https://www.prothomalony.com/
16675
literature
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশন আমাদের সামনে এক বহুমাত্রিক বাস্তবতা তুলে ধরছে। বিশেষ করে তরুণ ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ এই অধিবেশনকে এক নতুন প্রাণ দিয়েছে। তাঁদের বক্তৃতায় যেমন রয়েছে উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস, তেমনি কোথাও কোথাও দৃশ্যমান হচ্ছে সংসদীয় রীতিনীতি সম্পর্কে অপ্রতুল অভিজ্ঞতার ছাপ। কিন্তু এই অসম্পূর্ণতাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রূপ—এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং বিকাশমান একটি প্রক্রিয়ার অংশ।
গণতন্ত্র কখনোই নিখুঁত বা স্থির কোনো কাঠামো নয়। এটি একটি চলমান যাত্রা, যেখানে অভিজ্ঞতা, বিতর্ক, মতভেদ এবং সংশোধনের মধ্য দিয়েই পরিপক্কতা অর্জিত হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বরং একটি উন্নয়নশীল গণতন্ত্র হিসেবে আমাদের জন্য এই প্রক্রিয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকরা যখন সংসদে প্রবেশ করেন, তখন তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে আসেন ভিন্ন অভিজ্ঞতা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। ফলে তাঁদের ভাষণ ও আচরণে কখনো কখনো অস্থিরতা বা অপরিপক্বতা থাকলেও, তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সম্ভাবনার বীজ।
সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের স্থান নয়; এটি জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। এখানে মতবিনিময়, সমালোচনা, প্রতিবাদ—সবকিছুরই একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা রয়েছে। সেই শৃঙ্খলা শেখা এবং চর্চা করা সময়সাপেক্ষ। তরুণ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই শেখার প্রক্রিয়া চলমান থাকাই স্বাভাবিক। তাঁদের কিছু ভুল উচ্চারণ, বিধি ভঙ্গ বা আবেগপ্রবণ বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু তা যেন নিরুৎসাহের কারণ না হয়। বরং এই ভুলগুলোই তাঁদের পরিণত হতে সাহায্য করবে।
বর্তমান অধিবেশনে যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হলো—সংসদে বিতর্কের উপস্থিতি। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সংসদে কার্যকর বিতর্কের ঘাটতি নিয়ে যে অভিযোগ ছিল, তার বিপরীতে এখন ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। মতের অমিল, তর্ক-বিতর্ক, এমনকি উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়—সবই একটি সক্রিয় সংসদের লক্ষণ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিতর্কগুলো যেন ব্যক্তিগত আক্রমণে পর্যবসিত না হয় এবং সংসদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। মতভেদ থাকবেই, কিন্তু সেই মতভেদকে শালীন ও যুক্তিনির্ভর রাখাই গণতান্ত্রিক চর্চার মূল।
গণতন্ত্রের শক্তি তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রে। সংসদে বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও প্রজন্মের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়া মানে হচ্ছে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। তরুণ সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি সেই বহুমাত্রিকতাকে আরও সমৃদ্ধ করছে। তাঁরা প্রযুক্তি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিবেশসহ সমসাময়িক নানা বিষয়ে নতুন করে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত করছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি গণতন্ত্রকে আরও প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী করে তোলে।
তবে একইসঙ্গে প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ। সংসদে বক্তব্য দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত মত প্রকাশের সুযোগ নয়; এটি জনগণের প্রত্যাশা ও আস্থার প্রতিফলন। তাই প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আচরণই হওয়া উচিত পরিমিত ও দায়িত্বশীল। প্রবীণ সংসদ সদস্যদের এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা নবীনদের পথ দেখাতে পারে, সংসদীয় সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
গণতন্ত্রের যাত্রাপথে বিতর্ক অপরিহার্য। মতের সংঘাত থেকেই নতুন ধারণার জন্ম হয়, নীতির পরিমার্জন ঘটে। যে সমাজে বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হয়, সেখানে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই সংসদের ভেতরে যে তর্ক-বিতর্ক চলছে, তাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন—যদি তা নিয়ম ও শালীনতার মধ্যে থাকে। এই বিতর্কই ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখনও বিকাশমান। নানা চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এগিয়ে চলার যে প্রয়াস, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান সংসদ অধিবেশন সেই যাত্রারই একটি প্রতিচ্ছবি। এখানে যেমন আছে অপূর্ণতা, তেমনি আছে অগ্রগতির ইঙ্গিত। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে একটি পরিণত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কোনো গন্তব্য নয়—এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় ভুল হবে, শিখন হবে, সংশোধন হবে। তরুণ সংসদ সদস্যদের উদ্দীপনা, তাঁদের ভুল-ত্রুটি, এবং সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতা—সব মিলিয়েই গণতন্ত্রের পথ আরও সুদৃঢ় হবে। বিতর্ক, মতভেদ ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন