https://www.prothomalony.com/
16135
literature
সাংবাদিকের চোখ যা দেখে, কলামিস্টের মগজ যা বিশ্লেষণ করে। আর কবির হৃদয়ে যখন তার শিল্পরূপ ঘটে, তখনই জন্ম নেয় ‘ফিরছি পুরোনো পথেই’ এর মতো কালজয়ী পঙ্ক্তিমালা। সাংবাদিক ও কবি কাকন রেজা যখন তার ক্ষুরধার কলমটি খবরের কাগজ থেকে সরিয়ে কবিতার সাদা পাতায় রাখেন, তখন মনে হয়, সেখানে কেবল আবেগ ঝরে না, বরং সেই কবিতার শরীর তৈরি হয় নিরেট বাস্তবতার ইট–পাথরে, আর তার আত্মা হয় সমাজের অবদমিত আর্তনাদ।
কবিতার শুরুতে তিনি যে ‘পুরোনো পথ’ এ ফেরার কথা বলেছেন, তা জীবনানন্দের কোনো মায়াবী ধূসর পথ কিংবা রূপসী বাংলার কোনো সাধারণ মেঠোপথ নয়; বরং এ এক রূঢ় রাজনৈতিক গোলকধাঁধা। কবির এই ‘পথ’ আসলে শোষণ ও শাসনের সেই একই পুরোনো পদ্ধতি। মানুষের প্রত্যাশা থাকে নতুনের দিকে যাওয়ার, কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই তাকে ঘুরিয়ে সেই একই জীর্ণ পথে নিয়ে আসে।
কাকন রেজা যখন লেখেন,
‘নতুন বোতলে মদিরার নাম বদলে যায়
কিন্তু নেশাটা থাকে আগের জনমের...’
তখন তিনি মূলত ইতিহাসের এক নির্মম সত্যকে ব্যবচ্ছেদ করেন। একটি শাসনের পতনের পর যখন নতুন ব্যবস্থা আসে, তখন সাধারণ মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু কবি আমাদের সতর্ক করে দেন যে, কেবল ‘বোতল’ অর্থাৎ নাম, স্লোগান কিংবা বাহ্যিক কাঠামোই বদলেছে। অন্তর্নিহিত চরিত্র বা শাসনব্যবস্থার যে পুরোনো ‘মদিরার নেশা’ বা দমনমূলক চরিত্রটি অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।
কবি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ফ্যাসিবাদের উপমা টেনে এনেছেন—
‘মৃত্যুর পরও আত্মা টিকে থাকে
যেমন থাকে ফ্যাসিবাদ পতনের পরেও’
এই পঙ্ক্তিটি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। কবিরা প্রায়ই সতর্ক করেন যে, একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতন মানেই তার আদর্শের বিনাশ নয়। ফ্যাসিবাদ কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, এটি এক সংক্রমক মানসিকতা, যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে যায়। শরীর ধ্বংস হলেও যেমন আত্মা টিকে থাকে বলে বিশ্বাস করা হয়, তেমনি রাজনৈতিক অপশক্তিও নতুন কোনো নাম বা পরিচয়ে (নয়া শরীরে) সমাজে তার প্রভাব টিকিয়ে রাখে। কবির ভাবনায় এটিই সেই ‘অভিশপ্ত পুনর্জন্ম’, যা নতুন কোনো সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়।
আমরা জানি, মদিরা পুরোনো হলে বা ‘পচে যাওয়া মদিরা’ আর কেবল নেশার সামগ্রী থাকে না, বরং তা বিষে পরিণত হয়। ঠিক তেমনি কোনো রাজনৈতিক আদর্শ বা সংস্কৃতি যখন দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতি, স্বৈরাচার আর অন্যায়ের আবর্তে পচতে থাকে এবং নতুন মোড়কে ফিরে আসে, তখন তার ‘পচনের নেশা’ আরও বেশি সংক্রামক ও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
‘পচনের নেশা বড় ভয়ংকর’ এই বাক্যটি দিয়ে কবি সেই অন্ধকারের দিকে ইঙ্গিত করছেন, যা একটি সমাজকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়।
কবিতার শেষে ‘অতএব, ফিরছি পুরোনো পথেই / অথচ কথা ছিল অন্যরকম’ বাক্যটি কোটি নাগরিকের দীর্ঘশ্বাস। এটি সেই স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস, যেখানে মানুষ বড় কোনো পরিবর্তনের আশায় পথে নেমেছিল, কিন্তু দিনশেষে দেখল, তারা আবার সেই শুরুর বিন্দুতেই দাঁড়িয়ে আছে। কবি এখানে ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনের সেই ট্র্যাজেডিকেই তুলে ধরেছেন, যেখানে মুক্তির প্রতিশ্রুতি কেবল শব্দেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
সম্পূর্ণ কবিতাটি: ‘ফিরছি পুরোনো পথেই’ কাকন রেজা
ফিরছি পুরোনো পথেই
অথচ কথা ছিল অন্যরকম
নতুন বোতলে মদিরার নাম বদলে যায়
কিন্তু নেশাটা থাকে আগের জনমের
পুনর্জন্ম নিল অভিশাপ
ধারণাটি বিস্ময়কর, আত্মা ও শরীর
মৃত্যুর পরও আত্মা টিকে থাকে
যেমন থাকে ফ্যাসিবাদ পতনের পরেও
জন্মান্তরবাদ বলা যায় নিঃসন্দেহে
নয়া শরীরে পুরোনো আত্মার প্রতিস্থাপন
নতুন বোতলে যেমন পচে যাওয়া মদিরা
পচনের নেশা বড় ভয়ংকর
অতএব ফিরছি পুরোনো পথেই
অথচ কথা ছিল অন্যরকম
কাকন রেজার লিখনশৈলী নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যা চোখে পড়ে, তা হলো তার ‘নির্ভীক নির্মোহতা’। তিনি যখন কলাম লেখেন, তখন তার কলম চলে সার্জিক্যাল নাইফের মতো সমাজের ক্ষতগুলোকে একের পর এক উন্মোচিত করে। আর যখন তিনি কবিতা লেখেন, তখন সেই বাস্তবতার গায়েই তিনি শৈল্পিক প্রলেপ দেন, যা আমার মতো পাঠককে কেবল ভাবায় না, বরং এক গভীর অপরাধবোধ বা সচেতনতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
একজন পেশাদার সাংবাদিক হওয়ার কারণে তার লেখায় তথ্যের ভিত্তি থাকে অত্যন্ত মজবুত। কিন্তু তার বিশেষত্ব হলো, তিনি খসখসে তথ্যের জঙ্গল থেকে নির্যাসটুকু বের করে তাকে সাহিত্যের রূপ দিতে পারেন। তার প্রতিটি বাক্য যেন এক একটি ‘স্টেটমেন্ট’। ‘ফিরছি পুরোনো পথেই’ কবিতার মতোই তার সামগ্রিক লেখনীতে এক ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী থাকে, যা সমসাময়িক ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভবিষ্যতের বিপদকে আগেভাগেই শনাক্ত করতে পারে।
কাকন রেজা ক্ষমতার লড়াই, শোষণের রাজনীতি বা সামাজিক অবক্ষয়কে সরাসরি বর্ণনা করার চেয়ে রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে বেশি পছন্দ করেন। ‘নতুন বোতল’, ‘পুরোনো মদিরা’ কিংবা ‘অভিশপ্ত পুনর্জন্ম’—এই রূপকগুলো সাধারণ পাঠকের কাছে যতটা সহজবোধ্য, চিন্তাশীল পাঠকের কাছে ততটাই গভীর। তিনি বিমূর্ত ধারণাকে মূর্ত করার এক অসামান্য ক্ষমতা রাখেন।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার বিপরীতে কথা বলা বা ফ্যাসিবাদের মতো শব্দকে শিল্পের অনুষঙ্গে আনা সাহসের কাজ। কাকন রেজার লিখনশক্তি এখানেই অনন্য যে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর চশমায় সমাজকে দেখেন না। তার কলম আপসহীন। তিনি যখন শাসনের ‘পচনের নেশা’ নিয়ে লেখেন, তখন তিনি কোনো ব্যক্তিবিশেষকে নয়, বরং একটি পুরো ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তার শব্দগুলো ধারালো হলেও তাতে ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকে না, থাকে আদর্শিক দৃঢ়তা। তিনি মানুষের আক্ষেপ ও স্বপ্নভঙ্গকে এমনভাবে শব্দবন্দী করেন যে, তা সাধারণের দীর্ঘশ্বাস থেকে ‘জনগণের ভাষা’য় রূপান্তরিত হয়। তার লেখায় এক ধরনের গাম্ভীর্য বা ‘সবার কথা বলা’র দায়বদ্ধতা কাজ করে। ‘কথা ছিল অন্যরকম’ এই সহজ একটি বাক্যে তিনি কোটি মানুষের অপ্রাপ্তির বেদনাকে ধারণ করেছেন। এটাই তার লিখনীর সবচেয়ে বড় শক্তি; তিনি সাধারণের অপ্রকাশিত যন্ত্রণাকে সর্বজনীন রূপ দিতে পারেন।
সামগ্রিকভাবে কাকন রেজা একজন ‘সতর্ক প্রহরী লেখক’। তার কলম কেবল বর্তমানকে তুলে ধরে না, বরং অতীতকে বিশ্লেষণ করে আমাদের ভবিষ্যতের আয়না দেখায়। তার গদ্যের জোর ও পদ্যের গভীরতা উভয়ই পাঠকের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনি এমন একজন লেখক, যাঁর কাছে শব্দ কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের একটি শৈল্পিক হাতিয়ার।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন