https://www.prothomalony.com/
15869
literature
ফিরছি পুরানো পথেই
কাকন রেজা
ফিরছি পুরানো পথেই
অথচ কথা ছিল অন্যরকম
নতুন বোতলে মদিরার নাম বদলে যায়
কিন্তু নেশাটা থাকে আগের জনমের
পুনর্জন্ম নিলো অভিশাপ
ধারণাটি বিস্ময়কর, আত্মা ও শরীর
মৃত্যুর পরও আত্মা টিকে থাকে
যেমন থাকে ফ্যাসিবাদ পতনের পরেও
জন্মান্তরবাদ বলা যায় নিঃসন্দেহে
নয়া শরীরে পুরানো আত্মার প্রতিস্থাপন
নতুন বোতলে যেমন পচে যাওয়া মদিরা
পচনের নেশা বড় ভয়ংকর
অতএব ফিরছি পুরানো পথেই
অথচ কথা ছিল অন্যরকম...
মানুষ
এনাম রাজু
তবুও সময় হোক, ক্লান্ত হয়ে হলেও
সব ডাকনাম উপাধি মুছে আয়নামুখে-
স্মৃতির কুয়াশা ঝেড়ে নিজেকে দেখার।
একান্তে নিজের সাথে নিজের কথা...!
লুকিয়ে থাকা কথা শুনতে হয়, বুঝতে হয়,
এ যে এক আশ্চর্য চেরাগ, ভাবনার অধিক।
একবার যদি ভেতরটা বাহির হয়
অথবা স্থান বদল করে
নিশ্চিত করা যায়,
আত্মহত্যা অথবা নির্জনতা
প্রিয় হবে মানুষের।
এটা আশা মাত্র! মানুষ তো
অন্তত একবার নিজের ভেতরে ঢোকে
অথচ বাহির হলে হয়ে ওঠে ফোঁস।
বুকের ভেতর লুকানো রোদ্দুর
জহিরুল হক বিদ্যুৎ
রাত যতই দীর্ঘ হোক তবু ভোর আসে,
অন্ধকার যখন নিজের ছায়াকেও ভয় পায়
তখনও পূর্ব আকাশে আলো আঁচড় কাটে।
হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো একেকটা গাছ
পাতাগুলো ঝরে গেলেও ডালে রস থাকে,
আবার গজায় নতুন কুঁড়ি হয়ে, অন্য রঙে।
দুঃসময় নিজেই এক শিক্ষক
যে প্রশ্ন করে না শুধু তাকিয়ে থাকে;
আর আমরা উত্তর খুঁজি আত্মার আড়ালে।
আজ জানালার ধারে দাঁড়িয়ে দেখি
একটি ফুল কংক্রিট ফাটিয়ে মাথা তুলেছে।
ভাঙন মানেই শেষ নয়,
বরং শুরু হতে পারে অন্য কোনো দিক থেকে।
আলো ফিরবেই জানালার গ্লাস পেরিয়ে
নয়তো ভেতর থেকে,
যেখানে আমরা বহুদিন আগেই
একটা রোদ্দুর লুকিয়ে রেখেছিলাম।
ভুলি গো তারে কেমন করে
রকিবুল ইসলাম
বাজিছে আজি তার তানপুরায় বিচ্ছেদের সুর!
বিরহের সুরলহরী।
অবজ্ঞার বাঁশি বাজিয়ে যে যাবার সে তো চলে যায়!
যাও চলে তবে তুমিও ব্যগ্র চিত্ত, ব্যাকুল হৃদয়ের
কোনো বাধা নাহি মানি।
কোন কারণে, কোন বারণে কভু ফেরানো যায় আর নাহি।
কোন দৃঢ় বাঁধনেও তারে আর নাহি বাঁধা যায়!
আজ প্রেমের অনটনে, দুঃখের দহনে দগ্ধ আমি
ভিজতে চাই, ভিজে যেতে চাই নিরন্তর!
ঐ আকাশ মনের প্রেমের বারিতে নয়,
সেই মনোহরিণীর হৃদয়ের অনুকম্পার বারিষণের
সুশীতল অঝোর ধারায়।
পারি যদি রাখবো বেঁধে তারে,
বিনি সুতোর মালা গলে পরিয়ে।
রেখে দিব বেঁধে কোন অদৃশ্য প্রণয়ের শৃঙ্খলে
ঘ্রাণ নিব তার অমোঘ মনোরঞ্জনে।
সে যে হাসনাহেনা! যার সুবাস কভু যায় না মুছে,
ভুলি গো বলো আমি তারে কেমন করে!
মুক্তির চেতনায়
ফারজানা ইয়াসমিন
শপথ নিয়ে মিছিলে গেল যে যুবক-
তার রক্তের দাগ আজ কংক্রিটের শহরে,
বৃষ্টি এসে মুছে দিয়ে গেল নিঃশব্দে।
নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে তাই কথা বলে রাজপথ।
তার শোকে যে কাক কেঁদেছিল সারাদিন -
আকাশ কাঁপিয়ে দিয়েছিল, শোকসভা করে
সেও আজ শান্ত হয়ে ক্ষুধার্ত চোখে,
তাকিয়ে আছে শকুনের ফেলে দেওয়া
উচ্ছিষ্ট খাবারের দিকে।
মানচিত্র আজ অরাজকতার কষাঘাতে জর্জরিত,
মুক্তির চেতনায় রাজপথ আজ উজ্জীবিত।
দেয়াল ভাঙার গান
আসাদুজ্জামান খান মুকুল
পঁচিশটা তো কেটে গেল- কিছু ধুলো জমল দৃষ্টির কাঁচে
আর কিছু মনের কোণে।
বারান্দার সেই পুরনো আড্ডাগুলো এখন যেন কেমন
পর পর লাগে,
সবাই আছে, শুধু মানুষের ভেতরের সেই 'মানুষটা'
কোথায়? চারদিকে আজকাল বড্ড বেশি ফাঁকা,
বুকের ভেতরটা হাহাকার করে অবিশ্বাসে।
তবুও, এই ভাঙাচোরা দিনগুলোর মাঝেই তো আমাদের
বেঁচে থাকা।
একটু মায়া, একটু চোখের কোণের জল-
এসব কি খুব বেশি চাওয়া?
আমরা কি পারি না নিজেদের এই জেদটুকু ভেঙে ফেলতে?
ছাব্বিশের সকালটা হয়তো আর পাঁচটা দিনের মতোই হবে,
সূর্য উঠবে সেই একই ভাবে।
কিন্তু ওই যে-একটা খ্যাপাটে ইচ্ছা হয় মনে,
সব ক্ষত লুকিয়ে আবার একবার বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর।
মানুষ তো মানুষের জন্যই মরে,
আবার মানুষের হাত ধরেই বাঁচে।
বিষণ্ণবিধুর
আবির হাসান
এইসব বধির রাত্রি—চাপা দীর্ঘশ্বাসের কফিনে
লুকিয়ে রেখে রেখে ঘুরে বেড়াই শহরের অলিগলি,
এত লাল-নীল আলোর মানচিত্রে
কিছুটা আলোড়ন পাই,
তুমি, আমি, আমরা সেসব যাপন দৃশ্য
মৌন হৃদয়ের গহিনে গেঁথে রাখি—
আমাদের পৌরাণিক সাদাকালো সময়,
মমতাবৃত্তের সমুদ্রে ডুবে থাকা
এইসব বহুকামী কণ্ঠস্বর, উন্মত্ত প্রেমের ইশারা,
সবকিছু হৃদয়ের কাছাকাছি এসে গান গায়
স্মৃতিমধুর বিষণ্ণবিধুর..
প্রেম প্রার্থনায়
কুমকুম দত্ত
মৃত্যু ডেকেছিল কাছে একবার প্রেম প্রার্থনায়
ভাত কাপড়ের মতো চিরাচরিত অঘ্রাণ ;
মুখোশের আড়ালে নিদাঘ দুপুরে
মেঘদল আকাশের মর্মার্থ বেদনায়
শূন্য একটি হাত ডালপালা বিস্তার বছর বছর
পৃথিবী আবর্তন মহাকাল সবুজ ঘাসে
রাতের পিদিম জোনাকির আলো ভুল অন্ধকার
মন অচেনা নদী স্রোতে খড়কুটো মগজের সাঁতার ;
বেমালুম ভুলে যাই মৃত্যু ডেকেছিল কাছে একবার
কেলেঘাই-এর মুখোমুখি
অলক জানা
ঝাউ জঙ্গল আর কাঁচা হাতের চিঠির মতো ঢেউ বন্ধনীর কেলেঘাই ছিল প্রথম যৌবনের ক্রাশ। রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠের ক্লাস ফাঁকির বহু প্রতারণা, প্রহর না জানি ধুলো জলে মিলেমিশে মহাসমুদ্রে সেই কবে হারিয়ে গেছে। খেজুর রসের সস্পর্শ গন্ধ, পরিযায়ী পাখির কিচমিচে পাঁচমিশালি কথোপকথন কেলেঘাই চরের পর্ণমোচী বিকেল ও ঝালমুড়ি দীর্ঘ কোনো আবছায়া অন্ধকারে এখন ঘুমসুখে আচ্ছন্ন। সেইসব মোহরবর্ণ দিন আর নেই সময়ের ধুলোবালি, অবহেলা ও দাবির কাছে পরাজিত অথবা আহত জটায়ুর মতো ফিকে অধ্যায়। ডিজে রবীন্দ্রসংগীত মানবেন্দ্র কেলেঘাই চরে একযোগে বেজে উঠলে বুঝতে পারি আজ ২৫ শে ডিসেম্বর। বহু দূর-দূরান্ত থেকে পিকনিকের জন্য আগত আগন্তুক দিনের কয়েক ঘণ্টা কাটাতে এসেছেন কেলেঘাই চরে। সেই নিবিড়তা নেই, কোথায় যেন কি সব একটু একটু করে গোচরে অগোচরে হারিয়ে যাচ্ছে। নদী তো আস্ত এক যৌবনের সমার্থক। হাজার জিগির-জেদ উদ্দাম আঘাত ভুলচুক নিয়ে দিব্যিই তিরতির বয়ে যায়। এখন সেই সময়ে দাঁড়িয়ে থাকা, যেখান থেকে পেছনের দিকে তাকানোর সময় বড়ো কৃপণ হয়ে গেছে। তবুও প্রিয় কোনো গন্ধ স্পর্শ শব্দ অথবা সুরের উসকানিতে মন যে ভার এবং নস্টালজিক হয় সে কথা অস্বীকার করার উপায়মন্ত্র আমার জানা নেই। সংরাগ লাল সূর্যাস্তের রঙ মুছে ঝাঁক ঝাঁক পাখির বাড়ি ফেরার উৎসাহ ইঁটভাটার চিমনির বিভীষণ কালো কুণ্ডলিত ধোঁয়ার আঁচে বদলে নিয়েছে রুট। তবু প্রচণ্ড স্রোতের টানে খসে পড়া পাড়ের ভগ্নাংশ বয়ে বেড়ায় নদী জন্মের মিথ, স্বভাব ও ইচ্ছেরঙ।
কেলেঘাই নদীর উৎপত্তি সম্পর্কে ভূগোল জানিয়েছে-- ঝাড়গ্রাম জেলার সাঁকরাইল থানার দুধকুণ্ডির কাছে বামিনিগ্রামে উৎপন্ন কেলেঘাই নদী। এটি কলসিভাঙা নামেও পরিচিত এবং পরে কংসাবতী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। নদীটি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নারায়ণগড়, সবং এবং পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর ও ভগবানপুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কংসাবতী ও কেলেঘাই মিলিত হওয়ার পর এই মিলিত স্রোতের নাম হলদি নদী। এই যাত্রাপথে ঐতিহ্যের নানান মেলা ও উৎসবের আনন্দ এখনো বহন করে চলেছে। কিছু অনুভব এভাবেই সেজে ওঠে----নিরন্তর শ্রদ্ধার বিনিময়েও কিছু সরলতা পরিমাপ করা সত্যি দুরূহ। জল ছুঁয়ে দেখলে কলম্বাসের কথা মনে পড়ে, তাঁর পালের অনুসন্ধিৎসু মোচড় এখনো জলের সর্পিলে দীর্ঘ পরমায়ু নিয়ে থেকে গেছে। প্রতিটি জলাভিযান আবিষ্কার দাবি করে, যেমন মুক্তো অথবা ধ্বংসাবশেষ। তুমি পৃথিবীর সরলতম জলাশয়। তুমি মানে সব ধরনের অস্থির-উৎপাতের বিপরীতে নিশ্চিত জিরিয়ে নেবার সামান্য ফুরসত। রিপু পীড়ন ছাড়াই তালুভর্তি প্রত্যাশার রেখাগুচ্ছ, প্রসন্ন হাত বাড়িয়েই আছি। বহ্নিমান ঘৃণার নির্মমতা না হয় অন্য কারো জন্য তোলা থাক। নিরলস নির্মাণ প্রত্যাশীর অনুনয় একবারটি মঞ্জুর হতেই পারে। বিনত সরলতায় একমাত্র অক্ষর সম্পদে কবি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী। এইসব আত্মালাপ সাধারণে না বুঝলেও শিল্পীমনন জানেন একটি অনুভব কীভাবে নতুন সৃষ্টির পথকে উসকে দেয়।
হাওয়া বরাবর স্বাধীন। তাকে আটকে রাখার বোকামিতে ঝড় হয়ে যায়। তখন ঘর ভাঙে গাছ ভাঙে, অকালে গাছের তলায় রচিত হয় পাতাঝরা দিন। হাওয়ার ডানায় ভর দিয়ে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর-জানুয়ারি অবধি নেচে বেড়ায় খেজুর রস ও গুড় তৈরির গন্ধ। সাথে সমান দমে ছুটতে থাকে ইঁটভাটার চিমনির দৈত্যাকার ধোঁয়ার পোড়া পোড়া গন্ধ। মনের মাদকতা ও আনন্দ নিমেষে বিষাদ হয়ে ওঠে। কেলেঘাই-এর নোনাচরে তৈরি নুনবাড়ি কৈশোরের এক অপার ভালোলাগা। বিশেষত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত জোয়ার জলে নোনতার পরিমাণ অত্যধিক হওয়ার ফলে নদীসংলগ্ন এলাকায় প্রচুর নুন তৈরির প্রক্রিয়া চোখ জুড়িয়ে যেত। শুকনো চর থেকে সাদা রঙের মাটি চেঁছে নুনবাড়ির মধ্যে জল দিলে ফোঁটার আকারে গড়িয়ে পড়তো খর নোনাজল। সেই জল উনুনে ফোটালে তৈরি হয়ে যেতো নুন। কেলেঘাই পাড়ের মানুষজন এই নুন খেতেই তখন অভ্যস্ত। এখন শৌখিনতা ঢের বেড়ে গেছে সুতরাং এখন তৈরি নুন নৈব নৈব চ।
কোথায় যেন কতকিছু হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। পটাশপুর ও সবংয়ের সীমানায় ঐতিহ্যের তুলসীচারার মেলাটিও বর্তমানে হারিয়ে ফেলেছে তার জৌলুস। সেই আগের মতো পৌষসংক্রান্তির ভোরে গঙ্গাস্নানের মতোই কেলেঘাই থেকে ডুবে মাটি তোলার পুণ্যার্থীর সংখ্যা অনেকটাই এখন কম।
শত শত দৈত্যাকার ইঁটভাটার থাবা দীর্ঘদিন ধরে কেলেঘাই-এর বিস্তৃত চর দখল করে নিয়েছে। উবে গেছে ঝাউ ঝাউ বনের মনমাতানো গান ও খেলার মাঠ। কমেছে পরিযায়ী পাখির পরিমাণ। সময়ের দাবির কাছে হেরে যাওয়া নির্মল প্রকৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সৌন্দর্য আর আটপৌরে আলাভোলা নিবিড়তা। সেভাবে আর জলযান নৌকো অথবা ছোট ছোট ট্রলার এলেও তা সামান্য। এখন স্থলপথেই যোগাযোগ যাতায়াত। পোড়া ইঁটের দূষণ নিয়ে না জানি কেলেঘাই-এর মতো কত নদী যত্নের আড়ালে মুমূর্ষু রোগীর মতো ধুঁকছে। একদা গতি হারিয়ে বিলীন হয়ে যাবে নিঃশব্দে সে আর নতুন কী ? এভাবেই যৌবনের ক্রাশ, ভালোলাগা ভালোবাসা ক্রমশ স্মৃতি। সব ভালোলাগার ব্যাকরণ হয় না। নিপাতন সম্পর্কে থেকে যায় মনের কাছাকাছি। কত কবিতার পংক্তিমালা, নতুন শব্দের গন্ধ এমন পরমাত্মীয় স্বজনের সংসর্গে পেয়েছি, সেই মধুরতা যা ভোলার নয়। কচুরিপানার সংসার ও প্রবাহপথে পলিসঞ্চয়ের নয়াচর কেলেঘাই-এর গতিকে অনেকটাই রুদ্ধ করেছে। বর্ষাকাল এলেই সবং, ভগবানপুর ও পটাশপুরে প্রতিবছর বন্যার আশঙ্কা থেকেই যায়। এখনো কোমরবিঁছে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে গেলে কত কবিতার ভগ্নাংশ মনের জমিতে বীজ হয়ে ফুটে ওঠে। বয়স বাড়ছে, ফিকে হয়ে আসে ইচ্ছেরঙ। তবুও অকৃপণ ভাবে উচ্চারিত হয় নদীকে ভালোলাগার বা ভালোবাসার কোনো বয়স হয় না।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন