https://www.prothomalony.com/
16426
bangladesh
দেশের সবচেয়ে কম বয়সে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন ফেলে দেশে এসেই মুখোমুখী হতে হয় মা হারানার বেদনার। তারপর নির্বাচনের ব্যস্ততা। জয়ী হয়ে সরকারে বসতেই দেশে আসে রমজান। বাজার ঠিক রাখার দিকে নজর দিতেই এবার শুরু হলো যুদ্ধ পরিস্থিতি। তার সাথে দীর্ঘদিন ‘চুষে’ খাওয়া দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি। সব মিলিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসতেই যেন ‘পাহাড়’ চেপে বসলো। প্রশ্ন এখন, কিভাবে এসব সামলাবেন তারেক রহমানের সরকার। নাকি মানুষ আবারও বলবে—‘আগেই ভালো ছিলাম!’
শুক্রবার দেশের সড়কে সড়কে চোখে পড়েছে লম্বা লাইন। সারিবদ্ধভাবে গাড়িগুলো অপেক্ষা করছে ফিলিং স্টেশনে। আগেরদিন মধ্যরাতে গুজব রটে যায় দেশে জ্বালানি তেলের সংকট। এমন পরিস্থিতিতে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে তেল নিতে ছুটে যান গাড়িচালকরা। বাড়তি চাপে যেমন হিমশিম খেয়েছেন ফিলিং স্টেশনগুলো তেমনি নড়েচড়ে বসেছে সরকারও। সড়কে লম্বা লাইন ধরার খবরের পর গ্যাস সাশ্রয়ে কিছু নির্দেশনা জারি করে সরকার। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাশ্রয় ও রেশনিং নীতি গ্রহণের বিষয়টি পরিলক্ষতি হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই করে কী মোকাবেলা করা যাবে সংকট।
জ্বালানি সাশ্রয়ই এখন প্রধান নীতি
সরকার ইতিমধ্যেই বিদ্যুৎ ও গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা জারি করেছে। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে এসি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আনা হয়েছে। একই সঙ্গে, কয়েকটি সার কারখানাকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ দেশে গ্যাসের বড় অংশ এই শিল্পখাতে ব্যবহার হয়।
পেট্রোবাংলা এলএনজির সরবরাহ সীমিত করেছে এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, সাশ্রয় এবং রেশনিংয়ের মাধ্যমে সীমিত মজুত জ্বালানি দিয়ে দেশের চাহিদা সামলানো।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি ব্যবস্থার উপর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এখন কোনও সময় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করা অর্থনীতির জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। সরকার যা করছে, তা হলো বিকল্প ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে সঙ্কট মোকাবিলা।”
প্রবাসী কর্মী ও রেমিট্যান্সের ঝুঁকি
বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমান—এই দেশগুলোতে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, নতুন নিয়োগ বন্ধ, এবং ভিসা প্রক্রিয়া ব্যাহত।
দীর্ঘমেয়াদে প্রবাসী আয়ে প্রভাব পড়তে পারে। এটি রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রভাবিত করবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, “যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু জ্বালানি নয়, দেশের মুদ্রা বিনিময় হার, আমদানি-রপ্তানি এবং বিনিয়োগের ওপরও প্রভাব পড়বে।”
সরকারী পদক্ষেপ এবং সমন্বিত পরিকল্পনা
সরকার ইতিমধ্যেই বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা, আমদানি বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস, শিল্প উৎপাদনে সাশ্রয়, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবস্থার আরও কার্যকর ব্যবহার—সবই এখন অগ্রাধিকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, “সাশ্রয় ও রেশনিংয়ের মাধ্যমে মার্চ মাস পর্যন্ত মজুত জ্বালানি দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ সম্ভব। তবে বিকল্প উৎস খুঁজে না পেলে পরিস্থিতি সংকটময় হতে পারে।”
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত ও কৃষি খাতের ওপর প্রভাব আরও বড় হতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
আমদানি ও রপ্তানির ওপর প্রভাব
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এবং কৃষিপণ্য রপ্তানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে যায়। যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হলে জাহাজ কোম্পানিগুলো ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ করে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে ইতিমধ্যেই অর্ডার সংকুচিত হয়েছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা কমাতে পারে। গার্মেন্টস মালিকরা বলছেন, “জ্বালানি ছাড়া অভ্যন্তরীণ উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই প্রভাবিত হবে।”
খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষির প্রভাব
জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি কৃষির খরচে প্রভাব ফেলে। সার ও কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যাহত হবে। দেশের সারের একটি বড় অংশ আমদানি করা হয় কাতার ও সৌদি আরব থেকে। যুদ্ধে সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষি উৎপাদনে ব্যাঘাত আসবে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা, আমদানি বহুমুখীকরণ, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সীমিত করা এখন সময়ের দাবি। সেলিম রায়হান ও মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, “সমন্বিত নীতি ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন এবং প্রবাসী আয়ের ওপর প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে।”
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন