https://www.prothomalony.com/
18070
bangladesh
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে ২০২৬ সালে দেশে প্রায় ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের চলতি বছরের ১৫ জুন তারিখের Bangladesh Contingent Emergency Response Project (CERP) এর অফিশিয়াল Project Paper-এ এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশে শ্রমের চাহিদা ও মজুরি বৃদ্ধির গতি কমে যেতে পারে এবং প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, সংঘাতের প্রভাব শুধু কর্মসংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও চাপ বাড়বে।
দারিদ্র্য কমার গতি থমকে যাওয়ার আশঙ্কা:
বিশ্বব্যাংকের নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসতে পারে, এমন পূর্বাভাস আগে ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ সংঘাতের অভিঘাতে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে আগের প্রত্যাশিত অগ্রগতির বড় একটি অংশ হারিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধিও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রায় ১০ শতাংশের সঙ্গে বাড়তি মূল্যবৃদ্ধির সম্পর্ক থাকতে পারে। জ্বালানির দাম আংশিকভাবে ভোক্তা পর্যায়ে স্থানান্তরিত হলে মূল্যস্ফীতি আরও ০.৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দামে পড়বে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জ্বালানি খাতে বড় ঝুঁকি:
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা দেশটির অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি গ্যাসনির্ভর হলেও দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৬০–৬৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় ৫৫–৬০ শতাংশ সংগ্রহ করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় এই নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটি force majeure পরিস্থিতির আওতায় পড়েছে। একই সময়ে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি MMBtu ২৪–২৮ ডলারে উঠেছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
শিল্প ও কর্মসংস্থানেও চাপ:
জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব শিল্প খাতেও পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর বিশেষ চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এবং শ্রমের চাহিদা ও মজুরি বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নিয়োজিত। ফলে অর্থনৈতিক ধাক্কা এলে নিম্নআয়ের ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার চাপ:
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সার সরবরাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নথি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশের ছয়টি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে পাঁচটি গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ করেছে। এরই মধ্যে ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকটে তা আরও বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়বে, কৃষকদের জন্য সার আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।
অর্থনীতির দুর্বলতার সঙ্গে নতুন ধাক্কা:
বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের এমন একটি সময়ে নতুন চাপ তৈরি করছে, যখন অর্থনীতি ইতোমধ্যেই বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি। ২০২৫ সালে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, সীমিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রকৃত আয় বৃদ্ধির দুর্বলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ২০২২–২৫ সময়ে প্রবৃদ্ধির দারিদ্র্য কমানোর সক্ষমতা দুর্বল করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
তবে ৬ লাখ চাকরি হারানো নিশ্চিত কোনো সংখ্যা নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব অব্যাহত থাকলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাংকের একটি পূর্বাভাস। তাই বাস্তবে চাকরি হারানোর সংখ্যা পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার, উৎপাদন এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতির ওপর নির্ভর করবে।
সূত্র: বিশ্বব্যাংক
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন