https://www.prothomalony.com/

16233

literature

সাহিত্য

কবিতার একপাতা

ফেব্রুয়ারি সংখ‍্যা

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ০৪:২৪

বাংলাদেশ, ইংল‍্যাণ্ড, আমেরিকা ও কানাডার আটজন কবি আটটি কবিতায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে আজকের নিরিখে স্বমহিমাসিক্ত করেছেন। মাতৃভাষার প্রেমাবেগ তথা আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই যেমন বিধৃত হয়েছে, তদুপরি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভাষা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র দখলের নতুন ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার ইংগিত আছে কবিতাগুলিতে। কবিদের আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা জানাই।
শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছি সকল ভাষা শহীদদের।
আপনাদের জন‍্য ভালোবাসা ও কবিতাগুলি পড়ার আমন্ত্রণ।
ফারুক ফয়সল

ধৈর্য্যের অবশেষ
শামীম আজাদ

দু’দুটো যাত্রা হত্যা করেছো
এই শেষ ট্রেন
এ যানের তলপেটে 
শীতল পাটি বিছিয়ে বসবোই
তারপর পেরিয়ে যাবো 
দাউ দাউ দীর্ঘশ্বাস।

যদিও ভাবতে ভাল লাগছে না
পেছনে পড়ে থাকবে
তুমি ও তোমার প্রজাতন্ত্রের পাল 
দূর্ভাগ্য দেবে পরমাত্মীয়ের প্রহার।
কিন্তু আরতো নিতে পারছি না
ভিসুভিয়াস॥ 

রক্তাক্ত অক্ষরগুলো
ফারুক ফয়সল

বইয়ের পাতায় কালিতে ছাপা বর্ণমালা,
মাতৃভাষার সম্মানে বুকের ভিতর রাখি সাজিয়ে।
বিজাতীয় হাতুড়ির আঘাতে ক্ষত, রক্তাক্ত অক্ষরগুলো
আর্তনাদ করে ওঠে, শহীদ বেদীতে তাদের অশ্রু-রেখা!

মনে পড়ে যায়, আমাদের সব মনে পড়ে যায়!
ভাষা শহীদ রফিক, শফিক, সালাম, জব্বারের
শোণিতধারা ভেসে যায় কালো পিচের রাস্তায়;
আজো চেতনায় বেদনার বাণী ঠোঁটে একুশের মিছিল হেঁটে যায়!

তবু কোন্ অশনি সংকেত, ধেয়ে আসে বাংলার বাতাস বেয়ে
কারা তারা, মুখে বাংলা, বাংলাকে চায় দিতে ভুলিয়ে?
ওরা কি গেছে ভুলে, আজো ফাল্গুন আসে এই বাংলায়? কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী আল্পনা আঁকে লাল-সবুজ আঙিনায়!

ত্রিশ লক্ষ প্রাণ শহীদ হয়ে আছেন অতন্দ্র প্রহরায়,
দুই লক্ষ মা-বোন কৃষ্ণচূড়া-আগুন জ্বেলে শিয়রে জাগে!
সাদা ব‍্যানারে কালো বর্ণমালা একুশের গান গায়•••
এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ হয়ে আমেরিকায়!

ভাষাতত্ত্ব
 আব্দুর রব

[সব শিশু কাজ করে স্বপ্নের খনিতে
ভাষা পাল্টে যায়— স্বপ্নে, শিশু জবানিতে]
 
ঋতুভেদে ভিন্ন সব আলোছায়া-আবহাওয়াবোধ;
চারিদিকে শব্দরথ, স্বপ্ন আর আদর্শ-বিতান;
 
লিপিহীন কাল থেকে ভাষার আলোতে
প্রতিফলিত এসব দৃশ্যপট রহস্য ছড়ায়।
সোজা হও, জলাভূমি জুড়ে যে জীবন ছিল
তোমার খসড়া, তার স্তোত্রপাঠ, কিংবদন্তি,  
স্তুতি গান ধরে হাঁটতে থাকো, দেখবে,
নগ্ন-তিক্ত-শ্লেষে ভরা, চাষাভূষো
আঞ্চলিক কথাগুলো পাল্টে দেয় বিশুদ্ধ বয়ান!
 
এও এক আরোগ্য প্রক্রিয়া—রক্তদান কর্মসূচি:
বৈসাদৃশ্য পান করে সেরে ওঠো সবার অলক্ষ্যে;
সময়ের পরতে পরতে।
 
শিলীভূত সুখ-দুঃখ, জন্ম-মৃত্যু, উত্থান-পতন...
খুঁড়ে দেখো, শব্দময় শিশুরা তোমাকে
শিখিয়েছে ক্রীড়াধর্ম— কি করে খেলতে হয়
বৃক্ষলতাপাতা পশুপাখিদের সাথে;
হাসতে জানো না তুমি, হেসে খেলে ওরাই তোমাকে
পার করে দেয় ভবনদী—
ওরা শেখে আর পাল্টে দেয় তোমার নিয়তি!
 

দণ্ডিত বায়ান্ন 
তুষার গায়েন 

ভাষাহীন আজ ভাষা দিবসের মাসে 
রুদ্ধবাক জাতি অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে দেখে 
ভাষাশহীদের পদচিহ্ন পড়েছে পাথরচাপা আজ। 

ফাল্গুন নিষ্পত্র যেন, একুশের যে-করুণ সুরে 
জাগে কিংশুক, পলাশ—কোথায় সে সুর? 
বর্ণহীন সব, কোকিলও ডাকে না আর কৃষ্ণচূড়ার ডালে ! 

কারা যেন সহসাই নিয়েছে দখল বাঙালির কণ্ঠ
গান, ভাষা জাগরণ—প্রেতায়িত হাসির আড়ালে;
ধীরে ধীরে সুনিপুণ জালের বিস্তারে আটকা পড়েছে প্রাণ
ছটফট করে—নিতে চায় আঘ্রাণ নতুন বইয়ের
ফাল্গুনের ধুলোওড়া সান্ধ্যবিকেলে নেই মুগ্ধ তরুণ-তরুণী
খাঁ খাঁ শূন্য মাঠ—বাংলা একাডেমি থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান 
কোথায় দোয়েল সেই মর্মরিত সড়কের মাঝে
শিস দিয়ে বলতো ঠিকানা রক্তিম শহিদ মিনারের? 

নতমুখী শোকার্ত জননী, দুপাশে সন্তান তাঁর দণ্ডায়মান ও
দণ্ডিত বায়ান্ন থেকে একাল অবধি ! 

আমকাঁঠালের দেশে
মুজিব ইরম

সন্ধ্যা নামে
আমজাম কাঁঠালের দেশে
আমার বেদনা বাড়ে
জালালী কৈতর ওড়ে কাজল বরণ…

কেনো যে ডাকিছো তুমি
আম্র মুকুলের দিনে
সুমিষ্ট বাংলায়…

তুমি তো জানোই
বিষণ্ণ ডাহুক আমি
তোমাকেই ডেকে ডেকে বিবাগী হয়েছি।

লালরং নদী
খলিল মজিদ

একটাই মাত্র নদী, যার রং লাল
রক্তে খচিত আমাদের অভিন্ন আত্মজীবনী

ব্রহ্মার বাহু চুঁয়ে নেমে আসা সুরের নহর
সহস্রাব্দ জুড়ে ধ্বনিত সবুজ লোকগান

উনিশ শ’ বায়ান্নতে গুলিবিদ্ধ একটি গান
বর্ণমালার বিদ্রোহে জেগে থাকে শহীদ মিনার

অক্ষরের প্রজাপতিত্বে উড়ে গান, সবুজ পতাকা
এ নদী রক্তলেখ, জাতিস্মর, স্বর-ব‍্যঞ্জনধারা

নির্ভয়ে থাকো আমার কবিতা, তোমার বর্ণ লাল
মিথ্যার পথ বিশ্বাসঘাতকের, সে পথ হারিয়ে যায়

একটা একুশ জীবন
অপরাহ্ণ সুসমিতো

 
বাদল ডানায় কান্না করেছিলে সকালের মোহনায়।
রুমঝুম
নেচে উঠেছিলে বর্ষার একুশ ছন্দে। এত হারাও তুমি বারে
বারে। তুমি কি শুধু হারাতেই জানো? ভাষা হারাও, নিজের
স্বাধীনতাটুকুনও। উঠতে জানো না একুশ প্রহরে, বেলা
অবেলায়। তোমার ডানে বামে মুক্তিকামী হরিণ, তোমার
মাথার উপর কোজাগরী স্বদেশ- চাঁদ। তুমি আনমনে কাঁদো।
আমি পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে তোমার বেদনার ঢেউ গুনি।
বলো কেন কাঁদো অই সুখ দু:খের বাজারে?
 
 কেউ কাগজের বাঁশি বাজাতে বাজাতে ব্রিজের ঢালু রাস্তা ধরে
দূর পবনের মাঝে হারায়, কেউ কাঁধে নিয়ে জীবনের বোঝা।
কেউবা জীবন..
আমি তোমার নাম মুখস্ত করি স্বরলিপির সুরে, নিজ ভাষার
জাদুমায়ায়। দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ বোঝে, কত কথা তোলে। দেশ-
মাঝি জানে, জানো?
শুধু তুমি বোঝো না। মানো না এক ফোটাও। শুধু শুধু ভয়
পাও, ও আমার জমিন।

ক্রুশ কাঠের ফুল
সেঁজুতি বড়ুয়া

 
মুগ্ধতাগুণে হতে চেয়েছিলাম
সবুজ আপেল, আঙুলস্পর্শ রঙিন অক্ষর
অথচ উচ্চারণের অমোঘ মন্ত্রে
চেয়ে দেখি— আমি যেন আদ্যোপান্ত
ক্রুশ কাঠের ফুল।
 
তবুও যখন বলো, ‘হও উচ্চারিত, আরও অরক্ষিত
কেননা ভাষা শতভাগ সুন্দর’— মিশে যাই
বিনা উস্কানিতে রক্তের গরম তাওয়ায়।
উড়ে যাই মাছি স্বভাবে, যেভাবে আঙুল গ’লে
খুলে যায় অসতর্ক ফুলের সারল্য।
 
এরপর তো, মায়ের মুখের অমোঘ বোলে
ঢুকে যাই দিব্যশরীরে — শব্দ কোটরে।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন