https://www.prothomalony.com/

15948

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারী ২০২৬ ০৬:২৬

ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরের বড় স্টেশনে একদিন

ড. আব্দুস সাত্তার

 

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্যের দেশ আমাদের বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে হাজারো প্রাকৃতিক নিদর্শন। যার মাঝে অন্যতম চাঁদপুরের তিন নদীর মোহনার মনোরম দৃশ্য। পদ্মা,মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলটি মোলহেড নামেও পরিচিতি লাভ করেছে।  মোলহেড সংলগ্ন পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার মিলনস্থল রূপালি ইলিশের উৎকৃষ্ট প্রজনন কেন্দ্র। সাগর থেকে উঠে আসা মা-ইলিশ এ মোলহেড সংলগ্ন ত্রি-মোহনায় ডিম ছাড়ে এবং জাটকা থেকে কিশোর ইলিশ (টেম্পু ইলিশ) পর্যন্ত বৃদ্ধি এ মোলহেড সংলগ্ন ত্রি-মোহনায় ঘটে। তাই দেশের ইলিশ উৎপাদনে এ ত্রি-মোহনার গুরুত্ব অসীম। 

মোলহেড শুধুমাত্র রূপালি ইলিশের ডিম ত্যাগ এবং বেড়ে ওঠার স্থান হিসেবেই খ্যাত নয়, এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অতুলনীয়। এমন মনোরম দৃশ্য উপভোগ করার জন্য ভোর বেলা থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত প্রতিদিনই শত শত দর্শনার্থী ঘুরতে আসেন ৷ তবে সকালের চেয়ে বিকেলের সময়টায় ভিড় থাকে বেশি। এর মধ্যে স্থানীয় দর্শনার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি ৷ তবে দূর দূরান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা ঘুরতে চলে আসেন চাঁদপুর বড় স্টেশনে। 

নদীর পাড় ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে বসার জায়গা ৷ সেখানে বসে দেখা যায় পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনমেলা, আর উপভোগ করা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত ৷ সেই সাথে দেখা যায় জেলেদের মাছ ধরার মনোরম দৃশ্য আর নৌযান চলাচলের দৃশ্য৷ এছাড়া চাঁদপুর ত্রিনদী মোহনা বড়স্টেশন মোলহেড থেকে ট্রলারে দিয়ে মিনি কক্সবাজার যাওয়া যায় এবং ছোট ছোট নৌকার ভেসে ঘুরে বেড়ানো যায়। 

বড়স্টেশনের পাশেই রয়েছে রুপালি ইলিশের বিশাল আড়ৎ৷  চাইলে সেই আড়ৎটিও ঘুরে দেখতে পারেন৷ আর যাওয়ার সময় নিয়ে যেতে পারেন চাঁদপুরের তাজা রুপালি ইলিশ মাছ৷ আমি দেখে লোভ সামলাতে পারিনি।অনেকগুলো কিনেছি। এখন অনেক সুবিধা আড়ৎদারের লোকজন আবার সুন্দর করে বরফ দিয়ে বক্স করে দেন যাতে দুই তিন দিনে মাছ তাজা থাকে।  

চাঁদপুর শহরে প্রবেশের মুখেই রয়েছে রুপালি ইলিশের ভাস্কর্য ৷ যেহেতু চাঁদপুর জেলা রুপালি ইলিশের জন্য প্রসিদ্ধ তাই চাঁদপুর জেলাকে বলা হয় ' ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর ' ৷ তাই শহরের আইকন হিসেবে স্থাপন করা হয় 'ইলিশের ভাস্কর্য' ৷ যাতে এক দেখায় বলা যায় ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর জেলা ৷ বড় স্টেশনে আছে রক্তধারা ভাস্কর্য ৷ যেখানে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদার কর্তৃক পরিচালিত টর্চার সেলে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ৷ সেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উক্ত ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয় ৷

৩৪ বছর পূর্বে এসেছিলাম বড়স্টেশনে। সেই সময় স্টেশনের পশ্চিমপাশে নদীর কাছে যাওয়া যেত না। আবর্জনায় ভরা ছিল পুরো এলাকা। বখাটেদের আড্ডা ছিল এখানে। সেই সময় স্টেশনের এক পাশে ছিল স্টিমারঘা, অন্য পাশে লঞ্চঘাট আর মাঝখানে ছিল রেলস্টেশন ৷ পানির ভয়াবহ স্রোতের কারণে লঞ্চঘাটের স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে পুরো বড়স্টেশন পর্যটক উপযোগী করা হয়েছে। এখানে খাওয়া দাওয়ার জন্য অনেক দোকান আছে এবং সম্পূর্ণ পরিবেশটা অনেক সুন্দর ভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখেছে।  আমি সত্যি আনন্দিত ও উদ্ভাসিত এখানে আসতে পেরে। আপনারা ও সময় পেলে একবার ঘুরে আসুন আমাদের চাঁদপুরে, ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরের বড়স্টেশনে। 

 

 

 

সরিষা ফুলের হলুদ রঙ

সাঈদুর রহমান লিটন 

 

শীতের শেষ প্রান্তে কিংবা বসন্তের আগমনী বার্তায় বাংলার গ্রামবাংলায় যে দৃশ্যটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো দূরদূরান্তে ছড়িয়ে থাকা সরিষা ফুলের হলুদ সমারোহ। সবুজ মাঠের বুকে হলুদের ঢেউ যেন প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা এক বিশাল ক্যানভাস। 

সরিষা ফুল শুধু একটি কৃষিজ ফসল নয়, এটি বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক অনন্য প্রতীক। সরিষা ফুলের হলুদ রঙ-আলাদা করে চোখে পড়ে। এই হলুদ কোনো চড়া বা দৃষ্টিকটু নয়; বরং কোমল, উজ্জ্বল এবং প্রাণবন্ত। শীতের ধূসরতা কাটিয়ে যখন মাঠে মাঠে সরিষা ফুল ফোটে, তখন প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। বাতাসে হালকা শীতলতা, আকাশে নরম রোদ আর তার নিচে দোল খাওয়া হলুদ ফুল, এই মিলনই সৃষ্টি করে প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপ–লাবণ্যতা। 

গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটলে দুই পাশে দেখা যায় সরিষা ক্ষেত। সূর্যের আলো পড়লে ফুলের পাপড়িতে ঝিলমিল করে ওঠে সোনালি আভা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, যেন মাটির বুকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট ছোট সূর্য। এই দৃশ্য শুধু চোখে দেখার নয়, অনুভব করার। মন অজান্তেই শান্ত হয়ে যায়, হৃদয়ে জন্ম নেয় এক ধরনের প্রশান্তি। সরিষা ফুলের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায় যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রকৃতির অন্য উপাদানগুলো। নীল আকাশের নিচে হলুদ ক্ষেত, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু খাল, খালের ধারে কাশফুল কিংবা খেজুর গাছ -সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক নিখুঁত গ্রামীণ দৃশ্যপট। সকালে শিশিরভেজা ফুল আর সন্ধ্যায় পড়ন্ত রোদের আলোয় রাঙা সরিষা ক্ষেত, প্রতিটি সময়েই এর রূপ আলাদা, কিন্তু সমান মুগ্ধকর। এই ফুলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ জীবনের নানান গল্প। কৃষকের আশা-ভরসা, পরিশ্রম আর অপেক্ষার ফসল এই সরিষা। ক্ষেতজুড়ে হলুদ ফুল মানেই সামনে আসছে ফসল কাটার আনন্দ, ঘরে ঘরে আসবে সরিষার তেল, যা রান্নাঘরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সরিষা ফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি জীবিকার প্রতীকও।

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও সরিষা ফুলের উপস্থিতি লক্ষণীয়। কবি-লেখকরা বারবার তাদের লেখায় সরিষা ক্ষেতের কথা এনেছেন। প্রেমের গল্পে, গ্রামের স্মৃতিচারণে কিংবা প্রকৃতির বর্ণনায় সরিষা ফুল হয়ে উঠেছে আবেগের ভাষা। অনেকের কাছে এটি শৈশবের স্মৃতি, ছুটির দিনে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সরিষা ক্ষেতে দৌড়ানো, ফুল ছেঁড়া, কিংবা হলুদ রঙে ভরে ওঠা দিগন্ত দেখা। সরিষা ফুলের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এর সরলতা। এতে কোনো জটিলতা নেই, নেই বাহুল্য। ছোট ছোট চার পাপড়ির ফুল, কিন্তু অসংখ্য ফুল একসঙ্গে ফোটার কারণে তৈরি হয় বিশাল সৌন্দর্য। প্রকৃতি যেন এখানে শেখায়—সরলতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আসল লাবণ্য। পাখি, প্রজাপতি আর মৌমাছিরাও সরিষা ফুলের সৌন্দর্যের অংশ। ফুলের মধু সংগ্রহ করতে আসা মৌমাছির গুঞ্জন কিংবা হলুদ ফুলের ওপর বসে থাকা রঙিন প্রজাপতি পুরো দৃশ্যকে করে তোলে আরও জীবন্ত। প্রকৃতির এই সহাবস্থান দেখলে বোঝা যায়, সরিষা ফুল কেবল মানুষের চোখের আনন্দ নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ জীবন্ত পরিবেশের কেন্দ্রবিন্দু। আজকের ব্যস্ত নগরজীবনে আমরা অনেকেই এই দৃশ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। কিন্তু সুযোগ পেলেই যদি কেউ সরিষা ফুলে ভরা গ্রামবাংলায় একবার ঘুরে আসে, তবে সে বুঝতে পারবে প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য কী। কৃত্রিম আলো, শব্দ আর যান্ত্রিক জীবনের বাইরে এই হলুদ প্রকৃতি মানুষের মনে এনে দেয় প্রশান্তি ও নির্মল আনন্দ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সরিষা ফুলের হলুদ প্রকৃতি শুধু একটি ঋতুভিত্তিক দৃশ্য নয়, এটি বাংলার আত্মার অংশ। এই ফুলের মধ্যেই ধরা আছে প্রকৃতির রূপ-লাবণ্যতা, মানুষের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি ও আবেগের মেলবন্ধন। 

 

 

 

বউ-পাগলা খাঁ'র সংসারতত্ত্ব

মেশকাতুন নাহার 

 

বউ-পাগলা খাঁ মহাশয়কে দেখলেই বোঝা যায়-সংসার নামক জিনিসটি আদতে কোনো সরল অঙ্ক নয়, বরং একেবারে উচ্চতর গণিত। বিশেষ করে যখন সেই সংসারে বউয়ের সংখ্যা এক, দুই পেরিয়ে চারে গিয়ে ঠেকে। তখন খাঁ সাহেব শুধু স্বামী নন, তিনি একাধারে বিচারক, অর্থমন্ত্রী, শান্তিরক্ষী বাহিনী এবং মাঝে মাঝে পলাতক অভিযাত্রীও বটে।

সকালের শুরু হয় সাধারণত একটি নিরীহ প্রশ্ন দিয়ে-চা কে বানাবে? প্রশ্নটি নিরীহ হলেও উত্তরের ঢেউ ভয়ংকর। একজন বলেন, তিনি কাল রাত জেগেছেন; আরেকজনের মাথা ব্যথা; তৃতীয়জন আবার স্মরণ করিয়ে দেন, গত সপ্তাহে তিনি তিন দিন একটানা রান্না করেছেন। ফলে চা বানানোর কাজটি শেষ পর্যন্ত খাঁ সাহেবের কাঁধেই এসে পড়ে, যদিও তিনি আদতে চা খাওয়ার সুযোগটুকুও পান না।

সংসারের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করাও কম ঝামেলার নয়। গয়না আর শাড়ির চাহিদা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে খাঁ সাহেব এখন বাজারে গেলে দোকানদাররাও সহানুভূতির চোখে তাকান। শাড়ির রঙ ভুল হলে বা নকশা পছন্দ না হলে চোখ রাঙানো থেকে শুরু করে দীর্ঘ নীরব প্রতিবাদ-সব কৌশলই প্রয়োগ হয়।

সবচেয়ে জটিল সমস্যা তৈরি হয় রাতের বেলায়। কে কার ঘরে থাকবেন, সে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে সংসারে প্রতিদিন যেন ছোটখাটো সংসদ বসে। যুক্তি, আবেগ, কান্না-সব অস্ত্রই ব্যবহৃত হয়। খাঁ সাহেব তখন গামছা বেঁধে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাতে লাভ হয় সামান্যই।

এই চরম পরিস্থিতিতে একদিন খাঁ মহাশয় স্থির করলেন, এভাবে আর নয়। সংসার ছেড়ে বনে গিয়ে সন্ন্যাস নেওয়াই শ্রেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী এক ভোরে তিনি নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়লেন। মনে হলো-এই বুঝি মুক্তি।

কিন্তু প্রকৃতি বড় নিষ্ঠুর। কিছু দূর যেতেই পেছন থেকে ভেসে এলো চেনা ডাক। ফিরে তাকিয়ে দেখলেন, চার বউ, চার রকম অভিব্যক্তি, কিন্তু উদ্দেশ্য এক। সেই মুহূর্তে খাঁ সাহেব বুঝলেন, সংসার থেকে পালানো যায় কিন্তু বউয়ের নিয়তি থেকে নয়।

এ কারণেই বোধহয় বলা হয়, বউ-পাগলা খাঁ'রা হার মানেন না, শুধু অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। আর পাঠক হিসেবে আমরা সে অভিজ্ঞতা থেকে একটাই শিক্ষা নিতে পারি; সংসার ছোট হলে ভালো, আর বউয়ের সংখ্যা হিসেব করে বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ। 

 

 

 

অদৃশ্য জোনাকি

আব্দুস সাত্তার সুমন 

 

রাতের নিস্তব্ধতা কখনো কখনো এমন নরম হয়ে আসে যে মনে হয় পৃথিবী নিজের বুকের স্পন্দন থামিয়ে রাখছে। গ্রামের পুরনো আমগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সাঈদের মনে ঠিক এমনটাই হচ্ছিল। দূরে কারও কলকাকুলি নেই, বাতাসের হালকা সোঁদা গন্ধে ভিজে আছে চারদিক। এমন মুহূর্তে সাঈদ দেখল দূরে এক বিন্দু আলো ভাসছে। ছোট্ট, নরম, কিন্তু গভীরভাবে ডাকছে তাকে।

সাঈদের মন কেঁপে উঠল। কেন জানি তার মনে হল এই আলো শুধু আলো নয়, যেন কেউ তাকে খুব আপন করে হাত বাড়িয়ে ডাকছে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল, আর যত এগোল ততই অনুভব করল একটা আলতো উষ্ণতা তাকে ঘিরে ধরছে। যেন কেউ খুব ভালোবেসে তাকে জড়িয়ে ধরছে।

জোনাকিটি সামনে এসে স্থির হয়ে রইল। তার আলোতে সাঈদের চোখ জ্বলজ্বল করতে লাগল। সেই আলোতে যেন মায়ের স্নেহ, বাবার সাহস, বন্ধুর হাসি সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত আলোকছটা তৈরি করছে। সাঈদের চোখে অকারণে পানি এসে গেল, জোনাকি হেসে উঠল-আলো তাকে নিভু নিভু সারা দিল। 

তুমি কাঁদছ কেন? জোনাকির কণ্ঠ যেন শিশিরের মতো কোমল।

সাঈদ ঠোঁট কামড়ে বলল, জানি না... মনে হচ্ছে তুমি আমাকে অনেক দিন ধরে চেনো।

জোনাকি বলল, চিনি। কারণ যাদের হৃদয়ে আলো থাকে, তারা কখনো একা নয়।

এই কথাটা সাঈদের বুকের মাঝে একটা উষ্ণ ঢেউ তুলল। সে হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলো, কিন্তু জোনাকিটি বাতাসের মতো নরম। তবু তার আলো সাঈদের হাতের কাছে এসে এমন অনুভূতি দিল– যেন কেউ সত্যিই তার হাতটা ধরে রেখেছে।

মূহুর্তের মধ্যে আশপাশ বদলে গেল। সাঈদ এক জোনাকিতে ভরা উপত্যকায় এসে দাঁড়াল। হাজার হাজার আলো বাতাসে ভাসছে। কিন্তু এই আলো কেবল জ্বলে না এগুলো অনুভূত হয়। যেন প্রতিটা আলো মানুষের ভুলে যাওয়া আবেগের টুকরো।

একটি জোনাকি কাছে এসে বলল– এ আলো সাহসের, ওটা সত্যের, ওটা দয়ার, আর যে আলোটির দিকে তুমি তাকিয়ে আছো এটা ভালোবাসার।

সাঈদ বলল, ভালোবাসার আলো কি অদৃশ্য?

জোনাকি বলল, হ্যাঁ। কারণ তা শুধু হৃদয় বুঝতে পারে, চোখ নয়।

এই কথায় সাঈদের চোখ ভিজে গেল। সে ভাবল মা যখন তাকে ঘুম পাড়ায়, বাবা যখন তাকে মাথায় হাত রেখে বলে 'ভয় পেও না', বন্ধু যখন রেগে থাকা সত্ত্বেও তাকে ক্ষমা করে দেয়, এসবই কি তবে এই অদৃশ্য আলো? সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

জোনাকিরা তাকে নিয়ে গেল এক গোপন গুহায়। দেয়ালে অদ্ভুত নকশা, যেন মানুষের হারানো আবেগের মানচিত্র। প্রতিটি নকশা ছুঁতেই সাঈদ অনুভব করল হাসির উষ্ণতা, কান্নার ব্যথা, ক্ষমার নিঃশব্দ শান্তি। তার চোখ টলমল করে উঠল।

সাঈদ প্রশ্ন করে বলল। তুমি এসব আমাকে দেখাচ্ছ কেন? 

জোনাকিগুলো একসাথে বলল, কারণ যে শিশু নিজের হৃদয়ের আলো বোঝে, সে বড় হয়ে কখনো কাউকে অন্ধকারে ফেলবে না।

সাঈদ নিচু স্বরে বলল, আমি কথা দিচ্ছি– আমি আলোকে বিপদে পড়তে দেব না। কাউকে কষ্ট দেব না। কাউকে একা ফেলে রাখব না।

হাজারো জোনাকি তার চারপাশে ঘুরে উঠল, তাদের আলো সাঈদের হৃদয়ের ভেতর ঢুকে গিয়ে যেন একটা ফুলের মতো উষ্ণতা ফুটিয়ে তুলল।

তারপর তারা সাঈদকে দিল একটি ক্ষুদ্র সোনালি দানা– দেখতে ছোট, কিন্তু যেন আবেগের নিঃসৃত আলো। যেদিন মনে হবে তুমি ভেঙে যাচ্ছ, হারিয়ে যাচ্ছ এটা হাতে রাখলে তোমার হৃদয়ের আলো আবার জ্বলে উঠবে।

মুহূর্তেই সব অদৃশ্য হয়ে গেল। সাঈদ আবার আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে। কিন্তু তার মুঠোতে এখনো সোনালি দানা নরম আলো ছড়াচ্ছে। সে দানা বুকে চেপে ধরল, মনে হলো কেউ যেন তাকে আলতো করে আশ্বাস দিয়ে বলছে: তুমি কখনো একা নও।

পরদিন থেকে সাঈদের পরিবর্তন এলো। সে আর রাগ করে না, কারো ওপর চেঁচায় না, মিথ্যা বলে না। যখন কেউ কাঁদে, সে আগে এগিয়ে গিয়ে বলে চিন্তা করো না, তোমার ভেতরেও আলো আছে।

রাতে আকাশের দিকে তাকালে তার চোখ ভিজে ওঠে। সে জানে সেই অদৃশ্য জোনাকিগুলো কোথাও না কোথাও থেকে তাকে দেখে, তার হৃদয়ের আলোকে আগলে রাখে।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন