https://www.prothomalony.com/

16310

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য-একুশের পাতা 

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ২৩:১৮

ফাল্গুনের দুপুর

অলোক আচার্য

হলদে পাখিটা গেয়ে যায় অকালের গান।

বিকেল পেরিয়ে রাত ভোরের অপেক্ষায়, 

বাতাসে সুর নেই, বোবা ঢেউ আছড়ে পড়ে 

তীব্র ক্রোধ আর স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পরে রাজপথে।

হাত থেকে হাত, বুক থেকে বুক- একটি শব্দগুচ্ছ

ফাল্গুনের দুপুরে তখন প্রজ্বলিত স্ফুলিঙ্গ।

ঘাতকের বুলেট- বেয়নেট আর শফিকের রক্ত

মিশে একাকার কৃষ্ণচূড়ার রঙে..! 

বাংলায়

আহাম্মদ উল্লাহ 

সমস্ত ভাঙাচোরা কথা জুড়ে দেই 

অসুখে, নয়নসজলে সাহায্যের কথা বলি আর্দ্র চোখেমুখে। 

সেতু ধরে হাঁটি। পথে প্রান্তরে। 

বাংলায়।

হাসির খলখল শব্দে মনের কথা উজাড় করি

রোদন করি 

নিদ্রায় আগে ক্ষুদ্র আলাপ 

"শুভরাত্রি।"

বাংলায়।

কালির দোয়াত থেকে বর্ণপরিচয়ে, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা 

বিয়োগান্তক চিঠি

কবিতা কিংবা প্রেমপত্র

পাণ্ডুলিপি 

বাংলায়।

আমার সন্তান হেঁটে যায় 

রওশন মতিন 

ঋদ্ধ পিতার কাছে নতজানু সন্তান আমি,

আদিম ফসিলে আমার প্রথম অক্ষর-পরিচয়,

মহাকালের ঢেউ ভেঙে ভেঙে দেখেছি মুক্ত আকাশ,

দৃষ্টিরেখায় এক খণ্ড স্বাধীন মানচিত্র ভাসছে 

অনন্তের ক্যানভাসে যেন এক সমুদ্র মলাট- 

যেখানে সবুজ বর্ণমালা পাড়ি দেয় মহাকাল;

পুনর্জন্মের চিঠি পাই, 

মহাবিশ্বে, দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্তে 

আমার সন্তান হেঁটে যায় দৃপ্ত পদক্ষেপে,

সবুজ বর্ণমালার অভয়ারণ্যে 

উজ্জীবিত আদিম পাথরের চোখেও 

ফোটে বর্ণ ও শব্দসম্ভার।

আমি তোমায় ভালোবাসি 

সোমের কৌমুদী

'ভাষা দিবস' উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সন্ধ্যায়। সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না তা খুঁটিয়ে দেখছেন বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক মোঃ মশিউর রহমান। মাইকের সংযোগ ঠিকমতো হয়েছে কি না যাচাই করছেন।

'হ্যালো, মাইক্রোফোন টেস্টিং! ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর মাইক্রোফোন টেস্টিং .........'

এগিয়ে এলেন "টুম্পা মাইক"-এর তত্ত্বাবধায়ক সাইফুল আলম। মোঃ মশিউর রহমানের কাছে অনুমতি নিয়ে বলতে শুরু করলেন-

'মাইকের শব্দ ঠিক আছে কি না যাচাই করা হচ্ছে। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত... "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি'...মাইকের শব্দ ঠিক আছে কি না যাচাই করা হচ্ছে। এক দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত...'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'...এক দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত! 

আকাঙ্ক্ষার স্রোত 

কুলসুম বিবি 

ফাল্গুনী মলয়ে ভাসে মৃদু সুগন্ধ,

ভীরু নয়ন ডুবে স্বপ্নের জোয়ারে। 

সন্ধ্যা নামে ধীরে, জানালার পাশে বসে। 

পবিত্র ভালোবাসা ছায়া আঁকি নিঃশব্দে,

যেন একই শ্বাসে দুজনের বেঁচে থাকা,

একই ছন্দে হৃদস্পন্দন। 

চারদিকের কোলাহল-

এই মৌনতার গহ্বরে হারায় যা- এটাই হৃদয় নিংড়ানো নিবিড় ভাষা, যেখানে প্রতিটি শব্দ অনাবশ্যক,

আর নীরবতাই পরিপূর্ণ বাক্য।

অনাগত দিনের গুঞ্জন এই স্বপ্নের পথচলায়, 

সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত তারপরে ভোর।

আকাঙ্ক্ষার স্রোত বয়ে চলে নদীর মতো।

প্রতিটি নিঃশ্বাসে ও নীরব দৃষ্টিতে।

একুশ একটি ফুল

ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয় 

স্ব-ইচ্ছায় কেউ হারিয়ে গেলে আমি তাকে একুশ বলে ডাকি। 

তুমি মহান স্বাধীনতা স্বদেশ; পতাকা বাঁধানো কপাল।

তুমি স্বপ্নের জাগরণে লেখা চিঠি— প্রিয়, নিরুদ্দেশ রক্ত। 

মিনারের পাদদেশে লাল ফুল; বেদিতে তরুণীর পদধূলির দাগ, ঘরে না ফেরা মুখেদের বিহ্বল শত চিহ্নের আলপনা, ফেস্টুনে স্মৃতির হিড়িক। 

বসন্তের রাজপথে কতগুলো উষ্ণ-কোমল খালি পা—

হৃদয়ে ডুবেছে শহর, যুবতীদের একুশের শাড়ি।

উজবুকি কৃষ্ণচূড়া ও আমের মুকুলে শোভিত প্রত্যাখ‍্যানের  বাতাস— একুশের কবি ও তার

শহরের অভিজাত মার্কেট ও শপিংমলের ঘন ব্যস্ততা; কোথাও থেমে নেই কেউ!

একুশের প্রণয়

রাহেলা আক্তার 

কোনো এক বসন্তে, চারটি বর্ণের সমন্বয়ে-

সংগঠিত শব্দ,প্রণয়ের আহ্বানে

একান্ত সংগোপনে প্রণয়ী প্ল‍্যাটফর্মে কথোপকথন। 

কিছুটা  আবেগ নিয়ে পঞ্জিকায় গোনা 

কয়েকটি ফি-বছর কেটে যায় প্রণয়ী প্রহসনে।

গাঁথুনি গাঁথে হৃদয়ের ফালিতে, অজস্র শব্দমালা-

জমে থাকা শব্দগুলো হৃদয়ের ক্যানভাসে 

মিছিল করে প্রণয়ের অধিকারে।

গোপন মঞ্জুরিগুলো, ফিসফিস করে বলে ভালোবাসি খুব

শব্দের সমাহারে হোক প্রণয়ের গোপন অভিসন্ধি। 

সুরের ঐক্যতানে উদ্ভাসিত হোক এক নতুন পৃথিবী। 

অধীর আনন্দে মনোবিলাসে প্রফুল্ল শব্দমালা-

মাধুরীময় আবেশে উষ্ণতা খোঁজে প্রণয়ের,

শুভ্রতার আলিঙ্গনে কুহেলি সুরে স্নিগ্ধতা ছড়ায় শব্দমালা।

স্বার্থের অমোঘ টানে, প্রতিবন্ধকতা ভেদ করতে পারেনি শব্দমালা বন্দি হয়ে যায় বিবেকের কারাদণ্ডে!

তুষারে পরিণত হয় আবেগ, বিবেকের মিছিলে

শব্দমালা বিক্ষোভে বিভক্ত হয়ে যায় রক্তাক্ত বর্ণমালায়।

একুশে ফেব্রুয়ার

রকিবুল ইসলাম

সদ্যোজাত শিশু কাঁদে, শোন ওই 

বলতে পারবে না কথা বাংলায়।

মায়ের ভাষা নেবে কেড়ে শকুনেরা, খাবলে ছিঁড়ে 

খেতে চায় মানচিত্র। রক্তে আঁকা বর্ণমালা কাঁপে থর থর,

বুকের ভেতর জ্বলে আগুন প্রতিক্ষণ।

মায়ের ডাকে সাড়া দিতে চায় যে প্রাণ,

শৃঙ্খল বাঁধে তারে অজানা শাসন।

রাজপথ জুড়ে প্রতিবাদের ওঠে ঢেউ, 

সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর, জব্বার নেয় দীপ্ত শপথ।

চারিদিকে উঠে রব-বাংলা আমার! আমি বাংলার!

গেয়ে ওঠে সমস্বরে-"মোদের গরব! মোদের আশা!

আ'মরি বাংলা ভাষা।''

নয়া পণে ভয়কে গুঁড়িয়ে যাত্রা করে ভোর- নতুন রথ।

গুলির শব্দ কাঁপায় আকাশ, বাতাস, পাতালপুরি।

রক্তে রাঙা হয় মাটি, লুটিয়ে পড়ে দেহ বীরদের...

তবু হয় না নত শির দামাল বাঙালির, নাড়ির টানে 

জেগে থাকে ভাষার আশা। 

শহীদের রক্তে ভিজে জন্ম নেয় নব রবি-

অ,আ, ক, খ বর্ণমালায় জেগে ওঠে পরিচয়।

ভাষার মাস

চন্দনা চক্রবর্তী 

ফেব্রুয়ারির বাতাসে জাগে রক্তের গান,

অক্ষরে অক্ষরে লেখা অমর অভিমান।

মায়ের ভাষা শিখিয়েছে মাথা তুলে কথা,

নীরব মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বলেছে ব্যথা।

পথের ধুলোয় জ্বলছে আজ শহীদের নাম,

প্রতিটি বর্ণে মিশে আছে ত্যাগেরই দাম।

এই ভাষাতেই কেঁদেছি, এই ভাষাতেই হাসি,

এই ভাষাতেই মানুষ হতে সাহস রাশি রাশি। 

গুলি থেমেছে, থামেনি কণ্ঠের উচ্চারণ,

প্রজন্মে প্রজন্মে বয়ে চলে বর্ণের অনুরণন।

ভাষার মাস তাই শুধু ক্যালেন্ডারের নয়,

এটা আত্মার শপথ, বাংলা বাঁচুক নির্ভয়।

অমর একুশে : জাতীয় চেতনার এক অনির্বাণ আলোকস্তম্ভ 

ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদ 

একুশে ফেব্রুয়ারি- বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন; বাঙালির আত্মপরিচয় ও জাতীয় চেতনার এক অনির্বাণ আলোকস্তম্ভ। 

১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববাংলার প্রথম প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয় রাষ্ট্রভাষাকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশ শাসন-শোষণের কবল থেকে মুক্ত হতে না হতেই বাঙালিদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে সমূলে ধ্বংস করার হীন উদ্দেশ্যে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬% লোকের মুখের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে মাত্র ৮% লোকের ভাষা উর্দুকে সমগ্র পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলার প্রতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, নুরুল আমীন, খাজা নাজিমুদ্দিন অপচক্রের চরম অবজ্ঞা ও বৈষম্যের প্রতিবাদে ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে বাংলার সর্বস্তরের মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পাক শাসকগোষ্ঠীর ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করতে গেলে পুলিশ মিছিলে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে। শহিদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা অনেকে। তাঁদের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ; আর সেই রক্তেই রচিত হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নতুন ইতিহাস। 

ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার দাবিতে সংগ্রামই ছিল না; ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পূর্বপাকিস্তানে প্রথম 'বাঙালি জাতীয় চেতনা' জন্মলাভ করে। একুশের এই অমর চেতনাই হলো বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম সিঁড়ি, যা থেকে পরবর্তীতে জন্ম নেয় ৫৪'র যুক্তফ্রন্ট, ৬২'র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬'র ছয়দফা-৬৯'র গণঅভ্যুত্থান সর্বোপরি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার মধ্য দিয়ে ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের প্রায় সকল দেশ দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পালন করে আসছে। আমাদের জাতীয় জীবনে এ এক বীরল সম্মান। 

মাতৃভাষাপ্রীতি থেকে বাঙালি জাতীয়তা বোধের উন্মেষ  একুশের এক অব্যর্থ চেতনা। বাঙালি জাতীয়তাবোধে ঐক্যবদ্ধ চেতনার এই সিঁড়িই হতে পারে বাঙালির ভবিষ্যৎ পথচলার অমলিন দিশারি।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন