https://www.prothomalony.com/
16391
bangladesh
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ ০৪:১১
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসায় স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন প্রফেসর ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা শিক্ষা ও অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত এই চিকিৎসক তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে দুই দেশের ব্যবস্থার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। ঢাকায় অবস্থানকালে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম সময় টিভির সঞ্চালক মুজাহিদ শুভকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের চিকিৎসা খাত নিয়ে তাঁর ভাবনা তুলে ধরেন।
প্রফেসর আহমেদ সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক দিকের মেডিকেল শিক্ষা ছিল ব্রিটিশ ধাঁচের, যেখানে মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হতো। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। রোগীর সঙ্গে আচরণ, সহানুভূতি এবং যোগাযোগ দক্ষতা শেখাতে অভিনয়ভিত্তিক সিমুলেশন পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়। তাঁর মতে, চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, মানবিক গুণাবলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা ত্রুটি বা রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় খোলামেলা পর্যালোচনার সংস্কৃতি রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়। কিন্তু বাংলাদেশে চিকিৎসকদের মধ্যে এমন আলোচনা করার পরিবেশ সীমিত। সামাজিক ও গণমাধ্যমের চাপের আশঙ্কায় অনেক ক্ষেত্রে ভুল স্বীকার বা বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
তিনি আইসিইউতে রোগীর স্বজনদের সীমিত প্রবেশাধিকারের পক্ষে মত দেন—সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের শর্তে। এতে চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ে এবং রোগীর মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটে বলে তাঁর মত।
আধুনিক চিকিৎসায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) দ্রুত রোগ নির্ণয় ও পরীক্ষার পরামর্শ দিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবে প্রফেসর আহমেদ সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তি কখনো চিকিৎসকের মানবিক স্পর্শ, সহানুভূতি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিকল্প হতে পারে না।
জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত ভিড় কমাতে তিনি ‘আর্জেন্ট কেয়ার’ মডেলের প্রস্তাব দেন। জীবনহানির ঝুঁকি নেই কিন্তু দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন—এমন রোগীদের স্বল্প সময়ে ও তুলনামূলক কম খরচে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা এটি। সিলেটের একটি কিডনি হাসপাতালে এই মডেল চালুর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারি পর্যায়ে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও এটি বাস্তবায়ন সম্ভব।
প্রবাসী চিকিৎসকরা দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে কাজ করতে আগ্রহী বলে জানান তিনি। বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে তাঁরা দেশে এসে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন এবং উন্নত বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ভাগ করে নিচ্ছেন। তবে প্রশাসনিক জটিলতা এবং দেশে নতুন বিশেষায়িত শাখা চালুর ধীরগতির কারণে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশে অধ্যাপকদের ৫৬ বছর বয়সে অবসরে পাঠানোর নীতিকে ডা. আহমেদ বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের আগেভাগে সরিয়ে দেওয়ায় নতুন চিকিৎসকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ ব্যাহত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যাপকরা অনেক বেশি বয়স পর্যন্ত শিক্ষা দিতে পারেন—যা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক।
আলোচনার সারাংশে প্রফেসর ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, চিকিৎসায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং প্রশাসনিক সংস্কার। মানবিকতা ও দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে দেশের স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর ও আস্থাভাজন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন