https://www.prothomalony.com/
15625
literature
বিজয়ের মাসে কবি, কবিতাপ্রেমী পাঠকগণ সহ সকলকে আমাদের প্রাণময় শুভেচ্ছা! দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে স্বাধীনতার লড়াইয়ে যাঁরা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, যে মা-বোনেরা সর্বোচ্চ সম্মান হানির শিকার হয়েছেন, নতমস্তকে আমরা তাঁদেরকে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদেরকে।
পশ্চিমের দেশসমূহে এবছর শীতের তীব্রতা আগাম সূচনা জানিয়ে দিচ্ছে। ডিসেম্বর সংখ্যায় বিষয় নির্দ্ধারিত না থাকলেও ‘কবিতার একপাতা’র কবিরা কেউ কেউ শীতের কষ্ট ও সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন কবিতায়। আশা করি, কবিতাগুলি আপনাদেরকে পাঠ আনন্দ দেবে।
ফারুক ফয়সল
শীতে ঈশ্বর উষ্ণতা খোঁজেন
আলী সিদ্দিকী
গাছের পাতাদের মৃত্যু সংবাদ নিয়ে আসে শীত
পথেঘাটে মাঠে ময়দানে
মড়কগ্রস্ত মরাপাতারা কুঁকড়ে পড়ে থাকে
শেষকৃত্যহীন
কাঠবিড়ালি লেজ নাচিয়ে পরখ করে শীতের সঞ্চয়
পাখির আনাগোনায় বাড়তে থাকে বিরতি
দাঁতালো বাতাস মেতে ওঠে কামড়ের মহোৎসবে
আমরা বুকের বোতাম খুলে উচ্ছ্বল হবার জামাগুলো
চালান করি বাৎসরিক উষ্ণ দেরাজে
চুলদাড়ি লম্বা করে বাতাসের ঝাপটা ঠেকাতে
মেতে উঠি মিথ্যা প্রয়াসে
রতিক্রিয়া আর প্রজননের ধুম লেগে যায় ঘরে ঘরে
শীত এলে ঘর গরম করার যন্ত্রগুলো হয়ে ওঠে সক্রিয়
ধূমায়িত কফি কাপ ছড়ায় মনোরম ঘ্রাণ
শীতে গৃহহীন মানুষ ঠাঁই নেয় পরিত্যক্ত জায়গায়
ঈশ্বর উষ্ণতার লোভে নিরাপদ ঘরে ঘুমাতে যান।
যতিচিহ্নহীন
রেজাউদ্দিন স্টালিন
সেইদিন কপোতাক্ষের
সাগরদাঁড়ির সেইদিন
বঙ্গভাষার সূর্য সংক্রমিত দিন
অমিত্রাক্ষর কূলপ্লাবী অন্তরাবধি
মেঘনাদের মৃত্যুদগ্ধ দিন
বিভীষণের বিভীষিকা ছড়ানো দিন
রৌরব বিছানো রাবণের শয্যাপথ
আর প্রত্যাবর্তনের পথে সীতার কাব্যগাঁথা
আর হংসযূথ রামের বিমান
আর লক্ষ্মণরেখা ভাঙা সীতার
প্রণয়লগ্ন দিন
নিকষাসতীর গর্ভে মধুসূদনের দিন
পাথরের শেকলে গাঁথা কপোতাক্ষের দিন
লঙ্কার পরাভবসিক্ত চোখ
সেই অগণিত আর্ত চিৎকার
আর বিনীত শিলালিপি মহাকাব্যের
পথিকের বিস্ময়ভরা দিন
জাহ্নবীর অগ্নি-জৃম্ভণ রাজনারায়ণের ক্রোধান্ধ দিন
সেই দিন সাগরদাঁড়ির
মহাবেদনার যতিচিহ্নহীন
শোকার্ত ডানায় রোদের উষ্ণতা
হোসাইন কবির
পাখিরা আকাশে ওড়ে
ভেসে বেড়ায়
পৃথিবীর কোলাহল দেখে–
নিবিড় নিস্তব্ধতায়
জলে-স্থলে অন্তরীক্ষে
শাসন-বারণ, বিধিনিষেধের দেয়াল–
নিরাপত্তা নজরদারি– নতুন বাস্তবতা
তবু পাখিরা আকাশে ওড়ে
আমরাও তাই
পাখি হতে চাই, পাখি হয়ে যাই
পরিযায়ী পাখি–
দূরে, দূরবর্তী সীমান্তরেখায়
তবে শীত এলে
কোনো এক শিশু পাখির–
শোকার্ত ডানায়– রোদের উষ্ণতা পেতে
আমরাও উড়ে যেতে চাই–
আলোর সুদীর্ঘ ছায়ায়
পৃথিবীতে শীত আসে
হেমন্তের পাতাঝরার বেদনার গানে
হিম নিঃসঙ্গতায়—
পাখিরা আকাশে ওড়ে
ভেসে বেড়ায়
পৃথিবীর কোলাহল দেখে–
নিবিড় নিস্তব্ধতায়
ট্রেন—‘ব্রহ্মপুত্র’
শিহাব শাহরিয়ার
তুমি ময়ুরাক্ষী নদী
আমি কপোতাক্ষ নদ
তুমি জলকেলি করো
আমি ডুব সাঁতার খেলি
তুমি রাত জাগো
আমি দিন দেখি
তুমি লিপিস্টিক দাও ঠোঁটে
আমি আটকা পড়ি লিফটে
তুমি হিউস্টনে হাঁটো, লং-ড্রাইভে যাও
আমি সান্তিয়াগোতে স্পেনিশ সুর শুনি
তুমি বুড়িগঙ্গার কথা মনে করে বুড়িয়ে যাও
আমি ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে শ্মশানের চিহ্ন খুঁজি
‘ব্রহ্মপুত্র’ ট্রেনে...
রাতে—আমাদের নান্দিনায় নামবার কথা ছিল?
ভুলে যেতে চাই
মনিজা রহমান
হরিণ কিংবা শিম্পাঞ্জি নয়, মানুষেরা হাঁটলেই পথ হয়ে যায়
অথচ পথ মানুষকে চেনে না
দ্বিতীয়বার হেঁটে গেলেও চিনতে পারে না
কত যাযাবর হেঁটে যায়, কার পদচিহ্ন মনে রাখে পথ?
কত আলো জেগে থাকে অন্ধকার বুকে নিয়ে –
বুকের ভেতর নিঃশব্দ অন্ধকার তা জানে না।
উত্তাপ কি মনে রাখে শীতের প্রার্থনা?
একটু উষ্ণতার জন্য শীতের আকুতি?
শীতও ভুলে যায় আগুনের ঋণ।
মানুষের দুর্লভ গুণ- সে সহজেই বিস্মৃত হতে পারে।
আমিও ভুলে যেতে চাই জুতোহীন হিমশৈল দিন
ভুলে যেতে চাই অন্ধকারের মুখোশধারি কষ্টগুলো
ওরা আমাকে নিঃস্বপ্ন জাগিয়ে রাখে শীতার্ত রাতে
জেগে থেকে পথ হাঁটি একা একা স্মৃতিহীন।
তোমারে ভুলিয়া
স্বপ্ন কুমার
হয়েছি ফতুর আমি
হয়েছি বিনাশ
আবার উঠিব ভাসি
নাই কোনো আশ
আবার উঠিব পাড়ে
উঠিব দাঁড়াই
নিশ্চত জানি তার
কোনো আশা নাই
তোমারে ভুলিয়া দেখো
তোমারে ভুলিয়া…
হয়েছি বিনাশ আমি
হয়েছি ফতুর
তোমারে ভুলিয়া চলে
গেছি বহু দূর
এতদূর চলে গেছি
এত দূরে আর
কোনো আশা দেখি নাতো
আবার ফেরার
তোমারে ভুলিয়া দেখো
তোমারে ভুলিয়া…
সিজনাল ব্লুজ
রওশন হাসান
এ শহরে উইন্টার নেমে আসে, নামে মন্থর—
ঘ্রাণহীন মৌন যেন কোন বার্ধক্য বাড়ির
সুদূরে থেমে যাওয়া জলাধার।
বেজে ওঠা অ্যালার্মে উধাও স্বপ্ন
ঘুম ভেঙে কে ডেকেছিলো অনাহূত
আশ্রয়ী পাখির কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে—
যে পাখি আসেনি ফিরে পুরনো সঙ্গীতে l
জানালার শার্শিতে বাতাস গোণে
অতন্দ্র কুয়াশার ভেজা ভেজা সম্পাত রেখা ।
ট্রেনের সাইরেন, সাবধানী জনপদ
স্ট্রীটে, স্টেশনে বিচলিত চোখ
তবুও নীরবে চেনা পথে খুঁজে ফেরে কেউ—
চিবুকের কাছে জিজ্ঞাসা
অবসাদ বিভ্রম, নিঃশব্দ কফির উত্তাপ ।
পাতাহীন ডালে ডালে মৃত কোরকের দীর্ঘ
শূন্যতা যেন অদৃশ্য মরণাস্ত্র
আকাশের পানে চেয়ে কবি—
খুঁজে পায় জমাট সংঘাত রুখে দেয়া হাতিয়ার।
এ শহর ভেজে শীতের উত্তাপে
উদয় শংকর দুর্জয়
ধূসর আকাশ ভেঙে আসে, বৃষ্টি কি কুয়াশা কি তুষার মিলে যায় পাবের
বেহালা বাদকের সুরে। সাথে থাকা গোল্ডাডোর মাথা গুঁজে শুয়ে থাকে।
ফায়ারফক্স থেকে ব্রাউজ করা ফক্স আর ভিক্সেনের লুটোপাটি দেখতে দেখতে
ফায়ারপ্লেসের স্ফুলিঙ্গ মনে করিয়ে দেয় শুভ্রতা জড়ানো শৈশব। এখানে শুভ্রতা শুষে
অন্ধকার নামে। শহর আরো প্রজ্জ্বলিত হয় যতটা রাত গভীর হয়। রাজনীতিহীন,
উপদেশহীন বিশ্বসংসার, নেই বিভেদ, নেই অহমিকা, নেই কোনো রেইসের ঘোড়া।
ক্যাম্ব্রিকের ভোর, সারি সারি এলইডি, আঁধারভেদী আলোকযান হালকা রঙের পোজ
ফেলে ছোটে। ক্যারামেল কফি থেকে স্কচের টেক্সার চিনে মধ্যবয়সী সেনোরিতা
আবার কার প্রেমে পড়ে, এ খবর রাখে কি শহর! এ শহর ভেজে শীতের উত্তাপে
কোষের পরমাণুতে ঢালে কাচের গুড়ো। কারো জন্য কেউ থাকে না অপেক্ষায়
তবু শূণ্য পড়ে থাকে ঘর।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন