https://www.prothomalony.com/
16124
literature
ঘাস বৃত্তান্ত
সাকিব জামাল
আমি ঘাস। ছোট বড় ঘাস।
আমায়, ছাগলে খায়।
গরুতে খায়...
মাঝেমধ্যে দুষ্ট নেতারাও খায়!
আমি ঘাস।
ছোট বড় ঘাস। তবে,
ইচ্ছে আছে, পরজনমে- ভীমরুল হবো!
ছাগল কামড়াবো।
গরু কামড়াবো।
সুযোগ পেলে-
সবার সাথেই শোধবোধ মেটাবো!
সন্ধার গাছে গাছে তারার ঝিলিক
স্বপ্ন কুমার
বাদুড়ও ঝুলে থাকে চাঁদ ঝুলে আছে
সন্ধার গাছে গাছে তারার ঝিলিক
পাখি নয় কোনোকালে মাছেরাই ডুবে থাকে
জলের অতল
কে টানে কাছে কারে -কে সরে যায় দূরে
কে বা লিখে রাখে হিসেব এমন খাতায়
বিকেল গড়িয়ে হাটে
ছায়া নিয়ে রোদ চলে যায়
বনে বনে বসে মেলা আর জোনাকি—
আঁধার কেটে কেটে জমা করে
আঁধারের স্তূপ
খড়কুটো উড়ে যায় লাজুক বাতাস হায়
এত নিশ্চুপ
করেনা শিকার
কি এমন রুপ আছে কোনদিনও পরেনি
চোখে কারো
কারো বুকে তুলেনি সে একটুও ঢেউ
ঢেউ উঠে তবু দেখি বিকেলের মাঠে মাঠে
খেলা করা শিশুদের চুলে..
জিরাফের চোখে জমে থাকা নীরবতা
মাসুম আহমদ
জিরাফের গলার মতো লম্বা সময়
স্যালুটরত সৈনিকের ধ্যান হয়ে
উত্তর না জানা প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে যখন
আমার চোখের সামনে দাঁড়ায়,
তখন হাত দিয়ে আকাশ ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন
যেসব শব্দে লুকিয়ে যায়,
সেসব শব্দ
আমার জিহ্বায় পড়ার সাথেসাথেই গলে যায়,
অর্থহীন অথচ গভীর একটা অনুভূতি
আমাকে তখন গিলে ফেলে।
মেঝেতে ছায়া আঁকতে বসে দেখি
দেয়ালে ভাসছে
জিরাফের চোখে জমে থাকা
অদ্ভুত সেই নীরবতা,
আমার জিহ্বা তখন শুধু স্বাদ নেয়
নামহীন ভাবনা এবং
ভাবনাহীন প্রশ্নবোধক চিহ্নের,
যেগুলো ছুঁতে গেলেই
নিমিষেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
জিহ্বায় গলে যাওয়া নীরবতা এবং
জিরাফের চোখে জমে থাকা সময়কে
পাশে নিয়ে চেয়ে থাকি
প্রশ্নচিহ্নের স্বাদে অদৃশ্য হওয়া আকাশের দিকে।
মাঝে মাঝে মনটা খাঁ খাঁ করে
অমিত মামুন
মাঝে মাঝে মায়ের জন্য মনটা খাঁ খাঁ করে।
সুই, কাঁচি, চাকুর কাছে মায়ের সাবলীল আত্মসমর্পণ ছাড়াও-ডায়ালাইসিস মেশিনে প্রবল রক্ত জমাট বেঁধে
রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়
মায়ের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় অচল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সেই দৃশ্যের ব্যপ্তি ঘূর্ণায়মান স্রোতের মতো
শরীরের অভ্যন্তরে যাত্রা করে সবকিছু ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়।
মাঝে মাঝে মায়ের জন্য মনটা খাঁ খাঁ করে।
ঢাকা শহরের ইট-পাথরের দেয়ালগুলো মাকে উৎকণ্ঠিত
করে তোলে; গ্রামে বিল থেকে ধরে আনা মাগুর মাছের ঝোল আর আত্মীয়স্বজনের নিকটতার অভাব মায়ের অসহায়ত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলে।
মায়ের অনুভবে শুধু খেলা করে চিকিৎসার ব্যয়বহুল ভাবনারা।
মাঝে মাঝে মায়ের জন্য মনটা খাঁ খাঁ করে।
তবু মায়ের কোলের কাছে সার্বক্ষণিক থাকা হয়ে ওঠে না।
দূর শহরে আমার বসবাস, দীর্ঘ অপেক্ষা পর বাবা হবো
তাই এই সতর্ক অবস্থান।
শুনেছি, আমার জন্মের সময় নাড়ি ছিঁড়ে বেড়িয়ে পড়েছিলাম রক্তাক্ত মাকে মরণাপন্ন অবস্থায় রেখে, আজকের মতো...
মায়ের জন্য মাঝে মাঝে মনটা খুব খাঁ খাঁ করে।
ভুল ঠিকানা
সফিউল্লাহ আনসারী
ভুল ঠিকানায় নির্ভুল মানুষের খোঁজে
খুঁজতে খুঁজতে ক্ষয়ে যায়
বিশ্বাসের মানচিত্র;
এক জীবনের হিসেবের খাতা
শেষমেশ খুললে ভেতরে শুধু শূন্যের স্বাক্ষর
এক কপালে ঝুলে থাকে
ভুল জীবন নামের এক নিরব তকমা
ভুলের শব্দচয়নে লেখা তথ্যে
আমাকেই প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানো হয়
যেখানে শুধুই ভুল আর ভুল...!
হিম পবনের রাত
বশির আহমেদ
তোমার মন একটি প্রত্নতত্ত্ব, তাই-
মাটির মতো খুঁড়ে খুঁড়ে আবিষ্কার করি চিন্তার কোলাজ!
তোমার চোখে একদিন রোদ ফুল দেখেছিলাম,
ঠোঁটের কারুকাজে মদিরার মানচিত্র।
তোমার হাত তোমার পা, তোমার মসৃণ শরীরের মোহনীয় ঘ্রাণে আমি বাতিক হয়েছিলাম।
মেডুসার গল্পের মতো জটিল ভেতরের রহস্য,তুমি রহস্যময়ী।
তোমার টলটলে কথন রুম্মান রসের মতো,
আমি নির্বুদ্ধিতার পরিচয় রেখে যাই পথে পথে।
নিঃশ্বাসের চাদরে গুজি লজ্জামুখ,
আত্মদহনে কেটে যায় হিম পবনের রাত
আমি নিজেই নিজেকে সংজ্ঞায়িত করি,
আমি এক ব্যর্থ প্রেমিক!
রাসপূর্ণিমা
দিপন মন্ডল
কতগুলো বিপথগামী নক্ষত্র
ঝরে পড়ছে জলের ঢেউয়ে, বনমাতার শরীরে।
কাঁদায়,ধোঁয়ায় জলে মাখামাখি
ঢেউগুলো সাঁতরে বেড়ায় মনের জানলায়;
আলোছায়ায় বন্দী তরঙ্গের
মন ভোলায় কালো মেয়ে।
আমার আকাশে ধাবমান চাঁদের বুড়ি
বয়সের ভারে নতজানু অন্ধকার,
কান্নায় ভেঙে পড়ে শৈশবের সিক্ত অনুভূতিরা।
কবিতারা এখানে বড্ড বেশি সাকার
দোদুল্যমান মেঘেদের মতো
দূর সমুদ্র থেকে ভেসে আসে প্রেম।
আমার শরীরের সরকাঁদায় তবু
আঁকড়ে আছে প্রাপ্তবয়স্ক সুঘ্রাণ।
বেদনারা এখানে বড্ড বেশি নির্লিপ্ত
কবিতার প্রেমিকা কিংবা তুমি
নষ্টপল্লী, নষ্ট জীবনের মতো
হারিয়ে যায় ঢেউয়ে, বন্যায়, নদীভাঙনে।
একমুঠো সুখ
রকিবুল ইসলাম
সেদিন নিশুতি ক্ষণে,
হৃদয় দুয়ার খুলে
বসেছিনু একা উদাস মনে,
চেয়েছিনু শুধু "একমুঠো সুখ!"
পাওনি তবু শুনতে,
নিশি জাগা ভোরে
ডেকেছি কত আবেগ আহ্লাদে,
চেয়েছিনু শুধু "একমুঠো সুখ!"
উপহাস, অবহেলা ভুলে,
আশায় বুক বেঁধে
বাঁচতে ভূমে নতুন করে,
চেয়েছিনু শুধু "একমুঠো সুখ!"
হেসেছিনু যত ভবে,
কেঁদেছিনু ঢের তবে
সেটা মোর নিয়তির খেয়ালে,
চেয়েছিনু শুধু "একমুঠো সুখ!"
সুখ সুখ করে,
গেলাম শুধু বিলাপ করে
আসেনি সে আপনার হয়ে,
চেয়েছিনু শুধু "একমুঠো সুখ!"
এক মুঠো রোদ্দুর ও একটি টি-শার্ট
কাজী রাহ্নুমা নূর
পাতারা রঙ বদলাচ্ছে, বাতাসে কুচি হিম। ঐ যে মেয়েটা ছোট্ট দুই হাত অবিরাম ঘষে ওম খোঁজে, তার টিমটিমে শরীরে একফালি কাপড়, কোনো এক সময় রাজার দুলালীর টি-শার্ট ছিল। এখন আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে ক্ষয়ে যাওয়া সুতোর গিঁটে মেয়েটার শীর্ণ শরীরের তাপটুকু বেঁধে রাখতে। বখে যাওয়া বাতাসের সাথে পেরে উঠছে না সে। ক'বছর আগেও টি-শার্টটা আয়না ঢাকা কাবার্ডের মখমলে মোড়া হ্যাংগারে দোল খেতো, বাতাসে ছড়িয়ে থাকতো মিষ্টি গন্ধ। না কোনো ফুলের গন্ধ নয়, কখনো স্ট্রোবেরি, কখনো বা অরেঞ্জ। মাঝে মাঝে কাবার্ডে এলাচ এলাচ গন্ধ ও পেতো। প্রথম কিছুদিন ওর খুব কদর ছিল। মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে পার্কে, বি'চে কত্ত ঘুরে বেড়িয়েছে।
শুনেছে সুখ কারো কারো কপালে সয়না। তার ও সইলো না। কয়দিন পর ঝুপ করে ঠাণ্ডা নামলো, আর কাবার্ডের মাঝ থেকে সরে এক কোণে ওর জায়গা হলো। দূর থেকে তাকিয়ে দেখতো বাহারী শীতের পোশাক। পার্পেল রঙের চমৎকার কাটের কোটটার কলারে গেঁথে থাকা নাক উঁচু মুক্তোটার ভাব দেখে গা জ্বলে যেত। শীতের পোশাক গুলোর টিপটপ সাজগোজ দেখে মাঝেমাঝে নিজকে খুব ছোট মনে হতো। খুব নিঃসঙ্গ ছিলো সে দিনগুলো। অবহেলার তীক্ষ্ণ সুঁচের খোঁচা খেয়েই কাটতো রাত দিন।এমনই এক শীতের সকালে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিলো সে।
হঠাৎ গোলাপি গালের মিষ্টি মেয়েটা ওকে টেনে তুলে হাতে নিল। আহ কতদিন পর ওর স্পর্শ পেল, আবেগে মনটা ভিজে উঠতে না উঠতেই ওকে ছুঁড়ে ফেলা হলো কুচকুচে কালো ব্যাগে। চারদিকে অন্ধকার, আরো নানান আকারের কাপড়ের ভেতর ও গুটিসুটি মেরে পড়ে রইলো। পাশেই একটা কাপড় নাকি সুরে বিলাপ জুড়েছে। টি-শার্টটা বুঝতে পারছিল ওদের গাড়ি করে কোথাও নেয়া হচ্ছে।
সেই শুরু! এরপর যে কত কত গাড়ি আর জাহাজে চড়ে কত শত হাত গলে কত কত দেশ ঘুরে বেড়ালো। একদিন সে এসে পৌঁছুলো এক অদ্ভুত দেশে। এ দেশের বাতাস শুঁকতেই বুকের ভেতরটায় একটা টান অনুভব করলো। এখন তার পড়ন্ত বেলা, শরীরের এখানে সেখানে বয়সের হলদেটে ছাপ। দিনের বেশিটা সময় ঘুমিয়েই কাটে। কিন্তু এই নতুন দেশের মাটিতে নামার সাথে সাথে শরীরে এক রকম জোর পাচ্ছে যেন। দুদিন পর জানতে পারলো এ দেশটির নাম বাংলাদেশ- এ যে তার জন্মভূমি। আহা! শেকড়ের টান বুঝি একেই বলে।
এর ক'মাস পর, পূবে সুর্য সবে উঠি উঠি করছে, সে পড়েছিল এক গাদা ময়লা কাপড়ের বাক্সে। হঠাৎ খসখস শব্দে ঘুম ভাঙে। একটা কালচে হাত তাকে তুলে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলো, এরপর ওর গায়ে হাত বুলিয়ে, হাত দুটো ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। আহা মায়ের ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়। সে মায়াবতি মা'কে সবাই মমতাজের মা বলে ডাকে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। সেদিন ও কাজেই যাচ্ছিল, ভাগ্যগুণে তাকে দেখতে পেয়ে তুলে নিয়েছিল। শেষ বাড়ির কাজ শেষ করে বেগম সাহেবের অনুমতি নিয়ে মমতাজের মা ওকে খুশবু মাখা সাবান দিয়ে সুন্দর করে নিজ হাতে গোসল করিয়ে দিয়েছিল। তার সারাটা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল ভালোবাসা আর মায়া।
শেষ কবে গোসল করেছিলো মনে নেই। আর সেই গোসল মানে তো এত্ত বড় মেশিনে একগাদা দুর্গন্ধ যুক্ত কাপড়ের সাথে ডিগবাজি আর একগাদা নোংরা পানিতে নাকানি- চুবানি। প্রতিবার ধোয়া শেষে সে অসুস্থ হয়ে পড়তো। অথচ সেদিন মমতাজের মায়ের হাতের জাদুতে সে ঘুমিয়েই পড়েছিল। ঘুম ভাঙতেই দেখলো ও একটা ছোট্ট মেয়ের শরীরে ঝুলছে। সেই থেকে তার নতুন জীবনের শুরু। ছোট্ট মমতাজ তাকে কখনো একা রেখে কোত্থাও যায় না। ওকে নিয়ে সে কত কি যে খেলে, মাঝেমাঝে মেয়েটা দুষ্টুমিতে মেতে ওঠে, সে ও সঙ্গ দেয়। অথচ আজ ছোট্ট মমতাজ ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপছে আর তার দুমড়ে যাওয়া বুড়ো শরীর বাচ্চাটাকে এক টুকরো ওম দিতে পারছে না। কষ্টে তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। মেঘলা আকাশটার দিকে তাকিয়ে ও খনখনে গলায় চেঁচিয়ে উঠলো -
"সূর্য দেব! এক মুঠো রোদ্দুর দাও, মেয়েটার গায়ে মাখিয়ে বাকিটা জীবন শুধু তোমার বন্দনা করবো। দয়া করো প্রভূ! চাই এক ছটাক ওম!"
তার হাহাকার বাতাসের দেয়ালকে ছোবল দিয়ে তার কাছেই ফিরে এলো।
সূর্য ঘুমিয়ে আছে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন