভাবক ও যত্নকারীদের উচিত স্কুল শিক্ষক, থেরাপিস্ট এবং স্থানীয় সাপোর্ট গ্রুপের সাথে একটি গভীর সমন্বয় তৈরি করা। যখন পরিবারের সদস্যরা মন খুলে কথা বলার সুযোগ পান এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেন, তখন অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনযাত্রা অনেক সহজ হয়ে ওঠে। তাছাড়া, বর্তমানে বিভিন্ন আধুনিক ওয়ার্কবুক ও ডিজিটাল অ্যাপস রয়েছে, যা সব বয়সী অটিস্টিক ব্যক্তিদের নিজের আবেগ চিনতে, প্রকাশ করতে এবং স্বাস্থ্যকরভাবে তা পরিচালনা করতে সহায়তা করে। 

মস্তিষ্ক ও স্মৃতিশক্তি রক্ষায় ডায়েটারি ফাইবার

সুস্থ থাকার জন্য আমরা অনেকেই ডায়েটে প্রোটিন বা ভিটামিনের দিকে নজর দিই, কিন্তু 'ফাইবার' বা আঁশযুক্ত খাবারকে প্রায়ই অবহেলা করা হয়। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য—ফাইবার কেবল আমাদের হজম প্রক্রিয়া ঠিক রাখে না, বরং এটি আমাদের মস্তিষ্কের বার্ধক্য রোধ করতে এবং জ্ঞানীয় ক্ষমতা বা স্মৃতিশক্তি রক্ষায় এক শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে। 

ফাইবার মূলত আমাদের অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে সচল করার মাধ্যমে মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেয়। ফাইবার গ্রহণের ফলে অন্ত্রে বিউটিরেট নামক একটি ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি হয়, যা অন্ত্রের দেয়ালকে মজবুত করে রক্তে ক্ষতিকর উপাদান মিশতে বাধা দেয় এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ কমায়। ২০২২ সালের একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, ৩,৭০০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি ফাইবার গ্রহণ করেছেন, তাদের ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এছাড়া কিংস কলেজ লন্ডনের মেরি নি লোখলেনের নেতৃত্বে যমজদের ওপর পরিচালিত এক ক্লিনিকাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, মাত্র তিন মাস প্রিবায়োটিক ফাইবার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ফলে অংশগ্রহণকারীদের কগনিটিভ টেস্ট বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষায় অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে। মূলত ফাইবারের প্রভাবে অন্ত্রে বিফিডোব্যাকটেরিয়াম-এর মতো উপকারী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি স্মৃতিশক্তি রক্ষা এবং আলঝেইমারের মতো রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

বিবিসি ফিউচারে উল্লিখিত গবেষণায় আরো দেখা গেছে, যারা নিয়মিত উচ্চমাত্রায় আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করেন, তাদের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সচল থাকে। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হিপোক্যাম্পাস (মস্তিষ্কের স্মৃতি ধরে রাখার অংশ) সংকুচিত হতে থাকে। পর্যাপ্ত ফাইবার এই সংকোচন প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, ফলে বার্ধক্যেও স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার ঝুঁকি কমে।

ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক জন কামিংসের মতে, উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার কেবল সুস্থ রাখে না, বরং মানুষের আয়ু বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে। একটি বিশদ গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রচুর পরিমাণে ফাইবার খান তাদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ১৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত কম। গবেষকদের মতে, প্রতিদিন অন্তত ৩০ গ্রাম ফাইবার গ্রহণ করলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০০০ জনে ১৩ জন ব্যক্তিকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব যদি তারা পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণ করেন।

একারণেই কামিংস, ফাইবারকে শরীরের জন্য একটি অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান হিসেবে গণ্য করার পরামর্শ দিয়েছেন।

মস্তিষ্কের সুরক্ষায় দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় যেভাবে ফাইবার যোগ করবেন:

উদ্ভিজ্জ খাবার, বিশেষ করে মটরশুঁটি, শিম এবং ডাল ফাইবারের চমৎকার উৎস। প্যানকেক তৈরির ব্যাটারে সেদ্ধ ছোলা ব্লেন্ড করে মিশিয়ে দিতে পারেন।পাস্তা রান্নার সময় তাতে বাড়তি মটরশুঁটি যোগ করুন। সাদা আটা বা ময়দার পরিবর্তে লাল বা ভুসিযুক্ত শস্য বেছে নিন। সাদা রুটি বা পাস্তার বদলে লাল আটার রুটি বা হোল-হুইট পাস্তা খান। যদি লাল পাস্তা ভালো না লাগে, তবে সাদা ও লাল পাস্তা মিশিয়ে রান্না করতে পারেন। 

সকালের নাস্তায় 'হোলগ্রেইন' বা পূর্ণ শস্যের সিরিয়াল বেছে নিন। বিকেলের নাস্তায় ভাজাপোড়া বাদ দিয়ে আঁশযুক্ত খাবার বেছে নিন:এটি একটি ভালো ফাইবার সমৃদ্ধ স্ন্যাকস। আপেল, বিভিন্ন বীজ এবং বাদাম চিবিয়ে খেতে পারেন। আপনার ডায়েটে বিভিন্ন রঙের এবং ধরনের ফল ও সবজি রাখুন। 

বৈচিত্র্যময় আঁশ অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমকে উন্নত করতে সাহায্য করে। যারা চিবিয়ে বা গিলতে সমস্যায় ভোগেন (যেমন: পারকিনসন্স ডিজিজ আক্রান্ত ব্যক্তি), তারা চিকিৎসকের পরামর্শে ফাইবার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন। ফাইবার শরীরের ভেতর সঠিকভাবে কাজ করার জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। তাই দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন।

আধুনিক জীবনযাত্রায় ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্যের কারণে আমাদের খাদ্যতালিকা থেকে ফাইবার হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আপনার প্রতিদিনের থালায় এক ভাগ ফাইবারক্ত খাবার যুক্ত করা মানেই হলো আপনার মস্তিষ্কের আয়ু কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া।

 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন