https://www.prothomalony.com/
16527
literature
ঈদের দিনে
ভীষ্মদেব মণ্ডল
বছর ঘুরে ভুবন জুড়ে আসে যখন ঈদ
মোমিন মনে আর থাকেনা একটুখানি জিদ,
ভেদাভেদের বালাই ভুলে বুকে মিলায় বুক
সেই কারণে সবার মনে জাগে নতুন সুখ।
পাক পোশাকে সবাই মিলে ঈদগাহতে আসে
একই সাথে নামাজ পড়ে খুশির বানে ভাসে,
এমন দিনে সরল মনে করলে কিছু দান
হৃদয় মাঝে তখন বাজে নেক সুরের গান।
রোজাদারের বুকের মাঝে হাসে ঈদের চাঁদ
সবাই ভাসে হালাল সুখে কেউ থাকেনা বাদ,
দু'হাত তুলে খোদার কাছে এই মিনতি রাখে
সারা জীবন সবাই যেন পরম সুখে থাকে।
শেকড়ের উৎসব ঈদ
বিজন বেপারী
মনে পড়ে সেই সোনালী সকাল, শিশিরভেজা ঘাস
গাঁয়ের পথে বয়ে যেত এক বাসন্তী আশ্বাস।
পলাশ-শিমুল রঙিন বেশে সাজাতো বনের ধার
ছোট্ট খোকা লাটিম ঘুড়ি খুশিতে মনের পাড়।
বাঁকা চাঁদ উঁকি দিলে ওই হিজল বনের শিরে
আনন্দের বান ডাকত তখন গাঁয়ের প্রতি নীড়ে।
মাটির উনুন সুবাসিত ফিরনি-পায়েস-সেমাই
রাম-রহিমের মিলন মেলা নেইতো দাওয়াত বালাই।
মন্টু কাকার বাড়ির মুড়ি আর রহমত চাচার দই
সেই স্বাদের কাছে ফিকে আজ শহরের হইচই।
নতুন জামার দারুণ ঘ্রাণ, পকেটে ঈদের কড়ি
সবাই মিলে মেলায় যাওয়া হাতে হাত ধরাধরি।
বসন্তের এই রঙিন ফাগে মিলেমিশে একাকার
সম্প্রীতি ছিলো চিরন্তন এক অমূল্য উপহার।
এখনো যখন স্মৃতির চোখে চোখ রাখি আনমনে
ফেলে আসা সেই গাঁয়ের ছবি ভাসে মনের কোণে।
ঈদ মানেই ছিলো হট্টগোল আর সবার হাসিমুখ
এক থালাতে ভাত খাওয়া-ভাগ করে নেওয়া সুখ।
পথশিশুর ঈদ
রাহেলা আক্তার
পথশিশু বলে আমাকে সবাই করে অবহেলা,
ফুটপাতের ঐ খাবার খেয়ে কাটাই সারা বেলা।
"মা" হারালাম, বাপ হারালাম চলি আপন রথে
ঘর-বাড়ি আর ঠিকানা নেই, ঘুরি পথে পথে।
পোশাক ছাড়া শীতের মাঝে, থরথরিয়ে কাঁপি
দেখার, বলার নেই তো কেউ দুঃখের ওজন মাপি।
রাতটা কাটাই বস্তি পাড়ায়, গায়ে ছেঁড়া কাঁথা
পথশিশুরাও যে মানুষ, বলো কেই-বা বুঝে ব্যথা!
ছেঁড়া কাপড় পরে সদা, কাটাই যেথা-সেথা
বস্ত্র প্রদানের টাকা এলে সাবাড় করে নেতা।
বস্তা কাঁধে প্লাস্টিক কুড়াই রাস্তার অলিগলি
পেট চলে না, তাতে কত? সংগ্রাম করেই চলি।
নতুন পোশাক পরে সবাই কাটাবে ঈদের দিন,
পথের শিশু বলে আমি, হারালাম খুশির বীণ।
প্রভাবশালী ভাই বন্ধুরা পাশে যদি থাকতো
পথশিশু ছেলেমেয়েরা প্রাণটা ভরে হাসতো।
রোজার পরে ঈদের খুশি
মাসুদ রানা
বছর শেষে ঈদের খুশি এলো সবার ঘরে
নতুন জামা কাপড় পরে যাবো মাঠের তরে,
বাবা আর ভাইকে নিয়ে ঈদগাহের মাঠে যাই
ঈদের নামাজ পড়ি সবাই একসাথে জমকাই।
রমজানের ওই রোজার শেষে ঈদের খুশি আসে,
সিয়াম- সাধন করে মুমিন কান্নায় দুহাত ভাসে,
প্রভু আমার সিয়াম সাধন কবুল করো তুমি
রমজান পেয়ে পাপমুক্ত হতে পারি যেন আমি।
শহর জুড়ে ঈদের ঘ্রাণ
রোকেয়া দীপা
এখন এখানে কোনো পিচঢালা পথের ক্লান্তি নেই,
নেই কোনো রিকশার টুংটাঙ শব্দের দীর্ঘশ্বাস।
বরং জানালার কার্নিশে এক চিলতে রুপালি রোদ্দুর
বলে যায়- আজ এক পশলা আনন্দের দিন।
স্মৃতির আয়নায় ভাসে সেই চেনা মফস্বল,
পলাশ ঢাকা পথের ধারে এক কিশোরীর নুপুরের শব্দ।
শহরের এই যান্ত্রিক খাঁচায় আজ অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা,
যেন প্রতিটি ইটের দেয়াল গেয়ে ওঠে মিলনের গান।
সেমাইয়ের ঘ্রাণে ম ম করা ড্রয়িংরুম, আর
পুরানো ট্রাঙ্ক থেকে বের করা ইস্ত্রি করা জামা-
সব মিলেমিশে একাকার নাগরিক উৎসবের ফ্রেমে।
বাবা ফিরবেন না আর ঈদগাহ থেকে, আমিও
আলিঙ্গনে খুঁজে পাবোনা ফেলে আসা শৈশব।
এই তো মানুষের উৎসব, এই তো বেঁচে থাকা-
বুকের পকেটে কিছু রঙিন চিরকুট আর সালামির ভাঁজ।
ঈদের নীলচে রুপালি দিন
আব্দুস সাত্তার সুমন
আমার নাম সুবহা। রমজানের শেষ বিকেল হলেই আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত পাখি ডানা ঝাপটাতে থাকে। মনে হয় আজই বুঝি সেই রাত, যেদিন আকাশের বুকে ঈদের বার্তা লেখা হবে।
সেদিনও ঠিক তেমনই হলো। সূর্যটা নরম কমলার মতো গলে যাচ্ছিল পশ্চিমে। আমি আর আমার ভাই সাঈদুল ইসলাম ছাদে উঠলাম চাঁদ দেখতে। কিন্তু আমাদের আকাশটাকে খণ্ড খণ্ড দালানের দেয়াল এসে ঢেকে দিয়েছে। যতই তাকাই, চাঁদের দেখা নেই। আমি ভাইয়াকে বললাম,
"চাঁদ কি আজ অন্য কোথাও গেছে?"
ভাইয়া চোখের ইশারায় বলল,
"চলো, মাদ্রাসার মাঠে যাই। সেখানে আকাশ পুরোটা দেখা যায়।"
আমরা দৌড় দিলাম। মাঠে গিয়ে যখন মাথা উঁচু করলাম, তখনই দেখি একফালি দুধসাদা আলো! চিকন, শান্ত, লাজুক একটা চাঁদ। যেন সাদা কাঁচের তৈরি ছোট্ট নৌকা ভাসছে নীল জলে।
আমার মুখ থেকে নিজে নিজেই বের হয়ে গেল -ঈদ! ঈদ! কাল ঈদ! ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক।
আমাদের চিৎকারে মাঠের বাতাস পর্যন্ত আনন্দে ভাসছে। আমরা দৌড়ে বাসায় ফিরলাম। খবর শুনে সবাই ছাদে উঠে গেল। মুহূর্তেই জ্বলে উঠল রঙিন বাতি যেন জোনাকিরা সার বেঁধে বসেছে।
এরপর সবাই মিলে তারাবাতি জ্বালিয়ে খুব মজা করলাম।
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল দুধে সেদ্ধ সেমাইয়ের গন্ধ। আম্মু বললেন,
"আজ কিন্তু হাতে মেহেদি না দিলে ঈদের চাঁদ রাগ করবে।"
আমার হাতের তালুতে তিনি এমন নকশা আঁকলেন মনে হলো লতার ভেতর ছোট ছোট চাঁদ লুকিয়ে আছে। আমার বান্ধবীরাও এলো। আমাদের ঘরটা তখন গল্পের বাক্স হয়ে গেল মুখ খুললেই নতুন শব্দ বের হয়।
রাতে বাবার সাথে বাজারে গেলাম। বাজারটা আজ অন্যরকম। সেমাইয়ের প্যাকেটগুলো ঝুলছে সরু নদীর মতো, মাংসের দোকানগুলো লালচে আলোয় চকমকে, কাপড়ের দোকানে রঙের ঢেউ। মানুষের চোখেমুখে এমন ঝিলিক মনে হয় সবাই নিজের ভেতর একটা করে ঈদের খুশি লুকিয়ে রেখেছে।
ফজরের নামাজের পর ঈদের সকালটা হলো ধীরে ধীরে যেন নতুন বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা উল্টানো হচ্ছে। আমরা সবাই সাদা জামা-কাপড় পরলাম। মনে হচ্ছিল আমরা সকালের কুয়াশা গায়ে জড়িয়ে আছি। বাবা বললেন,
"একটা ছবি তোলা যাক, এই দিনটা কিন্তু বারবার আসে না।"
ঈদগাহে গিয়ে দেখি মানুষের ঢেউ। নিচতলায় আমাদের নামাজের ব্যবস্থা, ভাইয়াদের দোতলায়। চারদিকে সাদা, সবুজ, নীল কাপড়ের মৃদু শব্দের ঝংকার, যেন বাতাসেও নামাজ পড়ছে।
নামাজ শেষে দোয়ার সময় আমার মনে হলো আকাশটা খুব কাছে নেমে এসেছে। মসজিদের গেটের পাশে বসে থাকা গরিব মানুষদের হাতে যখন আমরা দান-সদকা দিলাম, তাদের মুখে যে হাসি ফুটল তা দেখে মনের ভেতর প্রশান্তি এনে দিল।
বাসায় ফিরে নাস্তার টেবিল দেখে আমি থমকে গেলাম। সেমাই, পায়েশ, নুডুলস, পাস্তা, ফালুদা সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল স্বাদের রঙিন মানচিত্র।
আমি আর ভাইয়া প্রতিযোগিতা করে খাচ্ছিলাম। আম্মু শুধু হেসে বলছিলেন,
"ধীরে খাও, ঈদ পালিয়ে যাচ্ছে না।"
দুপুরে টেবিল ভরে গেল পোলাও, মুরগির মাংস, গরুর মাংস, খাসির মাংস, বোরহানি আর জর্দায়। ঘরটা তখন সুগন্ধি উৎসব।
বিকেলে আমাদের বাড়ির সামনে মেলা বসল। নাগরদোলাটা আকাশ ছুঁতে চায়। আমি যখন ওপরে উঠলাম, মনে হলো সেই চিকন চাঁদের কাছে চলে যাচ্ছি।
সালামির টাকা দিয়ে একটা পুতুল কিনলাম। তার চোখ দুটো চকচক করছে। আমি নাম দিলাম "পিংকি" ।
ভাইয়া তখন তার বন্ধুদের সাথে দৌড়ে ধুলো উড়াচ্ছে। আমরা আত্মীয়দের বাড়ি গেলাম। আবার নতুন করে খাওয়া, নতুন করে গল্প।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আমরা সবাই একসাথে বসলাম। হাসি, গল্প, রঙিন পর্দার ভেতর নতুন নতুন দৃশ্য সব মিলিয়ে দিনটা ধীরে ধীরে সুন্দর ভাবে কাটলো আমাদের সকলের।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। চাঁদটা আর চিকন নেই, একটু ভরাট হয়েছে। আমি মনে মনে বললাম, "আজকের দিনটা আমি কোথায় রাখব?"
নিস্তব্ধ রাত উত্তর দিল, "মনের ভেতর রেখে দাও, কখনো হারাবে না।"
আমি হাতের মেহেদির দিকে তাকালাম। রঙ গাঢ় হয়েছে। ঠিক আমার ঈদের দিনের মতো। ঈদ মানে কখনো একা আনন্দ করা নয়! পাড়া-পড়শি, গরিব অসহায়, পথশিশুদের সাথে ঈদ ভাগাভাগি করাকেই ঈদের আনন্দ বলে। তাই ঈদের আলো ও রোজার আত্মত্যাগ যত্ন করে রেখে দিলাম, আমার ছোট্ট হৃদয়ের গোপন খাতায়।
ঈদ সালামি
কাজী নাজরিন
আগামীকাল ঈদ। ঘুম নেই রকির দুচোখে। এদিক ওদিক ওলট-পালট করে যাচ্ছে রকি। রকির মাথায় ভর করেছে ঈদের নানান জল্পনা-কল্পনা। মাথার ভেতর ঘুরছে ঈদের দিনের সবকিছু। দশ বছরের রকি ভাবছে ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ করে গোসল সেরে নেবে। এরপর মায়ের হাতের ফিরনি সেমাই খেয়ে নতুন জামা পরবে।
বাবা, কাকা,দাদুভাই এবং বাড়ির বিশ-পঁচিশজন পুরুষ সদস্য মিলেই একসাথে ঈদের নামাজ পড়তে যাবে ঈদগাহে। ঈদের নামাজ শেষে ঈদগাহে দেখা হওয়া পরিচিত সবার সাথে কোলাকুলি করবে। এরপর বাড়ি ফিরে শুরু হবে সালাম করে সালামি নেয়ার পর্ব।কে কত টাকা দিতে পারে বা কেমন টাকা সালামি পেতে পারে সেসব হিসাব আগে থেকেই ধারণা করা হয়ে গেছে রকির।
আজ ঈদ। মায়ের ডাকে খুব ভোরে রকি ঘুম থেকে উঠেছে।ফ্রেশ হয়ে দাদুর হাতে কয়েক চামচ পায়েস খেয়েই রকি নতুন পাঞ্জাবি পরা শুরু করেছে। নতুন জুতো পরে নিয়েছে। দাদুভাই ডেকে নিয়ে সুগন্ধি আতর মেখে দিয়েছেন পাঞ্জাবি এবং রকির হাতে। আতরের সুগন্ধি যেন পুরো বাড়ি ছড়িয়ে যাচ্ছে। সারাবাড়ি আজ আতরের সুগন্ধি। দাদুভাই আলমারি হতে একটা সুন্দর টুপি বের করে রকির মাথায় পরিয়ে দিলেন। টুপিটা কিন্তু ভীষণ চমৎকার। রকিকে দেখে দাদুমণি বলে উঠলেন, "মাশাল্লাহ আমার নাতিকে এক্কেবারে নবাবের মতো লাগছে।"
সবাই মিলে হাসিমুখে ঈদের নামাজ পড়ে এসেছে। এবার সবার ঘরে গিয়ে বাচ্চাদের সাথে রকিও সালাম করতে গেছে। সালামের পর সালামির জন্য অপেক্ষা। নতুন চকচক বিশ টাকা,পঞ্চাশ টাকা, একশো টাকার অনেক গুলো নোট পেয়েছে রকি।এছাড়া সবার ঘরে ঘরে আবার চলছে আপ্যায়ন । ফিরনি,সেমাই, পায়েস, জর্দাভাত,বিরিয়ানি, রোস্ট,পোলাও,,,। একটু একটু খেয়ে পাঞ্জাবীর পকেটে করে সব টাকাগুলো নিয়ে ঘরে এসেছে। দাদা দাদু এইবছর রকির হাতে দিয়েছে সালামি হিসেবে দুটো চকচকে দুইশো টাকার নোট।রকি পঞ্চম শ্রেণিতে ভালো রেজাল্ট করেছে সেই হিসেবে কাক্কু দিয়েছে চকচকে পাঁচশো টাকার নোট।
রকি ভীষণ খুশি। সব টাকা মাকে রাখতে দিয়েছে। বিকেল বেলা আবার ঘুরতে যাবে ফুফুদের বাড়ি, এরপর নানুবাড়ি এবং খালাবাড়ি।
হঠাৎ রকিদের ঘরের সামনের উঠোনে কান্নার শব্দ।পাশের বাড়ির মর্জিনা খালার ছেলে রাজু খুব কান্না করছে। মর্জিনা খালা রকিদের ঘরে কাজ করে। রকি গিয়ে রাজুকে জিজ্ঞেস করলো, "কেন কান্না করছো রাজু?"
রাজু তখন বলে, "আমাকে কেউ এক টাকাও সালামি দেয়নি!"
রকি ছুটে গিয়ে মায়ের কাছ থেকে নিয়ে রাজুর হাতে একটা চকচকে একশো টাকার নোট দেয়।দাদু,চাচি সবাইকে বলে রাজুকে আরও কিছু সালামি দেয়ার ব্যবস্থা করে রকি।রাজু খুব খুশি হয়।রাজু আর রকি ঈদের কোলাকুলি করে নিল।রাজু, বত্রিশ দাঁত বের করে খিলখিল করে হাসতে লাগলো। রাজুকে, রকি ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে সব খাবার খেতে দিল।দুজন একসাথে খাচ্ছে আর হাসছে। রকি, রাজুকে বলে দিয়েছে, বিকেল বেলা রকির সাথে যেন সবার বাড়িতে ঘুরতে যায়।ঈদ সালামি পেয়ে রকি এবং রাজু দুজনেই আজ ভীষণ খুশি।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন