https://www.prothomalony.com/
15929
literature
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারী ২০২৬ ০৭:৫৯
ইরান আবারও উত্তাল। রাস্তায় মানুষ, কণ্ঠে ক্ষোভ, চোখে অনিশ্চয়তা। বছরের পর বছর জমে থাকা অর্থনৈতিক দুরবস্থা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও সামাজিক বৈষম্য নতুন করে বিস্ফোরিত হয়েছে জনবিক্ষোভে। এই বিক্ষোভ শুধু দ্রব্যমূল্য বা কর্মসংস্থানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা, ক্ষমতার কাঠামো ও শাসনদর্শনের বিরুদ্ধেই এক গভীর প্রতিবাদ।
তবে ইরানের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এখন আর কেবল দেশের ভেতরের বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অবস্থান, সামরিক হুমকির ইঙ্গিত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের তীক্ষ্ণ নজর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। প্রশ্ন উঠছে—ইরান কি একটি বড় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে, নাকি আবারও কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে সময় কিনে নেবে তেহরান?
ইরানের বর্তমান বিক্ষোভের শিকড় বহু পুরোনো। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, তেলের বাজারে চাপ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং যুব সমাজের হতাশা একত্রে সমাজে বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকারি হিসাব ও বাস্তবতার ফারাক, ধর্মীয় শাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। এই ক্ষোভ মাঝে মাঝেই বিক্ষোভে রূপ নেয়, কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন—বিক্ষোভের বিস্তার, তীব্রতা এবং সাহস স্পষ্টতই বেশি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দমন অভিযানে বহু মানুষ নিহত ও গ্রেপ্তার হয়েছেন। ইরানি রাষ্ট্রযন্ত্র বরাবরের মতোই নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও বিদেশি ষড়যন্ত্রের ভাষা ব্যবহার করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই বিক্ষোভের মূল চালিকা শক্তি দেশের ভেতর থেকেই উঠে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনায়। ওয়াশিংটন একদিকে ইরানকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় বসতে আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে সামরিক হামলার সম্ভাবনাও প্রকাশ্যে আলোচনায় আনছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও প্রশাসনের ভেতরের বিভক্ত মতামত ইঙ্গিত দিচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র এখনো চূড়ান্ত কৌশল ঠিক করতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের এই দোটানা নতুন নয়। অতীতেও ওয়াশিংটন ইরানের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে চাপ ও আলোচনার নীতি অনুসরণ করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই দ্বৈত নীতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। সামরিক হামলা হলে তা হয়তো ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করবে—কারণ “বিদেশি শত্রু” দেখিয়ে ভেতরের বিরোধিতা দমন করার সুযোগ তৈরি হবে। আবার নিষ্ক্রিয় থাকলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় থেকে যুক্তরাষ্ট্র সহজে মুক্তি পাবে না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইরান প্রশ্নে বিভক্ত অবস্থান স্পষ্ট। ইউরোপীয় দেশগুলো কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে হলেও, রাশিয়া ও চীন ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে নরম অবস্থানে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব—লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন—এই সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দ্রুতই একটি বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে রূপ নিচ্ছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই বিক্ষোভ ইরানের জনগণের জন্য কী বার্তা বহন করছে? ইতিহাস বলে, গণআন্দোলন সব সময়ই পরিবর্তন আনে না, কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে যে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আজ তারই উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে নতুন প্রজন্ম।
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি বা আন্তর্জাতিক চাপের চেয়েও ইরানের শাসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই অভ্যন্তরীণ বৈধতার সংকট। বন্দুক, কারাগার ও ইন্টারনেট বন্ধ করে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা সমস্যার সমাধান করে না।
এখানেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের জনগণের ন্যায্য দাবিকে সমর্থন করা এবং একই সঙ্গে দেশটিকে আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত না করার ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ কাজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে চায়, তবে কেবল হুমকি নয়—কৌশলগত, দায়িত্বশীল কূটনীতিই হতে হবে তার প্রধান অস্ত্র।
ইরান আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সন্ধিক্ষণ হয়তো সংস্কার ও সংলাপের দিকে যাবে, অথবা আরও কঠোর দমন-পীড়নের দিকে। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তের ওপর—এবং একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রজ্ঞার ওপরও।
একটি বিষয় নিশ্চিত—ইরানের জনগণের কণ্ঠ এখন আর আগের মতো নীরব নয়। প্রশ্ন হলো, সেই কণ্ঠকে ইতিহাস শোনা হিসেবে নেবে, না আবারও শক্তি দিয়ে চেপে রাখা হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ইরানের ভবিষ্যৎ, এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন