https://www.prothomalony.com/
16459
literature
মহানায়কের ঊর্ধ্বে
জিয়া হক
এই দেশে আর থাকবে না তার নাম ও নিশানা চিহ্ন
তাকে করে দিবো একেবারে এই জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন
স্মারকে মোড়কে কিছুতেই নাম থাকবে না ভুল করেও
কেউ তার নাম মুখে নিলে ফের শান্তি পাবে না মরেও।
রাখবো না তার বংশধারাও রাখবো না কোনো ভক্তকে
তাকে নিয়ে গান-কবিতা করিস, ভয় পাস না কি রক্তকে
রক্তকে ভয় তবু কেন তোর এত্ত সাহস কলজেতে
বাঁচতে চাইলে দেশ ছেড়ে ভেগে পাকিস্তানেই বল যেতে।
চিরতরে তার নাম মুছে যাবে, নাম থাকবে না পেপারেও
নাম থাকবে না পত্রিকা বই টিভি টকশোর রেফারেও
তার সমাধিতে গজাবে না ফুল জ্বলবে না বাতি একটাও
নেট দুনিয়ায় থাকবে না তার বইয়ের কভার প্যাকটাও।
অথচ তাকেই আজকে সবাই রেখেছে হৃদয়-কোঠাতে
শহিদ ছেলেটা নয়া ইতিহাস ইনসাফ ফুল ফোটাতে
ইতিহাস মানে ইতিহাসে সেরা মহানায়কের ঊর্ধ্বে সে
নিঃশ্বাসে আছে বিশ্বাসে আছে এশিয়া ছেড়েও দূর দেশে।
সারা জাহানের সকল জাতির চোখের পানির মোনাজাতে
সেই ছেলেটাই উন্নত শির স্বর্গ-স্বপ্ন বোনা যাতে
আকাশে বাতাসে নদীতে পাহাড়ে একটাই নাম জ্বলজ্বলে
শহিদ হাদির বিয়োগ ব্যথায় কোটি কোটি চোখ ছলছলে।
চায়ের কাপ ও নগরবাণিজ্যের উপধারা
আশরাফ হাসান
চায়ের কাপ থেকে উড়ে যাচ্ছে রাত্রিবিষণ্ণতা l ধূম্রের মতো তরল নিঃশ্বাসগুলি জমা হচ্ছে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা আকাশে l চাঁদের গোধূলি থেকে শুধুই ভেসে আসে অকাল অস্তমিত হওয়া জোছনারোদের গল্প l সাপুড়ের ঝুপড়ি থেকে লাটিমের মতো বেরিয়ে আসে ছেলেখেলা মেয়েবেলাl সারাবেলা ডুব দেয় মাছরাঙা কাদামাটির কষ্টজলে l চায়ের কাপ শেয়ার মার্কেটের শূন্য বারান্দায় ঝুলে থাকে সর্বস্বান্ত বিনিয়োগকারীর মতো l
অস্ফুট নৈঃসঙ্গনিনাদে ভেঙে যাচ্ছে কাঁচঘেরা অনুভূতির ঘরদোর l সান্ধ্যকাকের চিৎকারের মতো সারি সারি আলিশান বাড়িগুলো রওয়ানা দিয়েছে অঘোষিত প্রস্থানবাণিজ্যে l
হায় ! গোধূলি-গোধূলি খেলতে খেলতে এখনো জানা
হলো না বেতের বন কিম্বা নগরবাণিজ্যের উপধারাসমূহ l
একটি মৃত্যুর সংবাদ
সু শা ন্ত হা ল দা র
একটি মৃত্যুর সংবাদে
আজ আর সূর্য উঠেনি হাসিমাখা সংলাপ কোঁচড় করে
যে গোলাপ ফুটেছিল কৃষ্ণচূড়া বসন্ত দুপুরে
সে-ও থেঁতলে গেল বজ্র নিনাদিত দাঁতভাঙা বিকেলে
এই স্মরণীয়তায়
আজ আর কোন কবিতা লেখা হবে না
যারা উৎসব মুখরতায়
জোনাকি-রাত খুঁজে খুঁজে কাতর হয়েছেন উলুধ্বনি সন্ধ্যায়
তাদের বলছি
শান্তির প্রাচুর্যতায়
সুখের পারদ যদি মেপে থাকেন দেবী আকীর্ণ মদিরায়
তবে ভুল পরিখায়
আমন্ত্রিত সব অতিথি আজ
মীরজাফর ভাবনায় বেহুঁশ আর্য-খ্যাত দ্রাবিড়ের বাংলায়!
মাটির হেঁসেল ও আমার মা
দ্বীপ সরকার
সন্ধ্যায় মাটির হেঁসেলের চারপাশে বসে আছে বোন
ভাগ্নিগণ- মা'র হাসিতে কী যে আহলাদ!
চোখের ভেতর বয়ে যাওয়া কী যে রুপোলি চাউনি!
তেলপিঠার রমরমা ঘ্রাণ বৌচির মতো খেলে যায়
হাতের পিঠে গরম তেল,ফোসকা পড়ে
তবুও মা'র মুখে খুশির ঢেউ আছড়ে পড়তেই থাকে
দুধপিঠার প্রতিটি ফোঁরে—তীক্ষ্ম নজরদারি তার
আগুন হেঁসেলে যেনো শীতল হাওয়া
গায়ের চাদরে ঝুলে থাকে আধো গুঞ্জন
আহলাদের শিসে বোন ভাগ্নিদের হাসির দোল
কবজিজুড়ে সোঁদালি ঘ্রাণের মৌতাত
মা আমার তখনো অতি ব্যস্ত মানুষ
রাতের ডাইনিং এ তখন আস্তে আস্তে জড়ো হয় সকল
ঘ্রাণের স্তূপ
আমরা বসি চারদিক গোল করে—
গোল গোল চোখ নেচে যাচ্ছে সকলের
গোল গোল তেলের বড়া, গোল গোল আন্দেসা
রাতের প্লেটে জোছনার মতো আলোকিত হয়
মা তখনও কিছু মুখে দেয়নি
মা'কে বলি—তুমিও বসো মা
মা শুধু হাসে
এই হাসিতে এতো আলো ছিলো যে—
পুরো ডাইনিং টেবিল এ জোসনাফুল ফুটেছে
আমার অতল দীঘি
আনন্দ পাল
তোমাকে আবিষ্কার করার পরে-
দেখি বুকের ভেতরে একটা অতল দীঘি আছে।
সেখানে কখনও লাল শালুক ফোটে,
কখনওবা বয়ে যায় দমকা হাওয়া।
মাঝে মাঝে দেখি-বুনোহাঁসের দল ভেসে যায়।
কখনওবা খেলা করে নিঃসঙ্গ রাতের আঁধার।
মনে হয় প্রত্যেকের বুকের ভিতরে
একেকটা অতল দীঘি থাকে; সেখানে সবাই
কোনো না কোনো সময় ডুব দেয়,কেউ টের পায়
কেউ বা অবহেলায় হারায়! হয়তো বা কেউ তাকে
আবিষ্কারই করতে পারে না!
আমার অতল দীঘিতে আমি শুধু তোমাকেই দেখি।
তোমার বুকেও কি এমন একটা অতল দীঘি আছে?
রোজ পাড়ে বসে কারো ছবি আঁকো, অতল দীঘিতে ডুব দাও, খুঁজে খুঁজে বের করে আনো শালুক-ঝিনুক!
ঝিনুকের বুক থেকে বের করো মুক্তো?
তোমার দীঘিতেও কি বুনোহাঁসেরা আসে?
তাদের মাঝে কি আমাকে খুঁজে বেড়াও?
তাদের সাথে তুমিও কি অতলে ডুব দাও?
নাকি দলছুট শুধু আমায় খুঁজে ফেরো?
অতল দীঘির জলে রোজ আমি তোমাকেই খুঁজে পাই।
মায়াবৃক্ষের ছায়ায়; অবেলায়
মিঠুন দত্ত
মায়াবৃক্ষ;
মায়ায়-ছায়ায় গুল্মের শাখা-প্রশাখায় জড়ানো
ভালোবাসা।
ক্ষণিকের অতিথি, মাকালি-আশা...
শুধুই এক বাজারের ফর্দ।
ক্রেতা, বিক্রেতা ও ইজারাদারের আজ পাশা;
কাল ছাতিমের বাগান...
রাঁধুনিকে খোঁজো;
গোধূলি দেখো, সন্ধ্যা এই-তো, ছুটি দূরে নয়।
পারের তরী খালি কেন তোমার,
জিজ্ঞাসিলে কী উত্তর দিবে?
চলরে মন খুঁজি গো তাঁরে, হোক না অবেলায়...
বনছায়া গ্রামের গল্প
দিনা ফেরদৌস
গ্রামটির নাম বনছায়া। ভেতরে একবার ঢুকলেই মনে হয় গ্রামটি যেন আরোও কাছে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পরম মমতায়। কী নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশ। যেই শান্তির গহিনে রয়েছে ভয়ংকর এক কালো ছায়া।
গ্রামের মাতুব্বরের মেয়ে তরু। যেমন সুন্দরী, তেমনি বুদ্ধিমতী। তবে কোনোদিনও ভালো কোন বুদ্ধি আসেনি তার মাথায়। ছোটবেলা থেকেই তরু খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী।সবকিছুতে তাকে সেরা হতে হবে। সেরাটাই তাকে পেতে হবে। তরুর যদি একবার কোনকিছু পছন্দ হয়, সে যেকোনো ভাবেই তা নিয়ে ছাড়ে।
তরুর চাচাতো বোন দোলা, বয়সে তরুর থেকে তিনমাসের বড়। তরুর মতো দেখতে সুন্দরী না হলেও পড়াশোনা ও কাজে সে তরুর থেকে অনেক এগিয়ে। যার কারণে দুজনের মধ্যে খুব ভাব হলেও মনে মনে তরু দোলাকে ঈর্ষা করে। দোলা সেটা বোঝে না। দোলার ধারণা তরু তাকে অনেক পছন্দ করে।
বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন দোলার বাবা দোলার বিয়ে ঠিক করে ফেলেন শহরের প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলের সাথে। আশরাফ দেখতে যেমন সুদর্শন, তেমনি ভদ্র ছেলে। পরিবার নিয়ে বিশাল গাড়ি করে যেদিন দেখতে আসে দোলাকে, দেখেই হিরের আংটি পরিয়ে দেন আশরাফের মা, সেদিন তরু ঈর্ষায় জ্বলে আগুন হয়ে যায়। আশরাফকে তরুর চাই-ই চাই, যেকোনো মূল্যে। দোলার বিয়ে ঠিক হয়। চারমাস পর বিয়ে।
ঈর্ষা তরুকে এতোটাই অন্ধ করে দেয় যে, এক কাপালিকের খোঁজ নিয়ে অন্ধকার অমাবস্যার রাতে একাই শ্মশানে চলে যায়। শ্মশানে তখন আগুন জ্বলছিল। বাতাস ভারী ছিল ধোঁয়া আর মন্ত্রের শব্দে। তরুকে দেখতে পেয়েই কাপালিক বলল, সব জানি কিছু বলতে হবে না। মনে রাখবি আগামী এক বছর প্রতি অমাবস্যার রাত্রে কালোজাদু করতে এখানেই তোকে আসতে হবে। না হলে জাদু উল্টো কাজ করবে। মোটা অংকের টাকা কাপালিক'কে দিয়ে তরু আশরাফের উপর কালোজাদু করে।
চারমাস হওয়ার পূর্বেই ঘটতে থাকে নাটকীয় সব ঘটনা। বদলে যেতে থাকে আশরাফ। সে এখন প্রায়ই আসে তরুদের বাড়িতে। এড়িয়ে চলতে শুরু করে দোলাকে। তারপর একদিন সবার সামনে জানিয়ে দেয় আশরাফ, বিয়ে করলে সে তরুকেই করবে। সকলেই হতবাক। গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে ঘটনাটা। দোলার সাথে যেই ছেলেটির বিয়ে ঠিক হয়েছিল, সে এখন বিয়ে করতে চায় তরুকে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে দোলা।
আশরাফের সাথে বিয়ে হয়ে যায় তরুর। সে এখন ধনী পরিবারের বউ। ইচ্ছেমত টাকা খরচ করছে দুহাতে। বিয়ের ছয়মাস পর থেকেই আশরাফ অসুস্থ হতে শুরু করে। কাপালিকের কথা ভুলে গিয়ে সে এখন নতুন নতুন শাড়ি-গহনা কেনাকাটা নিয়েই ব্যস্ত। আশরাফকে নিয়ে ভাবার সময় তার নেই। এদিকে বাড়ি থেকে খবর এসেছে দোলার বিয়ে। তরু বড়লোকের বউ, এটা সবাইকে বুঝিয়ে দিতে বাড়ির সবার জন্যে দামী দামী কেনাকাটা করে বাপেরবাড়ি যাচ্ছে।
গালিবের সাথে দোলার পরিচয় হয় বনছায়া গ্রামের পথটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে। দোলাকে দেখেই গালিব বলেছিল, আমি তোমার জন্যেই এসেছি, তোমাকে জানি। ছেলেটির কথা শুনে, চমৎকার ব্যক্তিত্ব দেখে দোলার মনে হয়েছিল সে এই মানুষটির অপেক্ষায় আছে এতদিন ধরে। কীভাবে যেন দোলাদের বাড়ির সবাইকেও আপন করে নেয় অচেনা এই যুবকটি। দোলার বাবা কোনোকিছু চিন্তা না করে এই গালিবের সাথে দোলার বিয়ে ঠিক করে ফেলেন।
বাড়ি ভর্তি মানুষ। দোলার মনে শান্তি নেই। বাড়ির পিছনের পুকুর ঘাটে একা বসে আনমনে কী যেন ভাবছিল দোলা। 'তোমার ভেতরে কী চিন্তা কাজ করছে আমি জানি'। কথাটা শুনেই পিছনে তাকিয়ে দেখে দোলা, গালিব বসে আছে তার পিছনে। আশ্চর্য হলো দোলা। সে কী এতটাই ভাবনার জগতে হারিয়ে গিয়েছিল, যে তার পিছনে কেউ আছে তা সে টের পায়নি। এ কি করে সম্ভব! কিছুক্ষণ আগেও পুকুরে একটা ব্যাঙের ঝপাৎ করে পানিতে পড়ে যাবার শব্দ স্পষ্ট সে শুনেছে। তাহলে গালিব তার এতো কাছে এসে বসলো সে টের পায়নি কেন? পিছনে তো আর রাস্তা নেই, গহীন জঙ্গল ছাড়া। আসতে হলে সামনে দিয়েই আসতে হয়। কোনো হিসেব যেন মিলছে না।
নীরবতা ভেঙে দিয়ে গালিব বলল, "হিসেব পরে মেলালেও চলবে। আগে তোমার কাজ হচ্ছে আশরাফের জীবন বাঁচানো। সে এখন জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।" দোলা যেন কিছুই বুঝতে পারছিল না। "কালোজাদুর সময় শেষ হয়ে আসছে। জাদু যখন তাকে পুরোপুরিভাবে ছেড়ে যাবে, তখন সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। একমাত্র তুমিই তাকে বাঁচাতে পারো দোলা।"
হতভম্ব হয়ে বলল দোলা, "যদি একটু বুঝিয়ে বলেন কী হয়েছে?"
গালিব বলতে শুরু করে, "তোমার সাথে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কারণ আশরাফ নয়, তোমার চাচাতো বোন তরুই দায়ী। সে তোমার সুখ দেখে আশরাফকে তার করে পেতে গিয়ে আশরাফের উপর কালোজাদু করে। জাদুর বশীকরণে আশরাফ তোমাকে বাদ দিয়ে তরুকে বিয়ে করে। সবই ঠিক চলত, যদি তরু সময়মতো সেই কাপালিকের কাছে গিয়ে আবারও জাদু করে আসত। ভুলে গিয়ে না যাওয়ায়, জাদু উল্টো কাজ করতে শুরু করেছে। আজকের অমাবস্যার রাতে তুমি যদি গিয়ে সেই জাদু আশরাফের উপর থেকে ফিরিয়ে দিতে পারো, তো সেটা গিয়ে পড়বে তরুর উপর। আশরাফ বেঁচে যাবে।"
গালিবের কথা শুনে দ্বিধায় পড়ে যায় দোলা। আশরাফকে বাঁচাতে গেলে তরুর ক্ষতি হবে। তরুকে বাঁচালে বিনাদোষে মরবে আশরাফ। দোলা এখনো বুঝতে পারছে না গালিব কেন তাকে সাহায্য করতে চাইছে। সে আসলে কী চায়। কেন বার বার আশরাফের কথা তাকে বোঝাচ্ছে।
"ভাবার সময় এখন না। আজ রাত্রে আমি অপেক্ষা করবো গ্রামের সেই শেষ পথটায়। তুমি চলে আসো শ্মশানে।"
ঘরের ভেতরে ঢুকতেই এক অস্বস্তি কাজ করছে দোলার ভেতরে। আয়নায় তাকাতেই দেখে আশরাফের বুকের মধ্যে মাথা রেখে পুকুরপাড়ে বসে আছে সে। আশরাফ তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। দৃশ্যটি দেখেই তার ভেতরে আশরাফের জন্যে এক ধরনের মায়া নাকী প্রেম অনুভূত হলো ঠিক সে বুঝতে পারল না।
অমাবস্যার কালো রাত। ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় শেষটায় যেতেই পিছন দিক থেকে গালিব বলে উঠে, "আমি তোমার পাশে আছি, যেতে থাকো।" দোলার ভেতরে একটুও ভয় কাজ করছে না। তার যে করেই হোক আশরাফকে বাঁচাতে হবে। দুজনেই এসে পৌঁছায় সেই শ্মশানে।
কাপালিক শ্মশানে বসে জোরে জোরে মন্ত্র উচ্চারণ করছিল চোখ বন্ধ করে। চোখ বন্ধ রেখেই দোলাকে বলল, "দেরি করে ফেলেছিস। তবুও আমি চেষ্টা করবো। গহনার পুঁটলিটা এইখানে রাখ। অর্থকড়ি ছাড়া আমি কোনো কাজ করি না।"
দোলা আশ্চর্য হয়ে গেলো। তার বিয়ের জন্যে যেই গহনাদি বানানো হয়েছিল, সেই সব গহনা সে নিয়ে এসেছে। কিন্তু কাপালিক সেটা জানলো কী করে। সে'তো এই ব্যাপারে গালিবকেও কিছু বলেনি।
"যা সব ঠিক হয়ে যাবে। ভাগ্য কেউ কারোটা নিয়ে যেতে পারে না। কেউ যদি অন্যের ভাগ্য জোর করে নিয়ে যায় তো শান্তিতে থাকে না। যা, তোর ভাগ্য তুই নিয়ে যা। পিছনে ফিরে তাকাবি না। যা যা যা এই দিকে ভুলেও আর কোনদিন আসবি না"-বলে চিৎকার করতে থাকে কাপালিক।
বহুকাল পরে যেন গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠেছে আশরাফ। চারপাশের সবকিছু কেমন যেন উল্টা পাল্টা লাগছে। বুঝতে চেষ্টা করছে কী হয়েছে।
ধীরে ধীরে ঘোর কাটছে। চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে আসছে সব। আশরাফের মা এসে বললেন, "বৌমার বাপেরবাড়ি থেকে খবর এসেছে ওখানে গিয়ে বৌমা নাকি পাগল হয়ে গিয়েছে। কাউকে চিনতে পারছে না। কাউকে দেখলেই কামড়ে দিচ্ছে। তাই তাকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।"
কালকেই দোলার বিয়ে। পুকুরপাড়ে হাঁটুর উপর মাথা রেখে একা বসে আছে দোলা। মাথা তুলে তাকাতেই দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আশরাফ। দোলার সম্মুখে মাটিতে বসে দোলার হাত ধরে বলে, "আমি ভুল করেছি, বিশ্বাস করো কেন এমন করেছি নিজেও জানি না।"
বলেই নিজের বুকে দোলার মাথাটা নিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে, "তোমাকে নিয়েই সুখী হতে চাই।"
দোলা তাকিয়ে থাকে। এই দৃশ্য তার চেনা।
"আমার কাজ শেষ"-বলে পিছন থেকে সামনে আসে গালিব। এই সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। দোলার হাতে গহনার পুঁটলিটা দিয়ে বলে, "আমি সব ঠিক করে দিয়ে যাচ্ছি, তোমরা সুখী হও।"
দোলা কিছু বলতে যাবে, থামিয়ে দিয়ে গালিব বলে- "কিছু সময় কথা বলতে হয় না, চুপচাপ সুন্দর সময় অনুভব করতে হয়। বিদায়।"
পরদিন শোনা যায় বনছায়া গ্রামের সবাই বলাবলি করে, সন্ধ্যায় গ্রামের শেষ সীমানায় লম্বা এক ছায়ামূর্তি আধো আধো অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে। এরপর থেকে রটে যায় বনছায়া গ্রামে যখনই কোন অন্যায়, অবিচার হতে শুরু করে ভেতরে ভেতরে, যার কোনো প্রমাণ থাকে না, তখনই রহস্যময় এক মানুষ এসে উন্মোচন করে দিয়ে যান আসল সত্য।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন