https://www.prothomalony.com/

15725

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য-বিজয় দিবস সংখ‍্যা

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৮:৫৪

উত্তরের সাহিত‍্য-বিজয় দিবস সংখ‍্যা

ভূমিকা: বাংলার গর্ব-বিজয়ের মাসে কবি, সাহিত্যপ্রেমী ও সকল পাঠক-মনকে জানাই আমাদের উষ্ণ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। স্বাধীনতার মহাযজ্ঞে যাঁরা আত্মোৎসর্গ করেছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য, যাঁদের ত্যাগে আমরা পেয়েছি স্বাধীন পতাকা, সেই শহিদ বীরদের স্মরণে আজও আমরা নতশির। আমাদের গভীর শ্রদ্ধা রইল তাঁদের প্রতি, আর জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রইল বিনম্র স্যালুট। 

 হৃদয়ের গভীর আবেগ দিয়ে যাঁরা মাতৃভূমিকে ভালোবেসে নিরন্তর সাহিত্যচর্চা করে চলেছেন, তাঁদের শব্দশৈলীতেই ইতিহাসের রক্তরাঙা স্মৃতি ও বীরত্বের আখ্যান আজও আমাদের মাঝে স্পন্দিত হয়। এমন সৃজনশীল প্রয়াসই উত্তরসূরিদের হৃদয়ে দেশপ্রেমের বীজ বপন করে এবং বিজয়ের চেতনাকে পৌঁছে দেয় এক গভীরতর জীবনবোধে। সকল কবির প্রতি রইল আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আশা করি, এ সংখ্যাটি আপনাদের ভালো লাগবে।

-এইচ বি রিতা

 

 

 

ঝড় থামার পর 

তমিজ উদ্‌দীন লোদী

 

ঝড় থামার পর, বৃষ্টির পিটুনি থেমে যাবার পর,

আমরা দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রক্তস্রোত দেখলাম

ধীরে বয়ে যেতে মাঠ ও গড়খাই  জুড়ে।

 

আমরা তাকিয়ে রইলাম কৃষ্ণবর্ণ আঁধারের দিকে,

দূরত্ব আমাদের দৃষ্টিকে বদলে দিয়েছিল

মনে হল আমরা একটি পর্দা কিংবা  কুয়াশা দেখছি

কাগজের ঘোড়ার মতো । 

 

তবুও এখনো আমি চোখ বন্ধ করলে সেই মেয়েটাকে দেখি

তার গ্রাম থেকে দৌড়াচ্ছে, ঊর্ধ্বশ্বাসে 

তার পোশাকের সঙ্গে জেলির মতো জড়িয়ে আছে ভয় 

তার হাত বাড়িয়ে আছে সেই শূন্যতার দিকে

যে অপেক্ষা করে উত্তাপের ঢেউয়ের মধ্যে তার সামনে।

 

আমি ভাবতে চেষ্টা করি সে রাস্তা ধরে দৌড়াচ্ছে আর ডানা

তার ভেতরে ঝাপটাচ্ছে যতক্ষণ না সে উড়ে যায়

উপরের দৃষিত জঙ্গল আর তার যন্ত্রণার

উপরে, আর তোমার যন্ত্রণার, আর আমার।

 

কিন্তু মিথ্যা আবার ফিরে আসে।

মিথ্যে আশ্বাস বারবার ফিরে আসে 

আর মেয়েটা দৌড়ায় শুধু যতদূর চোখ যায় 

 

এ দৌড় শেষ হয় না 

বরং আজও তা  চারদিক স্তব্ধ করে;

প্রাণ দাঁড়িয়ে থাকে ওষ্ঠে আঙুল রেখে । 

 

 

জ্যোৎস্না ও ভোরের পাখি 

শেখর ভট্টাচার্য

 

শেষরাতে জ্যোৎস্নার ভেলা ভেসে যাচ্ছে ভোরের 

পাখির কাছে

স্তব্ধতার ছন্দে আকাশের ক্যানভাসে কারা এঁকে যাচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাস। 

জ্যোৎস্না-নদীর হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে অগণন লাল আর সবুজ ফুলের পাপড়ি,

ফুলের শোভাযাত্রা রৌদ্রজ্জ্বল প্রভাতের গায়ে রূপকথার গল্প লিখতে উন্মুখ।

"দাস পার্টির" পানসি নৌকার ঢেউ, বয়ে নিয়ে যায় 

রক্তরঙ মানচিত্র

সোনালি আভার প্রান্তর কৃষ্ণরঙ আবরণে আশা হতাশার সাপলুডুতে নিমগ্ন,

পাঁজরে সাপের বিষাক্ত কামড় লীন হয়ে যায় লালাভ আলোক রশ্মির স্পর্শে

ধুধু মাঠ, তেরশত নদী পেরিয়ে বদ্বীপের আকাশে ওঠে মহাকাব্যিক এক সূর্য,

স্বপ্নে বুনন করা রেশমি সময় বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে, গেয়ে ওঠে মুক্তির গান,

"দাসের নৌকা" আর ভোরের পাখি, হাওরের আফাল পেরিয়ে প্রান্তরে মুখোমুখি

উদ্ভাসিত আলোয় অসীম আকাশে মেঘের পাখায় ওড়ে নির্ভিক "যাত্রার বিবেক'।

 

 

 

আমরা হাঁটছি গন্তব্য না জানা ধাঁধাঁয়

এনাম রাজু 

 

ডিসেম্বর এখন ঋতুকালীন এক কমোডিটি,

যেখানে রক্তের উষ্ণতা হারায় ক্যাফেইনের ধোঁয়ায়।

 

স্বাধীনতা হাতের তালুর নীল স্ক্রিনে থমকে থাকা আলো-

জ্বলে ঠিকই, অথচ তাপহীন নিরুত্তাপ ছড়ায়... ।

 

মুক্তিযুদ্ধ বইয়ের পাতায় চাপা এক ফুটনোট,

দ্রুত চোখ বুলিয়ে যাওয়া অনুচ্চার স্মৃতি।

 

পতাকাও যেনো এখন দেয়ালে বন্দী এক স্থির গ্রাফিতি,

'জয় বাংলা' ভাঙা প্লেয়ারের ভেতর আটকে থাকা শব্দ।

 

আমরা হাঁটছি গন্তব্যহীন এক দীর্ঘ ধাঁধাঁয়-

অপেক্ষা করি: কবে ফুটনোট হওয়া ইতিহাস

আবার মূল টেক্সট হয়ে উঠবে চিৎকারের মতো।

 

 

 

বিজয়হর্ষ 

সুমন শামসুদ্দিন

 

বজ্রকন্ঠে জেগে উঠলো রক্তকমল,

মোহনিদ্রা ভেঙে বৃত্তাকারে মুষ্টিবদ্ধ হলো-

সবুজ বদ্বীপের মধ‍্যবর্তী অন্তর্লীনে।

তারপর শুরু হলো গাঙচিলেদের কুচকাওয়াজ।

জয়দীপ্ত গর্বে শুরু হলো শোভাযাত্রা।

 

তারপর, দিনে দিনে চেতনার শানিত সূর্যালোকে

মনবিহঙ্গ খুঁজে পেল মহেশখালীর বাঁক।

 

বাঁশখালি আর চিত্রাজলে

বিজয়-রবির মুক্তালোকের ঝিকিমিকি,

সরুচঞ্চু গঙ্গাকৈতর রমণ করে স্নানানন্দ!

 

ছায়ানটের গাঢ়হাস‍্য প্রণয়রেণু ঠোঁটে

ব‍্যাকুল দোয়েলের বিহ্বলতা!

তৃণশ‍্যামল জমিনের বুকে

অংকিত মানচিত্রের হলুদাভ প্রভা,

আর, স্বস্তির আঙ্গিনায় নির্বিঘ্নে ওড়ে-

একটা লাল প্রজাপতি!

 

নিঃস্ব পর্ণকুটিরের চাতালে

চন্দ্রাতপের মায়াবী আভায় উঁকি দেয়

আশা জাগানিয়া এক অনাগত ভবিষ্যৎ!

 

দিগন্তহীন আকাশের বুকে

সোনালি চিলের ডানায় ভর ক'রে-

ভেসে বেড়ায় বিজয়হর্ষ!

 

 

 

আমি কি ভুলেছি........ 

‎সু শা ন্ত  হা ল দা র 

‎সবইতো ভুলেছি 

‎শুধু বকুল ঝরা দিনের

‎আহত পলাশের করুণ দৃষ্টিটুকু ভুলিনি 

‎আমি কি ভুলেছি 

‎ভাঙা পলেস্তারার বিচিত্র চিত্রিত আঁকচাড়া 

‎ফোস্কা পরা দেয়ালের

‎শ্রীহীন গা-ঘেষা মানুষের নির্জীবতার ধুলি-ওড়া সন্ধ্যা 

‎বিধ্বস্ত পিতার অরক্ষিত স্বাধীনতার উড্ডীন পতাকা?

‎আমি কি ভুলেছি 

‎দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মায়ের ভারাক্রান্ত মুখের বিষাদগ্রস্ততা

‎সজল নয়নের ক্রন্দনরতা বৈধব্য প্রেমিকা? 

‎আমি কি ভুলেছি 

‎বিজয় দিবসের জলপাই রঙের কুচকাওয়াজ মহড়া 

‎আকাশ ফাটা চিৎকারে

‎নির্যাতিতার স্বঘোষিত কামান-দাগা মৃত্যুর নিশানা? 

‎সবইতো ভুলেছি 

‎শুধু নির্জনতার এই যে প্রকৃতি বিমুখতা 

‎তার-ই কিছুটা উদ্বেলিত বেদনায়

‎রাঙিয়ে নিয়েছি নিজেরই ধূসর পাণ্ডুলিপি চেহারা! 

 

 

 

বিপ্লবে বিস্ময়ে আমার বাংলাদেশ 

সাকিব জামাল

 

বিপ্লবে বিস্ময়ে, আমার বাংলাদেশ।

শান্তিতে সংগ্রামে, আমার বাংলাদেশ।

এখানে সূর্য ওঠে রক্তিম সাহস নিয়ে,

এখানে সূর্য ডোবে লাল সালাম দিয়ে!

সাহস আর ভালোবাসায়

এগিয়ে চলছি বেশ।

বিপ্লবে বিস্ময়ে আমার বাংলাদেশ।।

 

বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, হৃদয়ে রয়েছে গাঁথা

একাত্তরে রক্তে কেনা -আমরা স্বাধীনতা।

নব্বইয়ে গণতন্ত্র আর চব্বিশে সুশাসন

বীরের সাথে বীরের বেশে -আমাদের বন্ধন।

তোমরা সবাই তাকিয়ে দেখো

আমরা অনিঃশেষ!

বিপ্লবে বিস্ময়ে আমার বাংলাদেশ।।

 

ভয় পাই না, জয় করে যাই

আমরা যেটা চাই!

মানবাধিকারের উজ্জ্বল পতাকা

আমাদের হাতে তাই!

বিশ্বকল্যানে আমরাই সেরা 

অবাক সকল দেশ!

বিপ্লবে বিস্ময়ে আমার বাংলাদেশ।

শান্তিতে সংগ্রামে আমার বাংলাদেশ।।

 

 

তোমাকে হারালে, স্বাধীনতা 

আবদুল বাতেন 

 

তোমাকে হারালে, স্বাধীনতা           

খোলা আকাশকে লাথি মেরে 

দাসত্বের পিঞ্জরকেই বেছে নেবে পাখিসকল। 

ফুল ও ফলোৎপাদনকে না- জায়েজ ভেবে 

বন্ধ্যাত্বকে বরণ করবে সারি সারি গাছ। 

 

উবে গেছে, এখন যেমন শিশুদের শৈশব,রঙিন                            

তোমাকে হারালে, স্বাধীনতা 

তাঁদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎও হারাবে অন্ধকারে।

জ্ঞান- বিজ্ঞানকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে 

মাদক আর অবৈধ অস্ত্রের আড়ত

হয়ে উঠবে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। 

 

শিল্প- সংস্কৃতি- শুদ্ধতা চর্চার গায়ে থুথু ফেলে 

দুর্নীতির শীর্ষে মাথা রাখবে 

সৃজনশীল- সম্ভনাময়- মানবতাবাদী মানুষগুলো। 

তোমাকে হারালে, স্বাধীনতা 

মেরুদণ্ডহীন প্রাণী হয়ে টিকে থাকবে প্রতিটি বাঙালি 

উঠে বসারও ক্ষমতা থাকবে না, কারো আর। 

 

 

বিজয়ের পরও কিছু রক্ত বাকি থাকে

জসীম উদ্দীন মুহম্মদ

 

বিজয়ের দিন ঢোল বাজে, বিজয় মিছিল নামে

কিন্তু একটি উচ্চাশা পুকুরের পানিতে ডুবে থাকে।

স্বাধীনতা তখন একটি আধা-লিখিত চিঠি

যার খাম খোলা কিন্তু প্রকৃত পাঠক অনুপস্থিত।

 

আমি কেবল দেখি, রক্ত শুকিয়ে ইট হয়

আর সেই ইট দিয়ে গড়ে ওঠে আমাদের ভবিষ্যৎ

অথচ সেই ভবিষ্যৎ প্রশ্ন করে, 

"আমরা কি সত্যিই জিতেছি....?" 

কে না জানে, বিজয়ের পরেও কিছু রক্ত বাকি থাকে! 

 

তবুও বিজয়... এখানো একটি আয়না

যেখানে দাঁড়ালে নিজেকেই জবাব দিতে হয়।

 

 

 

ষড়যন্ত্রের ছায়াপথ 

শাহীন সুলতানা 

 

বিপ্লবীর রক্তে ভিজে ওঠে সবুজ মানচিত্র;

ঘাতকের দল অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে আর

হিসাব মেলায় অনন্ত আগামীর।

স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত রাজপথে- 

ওরাও মিশে চলে বিপ্লবী জওয়ানের মুখোশে।

 

মঞ্চ কাঁপায় জওয়ান, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত রুখে 

দিতে বদ্ধপরিকর তার মুষ্টিবদ্ধ হাত! মুক্ত পাখির 

মতো হেঁটে বেড়ায় আনাচ-কানাচে, ডানে-বামে 

সামনে-পেছনে। মানুষের চোখে আঁকে স্বপ্নময় 

স্বদেশের ছবি।

 

এদিকে সুযোগ বুঝে দুর্বৃত্তের নাঙা তলোয়ার 

উড়িয়ে দেয় বিপ্লবীর মস্তক! 

ফুঁসে ওঠে সময়। ধ্বংসস্তুপ থেকে বেরিয়ে আসে

আলোর বিচ্ছুরণ; জমিনের প্রতিটি প্রাণে গ্রথিত 

হয় বিপ্লবের বীজ। 

 

 

 

রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা

হাসান মাহমুদ

 

হে আমার পূর্বপুরুষ,
আমরা তোমাদের ভুলবো না। 
এই স্বাধীনতা রক্তের বিনিময়ে কেনা

প্রিয় লাল-সবুজের পতাকা,
রক্তে আঁকা আমাদের মানচিত্র,
তোমাদের পবিত্র রক্তে রাঙা।

পদ্মা, মেঘনা, যমুনায়
আজও রক্তস্রোত বহমান—
এই স্বাধীনতা তোমাদের দান।

বধ্যভূমির মাটি আজও সাক্ষ্য দেয়,
অতন্দ্র প্রহরী আজও জাগে সেথায়, 
জ্বলে শিখা চিরন্তনী, আমরা পাহারায়।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন