https://www.prothomalony.com/

15876

literature

সাহিত্য

শিল্পঘর

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারী ২০২৬ ২৩:২৬

 ভূমিকা

“বুটিক” শব্দটি এসেছে ফরাসি ভাষা থেকে, যার অর্থ ছোট, ব্যক্তিগত দোকান। এই দোকানগুলো সাধারণত পোশাক ও অ্যাক্সেসরিজের মতো সীমিত, বিশেষায়িত জিনিসপত্র বিক্রি করত, যা বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের গণ-উৎপাদিত পণ্যের বিপরীতে ছিল।



১৯৬০-এর দশকে প্যারিসে 'বুটিক লেভা' বা 'বুটিক মাদেলেইন'-এর মতো দোকানগুলো ফ্যাশনে নতুন মাত্রা যোগ করে, যেখানে ডিজাইনাররা স্বতন্ত্র ও ট্রেন্ডি পোশাক তৈরি করতেন, যা বুটিক ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে।

বুটিক ব্যবসার লক্ষ্য থাকে অবস্থান ও পণ্যের ধরন নির্ধারণ করা, ভালো মানের ও ইউনিক পণ্য খুঁজে বের করা (পাইকারী, ডিজাইনার বা হাতে তৈরি), ক্রেতাদের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করা এবং তাদের চাহিদা বোঝা। সোশ্যাল মিডিয়া ও স্থানীয় ইভেন্টের মাধ্যমে ব্র্যান্ডের পরিচিতি বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

এই ব্যবসাটি ফ্যাশন ও উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের সৃজনশীলতা প্রকাশ করার একটি দারুণ সুযোগ দেয়। আজ শিল্পঘর-এ দুজন বুটিক ডিজাইনারের গল্প আছে, যাদের শৈল্পিক কাজ ও ভাবনার অনুরণনে আপনারাও মুগ্ধ হবেন। আশা করি 'শিল্পঘর'-এর আজকের মূল্যায়ন আপনাদের ভালো লাগবে।

ধন্যবাদান্তে, রোকেয়া দীপা



প্রবাসে দেশীয় ঐতিহ্যের অদম্য ফেরিওয়ালা তানিয়া আহমেদ

তানিয়া আহমেদ তার ‘স্টাইল চেক’ জীবনযাত্রা ও ফ্যাশন ডেস্কের জন্য পরিচিত। ক্যামেরার সামনে পোজ দেওয়া বা পর্দার অভিনয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততা। কিন্তু গ্ল্যামার জগতের সেই আলোকছটা পেছনে ফেলে তানিয়া এখন মগ্ন সুঁই-সুতার কারুকাজ ও তাঁতীদের বোনা কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে। প্রবাস জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি স্বপ্ন দেখছেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাককে বিশ্বদরবারে এক অনন্য আভিজাত্যে প্রতিষ্ঠিত করার। সেই স্বপ্নের নাম ‘স্টাইল চেক বাই তানিয়া আহমেদ’।

স্বপ্নের শুরু ও মডেলিং জীবনের স্মৃতি

তানিয়া আহমেদের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটি নতুন কোনো হুজুগ নয়। এর শিকড় রয়েছে তার মডেলিং ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোতে। তখন থেকেই তিনি নিজের পোশাকের প্রতি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। বাজারের প্রচলিত ডিজাইনের বাইরে গিয়ে নিজের পোশাক নিজেই ডিজাইন করতেন। পরবর্তীতে সহকর্মী মডেলদের অনুরোধে তাদের জন্যও কস্টিউম ডিজাইন শুরু করেন। ধীরে ধীরে পোশাকের কাট, ম্যাটেরিয়াল ও রঙের কম্বিনেশন নিয়ে তার এক সহজাত দক্ষতা তৈরি হয়।

তিনি বলেন, "শুরুতে এটা ছিল কেবল শখ। আমি যখন মডেলিং করতাম, তখন অনেকেই আমার ড্রেস দেখে প্রশংসা করতেন। তখন থেকেই অন্যদের জন্য গেট-আপ বা টোটাল কস্টিউম সেট করার কাজ শুরু করি।" ২০১৭-১৮ সালে তিনি দেশে ছোট পরিসরে ‘স্টাইল চেক’ নামেই একটি ক্লোদিং লাইন খোলার চেষ্টা করেছিলেন। ভাগ্যের খেলা ও গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়ার কারণে বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন তখন থমকে গেলেও মুছে যায়নি। ২০২৩ সাল থেকে তিনি নতুন উদ্যমে প্রবাসের মাটিতে কাজ শুরু করেছেন।

এক টুকরো বাংলাদেশ: প্রবাসে দেশীয় পণ্যের সংকট দূর করা

বিদেশে থাকার সময় তানিয়া লক্ষ্য করেন, প্রবাসীদের মধ্যে দেশীয় পণ্যের প্রচণ্ড চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সীমিত কালেকশনের বাইরে মানুষ ভালো মানের দেশীয় ডিজাইন পান না। অনেকেই দেশে যেতে পারেন না, কিন্তু দেশের মাটির ঘ্রাণ ও তাঁতিদের হাতের ছোঁয়া মিস করেন।

তানিয়ার মূল লক্ষ্য হলো এক টুকরো বাংলাদেশকে বিশ্ববাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। জামদানি, মসলিন ও টাঙ্গাইলের সুতি কাপড় নিয়ে তার কাজ প্রবাসীদের কাছে এখন আস্থার নাম। হ্যান্ড স্টিচের শাড়ি তৈরির সময় গ্রাহকরা ছোটবেলার নানী বা মায়ের সেলাই মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

 নকশায় নিজস্বতা বনাম ট্রেন্ডের মেলবন্ধন

তানিয়া ট্রেন্ডের পেছনে ছুটতে চান না। তিনি বিশ্বাস করেন, ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার মার্জিত সমন্বয় প্রয়োজন। তিনি বলেন, "আমি চাই না আমার ডিজাইনগুলো ট্রেন্ডের ভিড়ে হারিয়ে যাক। জামদানি ও মসলিনে আধুনিক ছোঁয়া দিতে চাই, যাতে তরুণ প্রজন্মও স্বাচ্ছন্দ্যে পরতে পারে।"

তানিয়ার সংগ্রহে রয়েছে শাড়ি, সালোয়ার কামিজ ও কাফতান। নকশী কাঁথা ও হ্যান্ড স্টিচের কাজে তিনি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। সব পোশাকই ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। প্রবাসে থাকলেও তার কারিগররা বাংলাদেশে কাজ করেন। প্রতিটি ধাপ তিনি নিজে সুপারভাইজ করেন।

তিনি বলেন, "আমার কারিগররা আমার বোন বা আত্মার আত্মীয়ের মতো। এটি কোনো ‘ওয়ান ম্যান শো’ নয়। এটি একটি বিশাল টিমের পরিশ্রম।"

উৎপাদনে তিনি গুণগত মানে ছাড় দেন না। কাঁচামাল হিসেবে উচ্চমানের কটন, লিনেন ও সিল্ক ব্যবহার নিশ্চিত করেন। পাথর বা চুমকির কাজে আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য নিজে খুঁটিনাটি যাচাই করেন।

 ইউনিকনেস: এক পিসের আভিজাত্য

বড় কোম্পানি একই ডিজাইনের শাড়ি প্রচুর তৈরি করে। তানিয়া ভিন্ন পথে হাঁটেন। তিনি মূলত ‘ডিজাইনার পিস’ তৈরি করেন। প্রতিটি শাড়ি বা ড্রেস সাধারণত একটি পিস। তিনি চান, ক্লায়েন্টরা কোনো অনুষ্ঠানে একদম আলাদা এবং ইউনিক পোশাক পরুক।

বিপণন কৌশল

তিনি ভাড়া করা ইনফ্লুয়েন্সার ব্যবহার করেন না। নিজেই নিজের ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বড় দূত। ফেসবুক লাইভে শাড়ি পরে দর্শকদের সঙ্গে কথা বলেন। অনলাইন ছাড়াও ট্রাঙ্ক শো ও মেলায় অংশ নেন, যাতে মানুষ কাপড় নিজে দেখে।

প্রতিযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, "আমি কাউকে প্রতিযোগী মনে করি না। প্রত্যেকে নিজের জায়গায় অনন্য। আমি শুধু আমার কাজ সুন্দরভাবে করতে চাই।"

বিদেশের সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রাত জেগে ডিজাইন চেক করা বা ভিডিও কলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দেওয়া সবই তিনি করেন ভালোবাসার টানে।

গ্রাহকদের জন্য কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুবিধা রয়েছে। পছন্দের পোশাক বুক করে রাখেন এবং পেমেন্ট ক্লিয়ার হলে ডেলিভারি দেন। মানি ব্যাক গ্যারান্টি বা ফেরতের ক্ষেত্রে তিনি নমনীয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

তানিয়ার স্বপ্ন কেবল একটি ছোট বুটিক শপেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান বিশ্বের প্রধান শহরে ‘স্টাইল চেক’-এর আউটলেট থাকবে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মসলিন ও জামদানিকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চাই, যেন বিশ্ববাসী এক নামেই এই আভিজাত্য চেনে।”

তানিয়ার ‘স্টাইল চেক’ কেবল একটি কাপড়ের দোকান নয়; এটি এক টুকরো বাংলাদেশ, একজন শিল্পীর স্বপ্ন ও অসংখ্য কারিগরের পরিশ্রমের প্রতিচ্ছবি। প্রবাসের মাটিতে দেশীয় ফ্যাশনকে তিনি স্বতন্ত্র রূপ দিচ্ছেন, যা প্রশংসনীয়।



 প্রবাসে দেশের স্বাদে উজ্জ্বল ফরিদা হাসান

ফরিদা হাসান কুইন্স ফ্যাশন-এর কর্ণধার। দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও ফ্যাশন, সংস্কৃতি ও দেশের গন্ধকে কখনও পেছনে ফেলে আসেননি। ভিন্ন দেশের পোশাক পরলেও দেশি না হলে অপূর্ণতা অনুভব করেন।

২০১২ সালে প্রথমবার দেশ থেকে নিউ ইয়র্কে আনার মাধ্যমে শুরু হয় দেশি পোশাকের কাজ। ব্লক ডিজাইন, বাটিক, সুতির শাড়ি, টাঙ্গাইলের শাড়ি, নকশি কাঁথা, এমব্রয়ডারি—সবই তিনি সরবরাহ করতে শুরু করেন।

সময়ের সঙ্গে নিজেকে আধুনিক করার চেষ্টা করেন। আগ্রহী গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হলো সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুকে Queens Fashion NY নামে একটি পেজ খুলে প্রোডাক্টের ছবি ও নাম দেন। লাইভে এসে প্রতিটি উপাদান, রঙ, সেলাই, স্থায়িত্ব, সাইজ ও দাম বিস্তারিত জানান।

বিদেশ থেকে দেশি পোশাক নিয়ে আসাও তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ। নতুন ডিজাইনের প্রতিযোগিতা মানেই টিকে থাকার লড়াই, যা তিনি আনন্দের সঙ্গে মোকাবিলা করেন। বিভিন্ন ভেন্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পছন্দের অর্ডার সংগ্রহ ও ডেলিভারি দেন।

ফরিদা আশা করেন, Queens Fashion NY একদিন সবার দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। তিনি চান, দেশি কাপড় ও ডিজাইন প্রবাসে বেড়ে ওঠা পরবর্তী প্রজন্মও সহজেই খুঁজে পাবে। সেই চেষ্টাই তিনি নিরলসভাবে করে যাচ্ছেন।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন