https://www.prothomalony.com/
16528
literature
উত্তাল মার্চের দিনগুলি, কিছু স্মৃতি, কিছু কথা! মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ কালের অসমসাহসী মানুষ, অদম্য মনোবল, স্বাধীনতার আকাঙ্খা, ত্রিশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সর্বোচ্চ ত্যাগ এবং বিজয়ের আনন্দ আর দেশপ্রেম ধরা থাকলো কবিদের লেখা শব্দে শব্দে। কবিতাগুলি পড়ার বিনীত আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
ফারুক ফয়সল
ডেকে যাও, সাড়া দিবো না
আবদুর রাজ্জাক
সহস্র বছর শুন্যতার দিকে তাকিয়ে পার হয়ে গেছে এবং
সেইসব গল্প অলিখিতই রয়ে গেছে।
তোমাকে অশুভ জ্যোৎস্নায় লাল একটি কুসুম হতে দেখেছি,
যেন এক অসীম নির্জনতা আমাকে পেয়ে বসেছে,
আমরা কেউ কখনো কারো কাছে আসিনি।
এক নেপথ্যচারী কাপালিক নিশ্চুপ থেকে গভীর অরণ্যে
একাকী হাঁটছি....
ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে, কোনো প্রত্যাশা নেই,
দূর সুদূরেই তোমাকে থেকে যেতে হবে।
দেয়ালে অঙ্কিত ঘোর বসতিকাল
ডেকে যাও, ইচ্ছে মতো ডেকে যাও, সাড়া দিবো না।
আগ্রাসনের এইসব দিনগুলি থেকে হয়তো একদিন
বের হবো তোমার কারণে।
নোনা হাওয়ায় হয়েছে প্রবল
মঈনুস সুলতান
আমাকে সীমান্তে নামিয়ে দিয়ে যে রিকশাওয়ালা শরণার্থীদের চলমান
মিছিলের ভেতর দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল, ভিটেবাড়িতে পৌঁছতে পারেনি সে
গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তপাতে হয়েছিল নিহত,ভাবি তার কথা,স্মৃতিতে হই প্রণত
ইচ্ছে হয় তাকে জানাই স্বদেশের কিছু সংবাদ, পাঠাই দৈব টেলিগ্রাম—
বলি… আদিগন্ত আমাদের রোনাজারি, অন্তহীন হে আমাদের প্রতিবাদ;
জানাই— বিষ্ফোরণে বিধ্বংস মেঘনার ব্রিজটি জোড়া লেগেছে নিখুঁতভাবে
ভাসছে অবলীলায় মহাজনের নাও— রৌদ্ররাগে ঝংকৃত হচ্ছে শ্বেতশুভ্রপাল,
জাদুঘরে জমা রেখেছি আমাদের কথকতা,সাজিয়ে রেখেছি স্বজনের কংকাল;
বধ্যভূমিতে নির্মিত হয়েছে সৌধ…জলাশয়ে বিশুদ্ধ শাপলা ফোটে নিত্যদিন
খাম্বার সেতু ধরে ছুটে যায় উড়ুক্কু আজদাহার আকৃতিতে তৈরী রেলগাড়ি
স্ক্রীনে চোখ রেখে আমাদের কৌম ক্রমশ হচ্ছে প্রবীণ,
গেল পঞ্চাশ বছরে ঘটেছে অনেক কিছু, তাকে পাঠাতে চাই তথ্য অশেষ
কিছু নদীর ভেঙ্গেছে পাড়,পড়েছে চড়া,তারপরও বইছে হে স্রোতজল,
যে যুদ্ধে মৃত্যু হয়েছে তোমার, জারি আছে, শেষ হয়েও হয়নি তা নিঃশেষ
জেগেছে নতুন দ্বীপ… নওল তরুরাজি নোনা হাওয়ায় হয়েছে প্রবল।
ট্রেন
মাহমুদ হাফিজ
রেলগাড়িটার শব্দ শুনে
দৌড়ে আসেন তিনি
অনেক বছর ধরেই তাকে চিনি
ইস্টিশনের ধারটি ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকেন ঠায়
ছেলের প্রতীক্ষায়
হুইসলে হুইসলে
কোন সে দূরের অচিনপুরে রেল চলে সব ফেলে
আসে না তার ছেলে।
একাত্তরে যুদ্ধে গেছে আসবে আজই ফিরে
হাজার কথা জমেছে মন ঘিরে
ট্রেন চলে যায় কেউ আসে না তো
প্রহর গুণে গুণেই চলেন মা তো
ভেবেই আকুল মায়ের অবুঝ মন
পরের ট্রেনেই আসছে বাছাধন
এইটুকু আশায়
দাঁড়িয়ে থাকেন ঠায়
এমনি করে দিন চলে যায়, ট্রেন চলে যায়, ট্রেন তো চলে যায়.......
এসো অন্ধকার পোড়াই
হোসাইন কবির
দৃশ্যত অদূরে থেমে আছে পথ
একটি উত্থিত তর্জনী-রেখায়—
আমরা পথিক পথ হয়ে
শুয়ে আছি সমগ্র মানচিত্রে
ভাবি,
ওরা কারা? পথে পথে পোড়াচ্ছে সময়–
সমূহ স্মৃতি-স্বাক্ষর— সব আয়োজন
ভাবি,
যদি অন্ধকার পোড়ানো যেত– মন্দ কী হতো!
তবে, এসো আলোর সন্ধানে–
আরো কিছুকাল নাহয় অন্ধকার পোড়াই
মহাকাব্যের কররেখা
বদরুজ্জামান আলমগীর
পোকামাকড়ের সাথে শস্যের কণা ভাগ করে
খায় পথভোলা নড়বড়ে নদীপাড়ের একলা মানুষ,
রাস্তার নুড়ি জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকে দুঃখের খড়িমাটি
ঘর বাঁধে ঝড়-ঝঞ্ঝার মুখে ভাঙা পালকের নিচে
মৃত্যু তাকে সোনার বাটায় সুগন্ধি ছুঁইয়ে দেয় অমরতা।
খোয়াব এক বাড়িয়ে ধরে, বলে যে চোখ বুঁজে দেখো
তুমিও অমর হতে জানো, তুমিও অক্ষয় পাথর এক।
মার্চ তারাসংহার আদিগন্ত উদাম গায়ের চাষাকে
আগুনে ঝলসানো জলনির্ণীত দুঃখ পাড়ের লখাইকে
একমোচড়ে এনে দেয় মহাকাব্যের স্থিতি অস্থিতি।
কে যে এক লহমায় হয়ে ওঠে সন্তাপে পরম অর্জুন,
হাসান-হোসেন, হাতে লাফায় ইকারুসের দুর্নিবার
আমাদেরই চোখের সামনে জবুথবু রাখাল এক
ঘুরে দাঁড়ায় ইলিয়াডের এচিলিস, কারখানা মজুর
কী এক কাঠমিস্ত্রী তন্তুবায় তমসার দিব্যি ওডিসিউস।
হেঁশেল থেকে উঠে আসা বোন আমার হয় মোরিগ্যান,
কী এক জলটঙ্গী নারী আচমকা জেগে ওঠে কুন্তি।
এই মাসে শৌর্যের বাঁকে হিসহিস রক্তাভ দুর্যোধন
এভাবেই ডোবে আর ভাসে রবিশস্য সমাজের মার্চ
এমন এক জমাট কালের নাভিমূল আমাদের গাঁথে
আমরাও ব্যথাসিদ্ধ হই নির্লিপ্ত কররেখার ভাঁজে ভাঁজে।
তার কথা মনে পড়ে
শিউল মনজুর
(ক)
ভেবে ভেবে দিনশেষে দূরবাসে তার কথা মনে পড়ে
আর কফিমগে সন্ধ্যার বিষণ্ণতা নেমে আসে;
কোথাও যেনো মাতৃভূমির সুঘ্রাণ নেই…
(খ)
জানালার পাশে বাতাবী লেবুর ঘ্রাণ, রিক্সার টুংটাং শব্দ,
স্কুলের ঘণ্টাধ্বনি, মিনার থেকে ভেসে আসা সুমধুর আজান,
গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত ও বসন্তের ফুল পাখি,
শহীদ মিনারের দিকে ছুটে যাওয়া প্রভাতফেরি, একাডেমির বইমেলা
মার্চ থেকে ডিসেম্বর একাত্তরের গল্পগাঁথা, নববর্ষের মিছিল,
ভোরের সংবাদপত্র আর ঝলমলে ঈদ সংখ্যার পাতাগুলো
মনের ভিতর জেগে থাকে তারুণ্যের স্বপ্নময় দিন। অথচ,
তারা জানে না কবির জন্মভূমি কবির শ্রেষ্ঠ অভিধান…
(গ)
ও গাঁয়ের পথে প্রান্তরে পড়ে আছে মন, মনোভূমি।
বাংলামায়ের লতায় পাতায় ছুঁয়ে আছে জীবনের সজীবতা-
মা ডাকছে… স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে তার দিকেই ধাবিত অবিরাম!
পূর্ণ স্বদেশ
আদিত্য শাহীন
একটি নিশানা থাকে, দিক নির্দেশনা থাকে
একটি ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ বাতাস থাকে, থাকে দুর্মর তাগিদ
রক্তের ভেতর থেকে কি যেন নেচে ওঠে,
প্রাণ আর থাকেনা দেহে,
প্রাণ হয়ে ওঠে আগুনের ফুলকি
দেহ খুঁড়ে নিজেকে নিভিয়ে পতাকা ওড়ানোর দিন
রক্তসমুদ্র কিংবা আর্দ্র চোখের ওপর
পতাকা ওড়ানোর দিন, পরাজিত মেঘ সরিয়ে
কোটি হাতে বানানো কিংবা শানানো সুর্য টানানোর দিন
একটি নিশানা থাকে স্বাধীকারের
একটি নিশানা থাকে স্বাধীনতার
যেন এক অদৃশ্য অক্ষর প্রতিটি বুকে বুকে পাঠিয়েছে
অদ্ভুত নিজস্বতার চিঠি, বহু বছরের ভুলে যাওয়া
নদীর স্রোতে আবারও আসে নতুন ঢেউ
কতশত ঢেউ ভেঙে এসেছিল একাত্তর
মানুষের হাতে হাতে নিজেরই দেহের গোলা
কতশত ঢেউ ভেঙে এসেছিল
নিজস্ব আকাশের প্রতি সুগভীর প্রেম প্রদর্শনের দিন,
পূর্ণ হৃদয়ে জন্ম নেয়া স্বদেশ
পূর্ণতায় ফিরে এসো তুমি
বাংলাদেশের যীশু
রেজা শামীম
যতবার তোমাকে বন্দী করা হয়-
ততবার তুমি ছড়িয়ে পড়ো লোকান্তরে
যতবার তোমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত হয়-
ততবার তুমি প্রতিধ্বনিত হও বাংলার বাতাসে
তোমাকে মাটিতে পুতে ফেললে—
তুমি আমূল গেঁথে যাও মাটির গভীরে
শেকড়ের মত ছড়িয়ে পড়ো ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে
তোমাকে নিষিদ্ধ করলে-
তুমি আরো বেশী হয়ে ওঠো অবশ্যপাঠ।
তোমাকে হত্যা করা যায়না
তুমি যিশুর মত পুনরুত্থিত হও পুনর্বার
তোমাকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে ফেলে যারা উল্লাস করে
তারা জানেনা - সেই ধ্বংসস্তুপ থেকে
তুমি উড়ে যেতে পারো ছাইডানা ফিনিক্স পাখি।
তুমি দেবতা অগ্নি'র মতো
জ্বলন্ত আগুনের ভেতরেও থাকো অদগ্ধ, নিরুত্তাপ।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন