https://www.prothomalony.com/
18080
bangladesh
শ্রাবণ নামলেই সিলেট যেন তার পরিচিত মুখটি বদলে ফেলে। আকাশের নীল মুছে গিয়ে সেখানে জমে ওঠে কালো মেঘের আনাগোনা। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে ঝরনার জল, চা-বাগানের সবুজ আরও গাঢ় হয়ে ওঠে, নদী ও হাওর ফিরে পায় বর্ষার উচ্ছ্বাস। ভেজা মাটির গন্ধ, দূরের পাহাড়ে মেঘের খেলা আর অবিরাম বৃষ্টির শব্দ—সব মিলিয়ে সিলেট তখন হয়ে ওঠে প্রকৃতির এক অন্যরকম আবাস।
শ্রাবণ মানেই বৃষ্টির পর্দা। কখনো ঝুম বৃষ্টি, কখনো মেঘের গর্জন, আবার কখনো হঠাৎ বৃষ্টির ফাঁকে এক টুকরো রোদ। মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যায় প্রকৃতির দৃশ্যপট। বৃষ্টির জলে ধুয়ে যায় পথঘাট, গাছের পাতায় জমে থাকা ধুলো। চারপাশের সবুজ হয়ে ওঠে আরও সতেজ, আরও দীপ্ত। মেঘের ভেলা ভেসে যায় আকাশজুড়ে। তার ফাঁক দিয়ে রোদের সামান্য আলো এসে যখন ভেজা পাতায় পড়ে, তখন সিলেটকে মনে হয় কোনো শিল্পীর যত্নে আঁকা জলরঙের ছবি।
শ্রাবণে সিলেটের পাহাড় যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। বৃষ্টিভেজা চা-বাগানের ঢাল বেয়ে তাকালে মনে হয়, পাহাড়ের গায়ে কেউ যেন সবুজের বিশাল চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। সেই সবুজের বুক চিরে কোথাও নেমে আসছে স্বচ্ছ জলধারা। বর্ষার পানিতে পাহাড়ি ঝরনাগুলো ফিরে পায় তাদের প্রাণ। দূর থেকে ভেসে আসে ঝরনার কলকল শব্দ—এক ধরনের নির্মল সংগীত, যার কাছে গেলে মন অকারণেই শান্ত হয়ে আসে।
সবুজের মধ্যে সাদা ফেনার মতো ঝরনার জল নেমে আসার দৃশ্য সিলেটের বর্ষাকে করে তোলে অনন্য। পাহাড়, ঝরনা আর চা-বাগানের এই মিলন যেন প্রকৃতির নিজস্ব কোনো চিত্রশালা। তাই বর্ষায় সিলেটের পাহাড়ি জনপদে ছুটে আসেন দূর-দূরান্তের মানুষ। কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে, কেউ ছবি তুলতে, কেউবা শুধু কিছু সময়ের জন্য শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকতে।
শ্রাবণের আনন্দ শুধু প্রকৃতির মধ্যে আটকে থাকে না। তার নিজস্ব স্বাদও আছে। বর্ষার দিনে গরম গরম খিচুড়ির আবেদন বাঙালির কাছে চিরন্তন। আর সেই খিচুড়ির সঙ্গে সিলেটের সাতকড়ার মাংস—স্বাদে যেন বর্ষারই আরেক অধ্যায়। মৌসুমি ফল, নানা রকম পিঠা আর ঘরোয়া খাবার বৃষ্টির দিনে পরিবার-পরিজনকে আরও কাছে টেনে আনে। বাইরে যখন বৃষ্টি নামে, ঘরের ভেতর তখন জমে ওঠে গল্প, আড্ডা আর খাবারের আয়োজন।
তবে শ্রাবণ কেবল সৌন্দর্যের ঋতু নয়। অতিবৃষ্টি কখনো নিয়ে আসে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগ। নদ-নদীর পানি বেড়ে যায়, নিচু এলাকা প্লাবিত হয়, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। কারও কাছে যে বৃষ্টি প্রকৃতির উৎসব, অন্য কারও কাছে সেটিই হয়ে ওঠে দুশ্চিন্তার কারণ। বর্ষার এই দুই মুখ—সৌন্দর্য ও সংকট—সিলেটের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবু শ্রাবণ এলে সিলেটকে নতুন করে ভালো না বেসে উপায় থাকে না। টানা বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া পাহাড়, ঝরনার ছুটে চলা জল, বৃষ্টিস্নাত চা-বাগান, নদীর উচ্ছ্বাস, হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি, মেঘে ঢাকা আকাশ আর ভেজা বাতাস—সবকিছু মিলে সিলেট তখন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক জীবন্ত জলরঙ।
শ্রাবণ একসময় চলে যায়। মেঘ সরে যায়, বৃষ্টি থামে, প্রকৃতি আবার অন্য ঋতুর সাজ পরে। কিন্তু শ্রাবণের সিলেট থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে—ভেজা মাটির গন্ধে, পাহাড়ি ঝরনার শব্দে, চা-বাগানের গাঢ় সবুজে, কিংবা এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে গরম খিচুড়ির ধোঁয়া ওঠা প্লেটে।
সিলেটের অনেক রূপ। কিন্তু শ্রাবণের রূপটি যেন একটু আলাদা—আরও কোমল, আরও সবুজ, আরও মায়াময়। এই রূপ একবার দেখলে, বৃষ্টি থেমে গেলেও তার রেশ সহজে মুছে যায় না।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন